Saturday, May 25, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

যে কারণে বকটি ঘুরে-ফিরে আখাউড়ার ঘোষবাড়িতে আসে

কারও কারও কাছে বিষয়টি অসাধারণ। কেউবা বলছেন জীব ও প্রকৃতি প্রেমের দৃষ্টান্ত

আপডেট : ১০ আগস্ট ২০২০, ০৩:৩৭ পিএম

মানুষের ভালোবাসা আর মমত্বে বনের পশু-পাখিও পোষ মানে। তবে সব প্রাণীই যে মানুষের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলে, বিষয়টি কিন্তু তেমন নয়। বক তেমনই এক প্রাণী। তবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলা সদরের রাধানগরের একটি বাড়িতে প্রতিদিনই আসে একটি বক। বাড়িটির সদস্যদের সঙ্গে তার সম্পর্কও অবাক করার মতো।

বকটি ঘোষ বাড়ির আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়ায় নির্ভয়ে। গপগপ করে খেয়ে নেয় রান্না ঘরের জানালা কিংবা খাবার ঘরের টেবিলের বাটিতে রাখা পুটি মাছ। বাড়ির ছোট, বড় সবার হাত থেকেই সে খাবার খায়। ইচ্ছে হলে চড়ে বসে ঘাড়ে। উচ্ছ্বলতা নিয়ে খেলে বাচ্চাদের সঙ্গে। আবার ইচ্ছে হলে উড়ে যায় তার আপন নীড়ে।

কারও কারও কাছে বিষয়টি অসাধারণ। কেউবা বলছেন জীব ও প্রকৃতি প্রেমের দৃষ্টান্ত। অনেকে মনে করছেন এমন ঘটনা থেকে পাখি প্রেমে উদ্বুদ্ধ হবে মানুষ।

বাড়িটির প্রতিষ্ঠাতা আখাউড়ার সর্বজনশ্রদ্ধেয় শিক্ষক, সাংবাদিক ও মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত কামাখ্যা রঞ্জন ঘোষ। ঘোষবাড়ির চারটি আমগাছ আর দুটি জামগাছে প্রায় চল্লিশ জোড়া বকের বসবাস। প্রায় দেড়যুগ ধরে এই বাড়ির গাছগুলো তাদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল।

বাড়ির মেজো ছেলে সাংবাদিক দুলাল ঘোষ জানান, চলতি বছরের ২৭ জুন বাড়ির আঙিনায় একটি বকছানা ছটফট করছিল। তার স্কুল পড়ুয়া ছেলে দ্রুনাঞ্জন ঘোষ (১৪) ও ভাতিজা প্রতীক্ষা ঘোষ (৭) সেটিকে উদ্ধার করে। রেফ্রিজারেটর থেকে রবফ এনে শুশ্রুষা করে বকটিকে গাছেও তুলে দিতে চেয়েছিল তারা। কিন্তু ছানাটির উড়ে যাওয়ার শক্তি ছিল না। তাই তাকে রাখা হয় বাড়ির একটি ঘরে। পরে বাজার থেকে পুটি মাছ কিনে এনে তাকে নিয়মিত খাইয়ে দেওয়া হতো। সেই থেকে এখনও বকটির জন্য পুটি মাছ কিনে আনা হয় নিয়মিত।

ছবি: ঢাকা ট্রিবিউনগৃহকর্তা দুলাল ঘোষ আরও জানান, বকটি প্রথমদিকে নিজে খেতে পারতো না। খাইয়ে দেওয়া হতো। সপ্তাহখানেকে পর থেকে নিজে নিজে খেতে শুরু করে। একটু সবল হলে এঘর-ওঘর ঘুরে বেড়াতে শুরু করে। প্রায় ৩ সপ্তাহ এভাবেই কাটে। এক সময় তাকে বাইরে আনা হয়। গাছে তুলে দেওয়া হতো। কিন্তু বকটি ঘরে ফিরে আসত। একদিন বকটি উড়ে গাছে ওঠে। সেদিন ছিল বাড়ির লোকদের জন্য আনন্দের দিন। এখনও বক ছানাটি প্রতিদিন সকাল, দুপুর আর বিকেলে ঘরে আসে। মাছ খেয়ে আবার উড়ে যায়।

দিন দুয়েক হলো বকটির একটি সঙ্গী হয়েছে। সে এখন বাড়ির অদূরে তিতাস নদী আর সংলগ্ন বিলে যায়। কিন্তু দিনে অন্তত একবার হলেও সে বাড়িতে আসে। ঘরে ঢুকে। ফ্রিজে থাকা পুটি জলে ভিজিয়ে উপযোগী করে দিলে খেয়ে নিজে থেকেই উড়ে যায়। 

প্রতিবছরই ঝড়ো বাতাসে বকের ছানা গাছ থেকে নিচে পড়ে যায়। আর ঘোষ বাড়ির সদস্যরা তাদের সুস্থ করে গাছে তুলে দেন। চলতি বছর আরও দুটি বকছানাকে সারিয়ে গাছে তুলে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই বকটি উড়ে গেলেও বাড়ির লোকজনের মমত্বের টানেই হয়ত ফিরে ফিরে আসে।    

বকটিকে উদ্ধারকারী দ্রুনাঞ্জন ঘোষ দ্বীপ জানায়, বাবা-মা বলেছেন বনের পশুপাখিকে আঘাত করতে নেই। তাই সে বকছানাকে আদর করে নিয়মিত পুটি মাছ খাওয়াত। সেদিনের সেই ছোট্ট পাখিটি যখন উড়ে তার বাসায় আসা-যাওয়া করে তা দেখে তার খুব ভালো লাগে।

ঘোষবাড়ির বউ দূর্গারানী বলেন, “বিয়ে হয়েছে আজ ষোল বছর। বিয়ের পর থেকে বাড়ির আমগাছে কয়েকটি বকের আনাগোনা তার চোখে পড়েছিল। স্বামী দুলাল ঘোষ তাদের ব্যাপারে বেশ সচেতন। তাই সন্তানকেও ছোটবেলা থেকেই প্রাণীদের প্রতি যত্নশীল হওয়ার শিক্ষা দিয়েছে। সব জায়গার বন্যপ্রাণী, অতিথি পাখি সুরক্ষিত থাকলে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা হবে।”

About

Popular Links