Sunday, May 26, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

প্রয়াণ বার্ষিকীতে প্রকাশনা শিল্পের নক্ষত্র মহিউদ্দিন আহমেদকে নিয়ে ব্যক্তিগত স্মৃতি

বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পের প্রবাদ ব্যক্তিত্ব বলা যায় তাকে

আপডেট : ২২ জুন ২০২২, ১০:৫৯ এএম

বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পের প্রবাদ ব্যক্তিত্ব বলা যায় তাকে। প্রকাশনা সংস্থা ইউনির্ভাসিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল) - এর প্রতিষ্ঠাতা তিনি। আজ ২২ জুন এক বছর অতিক্রান্ত হলো এই মানুষ মহিউদ্দিন আহমেদ চলে যাওয়ার।

ফেব্রুয়ারি এলেই ভাষা, সাক্ষরতা, বই ও প্রকাশনাশিল্প নিয়ে অনেক কথা হয়। সংবাদকর্মী হিসেবে আমরাও তা নিয়ে ব্যস্ত থাকি বা ব্যস্ত রাখি পাঠককে (ইদানিং পাঠক, শ্রোতা, দর্শক কতটুকু পাত্তা দেয় সংবাদমাধ্যমকে তাও অবশ্য বিবেচ্য)। কিন্তু কতটা পথ পাড়ি দেওয়া হলো আমাদের? এর হিসেব নিশ্চয়ই চাইতে পারি।

এ নিয়ে প্রয়াত মহিউদ্দিন আহমেদ স্যারের কিছু কথাগুচ্ছ অনুলিখন করেছিলাম ২০১২ সালে বণিক বার্তায় কর্মকালে। এক বিকেলে গিয়েছিলাম মতিঝিলের ইউপিএল অফিসে। ফেব্রুয়ারির ঢাকার শীতের কাঁপুনি আরও বেড়ে যায় এ প্রজ্ঞাময় ব্যক্তিত্বের সামনে রেকর্ডার অন করে।

স্যার কিছুক্ষণ কথা বলেন। তারপর বলেন, ‍“তোমার কোনো কাজ আছে? চলো বাসায় যাই।”

আমি লোভ সামলাতে পারি না। নিচে গিয়ে তার ফোর হুইলারে উঠতে বললেন। আমি ড্রাইভারের পাশের সিটে। কিছু দূর যাওয়ার স্যার বললেন, “দাঁড়াও, ম্যাডামকে তুলে নেই। একটা ফোন দেই।” গাড়ি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় প্রবেশ করে। টিএসসি'র সামনে দাঁড়ায়। সেখান থেকে গাড়িতে ওঠেন অধ্যাপক মেহতাব খানম। আমার জানা ছিল না ওনারা স্বামী, স্ত্রী। নিশ্চুপ হয়ে আমি শুনছিলাম পেছনের সিটের দুজনের আলাপ। এরপর গুলশান পৌঁছাই। গাড়ি একটি অ্যাপার্টমেন্টে প্রবেশ করে। আমরা তিনজন লিফটে সবচেয়ে উঁচু ফ্লোরে থামি। মেহতাব ম্যাম আমাকে বলেন, “তুমি দুপুরে খেয়েছিলে?” বলি, “জি ম্যাম। আমি লাঞ্চ করেছি অফিসে।” বললেন, “চা নিয়ে আসছি বসো।”

আমি রেকর্ডার অন করি। মহিউদ্দিন স্যার কথা শুরু করেন। আমি ব্যাকুল স্যারের দশ মিনিটের অডিও বাইটের জন্য। তা দিয়েই লেখা সাজাতে পারবো সে বিশ্বাস ছিল। চা দিয়ে গেলেন মেহতাব ম্যাম নিজে। ঘর ভর্তি তাদের বই আর বই। আর অনেক পেইনটিং। মহিউদ্দিন স্যার আস্তে আস্তে কথা শুরু করলেন। দু'মিনিট বলার পর বলেন, “দাঁড়াও, ওষুধ খেয়ে আসি।” ওষুধ খেলেন। নিয়ে গেলেন এরপর কিচেনে। বললেন, “আসো আবার চা খাই।” কিচেনের জানালা দিয়ে নিচের একটি বাড়ি দেখিয়ে বলেন, “এর ছাদে এক ভদ্রমহিলা হাঁটেন। জানো তুমি? বলি, “না স্যার।” স্যার বলেন, “তুমি কিন্তু তাকে চেনো। তিনি খালেদা জিয়া।” আমি এতক্ষণে বুঝলাম, এটা বিরোধী দলীয় নেত্রীর ভাই ইস্কান্দরের বাসা। মহিউদ্দিন আহমেদ স্যার কিচেন থেকে এর ছাদেই খালেদা জিয়াকে হাঁটতে দেখেন।

স্যার সেদিন দুই ঘণ্টার মতো আমাকে সময় দেন। গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ে কথা বলেন। যা প্রাসঙ্গিক এখনও।

তিনি বলেছিলেন, “আমি বিশ্বাস করি, প্রকাশনা শিল্পটি জ্ঞানভিত্তিক। শুধু প্রকাশনা নয়, একুশ শতকের অনেক বাণিজ্যই জ্ঞানভিত্তিক। সভ্যতা বিকাশের আজকের পর্যায়ে অনেক কিছু বদলেছে। কিন্তু মানুষের জ্ঞাননির্ভরতা কমেনি। বিকল্প নেই এর। নির্দিষ্ট কোনো ছকে এ জ্ঞানকে আবদ্ধের সুযোগ নেই আমাদের।

আমাদের অঞ্চলে বহু আগে খনা নামে এক বিদুষী নারী ছিলেন। একটি কৃষিনির্ভর সমাজে এই নারী বেড়ে উঠেছেন। অনেক সময় পার হলেও তার কথা এখনো অভ্রান্ত। সুতরাং একে বলতেই পারি লোকজ জ্ঞান। কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে এর সূত্রপাত না হলেও এর কার্যকারিতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই কারও।

আমার রেকর্ডার অন করা। স্যার কথা বলতে থাকেন।

১৯৮২ সালে ইংল্যান্ডে একটি কনভেনশন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেখানে বিশ্বের জ্ঞান-বিজ্ঞানে নেতৃত্বে থাকা অনেক পণ্ডিত ব্যক্তিত্ব উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশের একজন প্রকাশক হিসেবে আমি আমন্ত্রিত ছিলাম সেখানে। এই কনভেনশনে আমাদের নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছিল, বইয়ের কোনো বিকল্প নেই।  

ই-বুকের অস্তিত্ব থাকবে; কিন্তু তা বইকে অতিক্রম করে নয়। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে দেখেছি নতুন উদ্যমে চেইন বুকশপ বিস্তৃত হচ্ছে। তাই অনেকে বই নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করলেও আমি বলব, আমার প্রজন্মের জীবদ্দশায় বই প্রাধান্যে থাকবে।

আমাদের সরকার এখন বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ করছে শিক্ষার্থীদের। এ কর্মসূচিতে দেশে নিরক্ষরতার হার কমার কথা। কিন্তু সরকার এখনো ৭০% এর বেশি সাক্ষরতা অর্জনের কথা জোর গলায় বলছে না। এ প্রসঙ্গে আমার মত হচ্ছে, যে প্রক্রিয়ায় এই জরিপ করা হচ্ছে, তাতে বড় ধরনের গলদ আছে।

এ পরিস্থিতি দেশে সামগ্রিক জ্ঞানচর্চার প্রতিকূল। দেশের সেরা বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রসঙ্গে কিছু তথ্য উপস্থাপন করতে চাই এ সুযোগে। বিশ্ব র‌্যাঙ্কিংয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখন ৬ হাজার বিশ্ববিদ্যালয়ের নিচে অবস্থান করছে। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে এ বিশ্ববিদ্যালয় আছে ৩ হাজার বিশ্ববিদ্যালয়ের নিচে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮০ শতাংশ শিক্ষকের আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে এমন কোনো গবেষণা নেই।

আমার কাছে তাই মনে হয়, বিশ্বের মানটা কোথায়, তা আসলে জানা দরকার এ মুহূর্তে। বিশ্বের মান না জানলে নিজেদের অবস্থা অজানা থাকবে আমাদের।

যেকোনো কিছুর আরম্ভে গবেষণাকে আমি মনে করি প্রধান কাজ। গবেষণা হচ্ছে কাজের ধর্ম। এর ব্যত্যয়ে কোনো সাফল্য সম্ভব নয়। পাবলিক বা প্রাইভেট দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন উপেক্ষিত হচ্ছে গবেষণা। পরিস্থিতি আসলেই শঙ্কিত হওয়ার মতোন। এর সঙ্গে সম্পৃক্ত দেশের শিক্ষানীতিও। যেকোনো মূল্যে শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখা উচিত আমাদের রাষ্ট্রের।

ফেব্রুয়ারি এলে বই নিয়ে অনেক কথা হয়। এ মাসের সঙ্গে মহান ভাষা আন্দোলনের যোগসূত্র আছে। এই ঐতিহ্য গর্বের। কিন্তু বইমেলা নিয়ে এখনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি চোখে পড়ার মতো নয়। শুধু জনপ্রিয় লেখকদের বই বিক্রি। দেশে পাঠকসমাজ বা রিডিং সোসাইটি গড়ে ওঠেনি এখনো।  

এ বিষয়গুলো অতিক্রম না করে বাংলাদেশ এগোতে পারে না। অবাধ তথ্যপ্রযুক্তির যুগে আমি তাই লক্ষ্য রাখি, ‘ম্যান বিহাইন্ড দ্য মেশিন’র দিকে। এ মানুষ তৈরিতে সামগ্রিক জ্ঞান পরিকল্পনা প্রাধান্যের বিকল্প নেই আমাদের সামনে। প্রত্যাশা রাখি, আগামীর প্রকাশনাশিল্প সক্রিয় থাকবে আজকের অতৃপ্ত থাকা ক্ষেত্রগুলোয়।”

মহিউদ্দিন আহমেদ স্যারের এমন সব কথা রেকর্ড শেষে বিদায় নেই। নিচে নেমে পুরো রাস্তায় গিজগিজ করা পুলিশ দেখি। যত না পোশাকে, তার চেয়ে বেশি ছদ্মবেশে। পরের সপ্তাহে আবার স্যারকে লেখা দেখানোর জন্য যাই ইউপিএল অফিসে। আগেই মেইল করেছিলাম টেক্স। মহিউদ্দিন স্যার বললেন, “তুমি একটু আসো।” আবার ইউপিএল অফিসে যাই। স্যার টেক্সে কিছু এডিট করেন। আমার অনুলিখনে বণিক বার্তার ‘সিল্করুট’ এ প্রধান রচনা হিসেবে এটি প্রকাশ হয় ১ মার্চ ২০১২। এরপর স্যারের সঙ্গে কয়েকবার যোগাযোগ হয়েছিল ফোনে। কিন্তু দেখা আর হয়নি। অকৃতি অধম হয়েও আমি মহিউদ্দিন আহমেদ স্যারের সঙ্গ পেয়েছি। ভাগ্যবানই লাগে নিজেকে। আজ প্রথম প্রয়াণ বার্ষিকীতে তাকে মনে করে এত বেশি কথার অবতারণা। এমন নির্মোহ, কাজে ধ্যাণী মানুষ আমাদের কম।

অনন্তলোকে সুখে থাকুন মহিউদ্দিন আহমেদ স্যার। আপনার জন্য প্রার্থনা। প্রকাশনা শিল্প নিয়ে আপনার অতৃপ্তি হয়তো দূর করতে অনাগত প্রজন্ম। আমরা এর অপেক্ষায় আছি।

About

Popular Links