Tuesday, May 28, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

অপরাজিতা ফুলের চা বানাবেন যেভাবে

অপরাজিতা ফুলের নীল চায়ের জাদুকরী উপকারিতার জন্য এটি ভেষজ খাবারের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত

আপডেট : ১০ আগস্ট ২০২২, ০১:৫২ পিএম

শুধু সৌন্দর্য্য দিয়ে নয়, প্রকৃতি তার বিস্ময়কর সব উপাচার দিয়ে অকুণ্ঠচিত্তে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছে মানুষের সেবায়। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের বর্তমান অবস্থার পেছনে প্রকৃতির তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। গবেষণায় বেরিয়ে আসছে নানান উদ্ভিদের বিস্ময়কর ক্ষমতার কথা। তবে বাটারফ্লাই পি ফ্লাওয়ার বা অপরাজিতা ফুলের নীল চা খুব একটা নতুন বিষয় নয়। এশিয়ায় জন্মানো এই আকর্ষণীয় উদ্ভিদটির নীল রঙ এতে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্থোসায়ানিন নামক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যৌগের উপস্থিতির কথা জানান দেয়। নীল অপরাজিতার থেকে তৈরি করা যায় অনেক স্বাস্থ্যগুণ সম্পন্ন ভেষজ চা। চলুন, অপরাজিতা ফুলের চায়ের গুণাগুণ ও চা বানানোর পদ্ধতি জেনে নেওয়া যাক।

নীল অপরাজিতা ফুলের চায়ের উপকারিতা ও স্বাস্থ্যগুণ

ত্বক এবং চুলের স্বাস্থ্য সুরক্ষা

প্রসাধনী নির্মাতারা স্কিনকেয়ার সিরাম থেকে শুরু করে চুলের মিস্ট এবং শ্যাম্পু সব কিছুতেই অপরাজিতা ফুলের কার্যকারিতা নিয়ে গর্ব করেন। এর নির্যাস সাময়িক প্রয়োগের এক ঘণ্টা পরে ত্বকের হাইড্রেশন ৭০% বাড়িয়ে দিতে পারে। এছাড়া চুলের বৃদ্ধিতে এটি মিনোক্সিডিলের চেয়েও বেশি কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। তাই এটি চুল পড়ার চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত একটি সাধারণ পণ্য। এটি চুলের ফলিকলগুলোকে ভিতর থেকে শক্তিশালী করতেও সাহায্য করে।

ওজন কমাতে

অপরাজিতা ফুলের নির্যাস দেহের কিছু কোষের অগ্রগতিকে নিয়ন্ত্রণ করে চর্বির গঠনকে ধীর করে দিতে পারে। এতে থাকা টার্নেটাইন্স শরীরের চর্বি কোষের সংশ্লেষণ ব্লক করতে পারে।

রক্তে শর্করার মাত্রার ভারসাম্যতা বজায়

অপরাজিতা ফুল ডায়াবেটিস সম্পর্কিত লক্ষণগুলোর ঝুঁকি কমাতে পারে। এর নির্যাস রক্তে শর্করার মাত্রা উল্লেখযোগ্য হারে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কোষের ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে পারে। এতে থাকা ফেনোলিক অ্যাসিড এবং ফেনোলিক অ্যামাইড অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে ভরপুর। এর অ্যান্টিহাইপারগ্লাইসেমিক প্রভাবে ইনসুলিন নিঃসরণ উন্নত হয়, গ্লুকোজ বিপাক নিয়ন্ত্রণ হয় এবং শরীরের কোষগুলোর দ্বারা শর্করার অতিরিক্ত শোষণ প্রতিরোধ হয়। এমনকি এটি খালি পেট এবং ভরপেট খাওয়ার পরে উভয় ক্ষেত্রেই কাজ করে।

হতাশা এবং উদ্বেগের বিরুদ্ধে কার্যকারিতা

নীল চা পাতা একটি ভাল অ্যাডাপ্টোজেন। অ্যাডাপ্টোজেন এমন অণু, যা হতাশা এবং উদ্বেগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ বাড়াতে পারে। ফলে শরীর তার স্বাভাবিক এবং সুস্থ অবস্থায় ফিরে আসে।

হৃদপিন্ডের সুস্বাস্থ্যের নিশ্চয়তা

আয়ু বৃদ্ধির সর্বোত্তম উপায় হলো, যেকোনো বয়সেই হৃদপিন্ডকে শক্তিশালী এবং সুস্থ রাখা। এই কাজটি বেশ সুচারুরূপে করতে পারে নীল চা। এই সুস্বাদু পানীয়টি এলডিএল বা খারাপ কোলেস্টেরল কমাতে এবং শরীরে এইচডিএল বা ভাল কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়াতে সহায়তা করে। এটি হার্ট অ্যাটাক, রক্ত জমাট বাঁধা এবং হৃদযন্ত্রের জন্য একটি প্রতিরক্ষামূলক ঢাল হিসেবে কাজ করে। এই সব কার্ডিওভাসকুলার সুবিধার পাশাপাশি নীল চা হাইপারলিপিডেমিয়া বা রক্তে অত্যধিক চর্বি জমা থেকেও রক্ষা করে।

মস্তিষ্কের কার্যকলাপ বৃদ্ধি

অ্যাসিটাইলকোলাইন মস্তিষ্কের কার্যকরী স্নায়ু কোষ যোগাযোগের জন্য অপরিহার্য একটি অণু। বয়সের সঙ্গে এই যৌগটি হ্রাস পেতে শুরু করে, বিধায় স্মৃতিশক্তি হ্রাস পায় এবং অন্যান্য মস্তিষ্কের ব্যাধি সৃষ্টি হয়। এই নীল চায়ে রয়েছে অ্যাসিটাইলকোলাইন যৌগ যেটি স্নায়ুকে শান্ত করার সময় স্মৃতিশক্তি হ্রাস রোধ করে। এটি এমনকি মধ্য বয়স্ক ব্যক্তিদের জ্ঞানীয় ক্ষমতাও বাড়ায়।

বার্ধক্য বিরোধী বৈশিষ্ট্য

নীল চা অ্যান্থোসায়ানিনে পূর্ণ, যেটি এমন একটি যৌগ যা ত্বকের স্বাস্থ্যকে উন্নত করে। এটি ত্বকের কৈশিকগুলোতে রক্ত প্রবাহ বাড়িয়ে ত্বককে তরুণ করে তোলে। এটি গ্লাইকেশন প্রক্রিয়াকেও ধীর করে দেয়, যা ত্বকের টান টান ভাব হারানোর জন্য দায়ী।

হজমের স্বাস্থ্যের উন্নতি

খালি পেটে নীল চা পান করলে শরীর থেকে টক্সিন বের হয়ে যায়। সুতরাং লিভার, অগ্ন্যাশয় এবং অন্ত্রগুলো যে ভালোভাবে পরিষ্কার থাকবে সে ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থাকা যেতে পারে। আর এই পরিশুদ্ধি পরিপাকতন্ত্রকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। সপ্তাহে এক বা দুবার খালি পেটে এক কাপ নীল চা পান করা সিস্টেমে জমে থাকা টক্সিনগুলোকে বের করে দেয়।

ব্যাথানাশক ঔষধ

এক কাপ নীল চা প্যারাসিটামলের মত কাজ করে। ফলে এটি পেইন কিলারের ওপর নির্ভরশীলতা কমায়। এর প্রদাহ বিরোধী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বৈশিষ্ট্যগুলো জ্বর সহ যে কোন ধরনের শরীর ব্যাথা উপশম করতে সক্ষম। নীল চায়ের নির্যাসের চেতনানাশক বৈশিষ্ট্য ব্যথা এবং ফোলা থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য যুগ যুগ ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

প্রদাহ বিরোধী বৈশিষ্ট্য

নীল চায়ে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান রোগ-সৃষ্টিকারী প্রদাহের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য যথেষ্ট কার্যকর। এতে উপস্থিত উচ্চ পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এর প্রদাহ বিরোধী বৈশিষ্ট্যের জন্য দায়ী। এটি কেবল প্রদাহ কমাতেই সাহায্য করে না বরং অনেক দীর্ঘস্থায়ী রোগ থেকে রক্ষা করে। নীল চা বাহ্যিক এবং অভ্যন্তরীণ উভয় প্রদাহের চিকিৎসায় সমানভাবে কাজ করে। এতে থাকা ফ্ল্যাভোনয়েড রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। ফলে শরীর প্রদাহ এবং অন্যান্য সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সক্ষম হয়ে ওঠে।

অপরাজিতা ফুলের চা তৈরির প্রয়োজনীয় উপাদান

নীল চা তৈরিতে যেগুলো প্রস্তুত রাখতে হবে সেগুলো হলো- শুকনো নীল অপরাজিতা ফুলের চা দানা, গরম পানি, লেবু বা চুন, মধু বা মিষ্টি, ঠান্ডা চায়ের ক্ষেত্রে বরফের টুকরো। তাজা বা শুকনো অপরাজিতা ফুল ব্যবহার করা যেতে পারে। চায়ের স্বাদ কতটুকু গাঢ় হবে তার ওপর ভিত্তি করে ফুলে সংখ্যা কম বেশি করতে হবে। বেশি পুষ্টি অথবা স্বাস্থ্যগুণের সুবিধা ভালো ভাবে পেতে হলে বেশি ফুল ব্যবহার করতে হবে। তবে হালকা নীল চা থেকে অমৃতের স্বাদ পেতে এক চুমুকই যথেষ্ট।

অপরাজিতা ফুলের চা তৈরির পদ্ধতি

প্রথমে উচ্চ তাপে চায়ের কেটলিতে পানি গরম করতে হবে। ২ কাপ বা তার বেশি পরিমাণে পান করতে চাইলে একটি বড় পাত্রে পানি সিদ্ধ করে অতঃপর ছোট পাত্রে চা ঢেলে নেওয়া যেতে পারে।

এক-চতুর্থাংশ কাপ নীল চা দানা ছাকনী যুক্ত বলে নিতে হবে। অতঃপর একজনের জন্য তা একটি বড় মগে যোগ করতে হবে। আর ২ জনের জন্য ৪ কাপে যুক্ত করা যেতে পারে।

চায়ের বলের ওপর গরম পানি ঢেলে দিয়ে ৩ থেকে ৮ মিনিটের জন্য রেখে দিতে হবে। চা কতটা গাঢ় স্বাদের হবে তার ওপর নির্ভর করে এই সময়টা বাড়ানো যেতে পারে। তবে সতর্ক থাকতে হবে, কেননা ১০ মিনিটের বেশি হয়ে গেলে চা একদম তেতো হয়ে যাবে।

ঠান্ডা চায়ের জন্য একটি গ্লাসে ১ কাপ বরফ রাখতে হবে। এই বরফের ওপর ঢেলে দিতে হবে গরম নীল চা। পরিমাণ মত লেবুর রস যোগ করা যেতে পারে। এছাড়া আরো মুখরোচক করার জন্য মধু দেয়া যেতে পারে।

নীল রঙকে ভালোভাবে পেতে হলে ফুলগুলোকে কয়েক মিনিটের জন্য গরম পানিতে ভিজতে দিতে হবে। আরও রঙ বের করতে কাপের বিপরীতে ফুলগুলোকে চামচের উল্টো পিঠ দিয়ে পিষে নেওয়া যেতে পারে। অনেক বেশি পরিমাণে এই চা বানালে সাধারণত ২ থেকে ৩ দিনের জন্য ফ্রিজে রাখা যেতে পারে। তবে লেবুর রস দিয়ে পান করতে চাইলে পান করার জন্য প্রস্তুত করে অর্থাৎ পান করার ঠিক আগ মুহুর্তে লেবুর রস যোগ করতে হবে।

অপরাজিতা ফুলের নীল চায়ের জাদুকরী উপকারিতার জন্য এটি ভেষজ খাবারের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত। সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো এই বহুমুখী পানীয়টির তেমন একটা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। তাই এটি যে কোন ডায়েটে একটি দুর্দান্ত সংযোজন। অতিরিক্ত সেবনে সর্বোচ্চ হালকা বমি ভাব এবং ডায়রিয়া হতে পারে। তবে গর্ভবতী এবং স্তন্যদানকারী মহিলাদের ক্ষেত্রে নীল চা পান করার আগে তাদের ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।

About

Popular Links