Wednesday, May 29, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

চাকরির সাক্ষাৎকারে উদ্বিগ্নতা এড়াতে করণীয়

চাকরির সাক্ষাৎকারের সময় অনেকেই স্নায়ুবিক চাপ অনুভব করে থাকেন

আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১১:৫১ এএম

চাকরির সাক্ষাৎকার ভীতি খুবই সাধারণ একটা বিষয়, তবে অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পদের জন্য সর্বোচ্চ যোগ্য প্রার্থীরাও এই পরিস্থিতির শিকার হয়ে থাকেন। যিনি প্রথমবার এই অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে যাচ্ছেন তিনিও জানেন যে চাকরির সাক্ষাৎকারের আগে নিজেকে শান্ত রাখা জরুরি। কিন্তু যখন নিয়োগকর্তাদের সামনে নিজের যোগ্যতাকে প্রমাণ করার সময় আসে, তখন নিজের অবচেতনেই অনেকেই স্নায়ুবিক চাপ অনুভব করে থাকেন। ফলশ্রুতিতে হঠাৎ করে হাত ঘামতে শুরু করে, হৃদস্পন্দন বেড়ে যায় এবং মুখ শুকিয়ে যায়। এই অস্থিরতার কারণ কী, কীভাবেই বা এ অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়, চলুন জেনে নেওয়া যাক।

সাক্ষাৎকারের এর আগে অস্থিরতার কারণ

মুখোমুখি প্রশ্নোত্তরের সময় নিয়োগকারীদের কয়েক জোড়া দৃষ্টির সামনে যেকোনো চাকরি প্রার্থীই যে বিষয়টি নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন থাকেন তা হচ্ছে- কোথাও কোন ভুল হয়ে যাচ্ছে না তো! একদিকে মনে-প্রাণে যখন তিনি ভাবছেন পুরো পরিস্থিতি তার নিয়ন্ত্রণে আছে, অন্যদিকে তখন তিনি অনুভব করতে শুরু করেন, তার কন্ঠনালীর আশেপাশের পেশী টানটান হয়ে যাচ্ছে। এ সময় তার কথা বলার সময় কণ্ঠস্বরে কম্পন সৃষ্টি হয়। ধীরে ধীরে হাত-পা সহ সর্বাঙ্গে তা ছড়িয়ে পড়ে। মস্তিষ্কে জমা করে নিয়ে আসা তথ্যগুলো তখন একে অপরের সঙ্গে রীতিমত দৌড় প্রতিযোগিতা শুরু করে, চূড়ান্ত মুহুর্তে যেটি যে কোন একটি তথ্যের ওপর মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতাকে ধ্বংস করে দেয়। এ সময় বুকের ভেতর বাড়তে থাকা হৃদস্পন্দনের শব্দ নিজের কান-অব্দি পৌঁছে যায়।

এই উদ্বেগ মূলত একটি সহজাত প্রবৃত্তি। ব্যথা বা যন্ত্রণার মত যেকোনো শারীরিক সমস্যা অথবা স্নায়বিক চাপের মত যেকোনো মানসিক সমস্যার সম্মুখীন হলে মস্তিষ্ক এরকম প্রতিক্রিয়া দেখায়। শারীরিক বা মানসিক হুমকিগুলো মস্তিষ্কে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই স্নায়ুতন্ত্র বিপুল পরিমাণে অ্যাড্রেনালিন এবং কর্টিসল নামক হরমোন নিঃসরণ করে, যেগুলো স্ট্রেস হরমোন নামে পরিচিত।

অ্যাড্রেনালিন রক্তচাপ ও হৃদস্পন্দন বাড়ানোর পেছনে মূল চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করে। আর প্রাথমিক স্ট্রেস হরমোন কর্টিসল রক্ত প্রবাহে শর্করা বা গ্লুকোজের পরিমাণ বাড়ায়। এ সময় মস্তিষ্ক বেশি পরিমাণে গ্লুকোজ ব্যবহার করে এবং সেই সঙ্গে টিস্যু রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় পদার্থের যোগান বৃদ্ধি পায়। আর শারীরিকভাবে এর প্রকাশভঙ্গি স্বরূপ উদ্বেগ সৃষ্টি হয়, যাকে স্ট্রেস প্রতিক্রিয়া নামে পরিচিত।

দীর্ঘস্থায়ী চাপের সময় শরীর অত্যধিক পরিমাণে কর্টিসল তৈরি করে, যা অত্যন্ত ক্লান্ত এবং নির্দিষ্ট কাজে মনযোগ দিতে অক্ষম করে তোলে। উচ্চ কর্টিসলের মাত্রা কোনো কিছু শেখার এবং স্মৃতিশক্তির সাথে যুক্ত মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশকে অবনতির দিকে নিয়ে যায়। এর সঙ্গে অ্যাড্রেনালিনের অবিরাম নিঃসরণ যে কোন পরিস্থিতির উপর স্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রণ হারাতে সহায়তা করে, যা একটি ইন্টারভিউয়ের জন্য খুবই দরকারি ব্যাপার।

চাকরির সাক্ষাৎকারের আগে নিজেকে শান্ত রাখার কৌশল

সাক্ষাৎকারের দিনটির জন্য শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থাকা

যেকোনো কাজের জন্যই শারীরিক ও মানসিকভাবে উপযুক্ত থাকার কোনো বিকল্প নেই। সাক্ষাৎকারের আগের রাতে ভালো ঘুম না হলে শত প্রস্তুতি থাকলেও পরের দিন সকালে কাঙ্ক্ষিত পারফরমেন্স আসবে না। এছাড়া সকালের নাস্তা সঠিক সময়ে খেয়ে বের হওয়া বেশ জরুরি। হালকা খাবার বা ফল দিয়ে স্বাস্থ্যকর নাস্তা উদ্যমী দিনের সূচনা করাতে পারে। তবে ভরপেট খেয়ে সাক্ষাৎকারে যাওয়া মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। নিজেকে ভাল ভাবে হাইড্রেটেড রাখার দিকে খেয়াল দিতে হবে।

যাদের ইতোমধ্যে শরীরচর্চার অভ্যেস আছে তাদের জন্য সুখবর। নিদেনপক্ষে শারীরিক দিক থেকে কোনো বিড়ম্বনার শিকার হতে হবে না। আর যাদের এরকম অভ্যাস নেই তারা সম্ভব হলে ইন্টারভিউয়ের দিন ভোর বেলা কোনো খোলা পার্কে কিছুক্ষণ হাঁটাহাটি করে নিতে পারেন। 

সাধারণ করপোরেট সংস্কৃতির সঙ্গে মানিয়ে সুন্দর পোশাক পরিধান করা

সুন্দর পোশাক-পরিচ্ছেদ মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে। যেকোননো পরিস্থিতিতে আত্মবিশ্বাসী হতে চাইলে, সেই পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিজের পছন্দের সেরা পোশাকটি বেছে নেওয়া উচিত। অতঃপর সেটা ভালো ভাবে পরিধান করে গেলে পোষাকের অসংলগ্নতা নিয়ে কোনো বিড়ম্বনায় পড়তে হবে না। চাকরিপ্রার্থী তখন নির্দ্বিধায় তার সাক্ষাৎকারের প্রতি পূর্ণ মনযোগ দিতে পারবেন।

তাই সাক্ষাৎকারের আগে কোম্পানির ড্রেস কোডটি ভালো করে চেক করে নেওয়া জরুরি। অতঃপর নিজের ব্যক্তিত্ব এবং করপোরেট সংস্কৃতিকে প্রতিফলিত করে এমন একটি পোশাক বেছে নিতে হবে। সুস্থ শরীর ও প্রফুল্ল মনের সংমিশ্রণে সাক্ষাৎকারে “আগে দর্শনধারী” ক্ষেত্রটিতে অনায়াসেই কৃতকার্য হওয়া যাবে। এরপরে সম্পূর্ণ মনযোগ দিয়ে “পরে গুণ বিচারী” ক্ষেত্রটিতে কৃতকার্য হওয়া পালা।

সাক্ষাৎকারের জন্য সর্বতভাবে প্রস্তুত থাকা

প্রথমেই সঠিক সময়ে উপস্তিতিটা নিশ্চিত করতে হবে। ট্রাফিক জ্যামের কথা মাথায় রেখে অনেকটা সময় হাতে নিয়ে আগে ভাগেই ঘর থেকে সাক্ষাৎকারের জন্য বের হয়ে যেতে হবে। এখানে ভুল করা মানেই সাক্ষাৎকারের পুরোটা সময় ধরে নিজের অস্থিরতার সঙ্গে যুদ্ধ করা। টার্গেটকৃত কোম্পানি সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে গবেষণা ও নিজের কাজের অভিজ্ঞতাসহ সাক্ষাৎকারের সাধারণ প্রশ্নোত্তরগুলোর ওপর নিজের দখল রাখতে হবে। একটা ফাইলে করে জীবনবৃত্তান্ত, কভার লেটার, সার্টিফিকেট, কলম এবং নোটপ্যাড নিয়ে যাওয়া যেতে পারে।

ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সাক্ষাৎকারের ক্ষেত্রে কম্পিউটার, হেডফোন, স্পিকার এবং কনফারেন্সের অ্যাপ সঠিক ভাবে কাজ করছে কিনা তা আগে থেকে চেক করে রাখতে হবে। সর্বসাকূল্যে, সাক্ষাৎকারের  সময় কোনো কিছুর ঘাটতির কারণে সৃষ্টি বিড়ম্বনা অস্থিরতার মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। অন্যদিকে সদাপ্রস্তুত চাকরি প্রার্থীর নিজের মধ্যেও আত্মবিশ্বাস থাকে এবং তাকে ইন্টারভিউ করে নিয়োগকর্তারাও অভিভূত হন।

সাক্ষাৎকারের ব্যাপারে দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনা

প্রায়ই ক্ষেত্রে দেখা যায়, চাকরিপ্রার্থীরা সাক্ষাৎকারে যাওয়ার সময় সেই চাকরিকেই জীবনের একমাত্র অবলম্বন ভেবে থাকেন। এটি না হলে সব-ই শেষ। এই দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। এটা চিরন্তন সত্য যে, এমন চাকরি আরও আছে এবং সেখানে আবেদনের মাধ্যমে চাকরি পাওয়ার অজস্র সম্ভাবনা আছে। প্রতিটি মতবাদেরই একটা উৎকৃষ্ট বিকল্প আছে। কতটুকু কোম্পানির প্রিয়পাত্র হওয়া যাবে তার পরিবর্তে চিন্তা করতে হবে কোম্পানিটি একটি নির্ভরযোগ্য চাকরির জন্য কতটা উপযুক্ত। সুতরাং, নিয়োগকর্তারা ঠিক যেভাবে সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে প্রার্থীকে যাচাই করছেন, একইভাবে প্রার্থীরও পূর্ণ অধিকার আছে কোম্পানীকে যাচাই করা।

যেকোনো প্রত্যাখ্যান স্বাভাবিক ভাবেই মনোক্ষুন্ন অভিজ্ঞতার জন্ম দেয়। প্রকৃতপক্ষে মস্তিষ্কে কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিন নিঃসরণের জন্যও এই প্রত্যাখ্যাত হওয়া অভিজ্ঞতার ভূমিকা আছে। তাই মস্তিষ্ককে বুঝতে দিতে হবে যে, এই চাকরিটিই জীবনধারনের শেষ অবলম্বন নয়। এখানে চাকরিটা হয়ে গেলে হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। তাই আরও উত্তম সুযোগ অপেক্ষা করছে বিধায় এই প্রত্যাখ্যানের ঘটনাটি ঘটেছে।

সাক্ষাৎকারের নির্ধারিত সময়ের আগেই পৌঁছানো

যেকোনো পরীক্ষা বা সাক্ষাৎকারের জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখতে এটি একটি সাধারণ উপায়। সাধারণ লেনদেনের ক্ষেত্রেও ঠিক আগমুহূর্তে পৌঁছা ঠিক নয়। এতে বিভিন্ন ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। তাই এক্ষেত্রেও অস্থিরতাকে পাশ কাটানোর জন্য যথেষ্ট সময় নিয়ে বাসা থেকে ইন্টারভিউয়ের উদ্দেশ্যে বের হতে হবে। এতে দৌড়ে ইন্টারভিউ রুমে প্রবেশ করার অবস্থার সৃষ্টি হবে না। এ অবস্থায় শুধু যে নিয়োগকর্তারাই বিরক্ত হন তা নয়, চাকরিপ্রার্থীর নিজেরও স্বাভাবিক হতে বেশ বেগ পেতে হয়।

আর সাক্ষাৎকারের ওয়েটিং রুমে আগে যেয়ে বসে থাকার অনেক সুবিধা আছে। এ সময় বাইরের যানজট পেরিয়ে আসার অস্থিরতা কমানো এবং ওয়াশ রুমে যেয়ে বাইরের ধুলো-বালি ধুয়ে পরিষ্কার হয়ে নেওয়া যায়। কাপড়ের কোথাও কোন অসংলগ্নতা থাকলেও তাও ঠিক করে নেয়া যায়। ফলে একদম ফ্রেশ অবস্থায় হাজির হওয়া যায় নিয়োগকর্তাদের সামনে। 

এছাড়া পুরো সাক্ষাৎকার নিয়ে পূর্ব পরিকল্পনাগুলো আরও একবার ঝালিয়ে নেয়ার জন্য এই নির্ধারিত সময়ের আগে পৌঁছানোর কোনো বিকল্প নেই। আর কোম্পানির অফিসের এলাকাটি যদি আগে থেকে পরিচিত না থাকে তাহলে তো এ বিষয়টি একদম বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়ায়।

চাকরির সাক্ষাৎকারের আগে নিজের শান্ত রাখার উপায়গুলোর সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে এগুলোর অনুশীলন করা প্রয়োজন। এটি আসলে রাতারাতি সম্ভব নয়। যারা প্রথম সাক্ষাৎকার দিতে যাচ্ছেন তারাও বিষয়টি রপ্ত করতে পারেন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ার দিনগুলো থেকেই। ধৈর্য্য ধরে একটি কাজের পুনরাবৃত্তি করাও একটি দক্ষতা, যা সেই কাজে ধৈয্যধারীকে আরও নিখুঁত করে তোলে। 

এই অনুশীলনের পাশাপাশি প্রয়োজন হবে নেতিবাচক চিন্তাকে পরিহার করা। কেননা নেতিবাচক চিন্তা চূড়ান্ত অবস্থায় যেকোনো চেষ্টাকে নষ্ট করে দিতে পারে। তাই উদ্দেশ্য হাসিলে নিজেকে অনুপ্রাণিত করা শিখতে হবে। একজন মানুষের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা সে নিজেই। একজন চাকরিপ্রার্থী যখন নিজেকে অনুপ্রাণিত করে পুরো সাক্ষাৎকারের পূর্বপরিকল্পনা করতে পারেন, তখন চাকরি পাওয়ার প্রচেষ্টা অর্ধেক সম্পন্ন হয়ে যায়। বাকিটা নির্ভর করে সেই পরিকল্পনাটা বাস্তবায়নের ওপর।

About

Popular Links