Friday, May 31, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

রনদীপ হুডা: এক্সট্র্যাকশন আমার জীবনের সেরা কাজগুলোর একটি

ঢাকা ট্রিবিউনকে দেওয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে এক্সট্র্যাকশনে অভিনয় করা এই শিল্পী জানিয়েছেন হলিউড ও বাংলাদেশের বিভিন্ন বিষয়বস্তু সম্পর্কে তার মতামত

আপডেট : ১৫ মে ২০২০, ১০:০০ পিএম

চরিত্রের প্রয়োজনে নিজের শরীরের ওজনে পরিবর্তন আনতে একদমই দ্বিধা করেন না বলিউড তারকা রনদীপ হুডা। অভিনেতা হিসেবে পেশাগত বাধ্যবাধকতা না থাকলেও নিজের কাজকে আরও ভাল করে ফুটিয়ে তুলতে এমনটা করেন তিনি। সম্প্রতি অনলাইন বিনোদন প্ল্যাটফর্মে মুক্তি পেয়েছে রনদীপ অভিনীত সর্বশেষ ছবি এক্সট্র্যাকশন।

এই ছবিতে চিরচেনা ভোল পাল্টে নিজেকে প্রায় অচেনা রূপ দিয়েছিলেন তিনি।

অভিনয়ের পাশাপাশি রনদীপ একজন নিবেদিতপ্রাণ ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফার, সুঠামদেহী অশ্বারোহী এবং জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) দূত। 

অভিনীত চরিত্রকে দর্শকের সামনে ফুটিয়ে তুলতে নিজের সবটুকু নিংড়ে দেন তিনি।

ঢাকা ট্রিবিউনের সাদিয়া খালিদকে দেওয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে এক্সট্র্যাকশনে অভিনয় করা এই শিল্পী জানিয়েছেন অভিনয় সম্পর্কে তার মতামত। এখানে উঠে এসেছে হলিউড ও বাংলাদেশের বিভিন্ন বিষয়বস্তু।

ঢাকা ট্রিবিউন: গত মাসেই আপনার এক্সট্যাকশন মুভিটি মুক্তি পেয়েছে। ইতোমধ্যে এটি আগের অনেক রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। কাজ করার সময় এমন সাড়া পাওয়ার আশা করেছিলেন?

রনদীপ: ধন্যবাদ। আমি জানতাম অনেক মানুষ এর সঙ্গে যুক্ত হবেন। ভাল প্রচারণা হবে এবং এটি ব্যাপক পরিচিতি পাবে। ক্রিস হেমসওয়ার্থ একজন বিশ্বনন্দিত তারকা। তবে সত্যি বলতে এত বড় সাফল্যের কথা ভাবিনি। ১৯০টি দেশের কোটি কোটি দর্শকের কাছে পৌঁছানো একটি অভাবনীয় অভিজ্ঞতা।

ঢাকা ট্রিবিউন: ভারতে কেমন সাড়া মিলছে?

রনদীপ: দারুণ। মনে হচ্ছে আমি অলিম্পিকে অংশ নিয়ে সাফল্য পেয়েছি। (হাসি) কারণ এটি একটি অ্যাকশন মুভি, এখানে শারীরিক ব্যাপার-স্যাপার প্রত্যক্ষ। আমার মনে হয় আমার দেশের জনগণের সম্মান রাখতে পেরেছি আমি।

ঢাকা ট্রিবিউন: ছবিটির বেশিরভাগ দৃশ্য ঢাকাকেন্দ্রিক। কিন্তু আপনি বোধহয় এখানে আসেননি, তাই না?

রনদীপ: এখানে (ঢাকা) একটি ইউনিট ছিল। তারা ঢাকার *এরিয়াল শট নিয়েছে। কিন্তু অভিনেতারা সরাসরি সেখানে যাননি। আমরা গুজরাটের আহমেদাবাদে শুটিং করেছি। বোম্বেতেও অল্পকিছু দৃশ্যের শুটিং হয়েছে। তারপরে আমরা ব্যাংকক ও পার্শ্ববর্তী নাখোমপাথোনে শুটিং করেছি।

ঢাকা ট্রিবিউন: কোনো কারণে কখনো বাংলাদেশে এসেছিলেন?

রনদীপ: না। বছর কয়েক আগে ঘনিষ্ঠ বন্ধু চাঙ্কি পান্ডের সঙ্গে একটি ছবির কাজ করছিলাম। তিনি আমাকে বাংলাদেশ সম্পর্কে বলেছিলেন। একসময় তিনি "ঢাকার অমিতাভ বচ্চন" নামে পরিচিত ছিলেন। আমি অনেক অনেক বছর আগের কথা বলছি।

আমি কখনো ঢাকায় যাইনি। ছবির প্রয়োজনে বাংলা শিখেছিলাম। তবে আমার বাংলা সংলাপের দৃশ্যটি বাদ দেওয়ায় স্ক্রিনে আমাকে বাংলা বলতে দেখা যায়নি। তবে ভাষাটি মিষ্টি এবং আমি খুব উপভোগ করেছি।

ঢাকা ট্রিবিউন: আপনি একজন নিবেদিতপ্রাণ ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফার এবং সংরক্ষণকর্মী। বাংলাদেশ রয়েল বেঙ্গল টাইগারের জন্য বিখ্যাত। আশা করি, শিগগিরই আমরা আপনাকে সুন্দরবনে বাঘের ছবি তুলতে দেখব।

রনদীপ: হ্যাঁ, সুন্দরবনে যাওয়ার ইচ্ছা আছে। আমি অ্যাকোয়াটিক মাইগ্রেটরি অ্যানিম্যালসের (পরিযায়ী জলজ প্রাণী) একজন দূত (জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি ইউএনইপি'র)। ম্যানগ্রোভ বনের সাঁতার কাটা

শিকারি বাঘের দেখা পেতে আমি মুখিয়ে আছি। একজন দূত এবং ফটোগ্রাফার হিসেবে সেখানে যেতে চাইব আমি।

ঢাকা ট্রিবিউন: ইউএনইপি'র একজন দূত হিসেবে আপনার পরিকল্পনা কী?

রনদীপ: জল, স্থল ও আকাশে এমন অনেক প্রাণীর বিচরণ যারা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় অভিবাসন করে। আমাদের উদ্দেশ্য হলো, যেসব দেশ ও অঞ্চলে তারা ঘুরে বেড়ায় সেগুলোকে নিরাপদ হিসেবে গড়ে তোলা। কারণ তারা উপযুক্ত পরিবেশ না পেলে তা পুরো পৃথিবীর জন্যই ক্ষতিকর। কিন্তু দূত হিসেবে আমি কাজ শুরু করার আগে এই লকডাউন শুরু হয়ে গেলো।

ঢাকা ট্রিবিউন: চরিত্রের প্রয়োজনে বিশেষ ত্যাগ স্বীকারের জন্য আপনার সুনাম রয়েছে। যেমন সর্বজিৎ চরিত্রের জন্য আপনি ৩০ কেজি ওজন কমিয়েছিলেন, পরে আবার সেটা পুনরুদ্ধারও করেছেন।

রনদীপ: “দো লাফজো কি কাহানি” ছবির জন্য আমি ২০ কেজি ওজন বাড়িয়েছিলাম। আর্নল্ড শোয়ার্জনেগারের মতো পেশীবহুল শরীর বানিয়েছিলাম। এতে ছয় মাস সময় লেগেছিল। তারপরে সর্বজিৎ চরিত্রটির জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়ে দেখলাম স্বল্প সময়ের মধ্যে ওজন কমাতে হবে। যত ওজন কমাতে থাকলাম, ততো আমার শরীর ছিপছিপে আর সুন্দর হতে লাগল। পুরোপুরি খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিয়ে পেশীগুলোকে ভেঙে ফেললাম। বেশ কষ্টসাধ্য ছিল ব্যাপারটা। চরিত্রটির শারীরিক কষ্ট ক্যামেরায় ফুটিয়ে তুলতে না পারলে যথার্থতা আসতো না। আর সর্বজিতের বিষয়গুলো আমি অনুভব করতে চেয়েছিলাম। ১৮ বছর ধরে আলোহীন কারাগারে বন্দি থাকা, সেইসঙ্গে হাত-পায়ে শেকল বাঁধা। একাকি আর অভুক্ত থেকে আমি ওইসব কষ্ট কিছুটা হলেও অনুভব করতে পেরেছি।

আমার মা ছবিটি দেখেননি। ছবিটির জন্য যখন কাজ করছিলাম তিনি তখন বাড়ি ছেড়ে চলে গেলেন। থাকলে তিনি হয়ত এটা-সেটা বানিয়ে আমাকে খাওয়াতে চাইতেন এবং আমি না করতাম। সেজন্য এক-দু' সপ্তাহ পরে তিনি বললেন, আমি তোমাকে এই অবস্থায় দেখতে পারব না। তাই চলে যাচ্ছি। তাই তিনি আমার বাড়ি ছেড়ে ফরিদাবাদের বাড়িতে চলে গেলেন। আর ছবির প্রিমিয়ারের সময়ও তিনি পুরোটা না দেখেই উঠে গিয়েছিলেন।

ঢাকা ট্রিবিউন: এভাবে ওজন বাড়ানো-কমানো কি আপনার স্বাস্থ্যের ওপরে প্রভাব ফেলে?

রনদীপ: হ্যাঁ। এক বছরের মধ্যে এভাবে ওজন বাড়ানো-কমানোর কারণে আমার শরীরের বিপাক প্রক্রিয়া নষ্ট হয়ে গেছে। এছাড়া, আরও কিছু অভ্যন্তরীণ অসুবিধা হচ্ছে। আমি কাউকে এমনটা করার পরামর্শ দেব না। অতিরিক্ত উচ্চতায় পৌঁছানোর প্রয়োজন নেই আপনার। এটা একটা ব্যক্তিগত পছন্দ মাত্র।

ঢাকা ট্রিবিউন: এক্সট্র্যাশনের এই চরিত্রটির জন্য আপনাকে কি অনেক প্রশিক্ষণ নিতে হয়েছে?

রনদীপ: অনেক, অনেক, অনেক! প্রথমতঃ আমি যেমন, শারীরিকভাবে আমাকে তার চেয়ে বড়সড় হতে হয়েছে। ছবিতে আমাকে একজন “সরদারের” ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয়েছে। পরিশ্রমী একজন সর্দারের মতোই আমাকে ওজন পরিবর্তন করতে হয়েছে। কারণ ক্রিস আসলেই বড়সড় একটা মানুষ। ছবির একাধিক দৃশ্যে তার জন্য হুমকির কারণ হতে গেলে সামঞ্জস্যপূর্ণ দেহাবয়ব দরকার।

আর মারামারির দৃশ্যের জন্য দুই-তিন সপ্তাহ আমরা প্রচুর রিহার্সেল করেছি। প্রত্যেকটা ঘুষি থেকে শুরু করে প্রতিটি ছুরির পোচ, প্রতিপক্ষকে বোকা বানানো, আঘাত হজম, হ্যান্ডগানের ব্যবহার নিয়ম করে শিখতে হয়েছে। ক্রিসের কাছে পরামর্শ চাইলে সে বলত, “অ্যাকশন স্টার হতে চাইলে তোমাকে অবশ্যই এগুলো করতে হবে।” আর ছবির স্ট্যান্টম্যান, অ্যাকশন কো-অর্ডিনেটররা সত্যিকারার্থেই ছিল বিশ্বসেরাদের সেরা। অভিনেতাকে অক্ষত রেখে তারা এসব দৃশ্যের জন্য কাজ করেছেন। আবার সেসব দৃশ্যকে বাস্তব রূপে ফুটিয়েও তুলতে হয়েছে।

ছবিতে আমি আর ক্রিস পরস্পরকে আসলেই মেরে ফেলতে চেয়েছিলাম। নাচের মতোই আমরা কোরিওগ্রাফি রিহার্সেল করেছি। কিন্তু প্রলুব্ধ করার বিপরীতে আমরা একে অপরকে মেরে ফেলতে চাচ্ছিলাম। পদ্ধতি একই হলেও পার্থক্যটা এখানেই।

ঢাকা ট্রিবিউন: ছবিতে আপনার কোনো পছন্দের দৃশ্য?

রনদীপ: ১২ মিনিটের ওই শটটা। ওটা আসলে ছবির হাইলাইট। ক্রিস আর রুদ্রাক্ষ্মের ওই দৃশ্যটা আমার অনেক পছন্দের। টাইলার যখন অভিকে সবার সামনে নিয়ে এলো সেটা ছিল ছবির সবচেয়ে আবেগী দৃশ্য। আমি মনে করি ক্রিস বর্ণনাতীত সুন্দরভাবে বিষয়টি ফুটিয়ে তুলেছে। দৃশ্যটির আবেগী ভাবের জন্য আমি সত্যিই এটাকে অনেক পছন্দ করি।

ঢাকা ট্রিবিউন: একজন সহ-অভিনেতা হিসেবে ক্রিস কেমন? তার সঙ্গে মনে রাখার মতো কোনো স্মৃতি?

রনদীপ: রন হাওয়ার্ড পরিচালিত রাশ মুভিতে ক্রিসের কাজ দেখে অভিভূত হয়েছিলাম। সে অত্যন্ত মিশুক, কাজের প্রতি আন্তরিক। প্রচুর পরিশ্রম আর হোমওয়ার্ক করে সে, মানুষের মধ্যে এসব গুণকে আমি শ্রদ্ধা করি। একইসাথে তার রসবোধ ও মজা করার গুণও অসাধারণ। সবসময় সবাইকে হাসিয়ে বেড়ায়, কখনোই রাশভারী হয়ে যায় না। আমি মনে করি এটা একটা বড় গুণ। আমি এই ধরনের বিষয় শিখতে আগ্রহী। সে আসলেই অসাধারণ মানুষ এবং তার সঙ্গে কাজ করাটা উপভোগ্য।

ঢাকা ট্রিবিউন: ২০০১ সালে মনসুন ওয়েডিং দিয়ে শুরু  করে দীর্ঘদিন বলিউডে কাজ করছেন। হলিউড ও বলিউডে কাজের মধ্যে বড় ধরনের কোনো পার্থক্য চোখে পড়ে?

রনদীপ: সেখানকার কাজে (হলিউড) ছিল অনেক বেশি প্রস্তুতি, অনেক বেশি রিহার্সেল, বহু সংখ্যক অভিনয়শিল্পীর সমাগম। আর মুভিটির সেটাপ ছিল বিশাল। অভিনেতাদের সেটে নামানোর আগে তারা মাসের পর মাস রিহার্সেল করে। বিষয়টি এমন যে, আপনি “র‍্যাম্বো”র মতো হলিউড সিনেমা দেখতে পছন্দ করেন আর হঠাৎই তেমন একটি ছবিতে কাজের সুযোগ পেয়ে গেলেন। এটা আমার জীবনের সেরা কাজগুলোর একটি।

ঢাকা ট্রিবিউন: ভবিষ্যতে আরও হলিউড ছবিতে কাজ করবেন?

রনদীপ: আমি তেমনটাই আশা করি। এই কাজের মাধ্যমে দরজা খুলে গেলো। আনন্দের সঙ্গে রাজি হয়ে যাব। আমি মনে করি একজন শিল্পীর গভীরতম চাওয়া হলো যত বেশি সম্ভব দর্শকের কাছে পৌঁছানো। আর এসব ছবি বিশ্বব্যাপী প্রচারণা পায়।

ঢাকা ট্রিবিউন: এই লকডাউনে কী করছেন?

রনদীপ: বিভিন্ন শারীরিক কসরৎ এবং হারমোনিয়ামে ভোকাল কর্ডের চর্চা। মস্তিষ্কের বিভিন্ন এক্সারসাইজ আর নেটফ্লিক্স। সব মিলিয়ে দুর্দান্ত।

ঢাকা ট্রিবিউন: বাংলাদেশি ভক্ত ও শুভানুধ্যায়ীদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন।

রনদীপ: সেখানে যাওয়ার জন্য মুখিয়ে আছি। যেমনটা আপনি বললেন, হতে পারে সেটা সুন্দরবন। আপনাদের সবার সঙ্গে দেখা করতে চাই এবং আমি জানি বাংলাদেশ আর ভারতের মানুষের মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য নেই। কারণ, মাত্র কয়েক দশক আগেও আমরা একই দেশ ছিলাম। আমার অনুরোধ থাকবে, দয়া করে আমার কাজগুলো দেখুন এবং আমি চেষ্টা করব আপনাদের বিনোদিত করতে। ধন্যবাদ।


About

Popular Links