Monday, May 27, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

এডিনবার্গ ডায়েরি: পর্ব ২

শহরটাকে ভালোবাসতে সময় লেগেছিল, ঠিক একইভাবে এখন ভুলতেও সময় লাগছে

আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০২০, ১১:০৬ এএম

এডিনবার্গে গিয়েছিলাম, পড়তে না ঘুরতে? কঠিন প্রশ্ন বটে আমার জন্য! আসলে ভ্রমণপিপাসু মানুষ পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তেই থাকুক না কেনো, মনের খোরাক যোগাতে কিছুটা সময় সে বের করে নেবেই। আর তাই এতোসব অনুভূতির ভাণ্ডার নিয়ে হাজির হলাম পর্ব এই পর্বে।

ইউনিভার্সিটির প্রথম দিন এখনও মনে পড়ে। আমার ক্যাম্পাসটা ছিল সিটি থেকে একটু দূরে। প্রথমে সিটিদে (ম্যাকওয়ান হল) যাই বিআরপি (রেসিডেন্সি পারমিট) সংগ্রহ করতে। সেখান থেকে আমার ক্যাম্পাস “কিংস বিল্ডিংয়ে” আসি। আমার পার্সোনাল টিউটরের সঙ্গে মিটিং (প্রত্যেক শিক্ষার্থী আদ্যোপান্ত খেয়াল রাখার জন্য একজন করে ফ্যাকাল্টি নির্ধারিত থাকতেন)। তার সঙ্গে মিটিংও শেষ হলো আর আমার মুঠোফোনের চার্জও ফুরালো। মাথায় ঘুরছে, গুগল ম্যাপ ছাড়া ঘরে ফিরব কীভাবে? আর বলবোই বা কাউকে কীভাবে আমাকে উদ্ধার করতে? কিংস বিল্ডিং এক মাথা থেকে আরেক মাথা ঘুরপাক খাচ্ছি। অতঃপর একটা স্টোরে গিয়ে চার্জার খুঁজলাম, বললো মার্কেটে যেতে। মার্কেট চিনে যেতে পারলে তো বাসাতেই যেতে পারতাম, বোঝাই কীভাবে!

কী যেন মনে করে লাইব্রেরিতে ঢুকলাম। ম্যানেজার ভদ্রলোককে বুঝিয়ে বললাম আজকেই প্রথম পদচারণা এই ক্যাম্পাসে, আর আজকেই আমার ফোনের “অ্যাডভাঞ্চার মোড” অন হতে হলো আর কী! সেই স্কটিশ ভদ্রলোক আমার ফোনটা নিলো, কোথা থেকে যেন একটা চার্জার খুঁজে বের করলো। একটু হেসে বললো, “তোমার কোনো তাড়া নেই তো? তাহলে ১ ঘণ্টা অপেক্ষা করো। চার্জ হোক, তারপর বাসায় যেও।” একজন অপরিচিত মানুষকে সে কতোটা আন্তরিকতা দিয়েই না আপন করে নিয়েছিল তার শহরে। তবে চলে আসার আগের দিন পর্যন্ত যতবার লাইব্রেরি গিয়েছি তাকে একবার করে হলেও জিজ্ঞেস করতে ভুলিনি, How are you doing today?”

ক্যান্টন হিল। ছবি: সৌজন্যশহরটাকে ভালোবাসতে সময় লেগেছিল, ঠিক একইভাবে এখন ভুলতেও সময় লাগছে। প্রচণ্ড গ্লুমি ওয়েদার, সারাটা দিন গুড়িগুড়ি বৃষ্টি, আর সঙ্গে হাড় কাঁপানো ঝড়ো বাতাসে মনে হবে, এ কোথায় এলাম? এরা সবাই দিনপঞ্জিকা ঘেঁটে বের করে রাখতো কবে কবে সূর্য মামার দেখা পাওয়া যাবে, সেদিন যেন এদের ঈদ লেগে যেতো। সব কিছুতেই খুশি খুশি ভাব, মাঠে ঘাটে (সমুদ্র সৈকতে) অলস ভাবে শুয়ে আছে, হাতে একটা বই, কানে হেডফোন, চোখে রোদচশমা। সুখি মানুষের সঠিক সংজ্ঞা যেন এমনই। 


আরও পড়ুন- এডিনবার্গ ডায়েরি: পর্ব ১


আসলে এরা এতো ব্যস্ততার মাঝেও এই বিরূপ আবহাওয়ায় নিজেদের জন্য, নিজেদের মতো করে সময় বের করে নেয় একটু ভালো থাকার জন্য। আর তাইতো আমিও সপ্তাহ শেষে একবার করে ঘুরতে যেতে ভুলতাম না। সেটা শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা, স্নো-ফল যাই চলুক না কেন। আর খুব পছন্দের জায়গাগুলোর মধ্যে একটি ছিল ক্যাল্টন হিল। মন খারাপ অথবা ভালো, যা-ই হোক না কেন এই একটি জায়গাতে গেলে প্রচণ্ড শান্তি পেতাম। এক কাপ কফি হাতে প্রচণ্ড শীতে কাঁপতে কাঁপতে উঠে যেতাম হিল বেয়ে। ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের অন্তর্ভুক্ত এই জায়গাটা স্কটিশ সরকারের কার্যালয় হিসেবেও পরিচিত। যার পাদদেশের একদিকে স্কটিশ পার্লামেন্ট আর অন্যদিকে হলিরোড প্যালেস অবস্থিত। এখানকার বেশ কিছু আইকনিক মনুমেন্ট নিঃসন্দেহে আপনার নজর কাড়বে। তার মধ্যে “ন্যাশনাল মনুমেন্টের” কথা না বললেই নয়। গ্রিক এথেন্স-এর প্যারাথেনন এর আদলে এর গঠন, যা মূলতঃ নেপলিয়নিক যুদ্ধের সব স্কটিশ সৈনিক এবং নাবিক এর আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান প্রদর্শনপূর্বক তৈরি। ইন্সক্রিপশনের লিখাটি তাই মনে দাগ কাটে “A Memorial of the Past and Incentive to the Future Heroism of the Men of Scotland”। 

ওদের দেশপ্রেমের কথা পুরো শহরজুড়েই এভাবে খোঁদাই করে আঁকা, লেখা অথবা ধারণ করা। এতোসব স্কাল্পচার, ইতিহাস, দর্শন এডিনবার্গকে তাই যুক্তরাজ্যের অন্যতম (২য়) পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত করেছে। যেখানে প্রতি বছর প্রায় ৫০ লাখ পর্যটক ভ্রমণ করে থাকে। 

এডিনবার্গ ক্যাসলের প্রবেশদ্বার। ছবি: সৌজন্যআর এডিনবার্গের হাজার বছরের ইতিহাসকে ধারণ করে অন্যতম স্বাক্ষী হিসেবে রয়েছে এডিনবার্গ ক্যাসেল। বাসে করে ওল্ড টাউনে নামার পর রয়্যাল মাইল ধরে পশ্চিমে এগোলেই দেখা মিলবে একগুচ্ছ ক্যাসেল রকের একদম চূড়ায় অবস্থিত এই দুর্গের। যেন পুরো দিগন্ত ছুঁয়ে আছে। গ্রেট ব্রিটেনের অন্যতম নিরাপদ একটি জায়গা ছিল এটি। 

ক্যাসেলের সামনে ঢালুতে ফোরকোর্ট নামে একটি আর্কিটেকচার আছে, যা “ইস্প্লানাদে” নামে পরিচিত। প্রতি বছর এখানে “মিলিটারি ট্যাটু” নামে দুনিয়াখ্যাত বিশাল এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়, তার গল্প আরেকদিন করব। দূর্গরূপী “পোর্টকুলিস” নামে প্রবেশদ্বার এবং আরগাইল টাওয়ার পেরিয়ে ক্যাসেলের একদম চূড়ায় গেলে দেখা যায় সেন্ট মারগারেট চ্যাপেল (এডিনবার্গের সবথেকে পুরনো প্রাসাদ), স্কটিশ ন্যাশনাল ওয়্যার মেমরিয়াল, রয়্যাল প্যালেস অব ক্রাউন ইথার, গ্রেট হলসহ আরও অসংখ্য ঐতিহাসিক স্থাপত্য। দ্বাদশ শতাব্দী থেকে এই একবিংশ পর্যন্ত এডিনবার্গ ক্যাসেলের যে ইতিহাস সঞ্চিত তা আসলে একদিন অথবা একবার ভ্রমণে মন ভরার নয়। এডিনবার্গ তথাপি স্কটল্যান্ডের ইতিহাসকে কেবল ধারণ করতে পারলেই আপনি সেই সময়ে ফিরে যেতে পারবেন। সময়টা নিঃসন্দেহে আপনাকে ভাবাবে।


ফারজানা আফরোজ, প্রভাষক, নর্দান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ (সাবেক শিক্ষার্থী, ইউনিভার্সিটি অব এডিনবার্গ



About

Popular Links