• বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ১২, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:১৮ রাত

মুনতাসির তুষার: কেবল স্বর ও সুরের সমন্বয় নয়, সঙ্গীত একটা দর্শন

  • প্রকাশিত ১০:২১ সকাল নভেম্বর ২৯, ২০১৯
মুনতাসির তুষার
মুনতাসির তুষার ফেসবুক

'আমার মনে হয় সুর ছাড়া পৃথিবী থাকবে না। সেদিন খুনের দিন, ধ্বংসের দিন হবে। সৃষ্টির শুরু থেকেই তো সুর আছে। তাই হৃদস্পন্দনের তালে তালে সুর আমাদের উজ্জীবিত করে'

নিভৃতচারী তরুণ সুরকার, সঙ্গীত পরিচালক ও গায়ক মুনতাসির তুষার। তার পরিচালনায় কিংবদন্তী শিল্পী শ্রীকান্ত আচার্যের কণ্ঠে ‘‘বৃষ্টি নেমেছে’’ ও প্রিয়াঙ্কা গোপের কণ্ঠে “মায়াময়” শিরোনামের নান্দনিক গানের জন্য পুরস্কৃত হয়েছেন দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত “গ্লোবাল মিউজিক অ্যাওয়ার্ড-২০১৮”-তে। এছাড়া উদীয়মান সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে পেয়েছেন কলকাতায় “গৌরিপ্রসন্ন মজুমদার সম্মাননা”। তরুণ এই সুরসাধকের রয়েছে পরিবারিকভাবে সঙ্গীত চর্চার ঐতিহ্য। তার মা দিলরুবা আক্তারও একজন নামী সঙ্গীতশিল্পী।

ঢাকা ট্রিবিউনকে দেওয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি কথা বলেছেন নিজের ক্যারিয়ার, সঙ্গীতচর্চা আর গানের বিভিন্ন খুঁটিনাটি নিয়ে।

ঢাকা ট্রিবিউন: আপনার সঙ্গীত চর্চার শুরুটা বলুন?

তুষার: শুরুর গল্প বলা মুশকিল। আমাদের পরিবারে সঙ্গীত এমনভাবে মিশে আছে যে, জন্মের পর অক্সিজেনের মতোই গান রক্তে মিশে গেছে। আপনার জেনে ভালোলাগবে- প্রায় দেড়শ’ বছর ধরে আমরা শুদ্ধ সঙ্গীতের চর্চা করে আসছি। আমার মাতুলকূলে পূর্বপুরুষের আদিভিটা সিলেটের লাংলায়। ওখানে তাদের জমিদারি ছিল। অবিভক্ত ভারতবর্ষে ওই অঞ্চলটি ছিল ত্রিপুরার অন্তর্গত। আমার নানা সরকার লুৎফর রহমান। তিনি একজন ফোক আর্টিস্ট ছিলেন। ১৯৫২ সালে “হিজ মাস্টার্স ভয়েসে” তাঁর অডিও রেকর্ড হয়। তিনি বাংলাদেশ বেতার এবং টেলিভিশনের শিল্পী ছিলেন। নানার ক্ল্যাসিক্যাল তালিম ছিল। তিনি একাধারে মুক্তিযোদ্ধা, সুরকার, গীতিকার ও শিল্পী ছিলেন। নানার সঙ্গে আমার কাজ করার ইচ্ছাটা পূরণ হয়নি।

যদি ঘরের বাইরে সঙ্গীত শিক্ষার কথা বলেন, তাহলে বলব- পরিবারের বাইরে প্রথম অনুপ্রাণিত করে আমার বন্ধু ও মেন্টর শারমিন ইরা। ওর ইন্ধনেই ঘরের বাইরে আমার তালিম শুরু। ওস্তাদ অনীল কুমার সাহা, ওস্তাদ সাজিদ হোসাইন, ওস্তাদ মো. শাকুরের মতো শ্রদ্ধাভাজন গুণীজনেরা আমাকে তালিম নেওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। এখনো তালিম নিচ্ছি ওস্তাদ নেয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরীর কাছে। এর বাইরে আমার অনেক সহপাঠী ও সহকর্মীর থেকেও শিখছি।

ঢাকা ট্রিবিউন: তরুণ বয়সেই আপনি সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে কাজ শুরু করে নজর কেড়েছেন। এই অনুভূতিটা কেমন?

তুষার: ২০১৫-তে যাত্রা শুরু করে মিউজিক প্রোডাকশন প্রতিষ্ঠান “অক্ষর রেকর্ডস”। আমার “স্টুডিও অক্ষর” যখন ছিল না তখন স্টুডিও ভাড়া নিয়ে কাজ করতাম। ফলে স্টুডিও আর অফিস শিডিউল সামলাতে হিমশিম খেতে হতো। সময়ের সমন্বয় করতে গিয়েই নিজ বাড়ির নিচতলায় এই স্টুডিওটা করা।

শ্রীকান্ত আচার্যের সঙ্গে মুনতাসির তুষার ফেসবুক

ঢাকা ট্রিবিউন: চাকরি আর মিউজিক, সময় সমন্বয় করেন কীভাবে?

তুষার: আমি কখনোই মনে করি না যে, চাকরির পাশাপাশি মিউজিক করছি। আমি মিউজিকেও ফুলটাইমার। সঙ্গীত আমার প্যাশন ও প্রেম হওয়ায় এটা আমাকে হ্যাপি রাখে। তাই ক্লান্তিও আসে দেরিতে। টায়ার্ড লাগলে আমি অবকাশে যাই। তখন নিজেকে ভাবি। আর অদ্ভূত হলেও সত্য, তখনও সঙ্গীত আমাকে ঘিরে থাকে। সেটা সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে একটা যোগসূত্র তৈরি করে।

ঢাকা ট্রিবিউন: দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত “গ্লোবাল মিউজিক অ্যাওয়ার্ড-২০১৮”তে আপনি পুরস্কৃত হয়েছেন। উদিয়য়ান সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে পেয়েছেন কলকাতায় “গৌরিপ্রসন্ন মজুমদার সম্মাননা”।কেমন লাগে?

তুষার: অবশ্যই ভালো লাগে। যেকোনো স্বীকৃতিই অনুপ্রেরণাদায়ক।

ঢাকা ট্রিবিউন: আপনার সুরের প্রেরণা কী?

তুষার: সুর তো ধরা দেয়। আমার অনুভূতিগুলো সুর বহন করে আনে।

ঢাকা ট্রিবিউন: গান ছাড়া একটা দিন কেমন হতে পারে?

তুষার: আমার মনে হয় সেদিন পৃথিবী থাকবে না। সেদিন খুনের দিন, ধ্বংসের দিন হবে। সৃষ্টির শুরু থেকেই তো সুর আছে। তাই হৃদস্পন্দনের তালে তালে সুর আমাদের উজ্জীবিত করে। আমি বিশ্বাস করি, সংগীত হচ্ছে দর্শন, কেবল স্বর এবং সুরের সন্ধান নয়। সংগীত হচ্ছে পরমাত্মার সাথে যোগাযোগের মাধ্যম। আমার আধ্যাত্মিক গুরু সৈয়দ গাজী শাহ বলেন- সঙ্গীত অন্তরে আলো জ্বালে, পরমাত্মার সাথে লীন করে দেয়।

ঢাকা ট্রিবিউন: বলছিলেন, সুর-সঙ্গীত দর্শনের মাধ্যম। আপনার গান কি কোনো দর্শন ব্যক্ত করে?

তুষার: অবশ্যই আমার গানে আপনি দর্শন পাবেন, বক্তব্য পাবেন, অনুপ্রেরণা খুঁজে পাবেন। যেমন- বৃষ্টি সিরিজের প্রিয়াঙ্কা গোপের গাওয়া গানটি নারীকে উজ্জীবিত করে। অনুপ্রেরণা ও শক্তি দেয়। শ্রীকান্ত আচার্যের “বৃষ্টি” প্রেমের শক্তিকে প্রকাশিত করে। নাসার গাওয়া “বৃষ্টি” ভঙ্গুর মনে নতুন করে চলার অনুপ্রেরণা যোগায়। তো, আমার মনে হয়, আপনি সাধারণভাবে শুনলে গানগুলো একরকম আবেদন সৃষ্টি করে, আপনি বিশেষভাবে শুনলে ভিন্ন দার্শনিক মাত্রা যোগ করে।

ছবি: ফেসবুকঢাকা ট্রিবিউন: এখন কী নিয়ে ব্যস্ত আছেন?

তুষার: গান নিয়ে আগের চেয়ে ব্যস্ততা বেড়েছে। প্রতিষ্ঠিত শিল্পীদের পাশাপাশি নতুনদের নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করছি। এছাড়া চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে কাজের কথা চলছে। শিগগিরই এ বিষয়ে জানাতে পারব।

এছাড়া, কণ্ঠশিল্পী সাব্বির নাসিরের সঙ্গে “সাইকেডেলিক রক” (Psychedelic rock) ঘরানার গান নিয়ে  এক্সপেরিমেন্ট করছি। পপ ও রোম্যান্টিক গান নিয়ে কাজ করছি সালমান, সম্রাট, ঐশী, পল্লবী, হাসান, বান্টি, বদরুল, তিয়াশ, প্রিয় এবং নাসার সঙ্গে। প্রিয়াঙ্কা গোপেরসঙ্গে ক্ল্যাসিক্যাল গান নিয়ে কাজ করছি। এছাড়া আমার মায়ের জন্য গোপনে গোপনে ৫-৬টা গান রেডি করে ফেলেছি। সুযোগ বুঝে সেগুলোর রেকর্ডিংয়ের পরিকল্পনা করছি।