Sunday, May 26, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

অশ্রুতেই বাঁশুরিয়া বারীকে স্মরণ

২০১৭ সালের আজকের দিন ২৪ নভেম্বর এই মহান শিল্পীর শেষ দমটুকু ফুরিয়ে যায়। রাজধানীর স্কয়ার হসপিটাল থেকে অদেখা ভুবনে পাড়ি জমান বারী সিদ্দিকী

আপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০২১, ১০:০০ পিএম

সুর ও কণ্ঠের বারী সিদ্দিকীকে চিনতে বাঁশুরিয়া বারীকে চেনা জরুরি। এই দমবাদ্যই তিনি ধারণ করেছেন আমৃত্যু। দুঃশাসন , দূষণ ও অপমৃত্যুকে বিশ্বমঞ্চে উপস্থাপন করেছেন তার অতিন্দ্রীয় ফুঁকে। ১৯৯৯ সালে জেনেভায় অনুষ্ঠিত বিশ্ব বাঁশি সম্মেলনে ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে একমাত্র প্রতিনিধি ছিলেন আমাদের বারী।

২০১৭ সালের আজকের দিন ২৪ নভেম্বর এই মহান শিল্পীর শেষ দমটুকু ফুরিয়ে যায়। রাজধানীর স্কয়ার হসপিটাল থেকে অদেখা ভুবনে পাড়ি জমান বারী সিদ্দিকী। গানে বলেছিলেন, “আমার অনেক বাঁশের বাঁশি আছে। মিছে কেন কিনবি চাঁটাই বাঁশ?” তবু বাদ আসর তার নশ্বর দেহটুকু  সমাহিত করা হয় চাঁটাই বাঁশ-বেষ্টিত করেই। তার স্বপ্নের নেত্রকোনার কারলি গ্রামে “বাউল বাড়ি”তে।

বারী সিদ্দিকীকে শহরের সংস্কৃতিবানরা  চিনেছেন অনেক পরে। বলা যেতে পারে তার সঙ্গীত জীবনের মধ্যপ্রহরে। তাও মায়েস্ত্রো হুমায়ূন আহমেদের জহুরি চেনার গুণে।

১৯৯৫ সালে বারী সিদ্দিকী হুমায়ূন নির্মিত “রঙের বাড়ই” নামে একটি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানে সঙ্গীত পরিবেশন করেন। তা প্রচারিত হয় তখনের একমাত্র বিটিভি সর্বস্ব জনপদে। ব্যাপক সাড়া ফেলেন তিনি। ভাটির সুরে যেন কেঁপে ওঠে ভেতরে ফাঁপা কংক্রিট শহর। অথচ ১৯৫৪ সালে নেত্রকোনার বারহাট্টায় জন্ম নেয়া বারী সিদ্দিকীর রক্তেই ছিল সঙ্গীতধারা। পরিবারে তার গানের চর্চা ছিল।

১২ বছর বয়সে বারী সিদ্দিকী সঙ্গীতে তালিম নেন নেত্রকোনার ওস্তাদ গোপাল দত্তের কাছে। এ ছিল পরিবারের বাইরে বারী সিদ্দিকীর প্রাতিষ্ঠানিক শেখার শুরু। এরপর শিখেছেন ওস্তাদ আমিনুর রহমান, দবির খানের মতো গুরুর অধীনে। ৭০ এর দশক থেকে বারী সিদ্দিকী নেত্রকোনা জেলা শিল্পকলা একাডেমির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। প্রতিক্ষণে তিনি নিখাঁদ হয়েছেন ভাটির লোকজ সুর আর উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের আঁচে। কণ্ঠশিল্পী হিসেবে নিজেকে প্রশিক্ষিত করেছেন। সঙ্গে নিতে ভুলেননি প্রিয় বাঁশিকে।

বারী সিদ্দিকী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যাচেলর ডিগ্রি অর্জন শেষে ১৯৮৫ সালের দিকে বাংলাদেশ টেলিভিশনের সঙ্গে যুক্ত হন। তবুও তখন তাকে চিনেছে অল্প লোক।

এক পর্যায়ে সঙ্গীত শেখা যেন তার মর্মের এবাদত হয়ে ওঠে। দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে যান তখন। ৯০ এর দশকের শুরুতে বারী সিদ্দিকী ভারতবর্ষের পুনেতে পাড়ি জমান। কিংবদন্তি ভি.জি কার্নাডের কাছে সেখানে তালিম নেন তিনি।

বারী সিদ্দিকীকে জনপ্রিয় হতে হুমায়ূন আহমেদ পরিচালিত অনুষ্ঠান পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। তার আকাশ ছোঁয়ার পর্বও  হুমায়ূনকে নিয়ে। ১৯৯৯ সালে এই স্রষ্টার নির্মিত “শ্রাবণ মেঘের দিন” ছবিতে ৭টি গানে কণ্ঠ দেন তিনি। বাংলা গানে “শুয়া চান পাখির” প্রতিশব্দ হয়ে ওঠেন বারী সিদ্দিকী। বিংশ শতকের শুরুর দিকের ভাটি বাংলার আধ্যাত্মিক সঙ্গীত স্রষ্টা রশিদউদ্দিন ও উকিল মুন্সি নতুন ভাবে ফিরে আসেন নাগরিক বোধে। কণ্ঠে, বাঁশিতে, সঙ্গীত আয়োজনে বারী সিদ্দিকীর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয় মরমীবাদ। 

জনমানুষের মনের রসায়ন বোঝা হুমায়ূন আহমেদ এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “মৃত্যুর আগে আমি বাংলার সমস্ত লোকগান একত্রিত করতে চাই।” বিধি তার এ সাধ অপূর্ণ রাখেন। কিন্তু একজন বারী সিদ্দিকীর মাধ্যমে অনন্তকাল বাংলা গানে প্রভাবিত হবে ভাটি বাংলা লুপ্ত সঙ্গীতস্রষ্টারা। আর তা ভেঙে, রিমিক্স, ম্যাশ আপ করে খেয়ে পড়ে যেতে পারবেন পরের বহু প্রজন্ম।  

চলে যাওয়ার পর বারী সিদ্দিকীর নেত্রকোনায় স্থাপিত স্বপ্নের “বাউল বাড়ি” পূর্ণতা পায়নি। তিনি তার বাঁশি দিয়ে একাধিক ইন্সট্রুমেন্টাল অ্যালবাম প্রকাশ করেছেন। এ থেকে সঙ্গীত জগত কতটা শিখেছে কে জানে? হারিয়ে যাচ্ছে আরো নিজস্বী অনেক অ্যাকুইস্টিক যন্ত্রের মতো বাঁশি আর এর এতে ফুঁক দেওয়ার সঙ্গীতবোধসম্পন্ন শিল্পী। আসল সঙ্গীতস্রষ্টাদের মনে না রেখে ভিউ, রিচের ডিজিটাল দুনিয়ায় বিত্ত উপচে পড়ছে “ফোক” ব্যবসায়ীর চাতুর্যের অ্যাকাউন্ট।

গান গাওয়ার সময় প্রায়ই চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়তো বারী সিদ্দিকীর। তার অশ্রু, সুরেলা বাঁশি, সুর, সঙ্গীত, স্বপ্নের কতটা ধারণ করছে আজকের বাংলা গান? তার প্রয়াণ দিবসে এ প্রশ্ন কি অযৌক্তিক? হয়ত অশ্রুই এর উত্তর।


ফ্রিল্যান্স লেখক ও সাংবাদিক হাসান শাওনের জন্ম, বেড়ে ওঠা রাজধানীর মিরপুরে। পড়াশোনা করেছেন মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি বাঙলা কলেজ, বাংলাদেশ সিনেমা ও টেলিভিশন ইনিস্টিটিউটে। ২০০৫ সাল থেকে তিনি লেখালেখি ও সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত। কাজ করেছেন সমকাল, বণিক বার্তা, ক্যানভাস ম্যাগাজিন ও আজকের পত্রিকায়।

২০২০ সালের ১৩ নভেম্বর হাসান শাওনের প্রথম বই “হুমায়ূনকে নিয়ে” প্রকাশিত হয়।



About

Popular Links