• শুক্রবার, ডিসেম্বর ১৩, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ০১:৪১ দুপুর

ঈদ সামনে রেখে সৈয়দপুরে কারচুপি শিল্পীদের ব্যস্ততা

  • প্রকাশিত ১১:৫৫ সকাল মে ২০, ২০১৯
কারচুপি
মাহে রমজানে স্কুল বন্ধের সুযোগে কাপড়ে কারচুপি বসানো কাজে যোগ দিয়েছেন ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী প্রিয়া। ছবি: ফাইল ছবি

কারচুপির উপকরণ চীন থেকে আমদানি করা হয়। আর ভারত থেকে আনা হয় কাপড়। চাহিদা বাড়লে এসব পণ্যের দামও বাড়ে। ঈদের বাজারকে সামাল দিতে কম লাভ হলেও আমাদের শ্রমিকেরা কারচুপির কাজে ব্যস্ত থাকেন।

নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলায় নারী শ্রমিকের তৈরি চুমকি (কারচুপি) বসানো পোশাক যাচ্ছে ঢাকাসহ সারা দেশের ঈদের বাজারে। এসব পোশাকের মধ্যে রয়েছে, কারচুপির শাড়ি, লেহেঙ্গা, থ্রি-পিস ও ওড়না। 

সৈয়দপুর শহরের প্রায় ২০ হাজার নারী ঘরে বসে চালিয়ে যাচ্ছেন কারচুপির এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। রোজার ছুটিতে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও এই সুযোগে বাড়তি আয়ের আশায় ঝুঁকে পড়ছে কারচুপির বা কাপড়ে চুমকি বসানোর কাজে।

উপজেলা শহরের কাজিহাট, মুন্সিপাড়া, মিস্ত্রিপাড়া,ঢেলাপীর,বাঁশবাড়ী, হাতখানা, নতুন বাবুপাড়া, ইসলামবাগ, গোলাহাট, রসুলপুর, বার্মাসেল প্রভৃতি মহল্লার বাসা বাড়িতে চলছে কারচুপি বা চুমকি বসানো পোশাক তৈরির হিড়িক।

উপজেলার ঢেলাপীরের পাশেই উত্তরা আবাসন ঘুরে দেখা গেছে, শত শত নারীসহ স্কুল-কলেজ শিক্ষার্থীরাও কাপড়ে কারচুপি বসাচ্ছেন। বিশেষ ফ্রেমে করে (পেতে) তাতে টান টান করে কাপড় বসিয়ে গুরত্বসহকারে আপনমনে কারচুপি বসিয়ে যাচ্ছেন তারা।

কথা হয় উত্তরা আবাসনে স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী প্রিয়ার সাথে। ওই শিক্ষার্থী বলেন, আসছে ঈদ ও রোজা উপলক্ষে স্কুল ছুটি (বন্ধ)। তাই মায়ের সাথে কারচুপির কাজে জড়িয়ে পড়েছি। এতে বাড়তি কিছু আয় হবে ও কাজের অভিজ্ঞতা বাড়বে।

প্রিয়া জানায়, ঈদে কারচুপির কাজ করে ৮-১০ হাজার টাকা আয় করবে সে। যা দিয়ে মা, বাবা-ভাইবোনের জন্য কিনবে ঈদ উপহার।

একই এলাকার কারচুপি শিল্পী ও হোটেল শ্রমিক আমিনুর রহমানের স্ত্রী পারভিন আক্তার (৩৩), তার মেয়ে বৃষ্টি (১৫) ও ঝর্ণাকে  (১৩) নিয়ে কাপড়ে চুমকি বসানো কাজ করছেন। 

পারভিন আক্তার বলেন, সারা বছরই কারচুপির কাজ চলে। তবে ঈদ এলে এর কাজের চাপ বেড়ে যায়। রোজার মাসে স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকে। এ সুযোগে মেয়েদেরও সঙ্গে নিয়েছি। কারচুপির কাজ করে তারাও বাড়তি আয় করবে।

একই গ্রামের মোক্তার আলী পেশায় কুলি, স্ত্রী নাছিমা বেগম (৪৮) সংসারে বাড়তি আয়ের আশায় প্রায় ১০ বছর ধরে কারচুপি বসানোর কাজ করছেন। 

নাছিমা বেগম বলেন, পাঁচ মেয়ে-ছেলের সংসারে ভালই চলে। দুইজনের আয় দিয়ে দুই মেয়ে লেখাপড়া করছে। বড় মেয়ে মুক্তা আকতার এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে ও ছোট মেয়ে মরিয়ম নবম শ্রেণিতে পড়ে।

কারচুপি শিল্পী শাহেদা আশরাফী (৫৯) বলেন, এ কাজে সৈয়দপুরের শ্রমিকেরা খুবই দক্ষ। তাই ঢাকা থেকে প্রচুর অর্ডার আসে।  প্রতি মাসে হাজার হাজার শাড়ি, লেহেঙ্গা, থ্রি-পিস ও ওড়নার অর্ডার আসে। আর ঈদ এলে তো কাজের ফুরসতই থাকে না। চাহিদা বেড়ে যায় বহুগুণে। 

তিনি জানান, মহাজনেরা ঢাকা থেকে অর্ডার সংগ্রহ করে কাপড়, উপকরণ বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেন। তারা কেবল কারচুপির কারুকাজ করে দেন।

মহাজন আরমান আলী ও সিদ্দিকুল ইসলাম ঢাকা থেকে ই-মেইলে অর্ডার নিয়ে এসে নকশা (ডিজাইন) বুঝিয়ে দেন নারী শ্রমিকদের। ঘরে ঘরে পৌঁছে দেন জর্জেট বা শিফন কাপড়ের থান, বিভিন্ন রকম চুমকি, রেশমি সুতা, আঠা ইত্যাদি। কাপড়ে চুমকি করতে এসব উপকরণের দরকার হয়। মহাজনের অর্ডার পেলেই নারী শ্রমিকেরা রাত-দিন ব্যস্ত হয়ে পড়েন কারচুপির কাজে। 

শাহেদা আশরাফী বলেন, কাপড়ে কারচুপি বসিয়ে একজন নারী শ্রমিক দিনে ৫০০-৬০০ টাকা আয় করেন।

তিনি আরও বলেন, কারচুপির উপকরণ চীন থেকে আমদানি করা হয়। আর ভারত থেকে আনা হয় কাপড়। চাহিদা বাড়লে এসব পণ্যের দামও বাড়ে। ঈদের বাজারকে সামাল দিতে কম লাভ হলেও আমাদের শ্রমিকেরা কারচুপির কাজে ব্যস্ত থাকেন। 

সৈয়দপুর কারচুপি সমিতির সভাপতি আনোয়ার হোসেন বলেন, “ঢাকার বড় বড় শপিং মল ও মার্কেটে সৈয়দপুরের তৈরি কারচুপির পোশাক বিক্রি হয়। বিয়ে, পূজায় ও ঈদে এসব পোশাকের অনেক চাহিদা। এ সময় সৈয়দপুরের প্রায় ২০ হাজার নারী শ্রমিক কাপড়ে কারচুপি বসানোর কাজ করেন। স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীরাও এখন ব্যস্ত সময় পার করছে কারচুপির কাজ করে।”