• বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ১৪, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:৩৮ রাত

'ইতিহাস আমাদের সাহায্য করে অতীতকে পুনরায় কল্পনা করতে'

  • প্রকাশিত ১০:২১ রাত নভেম্বর ৫, ২০১৯
জয়শ্রী মিশ্র
জয়শ্রী মিশ্র। ছবি: ঢাকা ট্রিবিউন

ভারতের প্রখ্যাত লেখক জয়শ্রী মিশ্র কথা বলেছেন লেখালেখিতে তার অনুপ্রেরণা ও ঐতিহাসিক ফিকশন সম্পর্কে নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে

ভারতে নারী লেখকদের মধ্যে অন্যতম গুরত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর জয়শ্রী মিশ্র। তার প্রথম উপন্যাস 'অ্যানসিয়েন্ট প্রমিসেস' ছিল ভারতের একটি বেস্টসেলার এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ইংরেজি সাহিত্যে ব্যাপকভাবে এটি পড়ানো হয়। তার অনবদ্য কির্তী সিক্রেটস টেট্রালজি  ছাড়াও রয়েছে রানি, আফটারওয়ার্ডস, আ লাভ স্টোরি ফর মাই সিস্টার, অ্যাকসিডেন্টস লাইক লাভ অ্যান্ড মারেজ এর মতো কাজগুলো। এই সাক্ষাৎকারে তিনি কথা বলেছেন তার 'আ হাউস ফর মি. মিশ্র নিয়ে'। এছাড়া লেখালেখিতে তার অনুপ্রেরণা ও ঐতিহাসিক ফিকশন সম্পর্কে নিজের অভিজ্ঞতা নিয়েও আলাপ করেছেন। 

আপনার উইকিপিডিয়া পেইজে বেশ অদ্ভুত একটি মন্তব্য আছে যে আপনি "সাহিত্য উৎসবে আগ্রহী" ব্যক্তি। তো ঢাকা লিট ফেস্টের সঙ্গে অন্য সাহিত্য উৎসবের কী পার্থক্য আপনি দেখছেন?

আমি আসলে একজন অতি আগ্রহী ব্যক্তি কিন্তু আমি কোনো সাহিত্য উৎসবে যাওয়ার আগে বেশ দ্বিধায় পড়ে যাই, বিশেষ করে যদি এটি দূরে কোথাও হয়। ঢাকা লিট ফেস্টে যাওয়ার ক্ষেত্রেও একটু অনিশ্চিত ছিলাম কারণ এটি ইংল্যান্ড থেকে বেশ দূরে। সে যাই হোক, যখন থেকে আমি এখানে এসে নেমেছি, আপনি আপনাকে খুশি করার জন্য বলছি না, এটি সত্যিই আমার জন্য এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। আমি সম্ভবত এই উৎসবের উৎকর্ষের সেরা সময়টিতে এসেছি। কীভাবে এরকম একটি ইভেন্ট করা যায় তা নিয়ে এর আগের বছরগুলোতে তারা চেষ্টা চালাচ্ছিল। প্রথম দিককার প্রতিবন্ধকতাগুলো তারা নিশ্চয়ই এর মধ্যে কাটিয়ে উঠেছেন। এটি আসলেই বেশ গোছানো, ঘরোয়া ও আন্তরিকভাবে আয়োজিত হচ্ছে। যথাযথ স্বেচ্ছাসেবী ও নিরাপত্তা প্রদান করা হয়েছে। বড় পরিসরের উৎসব এর চেয়ে তাড়াহুড়োয় হয় ও এত নিরুদ্বিগ্ন হয় না। এই মূহুর্তে এটি খুবই আনন্দময় লাগছে। 

আপনি আপনার প্যানেলে যেমন বলেছেন, 'প্রকৃত ঐতিহাসিক নয়' এমন ব্যক্তিদের দ্বারা ইতিহাস বিষয়ক কাজ হচ্ছে যে কারণে কিছু মানুষ এতে বিরক্ত। এক্ষেত্রে আপনার উপন্যাসে ইতিহাসকে আপনি যেভাবে তুলে ধরেন তা নিয়ে আপনার কি কিছু বলার আছে? 

ভালো প্রশ্ন, কারণ ঐতিহাসিকরা সাধারণত বেশ বিরক্ত হন যখন একজন ঐতিহাসিক নয় এমন ব্যক্তি এসে ইতিহাস লেখা শুরু করেন, তা সে ঐতিহাসিক ফিকশন, ন্যারেটিভ নন-ফিকশন অথবা স্রেফ নন-ফিকশনই হোক। আমি বুঝতে পারি কোথায় তাদের হতাশা কাজ করেছে কারণ তারা নিজেদের বিষয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু আমার মনে হয় ইতিহাসের জ্ঞান জানার জন্য আমরা যদি শুধু ঐতিহাসিকদের উপরেই নির্ভর করি তাহলে এটি বেশ সংকীর্ণ একটি ব্যাপার হবে। তাদের যা করতে হবে তা হলো একে অপরকে খুশি করা, সহকর্মী ঐতিহাসিকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হবে এরকমভাবে ইতিহাস লেখা এবং এরপর যা থাকবে সেগুলো হল সাধারণ পাঠকদের জন্য। আমি এরকমই দেখে আসছি যতক্ষণ না পর্যন্ত আমি ইংল্যান্ডে ঐতিহাসিক ফিকশন লেখকদের আবিষ্কার করেছি। সেখানে এটি বেশ জনপ্রিয় জনরা। আমি রানি লেখার আগ পর্যন্ত ভারতে ঐতিহাসিক উপন্যাস শৈশব পর্যায়েই ছিল, এখন অবশ্য আরও লেখকরা আসছেন এই জনরাটি নিয়ে কাজ করতে।  

আমি যখন আপনার বই আ হাউস ফর মি. মিশ্র  সম্পর্কে প্রথম শুনেছি আমার প্রথমেই মনে পড়েছে নাইপলের আ হাউস ফর মি. বিশ্বাস এর শিরোনামটির কথা। 

একেবারেই তা না!

তো আপনার অনুপ্রেরণা কারা, সাহিত্য উৎসবে আপনি কার ভক্ত? 

নিঃসন্দেহে নাইপল না। তার লেখা নারীদের প্রতি খুব সহমর্মী নয়, এবং আমি বেশ শীঘ্রই তার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছি। আমি শুধু শিরোনামটি চুরি করেছি কারণ আমার চুরি করতে মনে হয়েছে! আ হাউস ফর মি. মিশ্র  সত্য ঘটনার অবলম্বনে লেখা, এটি আমার প্রথম নন-ফিকশন বই। আমার সবচেয়ে বড় সাহিত্যিক 'হিরো' হলেন, নিঃসন্দেহে, বিক্রম শেঠ, কারণ তার বৈচিত্র্যময় বইয়ের কারণে। তিনি যে কোনো কিছু করতে পারেন- শিশুদের বই, পরিবারের কথকথা, মহাকাব্য যে নামই বলুন না কেন! আমি মাঝে মধ্যে তাকে অনুকরণ করার চেষ্টা করি, কিন্তু কারোর পক্ষেই এমন মাথা ঘুরানো উচ্চতায় যাওয়া সম্ভব নয়। 

বৈচিত্র্যের প্রসঙ্গে, আপনি যেমনটা বললেন, বিক্রম শেঠ যে কোনো কিছু করতে পারেন, আপনি নিজে কি সাহিত্যের অন্যান্য ধারা নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করেছেন, অথবা ধরুন অন্য বিশেষ ধারা যেমন সায়েন্স ফিকশন বা ডিসটোপিয়া? 

আমার মনে হয় না আমি এটি খুব ভাল পারব। আমি আজকের সেশনের জন্য নারীরা সাধারণত যে ধরণের জনরা নিয়ে লেখালেখি করেন সেগুলো নিয়ে চিন্তা করছিলাম। সামিয়া (প্যানেলের সমন্বয়ক) লেখালেখি এবং প্রকাশনায় জেন্ডার ইস্যু নিয়ে কথা বলছিলেন। সায়েন্স ফিকশন, ডিসটোপিয়া এসব জনরাতে নারীদের উপস্থিতি খুব কম। অবশ্যই, মার্গারেট অ্যাটউড এবং উরসুলা কে. লে গুইনের মতো লেখকরাও আছেন যারা অগ্রদূত। ভারতের প্রেক্ষাপটে, সাধারনত খুব কম নারীই এ জায়গায় কাজ করছেন। পুরুষদের দ্বারা ডিসটোপিয়ান পরিবেশে নারী চরিত্রের অঙ্কন হয়েছে, সেখানে নারীদের সমস্যা উঠে আসেনি। একজন পুরুষ লেখক আসলে এসব সমস্যা সম্পর্কে ভাববেনই না। তারা শুধু ডিসটোপিয়ান প্রেক্ষাপটে একজন নারীকে যোগ করেন এবং বলেন, 'ঠিক আছে এই নাও'। শুধুমাত্র নারী লেখকই সম্ভবত অন্তত এ সমস্যা নিয়ে একটু চিন্তা করবেন। এই দৃষ্টিকোন থেকে, আমার মনে হয় ভবিষ্যতে ডিসটোপিয়ান ফিকশন লেখায় আমি হাত দেব। 

তরুণ লেখকরা যারা ঐতিহাসিক ফিকশন লিখতে চান তাদের প্রতি আপনি কী উপদেশ দেবেন?

আমার উপদেশ হলো- লিখ না। উপমহাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সৃষ্টিশীল স্বাধীনতার চর্চা করা ভীষণ কঠিন হয়ে পড়েছে। আমার বই নিষিদ্ধ হয়েছিল, উত্তর প্রদেশে এ নিয়ে অনেক অশান্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, এবং ঐতিহাসিক ফিকশন লেখার ক্ষেত্রে একজন লেখকের ওপর সহজেই ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ আনা যায়। যাহোক, যদি কেউ আসলেই এই কাজ করতে মনস্থির করে তাহলে আমি পরামর্শ দেব- গভীর গবেষণা করতে, মাঝে মাঝে ইতিহাসের বাঁকগুলো থেকে কল্পনা করে চরিত্রগুলোকে বিভিন্ন ভূমিকায় দাঁড় করাতে। আমার বইতে রানি লক্ষী বাঈ শুধু একজন রাষ্ট্রনায়ক বা সামরিক ব্যক্তিত্বই নন, সে ছিলেন একজন তরুণী, তরুণী বধূ এবং বিধবা। অন্যান্য আর দশটা মানুষের মতোই সে একজন মানুষ ছিলেন। ঐতিহাসিক ফিকশনের উদ্দেশ্য ইতিহাস শেখানো নয়; বরং, অতীতকে পুনরায় কল্পনা করতে এটি সাহায্য করে। 

সাক্ষাৎকারটি ২০১৮ সালের ঢাকা লিট ফেস্টের সময়ে নেওয়া