• বুধবার, ডিসেম্বর ১১, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:১৮ রাত

আমি তোমাদেরই লোক

  • প্রকাশিত ১০:৩০ সকাল অক্টোবর ২, ২০১৮
ছবি : সংগৃহীত
ছবি : সংগৃহীত

শুভ জন্মদিন নগরবাউল।

যে কোন শিল্প কোন একটি প্রজন্ম বা সময়কে দারুনভাবে প্রভাবিত করে। এই প্রভাব সর্বগ্রাসী এবং সর্বগামী। এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্ম যখনই তা গ্রহণ করে তখনই সেটি হয়ে ওঠে কালোত্তীর্ণ। শিল্পের সাথে একাত্ম হয়েই মানুষ বেড়ে ওঠে। আর সেই সব শিল্পীরা তাদের কাছে যেমন ভালোবাসার তেমনি শ্রদ্ধার মানুষ। যেমন—আমাদের বাংলাদেশের জেমস। ব্যান্ডসঙ্গীত শিল্পী হিসেবে আনুষ্ঠানিক পরিচিতি থাকলেও তার ভক্তরা তাকে ডাকেন ‘গুরু’ নামে। 

জেমসের গান মানেই উদ্দাম তারুণ্য। নব্বইয়ের উন্মাতাল ওপেন এয়ার কনসার্টগুলোর অন্যতম আকর্ষণ ছিলেন জেমস। এখন সেরকম নিয়মিত কনসার্ট হয় না কিন্তু জেমসের কনসার্ট মানেই তারুণ্যের ঢল। আর এই জনপ্রিয়তার মূল কারণ তার গানের মধ্যে থাকা উদ্দামতা, প্রেম, তারুণ্যের বারণ না মানার অভ্যাসের বহিঃপ্রকাশ। 

জেমসের নিজের জীবনেও রয়েছে বারণ না মানার ইতিহাস। গানের জন্য ঘর ছেড়েছেন, বোহেমিয়ান জীবন বেঁধেছেন গিটারের সাথে। আশির দশকে চট্টগ্রামের আজিজ বোর্ডিং থেকে তৈরি হয়েছেন বাংলা ব্যান্ডের নগরবাউল। আশির দশকে গড়ে তোলেন ফিলিংস ব্যান্ড। ‘স্টেশন রোড’ ছিল ফিলিংস ব্যান্ডের প্রথম অ্যালবাম। ১৯৯০-এ বের হয় ‘জেল থেকে বলছি’। তুমুল জনপ্রিয় হয় এই অ্যালবামের গানগুলো। এর আগে নিজের সলো অ্যালবাম অনন্যা বের করেন জেমস। অনন্যা এখনো জেমসের কালজয়ী গান।  গানের মধ্যে দিয়ে ভালোবাসার আকুতি দেশ-কালের সীমানা পেরিয়ে অমর হয়ে আছে। আকুল প্রেমিকের অকুণ্ঠ বয়ান অনন্যা। 

‘তুমি যে আমার বুকের গভীরে

আমার রক্তের প্রতিটি অণুতে অণুতে

প্রতিটি কোষে অনুভবে আছ মিশে

অনন্যা অনন্যা তুমি আমার ভালবাসা।’

জেমসের গায়কী এবং গানের কথা, সব মিলিয়ে তরুন সমাজের ভেতরকার আকুতি যেন কোন বাধা নিষেধ ছাড়াই প্রকাশ পায় এই গানের মাধ্যমে। এজন্যই এসব গান এত জনপ্রিয় তরুণদের মাঝে। 

শুধু তরুণদের মাঝে জেমসকে আটকে ফেলাটাও ভুল। প্রিন্স মাহমুদের কথা ও সুরে ‘বাবা’ এবং ‘মা’ গান দুটির আবেদন সব স্তরের মানুষকে ছুঁয়ে গেছে। যে কোনো আবেগই যেন জেমসের গলায় ফুটে ওঠে তীব্র আকুলতায়। হোক সেটা প্রেমিকার জন্য অথবা গর্ভধারিনী মা কিংবা দেশের জন্য। 

‘বাংলাদেশ’, ‘দুঃখিনী দুঃখ করো না’, ‘লেইস ফিতা লেইস’, ‘মীরাবাঈ’, ‘পাগলা হাওয়া’, ‘যতটা পথ তুমি চিনে রেখেছো’, ‘একজন বিবাগী’, ‘বিজলী’, ‘দুষ্টু ছেলের দল’, ‘আমি তোমাদেরই লোক’, ‘লুটপাট’, ‘তারায় তারায়’, ‘আকাশী’- একেকটা গান যেন একেকটা ইতিহাস। 

জেমসের আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তাকে হেয় করার জন্য নিন্দুকেরা অনেক সময়ই জেমসের গানের শিল্পমান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। সেসব প্রশ্ন যে অযৌক্তিক এবং ঈর্ষাকাতরতার বহিঃপ্রকাশ তা জেমস তাঁর গান দিয়েই বুঝিয়ে দিয়েছেন। জেমসের গান নিয়ে যাদের নাক সিটকানোর স্বভাব রয়েছে, তারা ‘তারায় তারায়’ বা ‘আকাশী’ গানটা শুনে দেখুন। কবি শামসুর রাহমান এর ‘উত্তর’থেকে ‘তারায় তারায়’ এবং গীতিকবি লতিফুল ইসলাম শিবলীর ‘প্যারিসের চিঠি’ অবলম্বনে ‘আকাশী’ গান দুটির মাধ্যমে কবিতার সাথে তরুনদের দারুন যোগসূত্র তৈরি করেছেন জেমস। তাইতো এখনও যখন বুয়েটে অর্ণব ‘তারায় তারায়’ গান, তখন গায়কের গলাটা কমই শোনা যায়, কারণ তরুনরা গানটি গায় অন্তর দিয়ে, গলা খুলে। এ যেন আমাদেরই কথা, আমাদেরই গান, আমরাই বলতে চেয়েছিলাম, আমাদের হয়ে জেমস গেয়েছেন। 

তাই চার দশক পরে এসে জেমসের গানের কথার সাথে কথা মিলিয়ে বলাই যায়, তিনি আমাদেরই লোক, তরুণদের প্রতিনিধি। 

শুভ জন্মদিন নগরবাউল।