• বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ১৪, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৪:১৭ বিকেল

দেবী রিভিউ : মনে রেখে দেবো!

  • প্রকাশিত ০১:১০ দুপুর নভেম্বর ৪, ২০১৮
ফাইল ছবি
ফাইল ছবি

এই ছবিতে আর কোনো চরিত্র নেই, কোনো শব্দ বা সঙ্গীত নেই শুধু জয়া আহসান আছেন, শুধু তাকেই পর্দায় দেখার জন্য দেড়-দুই ঘণ্টা বসে থাকা যায়!

মু্ক্তির সপ্তাহ দুয়েক পরে ‘দেবী’ দর্শনের সুযোগ হলো। মুক্তির আগে ‘দেবী’ চলচ্চিত্রের শক্তি ও শঙ্কা নিয়ে একটা লেখা লিখেছিলাম। তারই সূত্র ধরে এই লেখা। 

চলচ্চিত্র হিসেবে ‘দেবী’ একটি অসাধারণ নির্মাণ। চলচ্চিত্র একটি সম্মিলিত শিল্প। অনেকগুলো শিল্প মিলিয়ে একসঙ্গে চলচ্চিত্র তৈরি হয়। যেমন: চিত্রনাট্য, সঙ্গীত, শিল্পনির্দেশনা, অভিনয়। ‘দেবী’ চলচ্চিত্রটির ক্ষেত্রে বেশিরভাগ শিল্পমানই খুব ভালোভাবে উত্তীর্ণ হয়েছে। কিছূ ক্ষেত্রে অপূর্ণতা রয়েছে। তবে সব মিলিয়ে দর্শকের কাছে ‘দেবী’ একটি সময়োত্তীর্ণ চলচ্চিত্র হয়েই থেকে যাবে। 

‘দেবী’ চলচ্চিত্রটির মূল শক্তি এর আবহ সঙ্গীত এবং শব্দ পরিকল্পনা। দূর্দান্ত কাজ  করেছেন শব্দ নির্দেশক। হুমায়ূন আহমেদের ‘দেবী’ যেহেতু একটি মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস সেক্ষেত্রে চলচ্চিত্রের রুপান্তরে শব্দের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ লেখক তার বর্ণনা দিয়ে অনেক কিছু ফুটিয়ে তুলতে পারেন, চলচ্চিত্রে সেটিয়ে বিশ্বাসযোগ্যভাবে তুলে ধরা খুব একটা সহজ কাজ নয়। আবহ সঙ্গীত এবং শব্দ পরিকল্পনা ছবিটির মেজাজ এবং আমেজ তৈরি করেছে এবং শেষ পর্যন্ত তা ধরে রেখেছে। 

চিত্রগ্রাহকও খুব পরিমিতভাবে এবং গল্পের মেজাজের সঙ্গে মিল রেখে দৃশ্য তৈরি এবং ধারণ করেছেন। বিশেষ করে আলোক পরিকল্পনা খুবই সুন্দর। অনেক দৃশ্যই কবিতার মত নির্মল হয়ে উঠেছে। এরকম একটা দৃশ্যের ক

থা বলতেই হয়, ছাদে রানু বসে আছে তার পাশে একটি পেঁচা এবং পেছনে দুটি অশরীরি ছায়া। একই দৃশ্যে তিনটি সাবজেক্ট। কিন্তু চিত্রগ্রাহক কাউকে বিরক্ত করেননি সবাইকে সবার জায়গায় রেখে দৃশ্যটি তুলেছেন। এতেই চিত্রগ্রাহকের শিল্পবোধ, পরিমিতিবোধের পরিচিতি পাওয়া যায়। এরকম সুন্দর সুন্দর দৃশ্য পুরো ছবিজুড়েই রয়েছে। 

জয়া আহসান ‘দেবী’র সৌন্দর্য। চলচ্চিত্রটি দেখতে দেখতে আমার মনে হয়েছে এই ছবি থেকে সবকিছু সরিয়ে যদি শুধু জয়া আহসানকে রাখা হয় তাহলেও ছবিটির সৌন্দর্যের কোন কমতি হবে না। অর্থ্যাৎ এই ছবিতে আর কোনো চরিত্র নেই, কোনো শব্দ বা সঙ্গীত নেই শুধু জয়া আহসান আছেন, শুধু তাকেই পর্দায় দেখার জন্য দেড়-দুই ঘণ্টা বসে থাকা যায়! সে তুলনায় মিসির আলীর চরিত্রে চঞ্চল চৌধুরী খুব একটা আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারেননি। চঞ্চল চৌধুরী শক্তিমান অভিনেতা তাতে কোনো সন্দেহ নেই তবে হুমায়ূন আহমেদের তৈরি চরিত্র মিসির আলী আরও বেশি শক্তিশালী, সেই চরিত্রকে ঠিকমত বশে আনতে পারেননি চঞ্চল। তবে যে চেষ্টা তিনি করেছেন সেজন্য তাকে ধন্যবাদ। দেবী প্রকাশের ৩৩ বছর পর চলচ্চিত্রটি নির্মিত হলো। এই তিন দশকে পাঠক এবং দর্শকের মনে মিসির আলীর একটি ছায়াচরিত্র তৈরি হয়েছে। আমার কাছে যেমন মনে হয়েছে মিসির আলী চরিত্রটির প্রতি সবচেয়ে ভালো সুবিচার করতে পারতেন হুমায়ূন ফরিদী। তিনি যেহেতু নেই তার বদলে আসাদুজ্জামান নূর অথবা আলী যাকের হতে পারতেন। এরকম একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র নিয়ে আরো কিছুটা ভেবে সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন পরিচালক। 

অভিনয়ের ক্ষেত্রে শবনম ফারিয়া গড়পড়তা অর্থ্যাৎ কোন রকমে উতরে গেছেন। অনিমেষ আইচ নির্মাতা হিসেবে যেমন দারুন, অভিনেতা হিসেবে তেমন চমক দেখাতে পারেননি। পরিচালক অন্য কাউকে ভাবতে পারতেন আনিস চরিত্রে। ইরেশ যাকের চেষ্টা করেছেন কিন্তু ফল হয়নি। অবশ্য সুযোগও খুব একটা পাননি তিনি, চারটা বা পাঁচটা দৃশ্যে তেমন কিছুই করার ছিল না তার। 

একটি চলচ্চিত্র তখনই নিখুঁত হয় যখন এর প্রযোজকরা কাজটা বুঝেশুনে করেন। প্রযোজক বলতে শুধুমাত্র অর্থলগ্নীকারক নয়, যিনি বা যারা সত্যিকার অর্থেই চলচ্চিত্র আয়োজনটির দেখভাল করেন তাদের বোঝাচ্ছি। এক্ষেত্রে ‘দেবী’ শতভাগ সফল। সুন্দর, গোছানো এবং নিয়ন্ত্রিত একটি প্রযোজনা। প্রযোজকরা অত্যন্ত অভিজ্ঞ এবং রুচিবোধসম্পন্ন, তাদের রুচি এবং অভিজ্ঞতা ‘দেবী’ ছবির প্রতিটি দৃশ্যে ফুটে উঠেছে। প্রযোজকদের অভিনন্দন। 

চিত্রনাট্য, সংলাপ এবং সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্র রুপান্তর ভালো হয়েছে। মিসির আলীর সংলাপ নিয়ে খুব একটা কাজ করতে হয়নি, মূল উপন্যাসের সংলাপগুলোই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছে। কিছু সময়োপযোগী পরিবর্তন আনা হয়েছে, যেমন চিঠির জায়গায় ম্যাসেঞ্জার, এসব পরিবর্তন প্রাসঙ্গিক। গল্পের ছন্দ বজায় ছিল তবে শেষে একটু তাড়াহুড়ো করে শেষ হল বলে মনে হয়েছে। 

প্রথম ছবি হিসেবে পরিচালক অনেক বেশি সফল। নাটক এবং বিজ্ঞাপন নির্মাণের অভিজ্ঞতা তাঁকে একজন পরিপূর্ণ চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে তৈরি করেছে। কারণ ‘দেবী’ এর মত শক্তিশালী গল্পকে পর্দায় তুলে ধরা বেশ কঠিন কাজ, অনেকটা হেসেখেলেই কাজটা করেছেন তিনি। গল্পের জায়গায় গল্প আছে, নির্মাণের জায়গায় নির্মাণ, কেউ কাউকে বিরক্ত করেনি। কাহিনী বা চলচ্চিত্রের মধ্যে কোন প্রতিযোগিতার মনোভাবও পাওয়া যায়নি। 

বাংলা চলচ্চিত্রে সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্র হিসেবে ‘দেবী’ গুরুত্ব পাবে। দেবী সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ ও অভিনন্দন। 

আরও পড়ুন : চলচ্চিত্র ‘দেবী’: শক্তি ও শঙ্কা