• সোমবার, নভেম্বর ১৮, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:৩১ রাত

হেমন্ত, শেষ বিকেল এবং শীর্ষেন্দু... (পর্ব-২)

  • প্রকাশিত ০৮:৪০ রাত নভেম্বর ১৩, ২০১৮
দুই বাংলার সবচেয়ে প্রিয় কথাসাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। ছবি: রাজীব ধর
দুই বাংলার সবচেয়ে প্রিয় কথাসাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। ছবি: রাজীব ধর

"একটু ধৈর্য ধরতে হবে। সাংস্কৃতিক জিনিস জোর করে চাপানো যায় না"

(প্রথম পর্বের পর)

এরপরেই আলোচনা উন্মুক্ত করে দেয়া হয় প্রশ্নোত্তর পর্বের জন্য।

দর্শকদের মধ্যে থেকে একজনের প্রশ্ন আসে শীর্ষেন্দুর লেখা ‘ঔষধ’ এবং শেক্সপিয়ারের ‘মুখরা রমণী বশীকরণ নিয়ে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে, নারীবাদী সমাজে ‘ঔষধ’ লেখাটার পর প্রতিক্রিয়াটা কেমন ছিল? 

শীর্ষেন্দু যেন বেশ মজা পেলেন এই প্রশ্নে, জবাবে বললেন, ‘এটা তো খুব নারীবিরোধী লেখা বলে তারা মনে করে! আমাকে প্রায় পেটানোর আয়োজন করেছিল। আমি ক্ষমা চেয়েছি, আসলে এই ‘ওষুধ’টাকে সত্যিকারের ওষুধ বলবো না। আসলে আমি স্বামী-স্ত্রীর মিলনটা দেখাতে চেয়েছিলাম। সেটা করতে গিয়ে আমাকে একটু বাঁকাপথ অবলম্বন করতে হয়েছিল। আমার বিরুদ্ধে মিছিল করার কথাও ছিল কিন্তু শেষ অবধি আর করেনি” বলে খুব হেসে বললেন, “আমাকে থ্রেট করেছিল, আমি ঠিক হয়ে গেছি। এখন আর ওরকম কিছু লেখি না। আমি ভালো ছেলে হয়ে গেছি”।

আরেক দর্শকের প্রশ্ন ছিল, বাংলাদেশে পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের এত গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে, কিন্তু সেখানে এখানকার লেখকদের কোনও গুরুত্ব নেই, কেন? 

লেখকের সহজ-সরল স্বীকারোক্তি, “এটা একটা ফ্যাক্ট”, বলে তিনি বললেন, “ কিন্তু মিলনের লেখা কিন্তু গুরুত্ব পায়। পাঠক যে লেখা পড়ছে না এমনটি নয়। অনেকেই বসে থাকে, লেখা চলে না। এই জিনিস কিন্তু আমরা সেখানেও দেখতে পাই। পাঠক কমছে, কিন্তু কোনও কোনও ক্ষেত্রে, সব জায়গায় নয়। কাজেই এটা নিয়ে দুঃখ করার চেয়ে আমার কাছে মনে হয় বাংলাদেশের সব লেখকই ধীরে ধীরে সম্মানিত হবে”।

তবে তিনি যে ইউটিউবে বাংলাদেশি নাটক দেখেন, জানান সে কথা। বললেন, “ইউটিউবে সুন্দর সুন্দর বাংলাদেশি নাটক আছে। এখানকার টিভি চ্যানেল ওখানে দেখানো হয় না। তাই পশ্চিমবঙ্গের ছেলেমেয়ে দেখতে পারে না। আমি কিন্তু ইউটিউবে বাংলাদেশের নাটক দেখি। নাটকের গল্পগুলো খুব চমৎকার এবং মিষ্টি। আমার নিজেরও রোমান্টিক মিষ্টি গল্প পছন্দ। কাজেই এগুলো আস্তে আস্তে আদান প্রদানের মাধ্যমে হবে। একটু ধৈর্য ধরতে হবে। সাংস্কৃতিক জিনিস জোর করে চাপানো যায় না। ভালো কাজ করতে করতে সেই কাজ গৃহীত হবে। এই বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই”।

কথার পিঠে কথা, আর তাঁর পার্থিব-যাও পাখি-মানবজমিন-ঘুণপোকা-বাঙালের আমেরিকা দর্শন নিয়ে গল্প করতে করতে হঠাৎ কখন যে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে, সন্ধ্যাও শেষের পথে- সেদিকে কারো খেয়াল নেই। তবু কথা কি আর থামতে চায়? মনে হয়, আরেকটু থাকুন প্রিয় লেখক, আরেকটু হোক কথা। 

কিন্তু সময় হয়ে গেছে, প্রিয় লেখককে যেতে দিতে হবে।

‘যেতে নাহি দিতে চাই, তবু যেতে দিতে হয়’। তা-ই দিতে হল। প্রস্থান করলেন প্রিয় ঔপন্যাসিক আরেকবার এপারের বাংলার ভক্তদের মাঝে ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে। 

তিনি চলে যাচ্ছেন। তাঁর পেছন পেছন ছুটছে তাঁর ভক্তরা। প্রিয় লেখকের একটা অটোগ্রাফ যে তাঁরই বইতে নিতেই হবে! হয়তো ভুতগুলোও ছিল। হয়তো অটোগ্রাফ, কিম্বা কৌতূহল থেকে। ভুত বলে কি কৌতূহল হবেনা? 

তিনি হয়তো বলেছেন, তিনি নিজের জন্যই লেখেন। তা লেখেন তিনি। কিন্তু লেখার সময় ভক্তদের এই নিখাদ ভালোবাসাগুলোই তাঁকে প্রেরণা দেয় তাঁর কলম চালিয়ে যাওয়ার। আর হয়তো ভুতগুলোও চায় মানুষের সাথে একটা খোশমেজাজ সন্ধিতে আসতে তাঁর কলমের খোঁচাতেই।