• বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ১৩, ২০১৮
  • সর্বশেষ আপডেট : ১২:০৭ রাত

সিঙ্গেল ডিজিট সুদের সিদ্ধান্ত বিএবির।

  • প্রকাশিত ০৬:০৮ সন্ধ্যা জুন ২৫, ২০১৮
money-bab-1529928163037.jpg
সুদের হারে ঋণের জন্য ৯% পর্যন্ত এবং আমানতের উপর ৬% পর্যন্ত কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে (বিএবি)।কার্যকর হবে ১লা জুলাই থেকে।

সুদের হারে ঋণের জন্য ৯% পর্যন্ত এবং আমানতের উপর ৬%  পর্যন্ত কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ ব্যাঙ্কার্স (বিএবি)। নতুন সুদের হার নিয়ে এই সিদ্ধান্ত ১লা জুলাই থেকে কার্যকর হবে।

১১ থেকে ১২ শতাংশ সুদ অফার (প্রস্তাব) করেও গ্রাহকের কাছ থেকে যখন কোনও কোনও ব্যাঙ্ক আমানত পাচ্ছে না ঠিক সে সময় নতুন গ্রাহকদের কাছ থেকে ৬ শতাংশ সুদে আমানত সংগ্রহ করতে যাচ্ছে বেসরকারি ব্যাংকগুলো। আগামী ১ জুলাই থেকে ব্যাংক ঋণে সুদ হার সিঙ্গেল ডিজিট তথা এক অঙ্কে (৯ শতাংশ) নামিয়ে আনতে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে বেসরকারি ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স (বিএবি)।

সুদের হারে এই হ্রাসের ঋণাত্মক দিক সম্পর্কে সতর্ক করতে বিশেষজ্ঞরা জানান, এই হ্রাস গ্রাহকদের ব্যাংকে টাকা জমা রাখতে অনুৎসাহিত করবে। শুধু তাই নয়, এর ফলশ্রুতিতে তারল্য সঙ্কটও তীব্র আকার ধারন করবে। যদিও ব্যবসায়ীদের মতে এই পদক্ষেপ বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম জানান এর ফলে ব্যাংকগুলোতে নগদ টাকার সংকট আরও বাড়তে পারে। সংবাদ মাধ্যমকে দেয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘আমানতে সুদ হার কমানোর সিদ্ধান্ত গ্রাহকদের ব্যাংকবিমুখ করবে। নতুন করে কেউ হয়তো ব্যাংকে টাকা রাখতে চাইবে না। অনেকে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে সঞ্চয়পত্র অথবা ঝুঁকিপূর্ণ অন্যান্য খাতে বিনিয়োগ করবে।’

তিনি আরও মনে করেন, আমানতকারীদের ক্ষতি না করে বরং ঋণ এবং আমানতের সুদ হারের ব্যবধান (স্প্রেড) কমানোর মাধ্যমে ঋণে সুদ হার এক অঙ্কে নামানো যেত। তার মতে, ব্যাংক খাতে এমনিতেই আমানতের প্রবৃদ্ধি কিছুটা কমে গেছে। নতুন করে আমানতে সুদ কমানো হলে ব্যাংকগুলো আরও তারল্য সংকটের সম্মুখীন হবে। এতে করে সুদের হার কমানোর যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, সেটাও ভেস্তে যেতে পারে।  তিনি বলেন, ‘কেবল ঋণে সুদ কমালেই হবে না, ঋণের টাকা উৎপাদনশীল খাতে যাচ্ছে কিনা সেটাও দেখতে হবে।’

ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) সভাপতি ও এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার বলেন, ‘নতুন আমানত নেওয়ার ক্ষেত্রে আমরা ৬ শতাংশ বেঁধে দিয়েছি। এতে পুরনো আমানতকারীদের কোনও সমস্যা হবে না।’ তিনি বলেন, ‘সুদের হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার জন্য আমরা ব্যাংকের মালিকরা চেষ্টা করছি। ব্যাংকের এমডিরা চেষ্টা করছেন। সরকারও চেষ্টা করছে।’ 

তবে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সানেমের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলছেন, ‘আমানতের সুদ কমে গেলে কেবল নতুন গ্রাহকই নয়, ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন পুরনো আমানতকারীরাও।’ তিনি বলেন, ‘ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণ যদি সত্যিকার অর্থে অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখে তাহলে আমানতে সুদ কমলেও ক্ষতি নেই।’

সেলিম রায়হানের মতে, যেহেতু ব্যাংক খাতে সুশাসন নেই, ফলে যেসব উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, তাতে ব্যাংক খাতে সংকট আরও গভীর হতে পারে।

তিনি বলেন,‘সুদ হার কমাতে চাইলেই যে কমবে, তা নয়। কোনও কিছু চাপানো হলে সেটা হবে বাজার অর্থনীতির পরিপন্থী। ঋণের সুদ কমাতে গিয়ে যে জোর করে আমানতের সুদ কমানো হচ্ছে, তাতে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’ ব্যাংকিং খাত নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে যে সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয়েছে, তাতে সংকট কাটবে না বলে মন্তব্য করেন সেলিম রায়হান।

এদিকে, সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংক খাতের আমানত ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত বছরের ডিসেম্বর থেকে এ বছরের মার্চ— এই ৪ মাসে ব্যাংক খাত থেকে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে ব্যাংক খাতে জনগণের  আমানতের পরিমাণ ছিল ৯ লাখ ২৬ হাজার ১৭৯ কোটি টাকা। ৩ মাস পর অর্থাৎ মার্চ শেষে আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ২৫ হাজার ২৭৯ কোটি টাকা।

একদিকে আমানত আসছে না, অন্যদিকে ঋণ ঠিকই বিতরণ করা হচ্ছে। এর ফলে ব্যাংক খাতে নগদ টাকার সংকট দেখা দিয়েছে বলে ব্যাংক কর্মকতারা জানিয়েছেন। 

ব্যাংকের আমানতের একটা বড় অংশ আসে ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীদের কাছ থেকে। দেশে মোট ৫৭টি ব্যাংকে আমানত রাখা অ্যাকাউন্টধারীর সংখ্যা ১০ কোটি। এই ১০ কোটি মানুষের আমানত নিয়েই মূলত ব্যাংক ব্যবসা করছেন পরিচালকরা। 

মজার বিষয়, ব্যাংকিং খাতের কোনও কোনও উদ্যোক্তা এক ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে আরেক ব্যাংকের মালিকও হয়েছেন। আবার কেউ কেউ বিনিয়োগ করা টাকার চেয়েও কয়েকগুণ বেশি অর্থ তুলে নিয়েছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতে পরিচালকদের বিনিয়োগ মাত্র ৪৬ হাজার ১২৪ কোটি টাকা, অথচ ব্যাংক থেকে ঋণ হিসেবে তুলে নিয়েছেন ১ লাখ ৪৩ হাজার ৭০৭ কোটি টাকা। 

এই সুদের হার কমানোর আশ্বাসে ব্যাংক মালিকদের দেওয়া হচ্ছে নতুন নতুন ছাড়। আর এরই সুযোগ নিয়ে এ বছরের শুরুতে সুদের হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার কথা বলে ইতোমধ্যে ৪ ধরনের সুবিধা নিয়েছেন বেসরকারি ব্যাংকের মালিকরাএবং চলতি অর্থবছরে আরও ৩ ধরনের সুবিধা পেতে যাচ্ছেন তারা। প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যাংকের কর্পোরেট কর আড়াই শতাংশ কমিয়ে দেওয়ারও প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।  

উল্লেখ্য, বর্তমানে ব্যবসায়ীদের উচ্চ সুদে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে। এতে ব্যবসার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন তারা। এ পরিস্থিতিতে বিএবি এই সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় গ্রহন করেছে।  এই সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য শিল্পের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি, নতুন উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাণিজ্য বাড়ানো।