Thursday, May 23, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

মওলানা ভাসানী নেতৃত্বের ফারাক্কা দিবস আজ

৪৬ বছর আগে, আজকের এই দিনে রাজশাহী থেকে ফারাক্কা বাঁধ বিরোধী লংমার্চ শুরু করেন মওলানা ভাসানী

আপডেট : ১৬ মে ২০২২, ০৪:৩৩ পিএম

“কলম, লেখনি বন্ধ, গান স্তব্ধ, নাস্তি নাস্তি হৃদয় কন্দরে

মুক্তির ফসল কেটে কে যেন তা কারাগারে ভরে।

সাহিত্য কলঙ্কবতী, শিল্প দুঃস্থ, মানুষের দাস

নতুন ভয়ের মেঘে কালো হলো এমন বাংলার নীলাকাশ,

পলাতক স্তাবকেরা এবার শিল্পের ছদ্মবেশে

সাহিত্যের ছদ্মবেশে

বাজারে জমাট

দুদিনের খেলার আসরে, তারা আজ শিল্পের সম্রাট।

তখন হৃদয়ে পাই ভাষা,

দেখি তিনি মানুষের সকলের এমন কি আমাদেরও আশা।

নক্ষত্র সঙ্ঘের মত মানুষের জামাতে জামাতে

দেখি তিনি রাখি হাতে।

আমাদের মিলিত সংগ্রাম

মৌলানা ভাসানীর নাম।”

-    আমাদের মিলিত সংগ্রাম: মৌলানা ভাসানীর নাম, আবদুল গাফফার চৌধুরী।

মিলিত সংগ্রামের প্রতিরোধ সুস্পষ্ট হয়েছিল বহুবারের মতো ১৯৭৬ সালের মে মাসের ঠিক ১৬ তারিখেও। আমৃত্যু মজলুমের পক্ষে অবস্থান নেওয়া বজ্রকন্ঠ মওলানা ভাসানী ছিলেন এর মূল সংগঠক। যার তোলা দাবির ন্যায্যতা আজও বহাল। মানুষসহ প্রকৃতি মাতার ওপর এমন জুলুমে এখনও ধুঁকছে উপমহাদেশের ভূরাজনীতিসহ অনেক কিছু। আমাদের জনপদে রাজনৈতিক ভাবনায় আধিপত্যবাদ বিরোধী ও জনমানুষের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত পরিবেশ চিন্তার এক স্ফুরণও বলা যায় একে।

৪৬ বছর আগে আজকের এই দিনে রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদরাসা ময়দান থেকে ফারাক্কা বাঁধ বিরোধী লংমার্চ শুরু করেন মওলানা ভাসানী। লংমার্চ শেষ হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাটে। জনতার পদযাত্রায় উদ্ভাসিত ছিল পুরো পথরেখা। প্রতিবাদী মানুষের স্রোতে উত্তাল হয়ে উঠেছিল রাজশাহীর রাজপথ। বেলা ২টায় হাজার হাজার মানুষ জেলার গোদাগাড়ীর প্রেমতলী গ্রামে পৌঁছান। সেখানে মধ্যাহ্ন বিরতির পর আবার যাত্রা। সন্ধ্যা ৬টায় লংমার্চ বিরতি নেয় চাঁপাইনবাবগঞ্জে। মাঠেই রাত কাটিয়ে পরদিন সোমবার সকাল ৮টায় আবার শুরু। তখন গতিপথ শিবগঞ্জের কানসাট অভিমুখে। ভারত সীমান্তের অদূরে কানসাটে পৌঁছানোর আগে মহানন্দা নদী পাড়ি হতে হয়। জনতার স্বতঃস্ফূর্ততা এই লংমার্চের প্রাণ। তারা নিজেরাই নৌকা দিয়ে কৃত্রিম সেতু তৈরি করেন। এভাবেই অভূতপূর্বভাবে মহানন্দা নদী পাড়ি দেয় লংমার্চ। কানসাট হাইস্কুল মাঠে লংমার্চ পৌঁছে। এরপর সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী বক্তব্য রাখেন। এই লংমার্চ শুধু দেশ না আন্তর্জাতিক পর্যায়েও ব্যাপকভাবে সাড়া তৈরি করেছিল। বিষয়টি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতেও স্থান পায়। মওলানা ভাসানী এশিয়ার অন্যতম ও অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে বিবেচিত হতে থাকেন।

কানসাটের ঐতিহাসিক জনসভায় মওলানা ভাসানী বলেছিলেন, “শিশুর যেমন মায়ের দুধে অধিকার, পানির ওপর তোমাদের তেমনই অধিকার। তোমরা জাগ্রত হও তোমাদের প্রকৃতি প্রদত্ত শাশ্বত অধিকার যে হরণ করেছে তার বিরুদ্ধে উঠে দাঁড়াও। গঙ্গার পানিতে আমাদের ন্যায্য অধিকার, এটা আমাদের প্রাকৃতিক অধিকার, এ অধিকার পশু, পাখি, গাছপালা, কীটপতঙ্গ সব কিছুর জন্মগত অধিকার। এ অধিকার হরণ করার ক্ষমতা কারও নেই। যে হরণ করেছে সে, প্রাণের বিরুদ্ধে জুলুম করেছে। বাংলাদেশের প্রাণবান মানুষ কোনো দিন তা মেনে নেবে না।” এরপর তিনি আকাশের দিকে হাত তুলে বলেন, “আল্লাহ নিশ্চয় আমাদের বাঁচার পথ করে দেবেন।”

তবে, একবারেই লংমার্চের মতো কঠিন কর্মসূচিতে যাননি মওলানা ভাসানী। আগে তার সঙ্গে একাধিক পত্র বিনিময় হয়েছিল ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর। ১৯৭৬ সালের ১৮ এপ্রিল মওলানা ভাসানী ইন্দিরাকে লেখা চিঠিতে বাংলাদেশের ওপর ফারাক্কা বাঁধের বিরূপ প্রতিক্রিয়া বর্ণনা করেন। তিনি তার লংমার্চ কর্মসূচির বিষয়েও অবহিত করেন তাতে।

ইন্দিরা গান্ধী পত্রের জবাবে লেখেন, ...“এটি ভাবতে কষ্ট হচ্ছে যে, যিনি আমাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছেন এবং পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে আত্মত্যাগ ও বেদনাকে একই ভাবে সহমর্মিতা দিয়ে দেখেছেন, তিনি বর্তমানে আমাদেরকে এত বেশি ভুল বুঝেছেন, এমনকি আমাদের আন্তরিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।”

এ চিঠির জবাবে মওলানা ভাসানী ইন্দিরা গান্ধীকে লিখেছিলেন, “আপনার ৪ মে’র পত্র ফারাক্কার ওপর সরকারি ভাষ্যেরই পুনরাবৃত্তি। সুবিখ্যাত পূর্বপূরুষ মতিলাল নেহেরুর দৌহিত্রী ও পণ্ডিত জহরলাল নেহেরুর কন্যার কাছ থেকে আমার এরূপ প্রত্যাশা ছিল না। ফারাক্কা সম্পর্কে আমি আবারও আপনাকে অনুরোধ করছি বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলো সফর করে আমাদের কৃষি ও শিল্প উৎপাদনে যে ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে তা নিরূপণ করার জন্য। আমি আপনাকে সরকারি কর্মকর্তাদের রিপোর্টের ওপর আস্থা স্থাপন না করার অনুরোধ জানাচ্ছি। কারণ এগুলো প্রায়ই বিদ্যমান অবস্থার প্রকৃত চিত্রের প্রতিফলন নয়। পারস্পরিক সমঝোতা ও সহযোগিতার ভিত্তিতে সমস্যা সমাধানে আপনার পথকে আমি প্রশংসা করি। তবে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হওয়া প্রয়োজন। এটি শুধু মৌসুমের দু’মাসের ভেতর সীমাবদ্ধ না রেখে বরং সারা বছরব্যাপী প্রবাহের যথাযথ বণ্টন ভিত্তিক হওয়া উচিত।”

মওলানা ভাসানী এ চিঠিতে আরও লিখেছিলেন, যদি তার অনুরোধ গ্রহণ করা না হয়, তবে তিনি নিপীড়িত জনগণের নেতা ইন্দিরা গান্ধীর পূর্ব পুরুষগণ এবং মহাত্মা গান্ধীর প্রদর্শিত পথেই সংগ্রাম পরিচালিত করবেন।

ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চের আগে মওলানা ভাসানী জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব ড. কুট ওয়ার্ল্ডহেইম, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ফোর্ড, গণচীনের নেতা মাও সেতুং, সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রী অ্যালেক্সি কুসিগিন প্রমুখ নেতৃবৃন্দের কাছে বার্তা প্রেরণ করে ভারতের ওপর তাদের চাপ প্রয়োগ করে গঙ্গার পানির সুষম বণ্টনের মাধ্যমে বাংলাদেশের ন্যায্য অধিকার প্রাপ্তির সহযোগিতা কামনা করেছিলেন। ফারাক্কা বাঁধ প্রকল্প মূলত ভীষণ রকম প্রাণবিনাশী ও গোলমেলে। যার কারণে বাংলাদেশ যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, ভারতও তার বাইরে নয়।

সংবাদমাধ্যমগুলো থেকে দেখতে পাই, ভারতেও ফারাক্কার বিরুদ্ধে জনমত জোরালো। বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নিতীশ কুমার ফারাক্কা বাঁধ ভাঙার প্রস্তাবও দিয়েছেন। 

মেধা পাটকরের মতো অ্যাক্টিভিস্টসহ বিশেষজ্ঞরা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে বলছেন যে, ভারতেও ফারাক্কা এখন সুবিধার চেয়ে অসুবিধাই বেশি ঘটাচ্ছে, কাজেই এটি অবিলম্বে “ডিকমিশন” করা দরকার। 

বিহারের গাঙ্গেয় অববাহিকায় প্রতি বছরের ভয়াবহ বন্যার জন্য এখন ফারাক্কা বাঁধই দায়ী- এমন বলা হচ্ছে। 

ভারতীয় বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ফারাক্কা বাঁধের প্রভাব খুবই ধ্বংসাত্মক। এ বাঁধ নির্মাণের মূল উদ্দেশ্য ছিল কলকাতা বন্দরকে বাঁচানো। কিন্তু এখন কলকাতা বন্দর চালু রাখতে যে পরিমাণ ড্রেজিং করতে হয়, ফারাক্কা চালু হবার আগে তার প্রয়োজন হতো না। 

অনেকের মতে, ফারাক্কার জন্য গঙ্গায় এত বেশি পলি জমছে যে তাতে দু’পারের জমি ভাঙছে ও জনপদ প্লাবিত হচ্ছে। ভারতের বিশেষজ্ঞরাও এখন খোলাখুলিভাবেই বলছেন, শুধু বাংলাদেশের স্বার্থে নয়, ভারতের জন্যও ফারাক্কা এখন যত না উপযোগী বরং অনেক বেশি ধ্বংসাত্মক।

অনেকে বলছেন, এ ধরনের বাঁধ “ডিকমিশন” করার অসংখ্য নজির পৃথিবীতে এখন আছে। উদাহরণ হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কথা উল্লেখ করা যায়। সে দেশে নদীর ওপর নির্মিত শতাধিক বাঁধ ভেঙে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ চালু করা হয়েছে।

তাই ফারাক্কা দিবস “রেড মওলানা” খ্যাত ভাসানীর রাজনৈতিক ও পরিবেশ চিন্তার দূরদর্শীতা প্রমাণ করে। আমাদের মিলিত সংগ্রামের দৃষ্টান্ত এটি। একই সঙ্গে জুলুমের বিরুদ্ধে জনতার উত্থানে যা সব প্রহরে অনুপ্রেরক।

About

Popular Links