Friday, May 24, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

জেনে নিন রাশিয়া ও ইউক্রেন সম্পর্কে বিস্ময়কর কিছু তথ্য

 চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার বাইরেও দুুই দেশের রয়েছে ঐশ্বর্যমন্ডিত ঐতিহ্য

আপডেট : ০৩ মার্চ ২০২২, ১১:৪৩ এএম

সম্প্রতি রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘর্ষ নিয়ে সারা বিশ্বের দৃষ্টি এখন এই দুটি দেশের দিকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এটিই ইতিহাসের সবচেয়ে স্পর্শকাতর অধ্যায়, যার প্রভাব পড়তে পারে সারা বিশ্বে। 

১৯৯১ সালে বিশাল সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাবার পরও বিশ্ব অর্থনীতি ও রাজনীতি সহ বিভিন্ন অঙ্গনে স্বতন্ত্র অবস্থানে বহাল আছে রাশিয়া। অন্যদিকে ১৯৯১ সালে পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ ছিল ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ ইউক্রেন। এখন রাশিয়া আবার ইউক্রেনকে তার অংশ হিসেবে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। ফলে দুই দেশের পরিস্থিতি ক্রমাগত তপ্ততার দিকে মোড় নিচ্ছে।

অর্থনীতি ও রাজনীতি ছাড়াও দেশটির সভ্যতা ও সংস্কৃতির উত্তরোত্তর ক্রমবিকাশে সমগ্র ইউরোপ সহ বিভিন্ন দেশের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব আছে রাশিয়ার। চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার বাইরে ইউক্রেনেরও রয়েছে ঐশ্বর্যমন্ডিত ঐতিহ্য। এই নিবন্ধটিতে রাশিয়া ও ইউক্রেনের বিস্ময়কর কিছু তথ্য তুলে ধরা হলো।

রাশিয়ার কিছু বিস্ময়কর তথ্য

পৃথিবীর দীর্ঘতম রেলপথ

ট্রান্স-সাইবেরিয়ান রেলওয়ে মস্কো ও সুদূর পূর্ব রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়ে সরাসরি পাড়ি দিয়েছে ৯,২৫৯ কিলোমিটার রেলপথ। উরাল পর্বতমালা, সাইবেরিয়ার বার্চ বনও বৈকাল হ্রদ অতিক্রম করতে এই যাত্রাটি সময় নেয় ছয় দিন।

পৃথিবীর বৃহত্তম দেশ

ভূমির আয়তনের দিক থেকে রাশিয়া বিশ্বের বৃহত্তম দেশ। রাশিয়ার মোট ভূমির ক্ষেত্রফল ৬৬ লাখ এক হাজার ৬৭০ বর্গ মাইল, যা পৃথিবীর মোট ভূমির শতকরা ১১ ভাগের সমান। এত বড় দেশ হওয়াতে এখানে বৃক্ষের আধিক্য দেখা যায়। পৃথিবীর শতকরা ২০ ভাগ গাছ আছে শুধু এই রাশিয়াতেই। সংখ্যার দিক থেকে তা প্রায় ৬৪০ বিলিয়নের সমান।

পৃথিবীর গভীরতম হ্রদ

সাইবেরিয়ায় অবস্থিত বৈকাল হ্রদ বিশ্বের বৃহত্তম মিঠা পানির হ্রদ। শুধু এই একটি হ্রদ গোটা বিশ্বের মিঠা পানির শতকরা ২৩ ভাগ ধারণ করে।

বিশ্বের শীতলতম গ্রাম

রাশিয়ার ওয়ম্যাকন গ্রামটিতে শীতকালে গড় তাপমাত্রা মাইনাস ৫৮ ডিগ্রী ফারেনহাইট। ওয়ম্যাকনে সর্বশেষ রেকর্ডকৃত শীতলতম তাপমাত্রা পাওয়া গেছে মাইনাস ৯৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট। সেখানে বাইরে বেরিয়ে কেউ চশমা পরলে তার চোখের উপরেই চশমা জমে বরফ হয়ে যায়। এছাড়া গাড়ি রাখার গ্যারেজগুলোকেও বেশ উত্তপ্ত থাকতে হয়। রাশিয়ার ইয়াকুটস্ক থেকে ওয়ম্যাকনে দুই দিনের গাড়ির পথ। 

মহাকাশে প্রথম মানুষ

১৯৬১ সালের ১২ এপ্রিল পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথমবারের মত মহাকাশ ভ্রমণ করেন ইউরি গ্যাগারিন। ভস্টক-১ মহাকাশযানে চড়ে ১০৮ মিনিটের কক্ষপথ প্রদক্ষিণ করেছিলেন এই রাশিয়ান কস্মোনট।

নারীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ

রাশিয়ায় নারীদের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার শতকরা ৫৪ ভাগ এবং পুরুষদের সংখ্যা শতকরা ৪৬ ভাগ। জনসংখ্যার এই ব্যবধানের জন্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ অনেকাংশে দায়ী। সে সময় যুদ্ধে মারা গিয়েছিলো ২৫ মিলিয়ন রাশিয়ান সৈন্য। এখন যুদ্ধ না চললেও নারীদের তুলনায় পুরুষদের আয়ুষ্কাল আগের থেকে অনেক কম। পুরুষরা সাধারণত নারীদের তুলনায় এখানে ১০ বছর কম বাঁচে। এর পেছনে রাশিয়ান পুরুষদের ঘন ঘন দুর্ঘটনা, অধিক পরিশ্রমের কারণে স্বাস্থ্যের দুর্বলতা দায়ী।

বিশ্বের দীর্ঘতম এস্কেলেটর

রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গ মেট্রোর গভীর ভূগর্ভস্থ স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ এস্কেলেটর স্থাপন করা আছে। প্লোশচাদ লেনিনা, চেরনিশেভস্কায়া, ও অ্যাডমিরালটেইস্কায়া স্টেশনের এস্কেলেটরগুলো ৪৫৩ ফুট লম্বা এবং ২২৬ ফুট উচ্চতার। এগুলো দিয়ে উপর থেকে নীচে যেতে বা নীচ থেকে উপরে আসতে প্রায় আড়াই মিনিট সময় লাগে।

পৃথিবীর সবচেয়ে দূষিত স্থান

দক্ষিণ উরাল পর্বতমালার লেক কারাচে বিশ্বের অন্যতম দূষিত স্থান। ১৯৫০-এর দশকে এখানে তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ফেলা হতো। এই বর্জ্যের মধ্যে অধিকাংশ পদার্থ ছিলো নিকটবর্তী মায়াক পারমাণবিক কেন্দ্রের বর্জ্যসমূহ। কারাচে হ্রদ থেকে নির্গত বিকিরণ এক ঘণ্টার মধ্যে যে কোন মানুষকে মেরে ফেলতে পারে।

দাড়ির ওপর কর আরোপের আইন

১৬৯৮ সালে রাশিয়ার সম্রাট পিটার প্রথম রাশিয়ান সমাজকে পশ্চিম ইউরোপীয় মডেলের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ করার প্রচেষ্টার অংশ হিসাবে দাড়ির ওপর কর আরোপ করেছিলেন। দাড়ির উপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার জন্য জার পুলিশদের মাধ্যমে নাগরিকদের থেকে কর আদায় করা হতো। কেউ কর দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে প্রকাশ্যে তার দাড়ি কামিয়ে দেয়া হতো।

রাশিয়ানরা সদা হাস্যজ্জ্বল নয়

উন্নত দেশগুলোর সংস্কৃতিতে অপরিচিতদের মধ্যেই হাসি-খুশি এবং বন্ধুত্বপূর্ণ ভাব বিনিময় পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু রাশিয়ানদের কাছে হাসি দুর্বলতার লক্ষণ; কেননা এতে নিজের ভেতরের সত্যিকারের অনুভূতি প্রকাশ পেয়ে যায়। রাশিয়ানরা শুধুমাত্র পরিচিতদের সঙ্গেই হাস্যজ্জ্বল থাকে। রাস্তা দিয়ে কোন পথচারিকে পাশ কাটানোর সময় তাকে দেখে হাসাটা রাশিয়ানদের কাছে অদ্ভূত, অনাকাঙ্ক্ষিত ও নিরর্থক। তাই কোন পথচারি রাশিয়ানের দিকে তাকিয়ে হেসে বিনিময়ে হাসি পাওয়াটা বোকামি; এমনকি কোন কোন ক্ষেত্রে হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনা থাকতে পারে।

ইউক্রেনের বিস্ময়কর কিছু তথ্য

ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ

রাশিয়ার পর আয়তনের দিক থেকে ইউক্রেন ইউরোপের বৃহত্তম দেশ। ৬০৩,৬২৮ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের দেশটির জনসংখ্যা অবশ্য সে তুলনায় অনেক কম; প্রায় ৪ কোটি ৩৬ লাখ।

ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট

ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের সাতটিই অবস্থিত ইউক্রেনে। এর মধ্যে রয়েছে কিয়েভের সেন্ট-সোফিয়া ক্যাথিড্রাল, লভিভের ঐতিহাসিক কেন্দ্র, চেরনিভ্সি বিশ্ববিদ্যালয়, কার্পেথিয়ানের অনন্য কাঠের গির্জা এবং সেগুলোর চারপাশে বিচ গাছের বন।তীর্থযাত্রীরা সোফিয়া কিভস্কা গির্জা এবং সেন্ট মাইকেলের গোল্ডেন-গম্বুজ মঠ দেখার জন্য নিয়মিত আসেন অনেক দূর-দূরান্ত থেকে।

ভূতুড়ে শহরের দেশ

বিশ্বের সবচেয়ে মারাত্মক পারমাণবিক বিপর্যয় ঘটেছিলো ইউক্রেনের চেরনোবিল পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে। প্ল্যান্টের ৩০-কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে থেকে ৩৫০,০০০ নিবাসীকে সরিয়ে নেওয়া হয়। এরপর থেকে এর চারপাশের অঞ্চলগুলো জনবসতিহীন রয়ে গেছে। কিছু বয়স্ক বাসিন্দা সরকারী নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ওখানে ফিরে গিয়েছিলো। সেখানে বেশ কয়েকটি পরিত্যক্ত শহর রয়েছে, বিশেষত প্রিপিয়াত-এর ভূতুড়ে পরিবেশ দেখার জন্য প্রায় পর্যটকরা ভীড় করে। তাদেরকে যথাযথ নিরাপত্তার বেষ্টনীতে রেখে নির্দিষ্ট সীমারেখার মধ্যে ভ্রমণ করানো হয়।

ঐতিহাসিক কিয়েভের যুদ্ধ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪১ সালে জার্মানরা যখন ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভকে ঘিরে ফেলে, তখন সাধারণ শহরবাসীরা তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। শেষ পর্যন্ত হেরে গেলেও কোন রকম যুদ্ধ ছাড়াই হাল ছেড়ে দেয়নি সাধারণ মানুষ। নাৎসিদের বিরুদ্ধে তাদের দুর্দান্ত প্রতিরোধের জন্য তাদেরকে সোভিয়েত সরকার বীরের মর্যাদা দিয়েছিল।

বিশ্বের গভীরতম মেট্রো স্টেশন

কিয়েভ শহরের মেট্রো লাইনে অবস্থিত আর্সেনালনা বর্তমান সময়ে বিশ্বের গভীরতম মেট্রো স্টেশন। ১০৫.৫ মিটার গভীর এই স্টেশনে যাওয়ার জন্য একটি এসকেলেটরে করে পাঁচ মিনিটে যাত্রীদের ট্রেনের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। কিয়েভ শহরকে ঘিরে থাকা ডিনিপার নদীকে বাইপাস করতেই মূলত এত গভীর মেট্রো স্টেশন করা।

বিশ্বের বৃহত্তম সূর্যমুখী বীজ উৎপাদনকারী দেশ

ইউক্রেন বিশ্বের বৃহত্তম সূর্যমুখী বীজ উৎপাদক। অনুমান করা হয় যে, ইউক্রেনের সূর্যমুখী কৃষি জমির মোট আকার পুরো স্লোভেনিয়ার সমান হতে পারে।


নিয়ান্ডারথালদের বসতি

ইউক্রেন প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলো পূর্বে নিয়ান্ডারথালদের বসতি ছিল। এগুলোর মধ্যে মোলোডোভা সাইটগুলো ৪৩ থেকে ৪৫ হাজার খ্রিস্টপূর্বের। নিয়ান্ডারথালরা মূলত প্রাচীন মানুষের একটি উপ-প্রজাতি, পৃথিবীতে যাদের বিচরণ ছিলো প্রায় ৪০,০০০০ বছর আগে। আধুনিক মানুষের তুলনায় নিয়ান্ডারথালরা ছিল অনেক গুণ শক্তিশালী। তবে তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো আনুপাতিকভাবে ছোট ছিল।

বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম গম উৎপাদনকারী দেশ

ইউক্রেনকে এক সময় বলা হতো “ইউরোপের রুটির ঝুড়ি”। সোভিয়েত ইউনিয়নের গমের একটি বিশাল যোগান দেয়া হতো এই ইউক্রেন অঞ্চল থেকে। উর্বর কালো মাটি সহ ইউক্রেনের বিস্তীর্ণ আবাদযোগ্য জমি একে গম এবং অন্যান্য খাদ্য শস্যের জন্য একটি আদর্শ জায়গা করে তুলেছে। এখনো ইউক্রেন বিশ্বের বৃহত্তম গম উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে একটি।

গ্যাস ল্যাম্প উদ্ভাবন

১৮৫৩ সালে এলভিভ এর দুই ফার্মাসিস্ট - জ্যান জি এবং ইগন্যাসি লুকাসিউইজ গোল্ডেন স্টার নামে একটি দোকানে উদ্ভাবন করেন গ্যাস ল্যাম্প। আজও একই বিল্ডিংয়ের গ্যাসোভা ল্যাম্পা নামে একটি ক্যাফেতে এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের কৃতিত্ব স্মরণ করা হয়।

সবচেয়ে ভারী ওজন বোঝাইকারী উড়োজাহাজ

এএন-২২৫ এখন পর্যন্ত বিশ্বের সবচেয়ে ভারী বিমান, যার সর্বোচ্চ ৭১০ টন ওজন নিয়ে উড্ডয়ন করতে পারে। একটি আইটেমের বোঝা বহনের ক্ষেত্রে এর সর্বোচ্চ ৪১৮,৮৩০ পাউন্ড ওজন তোলার রেকর্ড আছে। আর সর্বমোট বোঝা বহনে সর্বোচ্চ ৫৫৯,৫৮০ পাউন্ড ওজন সরিয়েছে এএন-২২৫। সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ থাকার সময় ইউক্রেনে নির্মিত হয়েছিলো অ্যান্তোনোভ এএন-২২৫ ম্রিয়া। এছাড়া বিমানটির ডানাগুলোও বিশ্বের অন্যান্য সাধারণ বিমানের মধ্যে সবচেয়ে লম্বা।

About

Popular Links