Monday, May 27, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

লোডশেডিং: উৎপাদন ও আর্থিক খাত সংকটে

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. এম তামিমের মতে, শীতের ওপর ভরসা করা ছাড়া বিদ্যুতের ঘাটতির কোনো সমাধান তিনি দেখছেন না। নভেম্বর থেকে শীত শুরু হলে বিদ্যুতের চাপ কিছুটা কমবে

আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০২২, ১০:৫৩ এএম

তীব্র বিদ্যুতের ঘাটতি এবং ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে রপ্তানিমুখী শিল্প, উৎপাদন ও আর্থিক খাত সংকটের মুখে পড়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, গত জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতিদিন গড়ে দুই হাজার থেকে দুই হাজার ২০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং করা হয়েছে। তবে অক্টোবরে এই ঘাটতি বেড়েছে। এখন আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার মেগাওয়াটে দাঁড়িয়েছে এটি। যা গত জুলাইয়ের পর সর্বোচ্চ।

বিশেষজ্ঞ এবং শিল্পখাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের ঘাটতি তাদের উৎপাদন, আর্থিক লেনদেন এবং আউটপুটে সমস্যা তৈরি করছে। উৎপাদন ও পরিচালন ব্যয়ে “স্পাইক” তৈরি করেছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. এম তামিম ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “বিদ্যুতের ঘাটতি দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক ভারসাম্যের ওপর প্রভাব ফেলবে এটাই স্বাভাবিক। এর দুটি প্রধান শিকার হচ্ছে ব্যাংক ও উৎপাদন কারখানা। বিশেষ করে ব্যাংকের এটিএম এবং অনলাইন ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সমস্যা রয়েছে। বিশেষ ব্যবস্থাপনা থাকলেও তারা রাতদিন একটানা সেবা দিতে পারছে না।”

অন্যদিকে রপ্তানিকারক কারখানা, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের ব্যবসায়ীরা লোডশেডিংয়ের সমস্যা থেকে যেকোনো ভাবেই হোক মুক্তি পেতে চাচ্ছে। সম্প্রতি তারা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য প্রয়োজনে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে।

স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “শিল্পপ্রতিষ্ঠানে গড়ে প্রতিদিন চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। আমাদের এখানকার কারখানাগুলো সাধারণত দুই ধরনের বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। প্রথমত, জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ টানা হয়। দ্বিতীয়ত, ক্যাপটিভ পাওয়ার ব্যবহার করে। গ্রিড লাইন থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেওয়ায় ক্যাপটিভ পাওয়ার ব্যবহার করতে হচ্ছে।”

ডাইং ও ওয়াশিং প্লান্টগুলো ২৪ ঘণ্টা চালু থাকলেও লোডশেডিংয়ের কারণে এসব প্লান্টে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, “কারখানার আকারের ওপর নির্ভর করে প্রতি মাসে অতিরিক্ত ৩ থেকে ৪ কোটি টাকা খরচ হচ্ছে। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন অপ্টিমাইজেশনও কমে গেছে। যেহেতু কারখানা কম চালাতে হয়, ওভারহেড খরচ বেড়ে যায়। কর্মীদের বেতন নির্ধারিত। আমরা কয় কর্মঘণ্টা তাদের কাজ করালাম সেটি বিবেচ্য নয়। তাদের পুরো বেতন দিতে হচ্ছে।”

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “ডিজেলের অতিরিক্ত খরচ সম্পূর্ণরূপে গণনা করা না গেলেও সামগ্রিক উৎপাদন খরচ অন্তত ৫% বেড়েছে। এছাড়া হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় যখন জেনারেটর চালু করা হচ্ছে তখন পণ্যের মানের ওপর এর প্রভাব পড়ছে।”

উৎপাদন ব্যাহত হলে লিড টাইম বেড়ে আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে বলেও জানান তিনি।

স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলামও একই ধরনের মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, “ডিজেল দিয়ে বয়লার চালাতে হয়। পাঁচ টনের দুটি বয়লার ডিজেল দিয়ে চালানো হলে বিপুল পরিমাণ অর্থ অপচয় হয়।”

বাংলাদেশ টেরি তাওয়েল ও লিনেন প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিটিটিএলএমই) সভাপতি এম শাহাদাত হোসেন জানান, গত কয়েকদিন ধরে প্রতিদিন ১০ থেকে ১১ ঘণ্টা বিদ্যুৎ বিভ্রাট হচ্ছে। তাদের কারখানা চালাতে কোম্পানির প্রতিদিন ৪০০ লিটার ডিজেল লাগে এবং খরচ হচ্ছে অন্তত ৪৩ হাজার ৬০০ টাকা।

তিনি বলেন, “কারখানা ভেদে লোকসানের পরিমাণ কম-বেশি হয়। আমাদের উৎপাদনে প্রতি কেজি পণ্যের দাম দুই টাকা থেকে এখন প্রায় আট টাকায় পৌঁছেছে। এই বাজারে টিকে থাকা অত্যন্ত কঠিন।”

এ বছরের সেপ্টেম্বরে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ে ৬.২৫% নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এক মাস আগেই দেশের রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ১৪% এর বেশি। তার এক মাস পরই এই নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। এখন বাংলাদেশ বাইরের দেশের ক্রেতাদের ক্রয়াদেশ সময়মতো উৎপাদন ও পূরণ করতে না পারলে “বিশ্বাসের ঘাটতি” তৈরি হবে।

এছাড়া দেশের অনলাইন ব্যাংকিং ব্যবস্থাতেও বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে ইতিমধ্যেই প্রভাব পড়েছে। 

অনলাইন ব্যাংকিংয়ের লেনদেন ২০২২ অর্থবছরের শেষ দুই মাসে (মে এবং জুন) বাড়তে শুরু করেছিল। কিন্তু জুলাইয়ে তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। অর্থনীতি বিশ্লেষকেরা এই অবস্থার জন্য লোডশেডিংকে দায়ী করেছেন।

চলমান বিদ্যুতের ঘাটতি এবং ব্যাংকিং খাতে এর প্রভাব সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “আমরা একটি বড় ব্যাংক তাই এটি আমাদের ব্যয়কে সেভাবে প্রভাবিত করতে পারে না। তবে এটি অবশ্যই কিছু পরিমাণে আমাদের অপারেটিং খরচ বাড়িয়েছে।”

সমাধান কী?

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. এম তামিমের মতে, শীতের ওপর ভরসা করা ছাড়া বিদ্যুতের ঘাটতির কোনো সমাধান তিনি দেখছেন না।

তিনি বলেন, “নভেম্বর থেকে শীত শুরু হলে বিদ্যুতের চাপ কিছুটা কমবে। এটি আপাতত স্বস্তির উৎস হতে পারে। আগামী মার্চ থেকে এপ্রিলের মধ্যে আমাদের বিদ্যুতের উৎপাদন কমপক্ষে আড়াই হাজার মেগাওয়াট বাড়াতে হবে যাতে আগামী গ্রীষ্মে এই সমস্যাটি বড় মাথাব্যথার কারণ না হয়।”

এই সময়ে বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “সরকারের পরিকল্পনা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হলেই তা সম্ভব। রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র এপ্রিলের মধ্যে এক হাজার ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করবে। এছাড়া, ভারতের আদানি পাওয়ার লিমিটেড বিদ্যুতের একটি বড় অংশ (প্রায় ৪০০ মেগাওয়াট) সরবরাহ করার কথা রয়েছে। তাছাড়া পায়রা পাওয়ার প্ল্যান্টে আরও তিনশো থেকে সাড়ে তিনশো মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এসব সঠিকভাবে সম্পন্ন হলে আগামী গ্রীষ্মে বিদ্যুৎ বিভ্রাট সহনীয় হবে।”

সমাধান প্রসঙ্গে স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম বলেন, “সরকারের উচিত সর্বোচ্চ দুই ঘণ্টা লোডশেডিং রেখে উৎপাদন খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া। আমরা এই খাতের জন্য নিবেদিতভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য গ্যাস আমদানির জন্য তহবিল দিতে চেয়েছি এছাড়া আমরা সারচার্জ দিতেও প্রস্তুত।”

তবে বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জোর দিয়ে বলা হয়েছে, তারা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা করছেন। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের পর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম প্রায় ছয় গুণ বেড়েছে যা বাংলাদেশে গ্যাসের ঘাটতি শুরু করেছিল। 

এদিকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ জানিয়েছেন, নভেম্বরের আগে গ্যাস আমদানি করা যাচ্ছে না। ফলে এই সময়ের মধ্যে লোডশেডিং পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হবে বলে আশা করা যাচ্ছে না।

About

Popular Links