Saturday, May 18, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

নিঝুমদ্বীপের চেওয়া উৎসব

মাছের মৌসুমে এই দ্বীপে যেন উৎসব লেগেই থাকে। তবে উৎসবের পাশাপাশি রয়েছে উদ্বেগও

আপডেট : ০৩ মার্চ ২০২৩, ০৫:২১ পিএম

উৎসবের দেশ বাংলাদেশ। এদেশের বৈচিত্র্যময় ছয় ঋতুর প্রতিটি নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে অনন্য। প্রতিটি ঋতুই মেতে ওঠে কোনো না কোনো উৎসবে। পরিচিত উৎসবগুলোর মধ্যে রয়েছে পহেলা বৈশাখ, ঈদ, দুর্গা পূজা, বড়দিন এবং বিজু। চেওয়া উৎসব এমন কোনো পরিচিত উৎসব না হলেও শীতকালে উপকূলীয় অঞ্চলে চেওয়া মাছ ধরার সময়ে মনে হয় যেন উৎসব এবং এই উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নিঝুমদ্বীপের হাজারো মানুষের আশা-আনন্দ।

প্রতি বছর নিঝুমদ্বীপসহ উপকূলীয় অঞ্চলে ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত চলে এই উৎসব। এই সময় যেসব জেলেদের বাড়িতে চলে প্রস্তুতি আয়োজন, উঠানে সবাই জাল মেরামতে ব্যস্ত থাকে, আর যেখানে মাছ শুকানো হয় সেখানে ছোট ঘর তৈরি করে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র রাখে। মাছ বেশি ধরা পরলে রাতেই ফিরতে হয় মাছ রাখার জন্য। নিঝুমদ্বীপ বাংলাদেশের নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলার একেবারে দক্ষিণ-পশ্চিমে ছোট-বড় প্রায় ১১টি দ্বীপ নিয়ে একটি ইউনিয়ন। প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর নিঝুমদ্বীপ নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি। দ্বীপটিকে ঘিরে রেখেছে সংরক্ষিত ম্যানগ্রোভ বন, একেবেঁকে যাওয়া সরু খাল। শুধু তাই নয়, নিঝুমদ্বীপ পরিযায়ী পাখির গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। এখানে শীতে বিভিন্ন প্রজাতির হাজারো পাখি দেখা যায়, দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত এবং নদী। নদী ও সাগরের মিলনস্থলে জেগে ওঠা দ্বীপে বাস করে হাজারো মানুষ। দ্বীপের মানুষের জীবিকার একটি বড় অংশ মাছ শিকারের ওপর নির্ভরশীল। এখানকার বেশিরভাগ মানুষ কৃষিজীবি হলেও তাদের আয়ের সিংহভাগই আসে মৎস্যখাত থেকে। এছাড়া কিছু মানুষ ম্যানগ্রোভ বন থেকে মধু সংগ্রহ করে জীবিকা অর্জন করে এবং ম্যানগ্রোভ বৃক্ষ ছাড়াও প্রত্যেক বাড়ির আশেপাশে রয়েছে দেশি গাছগাছালি। তবে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে খেজুর বাগান। ফলে শীতকালে এখানে খেজুর রসের প্রতুলতা থাকে এবং রস থেকে সুমিষ্ট গুড় তৈরি করা হয় বিক্রির জন্য। নিঝুমদ্বীপের মানুষের প্রধান পেশা কৃষি এবং ধানের খুবই ভালো ফলন দেখা যায় এই দ্বীপে। মজার ব্যাপার হলো, একসময় এই দ্বীপের মানুষ প্রকৃতিতে আপনি বেড়ে ওঠা উড়ি ধানের ভাত খেয়ে জীবনধারণ করত।

বেহুন্দী জাল সাগরে ফেলার পূর্ব মুহূর্ত/সৌজন্য ছবি
মোহনার কারণে নিঝুমদ্বীপ সংলগ্ন জলাভূমিগুলো দুই ধরনের পানিতে বসবাসকারী নানান প্রজাতির মাছের একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল। মিঠা ও লোনা পানির মাছের বেঁচে থাকার স্বার্থে একে অন্যের আবাসস্থল ব্যবহার করতে হয়। নদী দূষণের কারণে মিঠা পানির বিপদাপন্ন মাছ আশ্রয় নিয়েছে মোহনাতে। দ্বীপের মিঠা পানির মাছের মধ্যে পাঙাশ, বোয়াল, চিতল, পাবদা, শিং, কই, ভেদা, ফলি এবং লোনা পানির ইলিশ, রিঠা, কোড়াল, পোয়া, খল্লা বাটা, ফাসা, কাইন মাগুড় উল্লেখযোগ্য।

বছরে মাছ আহরণের নির্দিষ্ট কিছু সময় আছে এবং সেই সময়ে জেলেরা জাল তৈরি ও মাছ ধরা নিয়ে অনেক ব্যস্ত থাকেন। মাছভেদে জালের ভিন্নতা রয়েছে। মাছের মৌসুমে এই দ্বীপে যেন উৎসব লেগেই থাকে। তবে উৎসবের পাশাপাশি রয়েছে উদ্বেগও। কারণ জেলেরা দ্বীপ থেকে নৌকা নিয়ে প্রায় ১০০-১৫০ কিলোমিটার দূরে সাগরে এক অনিশ্চয়তার মাঝে মাছ ধরতে যায়। 

নিঝুমদ্বীপে সবচেয়ে বেশি ধরা পড়ে ইলিশ। এতে অবশ্য সাধারণ মানুষের চেয়ে মহাজনদের আনন্দই বেশি। সাধারণ মানুষের আনন্দ চোখে পড়ে চেওয়া উৎসবের সময়। কারণ এই সময় মহাজনের কাছে দেনার চিন্তা মাথায় থাকে না।

নৌকা থেকে নামানোর পর চেওয়া মাছ/সৌজন্য ছবি

এখন কি আর বুঝতে বাকি আছে চেওয়া উৎসব কী! চেওয়া লোনা পানির একটি সুস্বাদু মাছ। নিঝুমদ্বীপে তিন প্রজাতির চেওয়া মাছ পাওয়া যায়। তবে লাল চেওয়াই বেশি ধরা পড়ে। এই মাছটি সারা বছর পাওয়া গেলেও শীতের মৌসুমে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। এই বেশির পরিমাণ এতই যে, সারারাত মাছ ধরার পরে মাঝে মাঝে সকালে সেগুলো তীরে আনার জন্য প্রয়োজন হয় বাড়তি খালি নৌকা। 

চেওয়া মাছ ধরা হয় বেহুন্দী নামে এক ধরনের জাল দিয়ে। প্রতি নৌকায় ৮-১০ জন মানুষের একটি দল থাকে।

মৌসুমে সবাই নৌকা, জাল এবং রান্নার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে দুপুরের পরেই দ্বীপ থেকে প্রায় ৫০-৬০ কিলোমিটার দূরে সাগরে জাল ফেলতে যায়। জাল ফেলে উজানের জন্য ৩-৪ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। তবে জেলেরা প্রতিদিন চেওয়া মাছ ধরতে সাগরে যান না, প্রতি অমাবস্যা এবং পূর্ণিমায় ভরা ও মরা কাটালে এই মাছ ধরা হয়। কাটাল সাধারণত ৪-৫ দিন ধরে চলতে থাকে এবং মাঝিরা তখন একটানা মাছ ধরেন। প্রতিদিন একই সময়ে তারা সাগরে যান এবং পরের দিন দুপুরের আগে মাছভর্তি নৌকা নিয়ে ফিরে আসেন সেগুলো শুকানোর জন্য।

নিঝুমদ্বীপে থাকাকালীন সময়ে আমার একবার সৌভাগ্য হয়েছিল দ্বীপ থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে জেলেদের সঙ্গে রাত্রিযাপনের। প্রায় ৫ ঘণ্টা নৌকা চলার পর আমরা নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছাই। ওই জায়গায় আগে থেকেই ছোট খুঁটির সঙ্গে দড়ি দিয়ে প্লাস্টিকের একটা বড় জার বেঁধে মাটিতে পুঁতে রাখা হয়েছিল। চেওয়া মাছ শিকার প্রক্রিয়ার সবচেয়ে কঠিন কাজটি হচ্ছে পানির ১০-১৫ফিট গভীরে বাঁশের খুঁটি পোঁতা। মূলত জারের সঙ্গে জালগুলো বেঁধে দেওয়া হয় জোয়ারের সময়। ভাটা শুরু হলেই মাছ আহরণের জন্য জাল তোলা হয় । জাল তুলে মাছগুলো একটি বাঁশের তৈরি খাঁচিতে পরিষ্কার করার জন্য ঢালা হয়। মাছ ঢালার পর যে ভয়ানক কাজটি করতে হয় তাহল মাছের সঙ্গে উঠে আসা সামুদ্রিক সাপগুলো হাত দিয়ে সাবধানে পানিতে ফেলে দেওয়া। কারণ সামুদ্রিক সাপ মারাত্মক বিষাক্ত।

শুঁটকি চেওয়া/সৌজন্য ছবি

মাঝিরা দল পূর্ণ করার জন্য মাঝে মাঝে ২-৩ জন শ্রমিক ভাড়া করে থাকে। নৌকা থেকে বিষাক্ত সাপগুলো অপসারণের দায়িত্বটা মূলত এই ভাড়াটে শ্রমিকদের ওপরেই বর্তায়।  কাটালের সময় জেলেরা রাতে দুইবার জোয়ার পায়, একবার মধ্যরাতে এবং পরেরবার ভোররাতে।

ভোররাতে জাল টান দিয়ে মাছসহ তীরের দিকে রওনা হতে হয়। কারণ দেরি হয়ে গেলে মাছগুলো পচতে থাকে আর পচা মাছে শুঁটকির মান ভালো হয় না। 

তীরে ফিরে প্রথম কাজ হলো মাছগুলো যত দ্রুত সম্ভব রোদে শুকাতে দেওয়া। নৌকা ফেরার পর মাঝির দল এবং তীরে অপেক্ষারত বাড়ির লোকজন মিলে মাছগুলো দ্রুত নামিয়ে রোদে শুকাতে দেয়। 

যেখানে মাছ নামানো হয় সেখানে গ্রামের ছোট বাচ্চা থেকে শুরু করে অনেকেই আসে কাঁচা মাছ সংগ্রহ করতে। এই কাঁচা মাছগুলো তারা বাড়িতে নিয়ে সারা বছরের জন্য শুঁটকি করে রাখে। রোদ ভালো থাকলে দুই দিনেই মাছ শুকিয়ে যায়। শুকনো অবস্থায় মাছ বৃষ্টিতে ভিজে গেলে শুঁটকির মান খারাপ হয়। স্বাভাবিকভাবেই সেগুলো কম দামে বিক্রি হয়। মৌসুমে দ্বীপের প্রায় ৩-৪ হাজার মানুষ চেওয়া মাছ শিকারে ব্যস্ত থাকে।    

মাছ শুকানো হলে এইভাবে গাঁদি করে প্লাস্টিকের কাগজ দিয়ে বিক্রির আগ পর্যন্ত ঢেকে রাখা হয়। এর মধ্যে শুঁটকি বেচাবিক্রি শুরু হয়ে যায়। নোয়াখালী এবং হাতিয়াসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে মহাজনেরা শুঁটকি কিনতে আসে নিঝুমদ্বীপে। মৌসুমে প্রতিমণ চেওয়া শুঁটকি প্রায় ১৬০০-২০০০ টাকা দরে বিক্রি হয়।

বিক্রির জন্য শুটকি চেওয়া ওজন দিয়ে প্যাকেট করা হচ্ছে/সৌজন্য ছবি

একেকটি নৌকায় মৌসুমে প্রায় ৫-৬ লাখ টাকার মাছ ধরা পড়ে। নৌকায় দশজনের দল থাকলে প্রত্যেকে গড়ে ৫০-৬০ হাজার টাকা করে পায়। মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই প্রত্যেক মাঝির দলকে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা খাটাতে হয় জাল তৈরি এবং নৌকা মেরামতে।   

নোয়াখালীর বাইরের মানুষ চেওয়া শুঁটকির সঙ্গে পরিচিত থাকলেও কাঁচা চেওয়া মাছের সঙ্গে তেমন একটা পরিচিত না। এই মাছ ভাজা খেতে খুবই সুস্বাদু। তবে দ্বীপের হোটেলগুলোতে সারা বছরই চেওয়া মাছের তরকারি পাওয়া যায়।

বেহুন্দী নামের যে জাল দিয়ে চেওয়া মাছ শিকার করা হয় তা ডলফিনের জন্য ক্ষতিকর বলে সরকারিভাবে নিষিদ্ধ। কিন্তু বিকল্প না থাকায় জেলেরা বেহুন্দী জালই ব্যবহার করতে বাধ্য হয়। শীতকালে অন্যান্য মাছ কম ধরা পড়ার কারণে চেওয়া মাছ বিক্রির টাকা দিয়ে জেলেরা শীত মৌসুমে সংসার এবং কৃষিজমির ব্যয় মেটায়।

জাল বসানোর পর মাছ শিকারে গাঙচিলের নৃত্য/সৌজন্য ছবি

প্রাকৃতিক সম্পদের আঁধার নিঝুমদ্বীপকে রক্ষা করতে হলে দ্বীপের মানুষের জীবিকার সুরক্ষা দরকার। উপকূলীয় এ দ্বীপের মানুষকে প্রতিনিয়ত প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে বাঁচতে হয়। দ্বীপের মৎস্য সম্পদ দেশেরই সম্পদ। মৌসুমে উপজেলা মৎস্য অধিদপ্তর এবং কোস্ট গার্ডের যৌথ অভিযানে অনেক বেহুন্দী জাল কাটা পড়ে। ফলে অনেক জেলেই আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় যার প্রভাব পড়ে আবার বনের ওপর। মৎস্য অধিদপ্তর এই মাছ ধরার নতুন কোনো জাল উদ্ভাবন এবং সরবরাহ করলে জেলেরাও ভালো থাকবে এবং জলজ বন্যপ্রাণীরও ক্ষতি হবে না। 

জেলেরা শুঁটকি প্রস্তুতিতে খুব বেশি সচেতন না। শুঁটকি প্রস্তুতি ও সংরক্ষণে তাদের দক্ষ করে তোলা গেলে মাছের অপচয় কমে আসবে এবং মানসম্মত চেওয়া শুঁটকি সারাদেশের মানুষ খেতে পারবে। নিঝুমদ্বীপের চেওয়া উৎসব বেঁচে থাক এবং দ্বীপের মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত হোক।


সমীর সাহা, এম ফিল শিক্ষার্থী, প্রাণীবিদ্যা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়



About

Popular Links