Sunday, May 19, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

কাওসার আহমেদ চৌধুরীহীন চৈতী রাতে, কবিতার সাথে

হয়তো এরমধ্যেই অদেখা ভুবনে লাকী আখন্দের সাথেও সাক্ষাৎ হয়েছে কাওসার আহমেদ চৌধুরীর। চিরনিদ্রায় না থেকে মাটি দিয়ে লিখছেন কাওসার, আর তাতে সুর বসাচ্ছেন লাকী, সৃষ্টি হচ্ছে অপার্থিব সঙ্গীত

আপডেট : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১২:৩২ পিএম

বসন্তের সীমানার খোঁজে যেন ছিলেন গীতিকবি কাওসার আহমেদ চৌধুরী। এরপর ফেরারী পাখি হয়ে আর কূলায় ফেরেননি। তাকে যে ফেরানো যাবে না সেটি নিশ্চিত হয় মঙ্গলবার রাত ৯টা ৪০ মিনিটে। লোকান্তরিত হন তিনি। তখনও যুতসই সময় আসেনি কবিতার পড়ার রাতের নির্জন প্রহরের।

বয়স ৭৭ হলেও কাওসার আহমেদ চৌধুরীর এমন চলে যাওয়া অকালই বলা যায়। তিনি হয়তো মিস করছিলেন তার সঙ্গীত সারথী লাকী আখন্দকে। বাংলা সঙ্গীতের এ কিংবদন্তি প্রয়াত হন ২০১৭ সালের ২১ এপ্রিল। লাকী-কাওসার জুটি একাত্ম হয়ে অন্য এক উচ্চতায় পৌঁছে দেন সঙ্গীতকে। মাণিকজোড় হয়ে থাকা এই সৃষ্টিশীলদ্বয়ের বহু জনপ্রিয় গানের মধ্যে উল্লেখ করা যায়, “যেখানে সীমান্ত তোমার, সেখানে বসন্ত আমার”, “কবিতা পড়ার প্রহর এসেছে রাতের নির্জনে”, “আজ এই বৃষ্টির কান্না দেখে”, “এই রুপালি গিটার ফেলে”, “আমায় ডেকো না” ইত্যাদি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম এ গান শুনে যাচ্ছে। যে কিশোর আজ মাত্র গিটার, কিবোর্ড বাদন শিখছে তার হৃদয়েও গাঁথা এই অজর সঙ্গীতমালা। সর্বকালে ঠাঁই পাওয়া এমন সৃষ্টিময় জীবন শেষে কাওসার আহমেদ চৌধুরী এখন অনন্তলোকের ফেরারী পাখি।    

কাওসার আহমেদ চৌধুরীর আরেক পরিচয় বিখ্যাত জ্যোতিষী হিসেবে। ১৯৯৯ সাল থেকে প্রথম আলোর সাপ্তাহিক ক্রোড়পত্র “ছুটির দিনে”-তে সাপ্তাহিক রাশিফল “আপনার রাশি”র যাত্রা। ভাগ্য জানতে আগ্রহীরা মূল পত্রিকা রেখে কাওসারের লেখা আগে পড়ে গেছেন। তিনি প্রথাগত কোনো জ্যোতিষী নন। প্রতি সপ্তাহে রাশিফলের শুরুতেই তিনি লিখতেন, “নিজের ভাগ্য নিজেই নিয়ন্ত্রণ করা যায় শতকরা ৯০ থেকে ৯৬ ভাগ। বাকিটা ফেট বা নিয়তি।” এই জননন্দিত রাশিচক্রে “নিউমারলজি” বা “সংখ্যা-জ্যোতিষ” পদ্ধতি প্রয়োগ করতেন তিনি। মূল কাগজের চেয়ে কাওসার আহমেদ চৌধুরী’র লেখনির দাপট ছিল ব্যাপকতর। হরস্কোপ নিয়ে বিশ্বজুড়েই পাঠক আকর্ষণ ছিল, আছে ও থাকবে। কিন্তু কাওসারহীন বাংলায় এর হাল ধরবেন কে?

কাওসার আহমেদ চৌধুরী মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। প্রথমা প্রকাশনী থেকে বের হয়েছে তার “ভাগ্য জানার উপায়” নামে একটি বই। এটিও পাঠক প্রিয়তা পেয়েছে। “ঘুম কিনে খাই” নামে একটি কাব্যগ্রন্থও আছে তার। অথচ এত এত জনপ্রিয় এই স্রষ্টা জীবন জুড়েই ছিলেন নেপথ্যে। তাকে লাগে যেন এ সময়ের এক “রহস্যমানব”। আত্মপ্রচার, পুরস্কার লালায়িত হওয়ার মতো তৎপরতার বিপরীতে তিনি ছিলেন আপদমস্তক নেপথ্যে।

কাওসার আহমেদ চৌধুরীর জন্ম সিলেটে। শিল্পী হওয়ার বাসনায় চারুকলায় ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু পড়া শেষ করেননি। কিন্তু তাতে কিছুই আসে যায়নি। শিল্পী তিনি ঠিকই হয়েছেন বহুমাত্রিক ধারায়। বেশ কিছু তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন। অমূল্য সেসব সৃষ্টি জনপদের লোকেরা টের পাবে বহু দেরিতে। সময়ের চেয়ে অগ্রসর জীবনে এমন কিছু অবশ্য নতুন কিছু নয়।  

নিজেকে নিয়ে একটি কবিতা লিখেছিলেন কাওসার আহমেদ চৌধুরী। তার প্রয়াণবেলায় তা প্রাসঙ্গিক।

“আমি শুধু এক দরিদ্র জ্যোতিষী

ধরে আছি গাঢ় অন্ধকারে

তোমার দক্ষিণ হাত

ভয় কি, তুমি পার হয়ে যাবে এই

তুফানি ঝড়ের রাত।”

পাঠক যখন এ লেখা পড়ছেন ততক্ষণে আজিমপুর কবরস্থানে দাফন হয়েছে কাওসার আহমেদ চৌধুরীর নশ্বর দেহ। হয়তো এর মধ্যে অদেখা ভুবনে সাক্ষাৎ হয়েছে লাকী আখান্দের সাথেও। চিরনিদ্রায় না থেকে মাটি দিয়ে লিখছেন কাওসার। আর তাতে সুর বসাচ্ছেন লাকী। সৃষ্টি হচ্ছে অপার্থিব সঙ্গীত। কিন্তু আমরা তা শুনতে পাচ্ছি না। কী বিচিত্র মানব জীবন! অসামান্য সক্ষমতা আর অগণন সামর্থহীনতায় ভরা। সামনের অনাগতরাও নিষিক্ত হবেন প্রতিভাধর গীতিকবি কাওসার আহমেদ চৌধুরীর লিখিত গানে। জোনাকির আলো নিভে আর জ্বলে লগ্নে সেই লাইন “কবিতার সাথে চৈতী রাতে কেটেছে সময় হাত রেখে হাতে... ”


লেখক, ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা হাসান শাওনের জন্ম, বেড়ে ওঠা রাজধানীর মিরপুরে। পড়াশোনা করেছেন মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি বাঙলা কলেজ, বাংলাদেশ সিনেমা ও টেলিভিশন ইনিস্টিটিউটে। ২০০৫ সাল থেকে তিনি লেখালেখি ও সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত। কাজ করেছেন সমকাল, বণিক বার্তা, ক্যানভাস ম্যাগাজিন ও আজকের পত্রিকায়।

২০২০ সালের ১৩ নভেম্বর হাসান শাওনের প্রথম বই “হুমায়ূনকে নিয়ে” প্রকাশিত হয়।


প্রকাশিত মতামত লেখকের ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন এর জন্য কোনো ধরনের দায় নেবে না।






About

Popular Links