Monday, May 20, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

নারীদের ঘরের ‘অবৈতনিক’ কাজে কোটি কোটি অর্থ হারাচ্ছে বাংলাদেশ

সংশ্লিষ্টদের মতে, গৃহস্থালির অবৈতনিক কাজের স্বীকৃতি, নারীর ওপর থেকে কাজের চাপ হ্রাস কিংবা কাজের আর্থিক মূল্য নির্ধারণের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ

আপডেট : ২১ নভেম্বর ২০২১, ০৭:১২ পিএম

গৃহস্থালির পরিচর্যা পরিষেবাগুলোতে ক্রমবর্ধমান বিনিয়োগ স্থানীয় ও বিশ্বব্যাপী উভয় ক্ষেত্রেই কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারে, যার ফলস্বরূপ লিঙ্গ সমতা বৃদ্ধি, শ্রম বাজার ও অর্থনীতির বিকাশ ঘটানো সম্ভব।

শনিবার (২০ নভেম্বর) সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) ও মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ) আয়োজিত “নীতি প্রণয়ন এবং বিশ্লেষণে গৃহস্থালি অর্থনীতির একীকরণ” শীর্ষক ওয়েবিনারে বক্তারা এ কথা বলেছেন।

দেশের জনসংখ্যাবিষয়ক বৈষম্য অনুসারে, প্রাপ্তবয়স্ক নারীরা দিনে আট ঘণ্টা বেতনহীন কাজ করেন, যেখানে পুরুষরা করেন দেড় থেকে দুই ঘণ্টা। যার অর্থ নারীরা তাদের বেশিরভাগ সময় অ-বিপণনযোগ্য চাকরি যেমন গৃহস্থালির কাজ বা পরিষেবার কাযে ব্যয় করেন।

সানেম-এর প্রতিবেদন অনুসারে, নারীদের কর্মসংস্থান শুধুমাত্র ১% বৃদ্ধি করা গেলে ২০২১ সালের জিডিপিতে অতিরিক্ত ১১.৩ বিলিয়ন ডলার (১ হাজার ১৩০ কোটি ডলার) যোগ হতে পারত।

ওয়েবিনারে আরও বলা হয়, এ বিষয়ে, সরকারকে একটি সুনির্দিষ্ট নীতি প্রণয়ন করতে হবে, যা শ্রমবাজারে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে পারবে।

ওয়েবিনারে বলা হয়, নারীরা একটি গতিশীল পরিসরের অবৈতনিক পরিচর্যা কাজ যেমন- রান্না করা, বাচ্চাদের লালন-পালন করা এবং প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনাকাটা করে যার জন্য তারা মজুরি দাবি করেন না।

সরকারি তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে বক্তারা বলেন, এ ধরনের কাজকে মজুরি প্রদান করে, এমনভাবে কাঠামোর আওতায় আনতে হবে যেন শ্রমবাজারে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো যেতে পারে।

বক্তারা বলেন, এর মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে পুরুষরা যেন এ ধরনের পরিচর্যা কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে উপার্জনে জড়িত হতে পারেন। অন্যদিকে নারীরা অন্য চাকরিতে যুক্ত হয়ে অর্থনীতিতে ভিন্নভাবে অবদান রাখতে পারেন।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, “নারীদের গৃহস্থালির ‘অদৃশ্য কাজ’ মোট জিডিপির প্রায় ৭০-৮০% অবদান রাখে। যা অর্থনীতির আকারকে দ্বিগুণ করতে এবং নারীদের আয় প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি করতে পারে।”

বাংলাদেশে কোভিড মহামারি চলাকালীন র‌্যাপিড অ্যানালাইসিস শীর্ষক সাম্প্রতিক একটি গবেষণা অনুসারে, বাংলাদেশের ৮৫% নারীকে পূর্ণকালীন চাকরি করার পরও বাড়িতে ফিরে গৃহস্থালির অবৈতনিক কাজে চার ঘন্টার বেশি সময় ব্যয় করতে হয়।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) অনুসারে, বিশ্বব্যাপী অবৈতনিক গৃহস্থালির দায়ভার নারী এবং মেয়েদের উপর অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। যার ফলে তাদের শিক্ষা, অবসর, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, বেতনভুক্ত কাজ এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য কম সময় থাকে।

এ ধরনের কাজের বেশিরভাগই পরিবারের সদস্যদের যত্ন নেওয়া এবং ঘরোয়া কাজ করার জন্য নিবেদিত। বেশিরভাগ দেশেই পরিচর্যার কাজ নারীদের জীবনের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সময় নিয়ে নেয়, বিশেষ করে যেখানে অবকাঠামো দুর্বল এবং সর্বজনীনভাবে দেওয়া পরিষেবা সীমিত বা অনুপস্থিত।

“গ্রামীণ পরিবেশে এবং বয়স্ক সমাজে যত্নের কাজের বোঝা বিশেষভাবে তীব্র” উল্লেখ করে আইএমএফ জানিয়েছে, এই বোঝার কারণে নারীদের অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপে যুক্ত হওয়ার পথ সীমিত হচ্ছে। তাদের কম বেতনের, অনানুষ্ঠানিক বা গৃহভিত্তিক কাজে মনোনিবেশ করতে হচ্ছে।”

আইএমএফ আরও বলেছে, কম বেতন ও অনানুষ্ঠানিক কাজে নারীদের “অসমান”  প্রতিনিধিত্ব লিঙ্গ মজুরি বৈষম্যতে অবদান রাখছে। যা নারীদের শ্রমকে অবমূল্যায়ন করে দরিদ্র শ্রমজীবীদের সংখ্যা বৃদ্ধি করে।

ওয়েবিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকা পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, “সাংস্কৃতিক কুসংস্কারের কারণে নারীদের অবৈতনিক গৃহস্থালি কাজ স্বীকৃত নয়।”

এই স্বীকৃতির অভাবের কারণে শ্রমশক্তির একটি বড় অংশ অলস বসে আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “দেশের মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৫০০ ডলারে (২ লাখ ১৪ হাজার ১৬৬ টাকা) উন্নীত হচ্ছে। ২০৪১ সাল নাগাদ, মাথাপিছু আয় ১২ হাজার ডলার (১০ লাখ ২৮ হাজার টাকা) ছাড়িয়ে যাবে।

ওয়েবিনার সঞ্চালনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান এবং সানেমের গবেষণা পরিচালক অধ্যাপক সায়মা হক মূল বক্তব্য রাখেন।

এ সময় সায়মা হক নারীদের কাজের স্বীকৃতি, দায়িত্ব হ্রাস এবং নারীদের গৃহস্থালি কাজ পুনর্বন্টণ করার ওপর জোর দেন।

তিনি আরও বলেন, দেশের ১৫-২৯ বছর বয়সী নারীরা দিনের উল্লেখযোগ্য কতগুলো ঘণ্টা অবৈতনিক গৃহস্থালি কাজে ব্যয় করেন। এই অবৈতনিক কাজের স্বীকৃতি ও নারীদের উপর থেকে কাজের চাপ হ্রাস করা আর্থিক মূল্য নির্ধারণের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”

About

Popular Links