Tuesday, May 21, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

ফেসবুক-গুগলকে করের আওতায় আনার সুপারিশ

ফেসবুক, গুগলসহ অন্যান্য গ্লোবাল টেক জায়ান্ট কোম্পানিকে পুরোপুরি করের আওতায় আনার সুপারিশ করেছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ

আপডেট : ২৯ এপ্রিল ২০২৩, ০৮:৫৫ পিএম

ফেসবুক, গুগলসহ অন্যান্য গ্লোবাল টেক জায়ান্ট কোম্পানিকে পুরোপুরি করের আওতায় আনার সুপারিশ করেছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।

রাজস্ব আদায়ের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করে ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে সিপিডির কর বিষয়ক এক গবেষণায় এই সুপারিশ করা হয়েছে।

শনিবার (২৯ এপ্রিল) এক সংলাপ অনুষ্ঠানে এই সুপারিশ উপস্থাপন করে সংস্থাটি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহযোগিতায় সিপিডি এই গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করেছে।

সিপিডির বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান গবেষণা সুপারিশ তুলে ধরে বলেন, “ফেসবুক, গুগলসহ বিশ্বের বড় বড় টেক জায়ান্ট কোম্পানির কাছ থেকে ভ্যাট আদায় করা গেলেও আয়কর আদায় করা যাচ্ছে না। কারণ, বাংলাদেশে তাদের অফিস না থাকাই কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইন) নেই। ফলে আয়কর নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। অথচ বিশ্বের বড় বড় এসব টেক জায়ান্ট প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ আয় করছে।”

আগামী অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এ বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করবে আশা করে তিনি বলেন, “ফেসবুক, গুগলসহ অন্যান্য গ্লোবাল টেক জায়ান্ট কোম্পানিকে বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিবছর প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। কিন্তু এর বিপরীতে প্রদেয় কর আমরা পাচ্ছি না। অভ্যন্তরীণ সম্পদ বাড়াতে নতুন নতুন এসব সেবার বিপরীতে করারোপ করতে হবে।”

মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে কর রাজস্ব আয় বাড়ানো এবং ডিজিটাল অর্থনীতির আরও কীভাবে প্রসার ঘটানো যায়, সে জন্য সুচিন্তিত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। প্রতিবছর যদি কর অব্যাহতি চলতে থাকে, তাহলে দেশে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মতো প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় বাড়াবো কীভাবে? সে জন্য যেসব জায়গায় কর অব্যাহতি আছে, তার কিছু জায়গায় ধাপে ধাপে কর আরোপ করতে হবে। সে বিষয়ে একটা রোডম্যাপ থাকা জরুরি।”

একই সঙ্গে স্টার্টআপ কোম্পানির প্রসারের জন্য তাদের ইনসেনটিভ দেওয়ার সুপারিশ করে তিনি বলেন, “স্টার্টআপকে এমনভাবে ইনসেনটিভ দিতে হবে, তারা যেন নতুন নতুন খাত তৈরি করে। ফলে কর আহরণের নতুন জায়গা তৈরি হবে। ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশ হবে। আমাদের অর্থনীতির বড় অংশ ডিজিটাল অর্থনীতি হবে। এ অবস্থায় অভ্যন্তরীণ সম্পদের মাধ্যমে কীভাবে রাজস্ব বাড়াতে পারি, এ বিষয়ে আমাদের পথনকশা করতে হবে। এটা বাস্তবতা, বরং আরও আগে করার প্রয়োজন ছিল।”

তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কর্মসূচি অনুযায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৯.৪% করতে হবে। এর জন্য অতিরিক্ত ২ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করতে হবে। বাড়তি এ রাজস্ব আদায় করতে হলে গুগল, ফেসবুক, টুইটারের মতো প্রতিষ্ঠানকে রাজস্বের অধীনে আনতে হবে। দেশের বড় ই-কোম্পানিগুলোকে ট্যাক্সের আওতায় আনতে হবে। এ জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ভারতের নীতি অনুসরণ করতে হবে।”

আইএমএফের ঋণ কর্মসূচি নীতি সার্বভৌমত্বের ‘আত্মসমর্পণ' 

সংলাপে আইএমএফের ঋণ কর্মসূচিকে নীতি সার্বভৌমত্বের ‘আত্মসমর্পণ' বলে মনে করেন সিপিডির বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। 

তিনি বলেন, “আইএমএফের ঋণ কর্মসূচির মাধ্যমে আমরা অন্তত কিছু নীতি সার্বভৌমত্বের ক্ষেত্রে আত্মসমর্পণ করেছি। আমরা তাদের শর্ত মেনে অর্থ নিয়েছি।”

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, “আইএমএফের অন্তত তিনটি শর্ত আজকের আলোচনার সঙ্গে মিল আছে। প্রথমত, কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে হবে। প্রতিবছর জিডিপির ০.৫% হারে অতিরিক্ত কর আদায় করতে হবে। দ্বিতীয়ত, কর ছাড় যৌক্তিক করা। এই দুটি শর্ত আদেশ দিয়ে করা যাবে। তৃতীয় শর্তটি হলো, কর আদায়ে প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি। এটা আদেশ দিয়ে হবে না। এটা বিদ্যুতের দাম নয়, এটি সারের দাম নয়, আদেশ দিলাম, আর বেড়ে গেল।”

আইএমএফের ঋণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “নেওয়ার বিষয়টি সরকার অনুমোদন দিল। কিন্তু এ নিয়ে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে আলোচনা হলো না। এমনকি মন্ত্রিসভার অর্থনীতিবিষয়ক উপকমিটিতে আলোচনা হয়নি। স্থায়ী কমিটি কিংবা কেবিনেট সম্পৃক্ত ছিল না। জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তারা সই করলেন।”

তিনি প্রশ্ন রাখেন, “বিদ্যুৎ-সারের দাম বেড়েছে, এর দায়িত্ব কে নেবে? জনপ্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ ছাড়া এ ধরনের সংস্কার কীভাবে এগিয়ে যাবে?' রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া এবং নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত অংশীজন যারা দেশের উন্নয়নকে তুলে ধরেছেন, আগামী দিনে ধারণ করবেন, তাদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ব্যতিরেকে এই সংস্কার কার্যকর করা কষ্টকর হবে।”

সংলাপে উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য আহসান আদেলুর রহমান, সংসদ সদস্য কাজী নাবিল আহমেদ, সিপিডির বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান, সিপিডির বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন, বেসিস পরিচালক হাবিবুল্লাহ এন করিম। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন ড. ফাহমিদা খাতুন।

সেমিনারে অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য সংসদ সদস্য কাজী নাবিল আহমেদ বলেন, “সরকার স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে কাজ করছে। স্মার্ট বাংলাদেশ হলে শতভাগ ডিজিটালাইজড করে পেপারলেস কার্যক্রম হবে। রাজস্ব আদায় থেকে প্রশাসনিক কার্যক্রম পর্যন্ত সবকিছু অটোমেশনে হবে। এর ফলে প্রযুক্তি খাতে কর্মসংস্থান যেমন বাড়বে, ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডকে কাজে লাগিয়ে প্রশিক্ষিত জনশক্তি তৈরি হবে। রাজস্ব আদায়েও কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে। গুগল, ফেসবুক, টুইটারের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানকে পুরোপুরি রাজস্বের আওতায় আনা না গেলেও আগামীতে আনা যাবে।”

নিজের টাকায় পদ্মা সেতু করলাম কিন্তু টোল আদায়ের দায়িত্ব দিলাম বিদেশিদের

সেমিনারে এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল মজিদ বলেন, “আগে আমাদের ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত কেন কম হচ্ছে, কোথায় কোথায় লিকেজ আছে, সেটা খুঁজে বের করতে হবে। আমাদের জিডিপি বাড়ছে, কিন্তু রাজস্ব আদায় কেন বাড়ছে না, সেটা জাতীয় সংসদেও আলোচনা হওয়া দরকার। লিকেজগুলো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে আলোচনা হওয়া দরকার। সিপিডিও এ বিষয়ে গবেষণা করতে পারে।”

তিনি বলেন, “আমরা নিজের টাকায় পদ্মা সেতু করলাম কিন্তু টোল আদায়ের দায়িত্ব দিলাম বিদেশিদের। কেন? আমি খরচ অনেক বৃদ্ধি করেছি, কিন্তু আয়ের উৎস কেন বাড়ছে না, সেই হিসাব মেলাতে হবে। ফেসবুক ও গুগলসহ সামাজিক মাধ্যমগুলোর বিষয়ে নীতিমালা দরকার।”

ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট ডিজিটাল ইকোনমির সঙ্গে মনস্তাত্বিকভাবে সমস্যা তৈরি করছে উল্লেখ করে এনবিআরের সাবেক এই চেয়ারম্যান বলেন, “ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের ফলে অনেক কথা বলা যাচ্ছে না। এমনকি লেখালেখির ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট অনেকটা বিশেষ ক্ষমতা আইন হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। এই আইনের সংস্কার করা প্রয়োজন, ডিজিটাল কথাটা গুরুত্বপূর্ণ, এটার জন্য সাইবার সিকিউরিটি আইন হতে পারে।”

About

Popular Links