Sunday, May 19, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

আহমেদ রুবেলকে নিয়ে যা বললেন তারকারা

শ্রদ্ধা জানাতে হাজির হন দেশের নাট্য ও সিনেমা অঙ্গনের অনেক শিল্পী-তারকা

আপডেট : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৬:১৯ পিএম

ভক্ত ও সহশিল্পীদের কাঁদিয়ে পরপারে পাড়ি জমিয়েছে গুণী অভিনেতা আহমেদ রুবেল। বুধবার (৭ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য বৃহস্পতিবার সকালে আহমেদ রুবেলের মরদেহ নেওয়া হয় শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা প্লাজায় নেওয়া হয়।

শ্রদ্ধা জানাতে হাজির হন দেশের নাট্য ও সিনেমা অঙ্গনের অনেক শিল্পী-তারকা। এ সময় তারা গুণী অভিনেতাকে নিয়ে তাদের স্মৃতিচারণা করেন।

সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দীন ইউসুফ বলেন, “অত্যন্ত অকালে চলে গেল রুবেল। অভিনয় শিল্পে তার আরও অনেক কিছু দেওয়ার ছিল। আমার নির্মিত ‘গেরিলা’ ছবিতে শহীদ আলতাফ মাহমুদের চরিত্রে অভিনয় করেছিল রুবেল। সেই স্মৃতিগুলো আজও মনে ভাসে। এত দারুণ অভিনয় করেছিল যে, আলতাফ মাহমুদ যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছিলেন।”

নাট্যজন মামুনুর রশীদ বলেন, “তার সঙ্গে বহু কাজ করেছি। অভিনয় করেছি একসঙ্গে, আমার লেখা দীর্ঘ ধারাবাহিকে কাজ করেছে। তার অভিনয় জীবন আরও দীর্ঘ হতে পারত। আরও অনেক চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে পারত। কিন্তু কীভাবে কী হয়ে গেল। আমাদের কাছে রয়ে গেল জীবন্ত রুবেলের বিনিময়ে শুধু তার স্মৃতি।”

নির্মাতা মোরশেদুল ইসলাম বলেন, “স্মৃতিচারণের ভাষা নেই আসলে। এত আকস্মিকভাবে চলে গেলো। রুবেল আমাদের সবার প্রিয় অভিনেতা। ‘পেয়ারার সুবাস’ দেখলাম, চমৎকার অভিনয় করেছে। তার চলে যাওয়া ভাবতেই পারছি না আমি। রুবেল যেখানেই থাকুক, শান্তিতে থাকুক। তার আত্মার শান্তি কামনা করছি।” 

ঢাকা-১০ আসনের সংসদ সদস্য ও চিত্রনায়ক ফেরদৌস আহমেদ বলেন, “এমন একটা মুহূর্ত, কথা বলার মতো পরিস্থিতি নেই। অসাধারণ একজন অভিনেতা, একজন ভালো মানুষ। আমাদের সবাইকে চলে যেতে হবে, কিন্তু অসময়ে চলে যাওয়া মেনে নেওয়া কঠিন। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল তার সঙ্গে একটি কাজ করার, হুমায়ূন আহমেদের ‘চন্দ্রকথা’। তার সরলতা, অসাধারণ অভিনয় দক্ষতা আমাকে মুগ্ধ করেছিল।” 

অভিনেতা ফারুক আহমেদ বলেন, “১৯৮৬ সালে রুবেলের সঙ্গে আমার পরিচয়। আমার যোগ দেওয়ার তিন বছর ও ঢাকা থিয়েটারে আসে। তার উচ্চতা, কণ্ঠস্বর প্রথম দিনই আমাকে মুগ্ধ করেছিল। রুবেলের কণ্ঠস্বর শুনে আমার রীতিমতো আফসোস হতো, এত সুন্দর কণ্ঠ কীভাবে হয়! একটা স্মৃতি শেয়ার করি, সিলেটে গিয়েছিলাম শুটিং করতে। আমি বাসে করে, সে তার গাড়িতে। শুটিং শেষে রুবেল বলে, ফারুক ভাই আপনি আমার সঙ্গে যাবেন। আমি যেতে চাচ্ছিলাম না। কিন্তু সে জোর করে আমাকে গাড়িতে নিয়ে বসালো। আমাকে পেছনের সিটে বসিয়ে একটি বালিশ দিয়ে বলল, ‘আপনি ঘুমান। আমি ড্রাইভারের সঙ্গে কথা বলতে থাকি, যাতে সে না ঘুমায়।’ ভোরে যখন আজান দেয়, তখন দেখি আমি আমার বাসার সামনে। সেখানে নামিয়ে দিয়ে তবেই রুবেল তার বাসায় ফিরেছিল।” 

নির্মতা অমিতাভ রেজা বলেন, “রুবেল ভাই অসাধারণ অভিনেতা, অসাধারণ ভয়েস আর্টিস্ট। কিন্তু রুবেল ভাই একজন নিঃসঙ্গ মানুষ ছিলেন। এক সপ্তাহ আগেও আমরা কেউ তার সঙ্গে যোগাযোগ করিনি। আমি সবাইকে অনুরোধ করব, সহযাত্রীদের পাশে থাকুন।”

অভিনয়শিল্পী সংঘের সভাপতি ও অভিনেতা আহসান হাবিব নাসিম বলেন, “আমরা একজন অসামান্য শিল্পীকে হারালাম। যার আরও অসাধারণ সব চরিত্রে কাজ করার কথা ছিল। যিনি সবসময় অভিনয় নিয়েই ছিলেন। এমন একজন মানুষ সবাইকে হঠাৎ স্তব্ধ করে দিয়ে চলে গেলেন। আমরা তার আত্মার শান্তি কামনা করি।”

অভিনেত্রী তানভীন সুইটি বলেন, “রুবেল ভাইয়ের সঙ্গে প্রচুর কাজ করেছি। তিনি শুধু একজন গুণী অভিনেতাই নন, একজন ভালো মানুষ। শুটিংয়ে এলে বাড়তি কথা বলতেন না, শুধু নিজের চরিত্রে থাকতেন। তাকে বলতাম, নিজের যত্ন নিন। তিনি শুধু বলতেন, ‘হবে হবে’! কী হলো! সবাইকে বলব, তার জন্য সবাই দোয়া করবেন। আমিও তার আত্মার শান্তি কামনা করছি।” 

বুধবার সন্ধ্যায় রাজধানীর বসুন্ধরা সিটির স্টার সিনেপ্লেক্সে আহমেদ রুবেল অভিনীত  সিনেমা “পেয়ারার সুবাস”র প্রিমিয়ার শো ছিল। সেটি দেখার জন্য তিনি এসেছিলেন। তবে শো দেখা হয়নি। বসুন্ধরা শপিং মলের পার্কিংয়ে মাথা ঘুরে পড়ে যান আহমেদ রুবেল। এরপর তাকে দ্রুত স্কয়ার হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে চিকিৎসক জানান, ততক্ষণে তিনি আর বেঁচে নেই। চিকিৎসকের এ ঘোষণার মধ্য দিয়ে মাত্র ৫৫ বছর বয়সে পরিসমাপ্তি ঘটে অভিনয়ের বৈচিত্র্যময় বর্ণাঢ্য এক অধ্যায়ের।

“পেয়ারার সুবাস” সিনেমার প্রযোজক রেদওয়ান রনি বলেন, “রুবেল ভাইয়ের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক অনেক আগের। সহকারী পরিচালক হিসেবে পথচলার শুরুর দিকেই তাকে সেটে পেয়েছি। আমার নির্মিত ধারাবাহিক ‘এফএনএফ’-এ তাকে পেয়েছি। তিনি এরকম একজন অভিনেতা, যাকে অদ্ভুত সব চরিত্রে মানিয়ে যায়। তার চেহারা, কণ্ঠস্বর; এটা সচরাচর হয় না। আমি কাল (৭ ফেব্রুয়ারি) একটা বিষয় ভাবছিলাম, আর দুইটা ঘণ্টা পরে কি হতে পারতো না! তার ছবিটা সবাই দেখছে, দর্শকের উচ্ছ্বাসটা তিনি দেখে যেতেন। আমাদের ছবিটা রুবেল ভাইকে উৎসর্গ করা হয়েছে।”  

শিল্পকলা একাডেমিতে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে আহমেদ রুবেলের মরদেহ নেওয়া হয় চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে। সেখানেও তার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর পর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর অভিনেতার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে গাজীপুরে নেওয়ার কথা রয়েছে। সেখানেই পারিবারিক কবরস্থানে তাকে আসর নামাজের পর দাফন করা হবে তাকে।

এদিকে, আহমেদ রুবেলের মৃত্যুর পর তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে “পেয়ারার সুবাস” সিনেমার প্রিমিয়ার শো অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন সিনেমাটির প্রধান অভিনেত্রী জয়া আহসান।

এ সময় জয়া আহসান বলেন, “বিশ্বাস হচ্ছে না, মনে হচ্ছে ওনার কাছে ছুটে যাই। স্ক্রিনে আবার তাকে দেখি। পরপর আমার দুটি কাজ ‘অলাতচক্র’ এবং ‘পেয়ারার সুবাস’-এ সহ-অভিনেতা তিনি। এই মুহূর্তে কিছু বলার মতো স্টেজে আমি নেই, কেউ নেই।”

প্রিমিয়ার শো চালিয়ে নেওয়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমার মনে হয়, রুবেল ভাই থাকলে নিশ্চয়ই চাইতেন না আমাদের শো বাতিল হোক। মানুষ তার কাজের মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকে। রুবেল ভাইও আমাদের মধ্যে আছেন। শো চলবে। এটা আমাদের শিল্পীদের জীবনের একটি ভয়াবহ অংশ।”

কান্নাজড়িত কণ্ঠে বাবার মৃত্যুর দিনের কথা স্মরণ করে জয়া বলেন, “আমার বাবার যেদিন মৃত্যু হলো সেদিন আমি কলকাতায় ছিলাম। আমার প্রথম বাংলা সিনেমার শুটিং। শুটিং করছিলাম, তখন বাবার মৃত্যুর খবর পাই। শেষ দিকের শুটিং, মাত্র দুটি দৃশ্য ধারণ বাকি ছিল। আমি হাউমাউ করে কাঁদছিলাম আর পরিচালককে জিজ্ঞেস করছিলাম আমি কী করব? আমি কি শুটিংটা শেষ করে যাব? আমাদের শিল্পীদের জীবনটাই এমন।”

এছাড়াও আহমেদ রুবেলের মৃত্যুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোক জানিয়েছেন অনেক অভিনেতা অভিনেত্রী।

অভিনেত্রী চঞ্চল চৌধুরী শোক প্রকাশ করে ফেসবুকে লিখেছেন, “বিশ্বাসই করতে পারছি না যে, অভিনেতা আহমেদ রুবেল ভাই আর নেই।”

আরিফিন শুভ লিখেছেন, “আপনি বেঁচে থাকবেন আমাদের হৃদয়ে....।”

অভিনেত্রী জোতিকা জ্যোতি ফেসবুকে লিখেছেন, “কারও মৃত্যু স্থবির করে দেয়—কথা বলতে দেয় না, কাজ করতে দেয় না, কাঁদতেও দেয় না। এক শূন্য অনুভূতি! যাচ্ছিলাম সিনেমা হলে, যেতে হলো হাসপাতালে। তারপর থেকে সব থমকে আছে আমার! এখনো মনে হয় রুবেল ভাই জেগে উঠবে।"

কণ্ঠশিল্পী আসিফ আকবর লিখেছেন, “প্রতিভা হত্যার দেশ ছেড়ে চলে গেলেন প্রিয় অভিনেতা আহমেদ রুবেল। তার বলিষ্ঠ কণ্ঠ থেমে গেল চিরতরে। একটা সময় অনেক কথা হতো আমাদের, দুজন ছিলাম দুজনের ফ্যান। দেখা হওয়াটাই প্রেম নয়, অনুভব করতে পারার মধ্যেই প্রেম বেঁচে থাকে...।"

About

Popular Links