Tuesday, May 28, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

প্রয়াণ দিবসে লাকী আখান্দকে স্মরণ

২০১৭ সালের আজকের দিন ২১ এপ্রিল বরেণ্য সঙ্গীত ব্যক্তিত্ব লাকী আখান্দ অনন্তলোকে পাড়ি জমান। প্রয়াণ দিবসে অনন্ত শ্রদ্ধা তার প্রতি

আপডেট : ২১ এপ্রিল ২০২২, ১০:২১ এএম

হয়তো তার পরনে ‌‘‘নেমেসিস’’ এর টি-শার্ট। লম্বা চুলে হয়তো সাদৃশ্য আর্টসেলের লিংকনের। কাঁধের গিটারটাও এ তরুণ ধরে হয়তো বেজবাবা সুমনের মতো। এর সবই হয়তোর আলাপ। কিন্তু এমনদের নিয়ে একটা কথা নিশ্চিত। তা হলো; এঁদের অধিকাংশের জীবনে গিটারে তোলা, গাওয়া প্রথম দিকের গানের মধ্যে ‘‘আবার এলো যে সন্ধ্যা‘‘ থাকবেই। সত্তরের দশকে ছোট ভাই হ্যাপিকে দিয়ে গাওয়ানো ‘‘ঘুড্ডি’’ হয়ে ওড়া এ গানের কম্পোজার একজন লাকী আখান্দ। বাংলা গানের প্রবাহিত ধারায় যাকে উপেক্ষা এখনও অসম্ভব।

২০১৭ সালের আজকের দিন ২১ এপ্রিল বরেণ্য সঙ্গীত ব্যক্তিত্ব লাকী আখান্দ অনন্তলোকে পাড়ি জমান। প্রয়াণ দিবসে অনন্ত শ্রদ্ধা তার প্রতি!

জীবন ‘‘নীলমণিহার’’ হয় তখন, যখন এই লাকী আখান্দের সঙ্গে এক টুকরো হলেও ব্যক্তিগত স্মৃতি থাকে। তখন ২০০৬ সাল। আমি সমকালের ফিচার বিভাগের কন্ট্রিবিউটর। একটি অনুলিখনের জন্য লাকী ভাইয়ের আরমানীটোলার বাসায় যাই। তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যুক্ত ছিলেন। স্বাধীন দেশে একটা অর্কেস্ট্রা ব্যান্ড গড়ে তুলবেন এমন স্বপ্ন তার। যা আজ পর্যন্ত কেউ বাস্তব করতে পারেননি (নানা বাহিনী বাদে)।

তার ‘‘মামুনীয়া‘‘ গান তো বিটিভিতে ছোট থেকে দেখে আসছি। বড় হতে হতে শুনতে শুনতে টের পাই অন্য সব গানের চেয়ে উনার কম্পোজিশনের পরিচ্ছন্নতা। আমাদের স্কুলবেলায় পুরো বাংলাদেশ একবার রঙিন হয়েছিল। সেটা ছিল ক্রিকেটে আইসিসি ট্রফি জেতার দিন। আশ্চর্য হচ্ছে ৭১ এর মতো বাঙালির সে বিজয় বার্তাও দেশে পৌঁছে বেতার মারফত। এরপর আমাদের সবচেয়ে বড় উল্লাস ছিল বিশ্বকাপে পাকিস্তানকে হারানোর পর। ঐ বিশ্বকাপের সময় ‘‘হঠাৎ করে বাংলাদেশ’’ নামে অসাধারণ একটা গান করেন লাকী আখান্দ। স্কুলে থাকতে থাকতেই ‘‘বিতৃষ্ণা জীবনে আমার’’ ক্যাসেটটা হিট হয়। মিক্সড অ্যালবামের যুগ তখন। উল্টো পাল্টে ‘‘এ-পিঠ’’ ‘‘বি-পিঠ’’ সবই দারুণ লাগে। গীতিকবি কাওসার আহমেদ চৌধুরী, গীতিকবি গোলাম মোর্শেদ আর লাকী আখান্দ জুটির অনন্যতা সব দিকে। সামিনা চৌধুরী, ফাহমিদা নবী, আইয়ুব বাচ্চু, জেমস, হাসান- যার ফ্যান যেই হোন; সবার ভালো লাগবে।

সেই লাকী আখান্দের অ্যাসাইনমেন্টে যাচ্ছি। খুব শিহরিত লাগে। সমকালের বিনোদন পাতার মিউজিক বিটে তখন কাজ করতেন জাকারিয়া সৌখিন, পাভেল আহমেদ, কবি সোমেশ্বর অলি ও রঞ্জু চৌধুরী। আমরা সবাই বন্ধু। সবাই তখন কন্ট্রিবিউটর। দুপুরে ভাত খাওয়ার টাকা না থাকলে কলা-পাউরুটি খাই শহীদ ভাইয়ের দোকানে। প্রয়াত মায়েস্ত্রো সাংবাদিক তৎকালের ফিচার এডিটর গোলাম ফারুক ভাই যোগ দিতেন আমাদের সাথে। আমার কন্ট্রিবিউটর বন্ধুরা আগে থেকে সতর্ক করে। কোনো খারাপ কিছু না। শুধু এটা বলে যে, লাকী ভাই কোনো মিডিয়াকেই পাত্তা দেন না। আমি রাজনৈতিক সাময়িকী ‘‘জনমঞ্চ’’ এ কাজের সুবাদে তখন বেশ কিছু শীর্ষ পলিটিশিয়ানের অ্যাসাইনমেন্ট করে ফেলেছি। আমার মধ্যে মুই কী হনু ভাব। বোল্ডলি ফোন দেই লাকী আখান্দের টিএন্ডটি নম্বরে। অনেকক্ষণ বাজে। কিন্তু কেউ তোলেন না। তারপর নাম মনে নেই কার কাছ থেকে যেন উনার সেলফোন নম্বর পাই। সেখানে কল দেই। টেক্সট পাঠাই। একই পরিণতি। আমার তখন লাকী আখান্দের জন্য ‘‘নীলিমায় দুটি চোখ ভাসিয়ে দিয়ে পথ চেয়ে থেকো’’ ছাড়া কিছু করার থাকে না।

২/৩ দিন পর লাকী ভাইয়ের নম্বর থেকে ফোন আসে। ভীষণ উত্তেজনা নিয়ে কল রিসিভ করি। উনি খুব পরিচিত ভঙ্গিতে বলেন, ‘‘শাওন, তুমি ফোন দিয়েছিলে? আমি স্টুডিও তে ছিলাম। তাই ধরতে পারিনি। সরি!’’ এসএমএস দেখে তিনি আমার নাম মনে রেখেছেন দেখে  আশ্চর্য বিনয়ী মানুষ মনেহয় ওনাকে। আমি বিস্তারিত বলি। তিনি আরমানীটোলার বাসার ঠিকানা দেন। চলে আসতে বলেন। 

পরদিন রওনা দেই। সাদেক হোসেন খোকার বিশাল বিশাল পোস্টার দেখতে দেখতে পুরনো শহরে প্রবেশ করি। আরমানীটোলায় আগে আসিনি। বাসা খুঁজতে একটু দেরি হয়। পৌঁছে দেখি একটা ভাঙা চলটে ওঠা স্টেশন ওয়াগনের সামনে লাকী আখান্দ দাঁড়ানো। অফিস যাওয়ার ফর্মাল ড্রেসে তিনি। স্পন্দিত বুকে আমি তার সাথে হ্যান্ডশেইক করি। লাকী ভাই খুব নির্বিকারভাবে বলেন, ‘‘শাওন, তুমি দেরি করেছো। এখন রেডিও অফিস যাবো। তুমি কাল সেখানে আসো।’’ এই বলে তিনি ড্রাইভিং সিটে উঠে বসেন। আমি দাঁড়িয়ে তার যাওয়া দেখি। বন্ধুদের কথা মনে পড়ে- লাকী আখান্দ মিডিয়া পাত্তা দেন না।

পরদিন গেলাম শাহবাগ রেডিও অফিসের গেটে। সকাল ১১টার মতো বাজে। তীব্র উত্তেজনায় ভুগছি আগের দিনের কথা ভেবে। আজও কি মিস হবে? আবার রেডিও অফিস তো খুব রেস্ট্রিকটেড এরিয়া। এর নিচতলা ফিল্ম আর্কাইভ তখন। কী হবে? আমি ফোন দেই। লাকী ভাই পাঁচ মিনিটের মধ্যে তার সেই ঝুরঝুরা স্টেশন ওয়াগন চালিয়ে আসেন। আমাকে বলেন, ওঠো। আমি ড্রাইভিং সিটের পরে তার পাশে বসি। গেট বন্ধ করতে যাই। তিনি বলেন, এই গাড়ির গেট তুমি বন্ধ করতে পারবে না। তিনি নিজে গেট বন্ধ করেন। এত বিখ্যাত একজন মিউজিশিয়ান (যাকে নিয়ে অঞ্জন দত্ত গান করেন) এমন সস্তা ভাঙা গাড়ি ইউজ করেন দেখে অবাক লাগে।

লাকী ভাই ফার্মগেটের দিকে গাড়ি ড্রাইভ করতে করতেই আমার সাথে কথা বলেন। এরপর রেকর্ডার অফ করলে, নানা প্রসঙ্গে কথা বলেন ভীষণ সরল গানের সরল এই মানুষ। অবাক হতে থাকি বিন্দুমাত্র স্টারডমহীন লাকী ভাইকে দেখে। এক সময় জানতে চাইলাম ‘‘স্বাধীনতা তোমাকে নিয়ে গান তো লিখেছি’’ এই গানের গল্প। লাকী ভাই বললেন, ‘‘দেশ স্বাধীনের পর ভোররাতে একবার শহীদ মিনার এলাকায় গেলাম। দেখলাম অনেক মানুষ ঘুমাচ্ছে বেদীতে। তখন মনে হলো, শহীদ মিনার তো ঘুমের জায়গা না। মানুষ এখানে ঘুমায় কেন? তখন সুরটা মাথায় এসেছে। আর কাওসার লিরিক লিখেছে।’’ উনি কোনো জটিলতার মধ্যে নাই। সবকিছু সহজভাবে চিন্তা।

লাকী ভাইয়ের কথার অনুলিখন প্রকাশিত হয় সমকালে। আমি উনাকে ফোন দেই। পত্রিকা নিয়ে দেখা করতে চাই। আমার ইচ্ছা এবার আরমানীটোলা বা উনার স্টুডিওতে যাওয়ার। উনি কীভাবে গান কম্পোজ করেন তা সরাসরি দেখা। লাকী ভাই ফোন ধরে, ‘‘পত্রিকা তোমার কাছে রেখে দাও। আমি পরে দেখব। এখন বিজি।’’ বলে ফোন কেটে দেন। অসম্ভব খেয়ালী মানুষ মনে হয় তাকে। একই সঙ্গে যিনি সব রকম রাখঢাকের বাইরে। আর তা প্রকাশেও সাবলীল।

নানা কারণে লাকী ভাইয়ের সাথে এরপর দীর্ঘ যোগাযোগহীনতা। কিন্তু তাকে নিয়ে অপার শ্রদ্ধা ও গুণমুগ্ধতা কাটেনি এতটুকু। ২০১২ সালে বণিক বার্তায় কর্মকালে আবার একটু লাকী ভাইয়ের দেখা পাই। সম্ভবত কোনো বিজয় দিবস সংখ্যার কাজে। সেবার দেখা হয় ময়মনসিংহে। তখন আমাদের স্কুল বন্ধু ও প্রথম আলোর সাবেক কন্ট্রিবিউটর সাজিদ আখন্দ ত্রিশালে সেটেল। আমরা সুযোগ পেলেই সেখানে যেতাম। অনেক বন্ধু মিলে যায় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় আর ময়মনসিংহ শহরে। ব্রহ্মপুত্র পাড়ের শহীদ বিপিন পার্ক আর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রচুর আড্ডা হতো। সবুজ ঘাসে হাত পা ছড়িয়ে ফুচকা খেতাম নদীর পাশের ‘‘সারিন্দা রেস্টুরেন্ট’’ এ। এ রেস্টুরেন্টটা বোধহয় এখন নেই।

লাকী ভাই তখন মুক্তাগাছা বেড়াতে যাবেন। উঠেছেন ময়মনসিংহ সার্কিট হাউজে। বললেন, চলে আসো। বহু বছর পর আলিঙ্গন করি লাকী ভাইকে। সেই স্টেশন ওয়াগনটাই দেখি মামন্তি চালাচ্ছে বিশাল মাঠের অন্ধকারে। লাকী ভাই ব্যস্ত ছিলেন। মুডে ছিলেন না কথার। বেশিক্ষণ তাকে পাই না। লেখাটাও অসমাপ্ত থেকে যায়। আর জানাও ছিল না এই শেষ দেখা।  

প্রাণঘাতী ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়তে হয়েছে লাকী আখান্দকে। যন্ত্রণার এ পুরোটা সময় তাকে সঙ্গ দিয়েছেন সংস্কৃতি স্বজন ও শিল্পী সমাজের সুহৃদ এরশাদুল হক টিংকু ভাই। লাকী ভাই চলে যাওয়া পর তাকে নিয়ে টিংকু ভাই লিখেছেন ‘কী ছিল লাকী ভাইয়ের শেষ চাওয়া’ শীর্ষক একটি লেখা। তাতে জানতে পাই লাকী আখান্দের অজানা ও নির্মম জীবন সংগ্রামের অনেক তথ্য-  

“ . . .গানটা নষ্ট করো না কিছুতেই!

এরপর লাকী ভাইয়ের গান। তিনি যখন তার গানের কপিরাইট সম্পর্কে জানলেন, এসব গান থেকে এতো.. এতো টাকা পাওয়ার কথা ছিল তার, তখন বললেন, তাহলে, এগুলো কপিরাইট করো। গান গোছাও। সব রেডি করো।

সব রেডি করা হলো। এবার আমরা রওনা দিবো কপিরাইট অফিসে। এ সময় একদিন বললেন, টিংকু এক কাজ করো। কপিরাইট অফিসে দিও না। ওখানে তো লোকজন নানা ধরনের। এটা-সেটা করবে। দেরি করাবে। তাছাড়া কনটেন্ট প্রোভাইডার, প্রোডাকশান ও মোবাইল কোম্পানিগুলো তো সবাই ওদের ধরে ফেলেছে। আমরা বরং এদের কাছে না গিয়ে তারানা হালিমের কাছে যাই। তাকে অনুরোধ করব যেন সে নিজে এগুলো নজরদারি করে। আমাদের কপিরাইটগুলো করিয়ে এনে দেয়। অনেকগুলো তো আর ফিরেই পাবো না। রেডিওতে আমার সুর করা প্রায় কয়েক হাজার গান আছে, সেগুলো তো আর পাবো না। তোমরা যে লিস্ট করেছো, সেগুলো নিয়ে মুভ করো। অন্তত আমার উত্তরসূরীরা যেন টাকাটা পায়, সেই ব্যবস্থা করো। আমি যখন তাকে বললাম, আপনি থাকবেন না কিন্তু আপনার গানগুলো থেকে আপনার পরিবার প্রতিমাসে রয়্যালটির টাকা পাবে। তখন তার মধ্যে একটা ভরসা তৈরি হলো। বললেন, আচ্ছা আমি অসুস্থ আজ প্রায় দু’বছর অথচ কোথাও থেকে কোনো ইনকাম নেই আমার।

লাকী ভাইয়ের বাসা ভাড়া ছাড়া আর কোনো ইনকাম ছিল না তখন। এখন মানুষের সাহায্য সহযোগিতায় তার চিকিৎসা চলছে। যখন থাকব না তখন এ সাহায্য সহযোগিতাও বন্ধ হয়ে যাবে। তখন কী হবে? আমি তাকে বললাম, চিন্তা নেই। প্রতিমাসে এসব গান থেকে বেশকিছু টাকা পাবেন। তিনি বললেন, তা কী সম্ভব? শিওর তুমি? আমি বললাম, নিশ্চয়ই। যদি মোবাইল কোম্পানিগুলো সাপোর্ট দেয়, রেডিওগুলো সাপোর্ট দেয় তাহলে সম্ভব।

এ সময় আমরা আর একটা কাজ করেছিলাম যে কাজের কারণে বাচ্চাদের নিয়ে টেনশন দূর হয় তার। ‘শিল্পীর পাশে ফাউন্ডেশন’ তাকে ৪০ লাখ টাকা দেয়। টাকাটা আমরা ফিক্সড ডিপোজিট করে দিলাম দুই বাচ্চার নামে। ফিক্সড ডিপোজিটের কাগজটা দেখে আবেগে কেঁদে ফেলেছিলেন লাকী ভাই। এখন আমার দুই বাচ্চার বিয়েশাদি-পড়াশুনা নিয়ে কোনো টেনশন নেই আর। ওরা ওদের মতো করে নিতে পারবে। তারও আগে, আরও এক দফায় দশ-দশ মিলিয়ে বিশ লাখ টাকা ওদের নামে ফিক্সড ডিপোজিট করে দিয়েছিলাম আমরা।

বিএসএমএমইউ-র সেন্টার ফর প্যালিয়েটিভ কেয়ারের অধ্যাপক নিজামউদ্দীন আহমেদ স্যারের প্রথম কথাই ছিল, ওনাকে মানসিক স্বস্তি দেয়া খুব জরুরী যাতে করে পরিবারের ভরণ-পোষন নিয়ে আর টেনশন করতে না হয়। ওনার যেসব সম্পত্তি ছিল তা আমরা উত্তরসূরীদের নামে হেবা দলিলের ব্যবস্থা করে দিয়েছি। সেখানেও তিনি কোনো ভেদাভেদ করেননি। দুই ছেলে-মেয়েকে সমানবাগে হেবা করে দিয়ে গেছেন। এছাড়া প্যালিয়েটিভ কেয়ারে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় শেষ গানের সুর করেছেন যা প্যালিয়েটিভ কেয়ারের প্রতি ভালোবাসার উপহার হিসেবে দিয়ে গেছেন।

যাওয়া হয়নি কপিরাইটের কাজেও

লাকী ভাইয়ের সব গুছিয়ে রাখা গানগুলো নিয়ে তার সঙ্গে কপিরাইট সংক্রান্ত কাজে তারানা হালিমের কাছে আর যাওয়া হয়নি। তারানা হালিম তখন সিঙ্গাপুর ছিলেন। এই কপিরাইট না করতে পারাটা ছিল তার আরেকটা কষ্ট। তার প্রকাশিত এবং অপ্রকাশিত অনেক গান। অনেক গানের রয়্যালটি অন্য কেউ পায়, তিনি পান না।

কপিরাইটের সঙ্গে আরেকটি বিষয়, কে তার কোন গানটি করবেন তার ফয়সালা। উনি বলতেন, এটা রুনাকে দিয়ে, এটা সাবিনাকে দিয়ে, এটা সুবীরকে দিয়ে, কিংবা এটা সামিনাকে দিয়ে গাওয়াবো। যার গলায় যেটি যায়। অথচ আমরা অনেকেই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছি না। যেমন, প্রাণ গ্রুপ বেশকিছু সময় আগে এসে বলল, ‘আগে যদি জানিতাম’, ‘আবার এলো যে সন্ধ্যা’, ‘এই নীল মনিহার’ গানগুলো লাকী ভাই বললে এগুলো নিয়ে মিউজিক ভিডিও তৈরি করবে। ওরা লাকী ভাইকে কিছু টাকাও দিয়েছিল। এই প্রজেক্টে লিমন-রেদওয়ান রনি কাজ করেছে। কিন্তু এগুলো লাকী ভাইকে না দেখিয়ে প্রচার করা হলে তিনি খুব কষ্ট পেয়েছিলেন। এর মাঝে লিনু বিল্লাহর মতো শিল্পী গাইলেন তার গান। তার বাসায় বারবার গিয়ে গানটি ঠিক করালেন। বারবার তিনি একটি কথা বলেছেন, গাও, কিন্তু গানটাকে নষ্ট করো না। গানের কথা আর সুরের বিচ্যুতি করো না। গানগুলো যেন ঠিকঠাক মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে। তিনি বলতেন, যখন তিনি থাকবেন না তখন কেউ তার গান করতে চাইলে আগে থেকে যেন তার পরিবারের অনুমতি নিয়ে নেয়। বেসুরো উপস্থাপনায় গানগুলোর অমর্যাদা করা হয়। সেগুলো যেন কেউ না করে।

লাকী ভাই বলতেন, তুমি যদি কঠিন গান তুলতে না পারো তবে গাওয়ার দরকার নাই। সহজ গানটাই করো। তাই আমার অনুরোধ, আপনারা লাইভ করেন বা যাই করেন প্রস্তুতি নিয়ে করেন। অনুমতি নিয়ে করেন। আপনি আপনার গানটাই গান। ওইটাই উৎসর্গ করেন লাকী ভাইকে। প্রোডাকশান কোম্পানিগুলো যেন যথাযথ অনুমতি ছাড়া শুধুমাত্র লাকি ভাইয়েরই না, অন্য কারো করা গান নতুন করে রেকর্ড না করেন, কেননা, রয়্যালটির প্রসঙ্গ রয়েছে।

শেষ সময় পাহাড়ে গিয়ে থাকতে চেয়েছিলেন লাকী ভাই। থাইল্যান্ডের ডাক্তারই মূলত তাকে বলেছিলেন পাহাড়ের বিশুদ্ধ হাওয়া নিতে। বন্ধুবর রাজা দেবাশীষকে তিনি বলেছিলেন পাহাড়ে গিয়ে থাকার ইচ্ছার কথা। একটা পাহাড় কেনারও শখ ছিল তার। সেখানে প্রকৃতির মাঝে বসে গান করবেন কাছের মানুষগুলোকে নিয়ে, এই ছিল তার বাসনা। . . .”

এখন পাহাড়ের চেয়েও অসীম উচ্চতায় লাকী ভাই। সে অনন্তলোকে সঙ্গী আছেন একই সময়ে গ্রহচারী সারথী গীতিকবি কাওসার আহমেদ চৌধুরীও। সুরের কম্পনমাত্রা দিয়ে মানুষকে জীবন জুড়ে মুগ্ধতা দিয়েছেন যারা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম মুহূর্তে মুহূর্তে আন্দোলিত হয় যে গেরিলা যোদ্ধা আর শব্দ সৈনিকের সৃষ্টিতে। যারা মিডিয়াকে শুধু না, কোনো পদ, পদবী, পদকের জন্য সৃষ্টিরত ছিলেন না। লালসার ক্ষুধার বাইরে সন্ত হয়ে শুধুমাত্র মানুষের একান্ত বেদনার উপশমে যাদের নিমগ্ন প্রহর কেটেছে।

১৯৫৬ সালের ৭ জুন ঢাকায় জন্ম নেওয়া শিল্পী লাকী আখান্দের পরিবার তার সব গানের রয়ালিটি পাচ্ছেন তো? ২০১৯ সালে যে শিল্পীর জন্মদিনে গুগল নতুন ডুডল প্রকাশ করেছিল, তিনি স্বভূমি ও স্বভাষায় সসম্মানে আছেন কি? আজকের এই দিনে এসব প্রশ্নের উত্তর জরুরি হয়ে উঠে আসা অসঙ্গত নয়।


লেখক, ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা হাসান শাওনের জন্ম, বেড়ে ওঠা রাজধানীর মিরপুরে। পড়াশোনা করেছেন মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি বাঙলা কলেজ, বাংলাদেশ সিনেমা ও টেলিভিশন ইনিস্টিটিউটে। ২০০৫ সাল থেকে তিনি লেখালেখি ও সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত। কাজ করেছেন সমকাল, বণিক বার্তা, ক্যানভাস ম্যাগাজিন ও আজকের পত্রিকায়।

২০২০ সালের ১৩ নভেম্বর হাসান শাওনের প্রথম বই “হুমায়ূনকে নিয়ে” প্রকাশিত হয়।  




About

Popular Links