Monday, May 20, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

শিমুল বিশ্বাস: ছবি নিয়ে প্রোডিউসারের জার্নি কখনো শেষ হয় না

‘দেবী’ এবং ‘হাওয়া’র মতো দুটি দর্শকনন্দিত ছবিরই নির্বাহী প্রযোজক হিসেবে কাজ করেছেন এই তরুণ। সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন ভেতরের অনেক না জানা গল্প। তরুণদের জন্য দিয়েছেন পরামর্শ

আপডেট : ১৮ অক্টোবর ২০২২, ০৬:৩৮ পিএম

একটি শুটিং ইউনিটে ক্যামেরার পেছনে যারা কাজ করেন তাদের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একজন হলেন প্রযোজক। ১০ বছর ধরে বাংলাদেশের ভিজ্যুয়াল মিডিয়ায় পেশাদার প্রযোজক হিসেবে কাজ করছেন শিমুল চন্দ্র বিশ্বাস। জনপ্রিয় অসংখ্য বিজ্ঞাপনে জড়িয়ে আছে তার নাম। তবে সাধারণ দর্শক তাকে চিনতে পারবেন দুটি ছবির নাম বললেই! ‘‘দেবী’’ এবং ‘‘হাওয়া’’। দুটি ছবিরই নির্বাহী প্রযোজক হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। 

ক্যামেরার পেছনের নিভৃতচারী, পারফেকশনিস্ট এই মানুষটি নিজের কাজের বিষয়ে দারুণ নিবেদিতপ্রাণ এবং খুঁতখুঁতে। সে কারণেই নামকরা পরিচালকদের আস্থায় থাকেন তিনি। 

নেপথ্যের এই মানুষটির সঙ্গে কথা বলেছেন ফাহিম ইবনে সারওয়ার। 

প্রশ্ন: আপনার শুরুটা কীভাবে? এক্সিকিউটিভ প্রোডিউসার হিসেবে আপনার পথচলা সম্পর্কে জানতে চাই। 

শিমুল: আমি অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে পড়তে গিয়েছিলাম। সেখানেই অ্যাকাডেমিকভাবে আমার প্রথম ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন প্রোডাকশনে হাতেখড়ি। ক্যাম্পাসের ক্যারিয়ার কাউন্সিলর আমাকে বলেছিলেন, শিমুল তুমি প্রোডিউসার হিসেবে ভালো করবে। তখন থেকে ব্যাপারটা মাথায় ছিল। আমার যেহেতু ম্যানেজমেন্ট স্কিল ভালো, মেমোরিও ভালো এবং গুছিয়ে কাজ করার অভ্যাস, তো আমারও মনে হয়েছিল করা যায়। তারপর বাংলাদেশে ফিরে এসে আমি কাজ শুরু করি অ্যাসিসটেন্ট ডিরেক্টর হিসেবে, গিয়াসউদ্দিন সেলিমের সাথে। ওনার সাথে প্রায় বছরখানেকের মত কাজ করি নাটকের। এরপর কাজ করি বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশনে, লোকেশন ম্যানেজার হিসেবে। ওখানে কাজ করতে গিয়ে রনির সাথে আমার পরিচয়। ও আগে ফেইসকার্ডে এক্সিকিউটিভ প্রোডিউসার হিসেবে কাজ করতো। তো আমরা অল্প সময়েই খুব ভালো বন্ধু হয়ে যাই। রনিই আমাকে ফেইসকার্ডে নিয়ে আসে। আমি প্রথমে এডি হিসেবে জয়েন করি, তারপর চিফ এডি হিসেবে কাজ করি। যখন মনে হলো যে যথেষ্ট অভিজ্ঞতা হয়েছে এখন প্রোডিউসার হিসেবে কাজ করতে পারবো, তখন শুরু করি। 

প্রশ্ন: আপনার দুটো গুণের কথা বললেন, ম্যানেজমেন্ট ভালো এবং মেমোরি ভালো। একজন এক্সিকিউটিভ প্রোডিউসারের আর কী কী গুণ থাকতে হয়?

শিমুল: ম্যানেজমেন্ট স্কিল তো অবশ্যই লাগবে। খুবই পপ হতে হবে। অর্থাৎ, নিজে পপ না হলেও আশেপাশে পপ কালচারে কী চলছে সেটা জানতে হবে। পিক করতে হবে, রিস্ক নিতে হবে। পিক বলতে, ধরেন আপনার কাছে পাঁচটা অপশন আছে, কিন্তু ছয় নম্বর একটা অপশনও আছে যেটা কেউ ট্রাই করেনি। সেটা ভালোও হতে পারে, খারাপও হতে পারে। তো ওই অপশনটা কাজে লাগাবেন কি-না সেই সিদ্ধান্তটা নেওয়ার ক্ষমতাটা থাকতে হবে। 

প্রশ্ন: এক্সিকিউটিভ প্রোডিউসার হিসেবে আপনার প্রথম ছবি কোনটা ছিল?

শিমুল: দেবী দিয়েই শুরু। 

প্রশ্ন: প্রথম ছবির ক্ষেত্রে আপনার চ্যালেঞ্জ কী ছিল?

উত্তর: বড় স্কেলে কাজ করা, বড়ভাবে চিন্তা করাটা চ্যালেঞ্জ ছিল প্রথমত। সাথে আমাদের ফেসকার্ডের টিমটাই ছিল। যাদের সাথে  নিয়মিত কাজ করি। কিন্তু ডিরেক্টর অনম ভাইয়ের সাথে আগে কখনো কাজ করা হয়নি। তার সাথে বোঝাপড়া, তার টিমের সাথে বন্ধুত্ব, এগুলোতে একটু সময় লেগেছিল কিন্তু সবকিছু ভালোভাবেই করতে পেরেছিলাম। 

প্রশ্ন: “দেবী”র পর “হাওয়া”। “হাওয়া”র ক্ষেত্রে আপনার চ্যালেঞ্জ কী ছিল? লোকেশন নাকি সমুদ্রে কাজ করাটা?

শিমুল: না, হাওয়ার ক্ষেত্রে লোকেশনের চ্যালেঞ্জ ছিল না। কারণ আমরা জানতাম যে সমুদ্রে শ্যুট করবো। আমাদের চ্যালেঞ্জ ছিল অনেকগুলো। বছরের কোন সময়টা সাগর শান্ত থাকে সেটা খুঁজে বের করা, কোন সময়টাতে মাছ ধরা নিষেধ, তা জানা। কারণ মাছ ধরা যখন নিষেধ থাকে তখন বোটের ভাড়া কম থাকে। আবার বোটের ভাড়া যখন কম থাকে তখন মাঝি পাওয়া যায় না। এইসব হিসেব মেলাতে হয়েছিল। সব মিলিয়ে দেখা গেলো অক্টোবর-নভেম্বরের সময়টা আমাদের জন্য সবচেয়ে ভালো হবে। নৌকা খুঁজে বের করাটা আমাদের জন্য বেশ ঝামেলার ছিল। নৌকার জন্য আমরা ছয় থেকে আট মাস বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন টিম নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছি। আমি নিজে গিয়েছি বরিশাল, পটুয়াখালী, চর কুকরি-মুকরি ওই  দিকটায়। বাবলু মামা, শিবলু ভাই এরা গিয়েছেন সুন্দরবন, খুলনার দিকে। নৌকা পেতেই আমাদের অনেক কষ্ট করতে হয়েছে।

হাওয়া পোস্টার/ সংগৃহীত

প্রশ্ন: নৌকার জন্য এত ঘোরাঘুরি কেন করতে হয়েছিল?

শিমুল: আমাদের এমন একটা নৌকা দরকার ছিল যাতে ১০০ জন মানুষ একসাথে থাকতে পারে। নৌকাটা ভারি হতে হবে, যাতে দৌড়াদৌড়ি করা যায়। আবার নৌকাটা আমাদের মতো করে মোডিফাই করতে হবে। সব মালিক তো নৌকা মোডিফাই করতে দেয় না। এত বড় নৌকা পাওয়া যায় না। আমাদের আবার কাঠের বডির নৌকাই লাগবে। এসব হিসাব-নিকাশ করেই নৌকাটা খুঁজে বের করতে হয়েছে।

প্রশ্ন: শুটিংয়ে আপনার কয়টি নৌকা ব্যবহার করেছেন?

শিমুল: আমাদের শুটিংয়ের মূল নৌকা তো একটাই ছিল, যেটাতে শুটিং হয়েছে। সাপোর্টিং বোট আরও কয়েকটা ছিল। পাশে একটা ছোট বোট ছিল যেটাতে আমরা রান্নাবান্না করতাম। আরেকটা থাকতো সার্ভিস ট্রলার যেটা আমাদেরকে তীর থেকে আনা-নেওয়া করতো। মোটামুটি তিনটা বোটেই আমাদের কাজ হয়ে গেছে। 

প্রশ্ন: হাওয়ার ক্ষেত্রে আপনার চ্যালেঞ্জটা তাহলে কী ছিল?

শিমুল: প্রি-প্রোডাকশনটা চ্যালেঞ্জিং ছিল। আমাদের কোন রেফারেন্স ছিল না। সমুদ্রে আমরা আগেও শ্যুট করেছি কিন্তু সেটা ছিল তীরের আশেপাশে। মাঝ সমুদ্রে শ্যুট করলে কি হতে পারে সেটা নিয়ে আমাদের আইডিয়া ছিল না। আমাদের প্রত্যেককেই প্রচুর পড়াশোনা করতে হয়েছে। আমাদের কয়েকজন ডাক্তার বন্ধুবান্ধবের সাথে পরামর্শ করে নেই যে স্বাস্থ্যগত কী কী ঝুঁকি থাকতে পারে। ওরা বললো যে মাথাব্যথা হতে পারে, কারো কারো বমি হতে পারে। সেগুলো আমরা নোট করে কি কি ওষুধ লাগবে সেগুলো নিয়ে নিছি। এর বাইরে আমাদের একজন সাইক্রিয়াটিস্ট বন্ধু ছিল। ওর সাথে  পরামর্শ করলাম। সে বললো যে আপনারা যেহেতু অনেকদিন একসাথে থাকবেন এতগুলো লোক একটা জায়গায়, সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যেই আপনাদের মধ্যে ঝগড়া শুরু হবে। এটা খুব স্বাভাবিক। তো ঝগড়া থামাতে মাঝখানে কাউকে এগিয়ে আসতে হবে। তো আপনারা গ্রুপ ভাগ করে ফেলেন, কোন গ্রুপে ঝগড়া হলে কে এগিয়ে যাবেন...

প্রশ্ন: রেফারি সেট করা..

শিমুল: একদম। আমরা জানতাম গ্রুপ “এ” তে ঝগড়া হলে সেখানে আমি যাব, গ্রুপ “বি”তে শিবলু ভাই, গ্রুপ সি-তে হলে আনিকা যাবে। আমরা এভাবে ভাগ করেই নিয়েছিলাম। আমাদের মধ্যে ঝগড়া লাগবেই আমরা নিশ্চিত ছিলাম এবং সেটা হয়েছেও। কিন্তু সেটার জন্য আমাদের পূর্বপ্রস্তুতি ছিল। 

প্রশ্ন: মানে একজন প্রোডিউসারকে সবকিছু নিয়েই নামতে হবে। সব প্রস্তুতি নিয়েই তাকে শুটিংয়ে যেতে হয়। 

শিমুল: হ্যাঁ। আরও একটা পয়েন্ট আমাদের সেই সাইক্রিয়াটিস্ট বন্ধু বলেছিলেন। আমরা যেন ১০ দিন পর পর সেন্টমার্টিনে নতুন কাউকে নিয়ে যাই দাওয়াত দিয়ে। ফ্রেশ কোনো ফেইস। যারা আমাদের পরিচিত, যাদের দেখে নতুন করে কথা বলার আগ্রহ জাগে। তো আমরা শোয়েব ভাই, রুশো ভাই, স্নেহাদ্রি, টিটু ভাইকে বলে রেখেছিলাম আসতে। তবে একসাথে না, ভাগে ভাগে। ওনারা যখন আসতেন তখন পরিবেশটা পাল্টে যেত। ঈদের সময় বাড়িতে আত্মীয়-স্বজন এলে যেরকম খুশি লাগে সেরকম লাগতো। শুটিং শেষে রাতভর আড্ডা হতো। 

প্রশ্ন: শুটিং কতদিনের ছিল?

শিমুল: সেন্টমার্টিনে আমরা টানা ৪৫ দিন ছিলাম। শুটিং হয়েছে ৩৩ দিন সব মিলিয়ে। এর মধ্যে ঘূর্ণিঝড় “বুলবুল”-এর জন্য শুটিং ছয় দিন বন্ধ ছিল। আর প্রতি ছয় দিন পর পর আমরা একটা বিরতি নিতাম, সাপ্তাহিক ছুটির মতো করে। 

প্রশ্ন: একটা ছবি নির্মাণের ক্ষেত্রে একজন পরিচালক অনেকাংশে তার প্রোডিউসারের ওপর নির্ভর করেন..

শিমুল: …সিনেমার ক্ষেত্রে আমি বলবো শুধু পরিচালক-প্রোডিউসার না, আসলে সবাই সবার ওপর নির্ভরশীল। একটা ফুটবল টিমের মতো। সবাইকেই সবার দরকার। একা কেউ কিছু করতে পারবে না।

ঢাকা ট্রিবিউনের জন্য দেওয়া সাক্ষাৎকারে প্রযোজনার নানা খুঁটিনাটি জানান শিমুল /সৌজন্য ছবি

প্রশ্ন: একজন প্রোডিউসারের টিমে কারা কারা থাকেন? প্রোডাকশন টিমটা কাদের নিয়ে তৈরি হয়?

শিমুল: লাইন প্রোডিউসার, অ্যাকাউন্টস, প্রোডাকশন ম্যানেজার, লোকেশন ম্যানেজার এরা একদম বেসিক। এরা না থাকলে আমি একা কাজ করতে পারব না।  

প্রশ্ন: আপনি বিজ্ঞাপন এবং চলচ্চিত্র দুটি মাধ্যমেই নিয়মিত কাজ করেছেন। আপনার কাছে এই দুই মাধ্যমের পার্থক্য কী মনে হয়েছে?

শিমুল: দুইটার মধ্যে অনেক পার্থক্য। একটা বিজ্ঞাপন আমরা ১০ দিনের প্রস্তুতিতে করে ফেলতে পারি। অল্প ব্যাপ্তির গল্প। কিন্তু সিনেমা অনেক বড় একটা ব্যাপার। সিনেমার মধ্যে ঢুকতে হয়। আপনাকে সিনেমার মধ্যে বাস করতে হবে। আমার কাছে অনেক সিনেমার অফার আসে। কিন্তু আমি স্ক্রিপ্ট পড়েই খারিজ করে দেই। কারণ স্ক্রিপ্ট পছন্দ হয় না, আর যেগুলো পছন্দ হয়, সেগুলো বলে তিন মাস পরে শুটিং। আমি এত অল্প সময়ে সিনেমা করতে পারি না। অনেকেই পারবে কিন্তু আমাদের যে স্কুলিং, মানে সুমন ভাই যেভাবে শিখিয়েছেন তাতে তিন মাসের মধ্যে শুটিং করা আমাদের পক্ষে সম্ভব না।

প্রশ্ন: বাংলাদেশের সিনেমায় “পরাণ” এবং “হাওয়া” দিয়ে যে নতুন একটা পরিবর্তন এসেছে, এই সময়টাকে আপনি কীভাবে দেখেন?

শিমুল: একটা খুব সুন্দর একটা টার্নিং পয়েন্ট হতে পারে। একদিনে হবে না হয়তো, আরও ১০ বছর সময় লাগবে। এই সময়টা বলে দেয় যে, আপনি আপনার গল্পটা বলতে পারবেন। এটা আমার কাছে ইতিবাচক মনে হয়েছে। তবে অনেক সিনেমা লাগবে, একটা “পরাণ”, “হাওয়া” বা “রেহানা মরিয়ম নূর” দিয়ে হবে না। এরকম ছবি বছরে পাঁচ-দশটা লাগবে। দর্শকের হলে আসার জন্য একটা উৎসাহ থাকতে হবে। হলে গিয়ে ছবি দেখাটাকে জীবনের অংশ করে ফেলতে হবে। যেমন- আমরা বিদেশে গেলে দেখি ছুটির দিনে পরিবার নিয়ে ছবি দেখাটা সংস্কৃতির একটা অংশ। আমাদের শহুরে জীবনে ছুটির দিনে খাওয়া ছাড়া আর কোনো সংস্কৃতি নেই। আমরা পরিবার নিয়ে রেস্টুরেন্টে যাই, ভালো একটা খাবার খাওয়ার জন্য জ্যাম ঠেলে ঢাকার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে চলে যাই। যখন দর্শকদের মনে হবে যে সিনেমাটা দেখতেই হবে তখন তারাও নিয়ম করে হলে যাবে। 

প্রশ্ন: একজন এক্সিকিউটিভ প্রোডিউসারের কাজ শুরু হয় রিসার্চ বা স্ক্রিপ্ট থেকে আর তার কাজ শেষ হয় কোথায়? কখন একজন প্রোডিউসার একটা ছবি থেকে বের হয়ে আসতে পারেন?

শিমুল: কখনোই না। একজন প্রোডিউসার কখনো তার সিনেমা থেকে বের হয়ে আসতে পারেন না।  এটা একটা নেভার এন্ডিং জার্নি। নিজের ক্ষেত্রে যদি বলি আমি এখনও “দেবী”র জন্য কল পাই, যে ওই টাকাটা পেয়েছেন কিনা, বা কোনো ফেস্টিভ্যালে ছবিটা পাঠাতে হবে..একটা ছবির কোনো শেষ নাই। একজন ডিরেক্টর হয়তো ফার্স্ট ডে ফার্স্ট শোতে তার জার্নি শেষ করলেন বা যখন এডিটটা লক হয়ে গেল তখন তার কাজ শেষ হয়ে গেল। কিন্তু এক্সিকিউটিভ প্রোডিউসারের কাজ কখনো শেষ হয় না। চিন্তা করেন, যদি ১০ বছর পর কেউ “হাওয়া” বা “দেবী” দেখাতে চায় তারা কিন্তু আমাকেই ফোন করবে। তাই আমার আসলে ছবি থেকে বের হওয়ার কোনো উপায় নাই। সব সময় ছবির সাথেই থেকে যেতে হয়।

প্রশ্ন: এই মুহূর্তে বাংলাদেশে যারা কাজ করছেন, তাদের মধ্যে আপনার পছন্দের এক্সিকিউটিভ প্রোডিউসার কে বা কারা?

শিমুল: এষা, এষা ইউসুফ। আমার ভয়ংকর পছন্দের। আমার মনে হয় এষা হচ্ছে সুপার ওম্যান। ও যেকোনো কিছু করে ফেলতে পারে। আমার অনুপ্রেরণা বলতে পারেন, এষা যেরকম করে কাজ করে আমি সেভাবে করতে চাই। ও আমার ভালো বন্ধু। 

প্রশ্ন: এর বাইরে? নতুন কেউ যারা ভালো করছে বা মনে হচ্ছে সামনে খুব ভালো করবে?

শিমুল: রেহানা মরিয়ম নূরের প্রোডিউসার এহসানুল হক বাবু ভাই। 

প্রশ্ন: বাংলাদেশে প্রোডিউসার হিসেবে নতুন যারা কাজ করতে চায়, আপনার কি মনে হয় তাদের জন্য এখানে একটা নিশ্চিত ক্যারিয়ার আছে?

শিমুল: কিছু কিছু ভুল ধারণা আছে, অনেকে না বুঝে চলে আসে। এক্সিকিউটিভ প্রোডিউসারের কাজ কিন্তু শুধু প্রোকিউরমেন্ট বা ম্যানেজমেন্ট নয়, যেটা আগে বলছিলাম, এর সাথে ক্রিয়েটিভিটি খুব ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কারণ আপনাকে প্রচুর ক্রিয়েটিভ পদক্ষেপ নিতে হবে, আর সেজন্য আপনার প্রচুর পড়া থাকতে হবে, জানা থাকতে হবে। একটা উদাহরণ দেই, আমরা যখন হাওয়া নিয়ে কাজ শুরু করি তখন আমাদের টিমের সবাইকে অন্তত ৩০/৪০ টা করে বই পড়তে হয়েছিল। একদম লিস্ট ধরে ধরে।  আমি দেখলাম যে এর অর্ধেক বই আমার পড়া আছে। তো নতুন যারা আসতে চায় তাদের সেই পড়াশোনাটা থাকতে হবে, তাহলে তারা নিজেদের জায়গাটা করে নিতে পারবে। তখন আর ক্যারিয়ার হিসেবে নিতে সমস্যা হবে না। 

প্রশ্ন: ইউনিটে একজন প্রোডিউসারের ভূমিকা কী থাকে শুটিংয়ের সময়?

শিমুল: অনেকেই আমাকে জিজ্ঞেস করে যে আমি আসলে শুটিংয়ের সময় কী করি? উত্তর- আমি আসলে বসে থাকি! আমি দেখি কোনো ঝামেলা হয় কি-না। যেহেতু আমাদের সবকিছু প্রি-প্ল্যানড থাকে, আমরা জানি যে কখন কী হতে পারে, এর মধ্যে যদি কোনো একটা কাজ ঠিকমতো না হয় তখনই আমার কাজ শুরু হয়। আমাকে সেই সমস্যাটার সমাধান করতে হবে। কিন্তু সমস্যাটা যাতে না হয় সেটা নিশ্চিত করার জন্যই আমরা থাকি। যদি আমাকে দেখেন শুটিংয়ে আমি কাজ করছি তার মানে বুঝবেন আমি পেছনে কোনো একটা ঝামেলা করে এসেছি, সেটাই শুটিংয়ে এসে ঠিক করছি। 

প্রশ্ন: নতুন ডিরেক্টরদের মধ্যে কাদের কাজ আপনার ভালো লাগে? 

শিমুল: তানভীর, তানভীর আহসান। ওনাকে খুব পছন্দ আমার। সুকর্ণ শাহেদ ধীমান। শাওকী, অনীম, এরা সবাই সুন্দর কাজ করছে। 

প্রশ্ন: আপনি যখন একজন ডিরেক্টরের কাজ দেখেন, আপনি কোন দিক থেকে বিচার করেন? টেকনিক্যাল দিক থেকে?

শিমুল: না, টেকনিক্যাল দিক আমি একদমই দেখি না। আমাদের বড় ভাইরা একটা কথা বলেন যে, কলম কখনও কবিতা লেখে না। কবিকেই কবিতাটা লিখতে হয়। আমি দেখি যে গল্পটা কতোটা বলতে পেরেছে। স্টোরি টেলিংটা ঠিকমত হয়েছে কিনা। আর কিচ্ছু না। কারণ ক্যামেরা কমদামি হতে পারে, আর্ট খারাপ হতে পারে। এগুলো ভালো হলে অবশ্যই ভালো। এটা অবশ্যই ভ্যালু অ্যাড করবে। তবে সবার আগে গল্প বলতে পারাটা জরুরি। 

প্রশ্ন: প্রোডিউসার হিসেবে আপনার সিনেমার জার্নিটা শুরু হয় কোত্থেকে?

শিমুল: একদম শুরু থেকে, স্ক্রিপ্ট থেকেই, একটা ইন্টারেস্টিং ঘটনা বলি, আমি তখন উত্তরায় “দেবী” ছবির শুটিং করছি। একদিন অনেক রাতে তখন সুমন ভাই কল দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “শিমুল, শুটিং কি শেষ?” আমি বললাম, না সুমন ভাই চলছে। সুমন ভাই বললেন, থাকো, আসতেছি। সুমন ভাই আর জাহিন চলে আসে উত্তরায়, আমাকে হাওয়ার গল্পটা শোনায়। গল্প শুনে আমি সাথে সাথেই বললাম, “হয়ে গেছে ভাই। গল্প পেয়ে গেছি আমরা! তো এভাবেই শুরু হয়, তারপর তিন, চার, পাঁচ বছর চলে যায় একটা ছবির সাথে। ২০১৭ তে হাওয়ার গল্প শুনেছি, সেটা রিলিজ করতে পেরেছি ২০২২-এ।”

প্রশ্ন: আমাদের ভিজ্যুয়াল মিডিয়ায় ক্যামেরার পেছনে নারীরা কতটা সম্পৃক্ত হচ্ছেন? আপনার অভিজ্ঞতা কী বলে?

শিমুল: আগে কম ছিল, কিন্তু এখন অনেকেই আসছেন। আমাদের কস্টিউম ডিপার্টমেন্ট তো পুরোটা মেয়েরাই দেখছে। প্রোডিউসার হিসেবে এষা তো আছেই, এর বাইরে আমাদের মৌ আপু আছেন, হাফ স্টপ ডাউনের মৌ আপু, তারপরে মৌমিতা, স্বর্ণা আছে, নোভা ফিরোজ আছে। সংখ্যাটা কম না এবং তারা সবাই খুব সুন্দর কাজ করছেন। আরও এলে আরও ভালো হবে। মেয়েরা যত আসবে, আমরা তত সভ্য হবো। 

প্রশ্ন: আপনি অনেক বছর ধরে কাজ করছেন কিন্তু নতুন যারা প্রোডিউসার হিসেবে কাজ করতে আসছেন তাদের হয়তো শুরুতে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়…

শিমুল: …হ্যাঁ, তবে এসব সমস্যা সমাধানের জন্য আমাদের একটা সংগঠন রয়েছে। আমরা এর নাম দিয়েছি বাপ!  Bangladesh Association of Advertising Producers! প্রোডিউসারদের কারো কোনো সমস্যা, অভিযোগ থাকলে আমরা সবাই মিলে সেটা সমাধানের চেষ্টা করি। 

প্রশ্ন: এর নেতৃত্বে কারা আছেন এখন?

শিমুল: কনভেনর হচ্ছেন তারেক ভাই, হাবিবুর রহমান তারেক, রান আউটের। আর জয়েন্ট কনভেনর হচ্ছেন মৌ আপু, মাহজাবিন রেজা চৌধুরী, হাফ স্টপ ডাউনের। 

প্রশ্ন: ছবি নিয়ে আপনার পরবর্তী পরিকল্পনা কী?

শিমুল: “রইদ” নামে আরেকটা ছবি আসছে আমাদের। এখনো কাজ শুরু হয়নি, প্রস্তুতি চলছে, স্ক্রিপ্টের ফার্স্ট ড্রাফট শেষ হয়েছে। এটা সরকারি অনুদানের ছবি। আমাদের আর জয়া আপুর যৌথ প্রোডাকশন হবে, সুমন ভাই ডিরেকশন দেবেন। আর ধীমানের জন্য “ফেউ” নামের একটা সিরিজ নিয়ে কাজ করছি। কার সাথে করবো সেটা এখনও কনফার্ম না কিন্তু করবো সেটা জানি। 

প্রশ্ন: “রইদ” অনুদানের ছবি, “দেবী”-ও অনুদানের ছবি ছিল। অনুদানের ছবিতে কাজ করার অভিজ্ঞতা কেমন? আমলাতান্ত্রিক কোনো জটিলতায় পড়তে হয়েছে কখনো?

শিমুল: না, সেরকম কোনো জটিলতার পড়তে হয়নি। কাজের অভিজ্ঞতা ভালো। অনুদানের ছবিতে কাজ করে দেখেছি, শর্ত মেনে আপনি নির্দিষ্ট সময়ে রাশ জমা দিলে, তারা টাকাটা ছেড়ে দেয়। ধাপে ধাপে নিয়ম মেনে কাজ হয়, কোনো দিক থেকে কোনো ঝামেলা নেই, যদি আমরা ঠিকঠাক মতো কাজটা জমা দিতে পারি। 

প্রশ্ন: সব মিলিয়ে তাহলে এখন আপনার ঝুড়িতে সিনেমা দুটি, “দেবী” আর “হাওয়া”?

শিমুল: আরেকটা ছবি করেছিলাম, চরকির জন্য, অ্যান্থোলোজি ফিল্ম, “এই মুহূর্তে”। সে হিসেবে তিনটি। 

প্রশ্ন: ফিল্ম নিয়ে যারা ক্যারিয়ার গড়তে চায়, হোক সেটা ক্যামেরার সামনে বা পেছনে আপনার অভিজ্ঞতা থেকে তাদের জন্য কী পরামর্শ থাকবে?

শিমুল: আগেই বলেছি, পড়ে আসতে হবে, দেখে আসতে হবে, চিন্তা করতে হবে, ভাবনাটা খোলা রাখতে হবে এবং এটা ধারাবাহিকভাবে করে যেতে হবে।

About

Popular Links