• রবিবার, মে ১৯, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৩:১০ বিকেল

নোবেল: গানের কাছে দেশ কিংবা ধর্ম বলে কিছু নেই

  • প্রকাশিত ০৬:৫০ সন্ধ্যা মার্চ ১৩, ২০১৯
কণ্ঠশিল্পী মাঈনুল আহসান নোবেল
কণ্ঠশিল্পী মাঈনুল আহসান নোবেল। ছবি: সৌজন্য

ঢাকা ট্রিবিউন সাংবাদিক আহমেদ সার্জিন শরীফকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে দুই বাংলার নতুন সেনসেশন মাঈনুল আহসান নোবেল জানিয়েছেন নিজের অভিজ্ঞতা আর অনুভূতির কথা

ভারতীয় বাংলা টেলিভিশন চ্যানেল জি বাংলার গানের অনুষ্ঠান ‘সারেগামাপা’-তে অংশ নিয়ে বাজিমাৎ করেছেন তরুণ বাংলাদেশি গায়ক মাঈনুল আহসান নোবেল। দুই বাংলার দর্শকরাই তার গায়কীতে মুগ্ধ। শুধু দর্শকদের মুগ্ধতাই নয়, নোবেল প্রশংসা পেয়েছেন খ্যাতনামা সঙ্গীতজ্ঞদের কাছ থেকেও। ঢাকা ট্রিবিউন সাংবাদিক আহমেদ সার্জিন শরীফকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে নোবেল জানিয়েছেন নিজের অভিজ্ঞতা আর অনুভূতির কথা।

ঢাকা ট্রিবিউন: জনপ্রিয়তা কেমন উপভোগ করছেন ?

নোবেল: আমার মনে হয় জনপ্রিয়তাটা দুয়েকদিন, একমাস, দু’মাস পর্যন্ত খুব উপভোগের বিষয় থাকে। তারপরে গিয়ে এটা অনেক বড় দায়িত্বে রূপ নেয়। তাই যতটা উপভোগ করছি তারচেয়ে বেশি নিজেকে ধরে রাখার চেষ্টা করছি, যাতে করে ভক্তরা হতাশ না হন।

ঢাকা ট্রিবিউন: আজকের এই অবস্থানে পৌঁছবেন, ভেবেছিলেন কখনো?  

নোবেল: দেখুন, আমি মনে করি সব মানুষের স্বপ্ন আকাশ ছোঁয়া থাকা উচিত। পরীক্ষায় যেমন ১০০ নম্বরের আশা করলে ৮০ পাবেনই। আমার ক্ষেত্রে বর্তমান অবস্থা নিজের স্বপ্নের তুলনায় অনেক পেছনে পড়ে আছে। আরও অনেক পথ পাড়ি দেওয়া বাকি।

ঢাকা ট্রিবিউন: বাড়ির সবাই পছন্দ করত?

নোবেল: বাড়ির সবাই আমাকে এবং আমার চিন্তা, স্বপ্নকে অনেক প্রাধান্য দিয়েছে। তবে আপনি হয়তো জানবেন দ্বাদশ শ্রেণির পর আমি আর পড়াশোনা করিনি। সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই আমার বাবা-মা চিন্তায় থাকবেন। আত্মীয়-স্বজনদের সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে অনেকবার। কিন্তু এখন খুব ভাল লাগে যখন বাবা মানুষকে বলতে পারেন- আমি নোবেলের বাবা। আর আত্মীয়-স্বজনরা পরিচয় দেয় নোবেল আমার ভাগ্নে, ভাতিজা অথবা ভাই।

ঢাকা ট্রিবিউন: সঙ্গীতশিল্পী না হলে কী হতেন? 

নোবেল: সঙ্গীত শিল্পী হওয়াটাকে আমার জীবনের মূল লক্ষ্য হিসেবেই আমি খুঁজে পাই। এর আগে ছন্নছাড়া, দিশেহারা ছিলাম। সঙ্গীত শিল্পী না হলে হয়ত আমি ট্রাভেলার হতাম। হাইলাইটেড হওয়ার আগে আমি আর্টিস্ট ছিলাম না, বিষয়টা কিন্তু এমন নয়। আমি এই আমি-ই ছিলাম। কিন্তু এখন অনেক মানুষের কাছে পৌঁছাতে পেরেছি। তবে মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারা মানেই কিন্তু শিল্পী হয়ে যাওয়া নয়। দেশের আনাচে-কানাচে কত ট্যালেন্ট পড়ে আছে। যাদের সামনে আমি হয়তো খুবই ক্ষুদ্র। তাদের আলোচনায় আসা উচিত।

ঢাকা ট্রিবিউন: সারেগামাপা থেকে প্রাপ্তি কী ?

নোবেল: সারেগামাপা থেকে আমার প্রাপ্তি, আমি আমার মানুষগুলোর কাছে পৌঁছাতে পেরেছি। এপার বাংলায়-ওপার বাংলায় হয়তো অবচেতন মনেই আমাকে খোঁজা হচ্ছিল। সেটা না হলে অবশ্যই পাওয়ামাত্র এভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে ধরত না? সারেগামাপাকে ধন্যবাদ এই মানুষগুলোর কাছে আমাকে পৌঁছে দেওয়ার জন্য।

ঢাকা ট্রিবিউন: গানের গুরু মানেন কাকে ?

নোবেল: আমার গানের গুরু আমার বাবা। ছোটবেলায় বাড়িতে যখন বিদ্যুৎ চলে যেতো, বাবা তখন আমাকে তার বুকের উপরে শুইয়ে গান শোনাতেন। মান্না দে, জগজিৎ সিং, ওস্তাদ নিয়াজ মোহাম্মদসহ আরো কতজনের! ওইগুলো শুনেই গান রক্তে মিশে গেছে।

ঢাকা ট্রিবিউন:  জেমসের অনেকগুলো গান গেয়ে প্রশংসা কুড়িয়েছেন, জেমসের ভক্ত?

নোবেল: জেমসের ভক্ত বাংলাদেশের সবাই। ওইরকম ইউনিক গায়কী পৃথিবীতে খুব কম মানুষের আছে। আমিও তার ব্যতিক্রম নই।

ঢাকা ট্রিবিউন: জেমসের সঙ্গে এক মঞ্চে গান গাওয়ার সুযোগ পেলে করবেন?

নোবেল: অবশ্যই, কেন নয়! জেমস ভাই যদি অনুমতি দেন, “আই উইল বি ওয়ে বিয়ন্ড অনার্ড।“

ঢাকা ট্রিবিউন: মৌলিক গান করছেন? 

নোবেল: অনেক আগে আমার একটা ব্যান্ড ছিল। ব্যান্ডের সঙ্গে একটা ছোট্ট অ্যালবাম রিলিজ করেছিলাম ২০১৭ সালে। ওইখানে আমার সুর করা একটা গান ছাড়া আরও চারটি গান ছিল। কিন্তু অ্যালবামটা খুব একটা আলোচনায় আসেনি। তাই মৌলিক গান বলতে এই ৫টাই আমার করা হয়েছে। আর যদি এখন বলতে হয়, সম্প্রতি যে গানটা করলাম এটাও আমার মৌলিক গান হিসেবেই বের হচ্ছে।

ঢাকা ট্রিবিউন: প্লেব্যাক করতে কেমন লাগলো, অভিজ্ঞতা কী ?

নোবেল: প্লেব্যাক করতে অবশ্যই খুব ভাল লাগে। একটা মজার ঘটনা বলি- যেদিন আমার প্লেব্যাকের জন্য কলটা এলো ঠিক তার আগেরদিনই আমি আমার বন্ধুদের সঙ্গে মজা করে আলোচনা করছিলাম, কোনও কারণে দেশে গান করার মতো পরিস্থিতি না থাকলে আমাদের টার্গেট থাকবে কোনওভাবে টালিউডে (কলকাতার ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি) চলে যাব। বন্ধুগুলো আমার ব্যান্ডের সহযোগী ছিল। তাই ওরাও মজা করেই সম্মতি দেয় করে। এটা কেবলই মজা ছিল। তাই বলে আমরা নিজেরাই হাসাহাসি করছিলাম। ঠিক তার পরের দিনই প্লেব্যাকের জন্য কলটা পেলাম। 

আমরা যে বিষয়টা নিয়ে ৫ বছর পরের কথা ভাবছিলাম সেটা কাকতালীয়ভাবে ২৪ ঘণ্টায় পরিণত হলো। ব্যাপারটা অনেকটা মেঘ না চাইতেই বৃষ্টির মত হলো কিছুটা।

এই আরকি, তারপর তো স্টুডিওতে গেলাম, অনুপম দা (অনুপম রায়) খুবই ভাল মানুষ। জাতীয় অ্যাওয়ার্ড পাওয়া একজন মিউজিশিয়ানের সঙ্গে কাজ করছি এটা মনেই হয়নি আমার। উনার অ্যাপ্রোচটা ছিল- যেন উনি আমার অনেকদিনের চেনা কলেজের কোনও বড়ভাই। সম্পূর্ণ স্বাধীনতা পেয়েছি কাজ করার সময়। এখন অনুভূতিটা আমি গান এবং সিনেমার সাফল্যের পর বলতে পারব। কারণ গানটা যখন মানুষ আগ্রহ নিয়ে শুনবে তখনই সেটাকে আমার সাফল্য বলে ধরে নেওয়া যাবে।

ঢাকা ট্রিবিউন: নতুন কোনও বাংলা বা হিন্দি প্লে-ব্যাকের অফার আছে?

নোবেল: এখনও সেরকম কোনও অফার আসেনি। তবে হ্যাঁ, শান্তনু মৈত্র খুব সম্ভবত আমার আর মোনালি ঠাকুরের জন্যে একটা ডুয়েট গান কম্পোজ করছেন। এরকম আমাকে বলা হয়েছে। তবে বিষয়টি এখনও চূড়ান্ত হয়নি।

ঢাকা ট্রিবিউন: মোনালি ঠাকুরের সঙ্গে বাংলা না হিন্দিতে? 

নোবেল: এটাও আমার ঠিক জানা নেই। বাংলাতেই হবে সম্ভবত। 

ঢাকা ট্রিবিউন: ভারতে তো প্রচুর প্রশংসা পেলেন, দেশের মানুষের প্রতিক্রিয়া কী?

নোবেল: আমি ভারত আর বাংলাদেশকে আলাদা করে দেখছি না। কারণ সত্যি বলতে আমার প্রতি তাদের ভালোবাসাটা যখন আমি কাছ থেকে দেখি, আমার কাছে দুইদেশের মানুষকে একদেশেরই মনে হয়। গানের কাছে দেশ কিংবা ধর্ম কোনও বিষয় না বলেই আমার মনে হয়।

ঢাকা ট্রিবিউন: আপনার ছোটবেলার কথা বলুন - শৈশব কৈশোর কীভাবে কেটেছে?

নোবেল: আমার ছোটবেলাটা খুব দৌড়াদৌড়ির মধ্যে দিয়ে কেটেছে। জীবনে ১৩ বার স্কুল পাল্টেছি। কোনও স্কুলেই দু-এক বছরের বেশি থাকা হয়নি। এজন্য কোনও ছোটবেলার বন্ধু হয়নি আমার। কারণ জায়গা পরিবর্তন করতাম আর বন্ধুরাও পরিবর্তিত হত। আর আমাদের সময়েতো ফেসবুক, হোয়াটস অ্যাপ ছিলো না। এজন্য কানেকশনটাও ওভাবে আর থাকত না।


সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অভাবে নোবেল তার ছোটবেলার বন্ধুদের হারালেও ভক্তরা তাকে সহজেই খুঁজে পাবেন তার ফেসবুক পেজইউটিউব চ্যানেলে


ঢাকা ট্রিবিউন: কয় ভাই-বোন, অন্যরা কী কেউ গানের সঙ্গে যুক্ত?

নোবেল: আমরা দুই ভাই, এক বোন। আমি সবার বড় এরপর বোন, তারপর ভাই। ওরা কেউ গানের সঙ্গে যুক্ত না।

ঢাকা ট্রিবিউন: ভক্তদের উদ্দেশে কিছু বলুন?

নোবেল: ভক্তদের উদ্দেশে আমি বলব, আমার কাছ থেকে যেন আরও অনেক অনেক উচ্চাকাঙ্ক্ষা আপনারা রাখেন সারাজীবন। সেটা আমাকে আরও এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে।