Saturday, June 22, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

সুবিধাবঞ্চিত কিশোরীদের জন্য মাসিক যেন এক আপদ

পুষ্টিকর খাবারের পাশাপাশি মাসিকের সময় স্যানিটারি প্যাডের ব্যবহার খুবই গুরুত্বপূর্ণ  

আপডেট : ২৪ মে ২০২৩, ১১:০৬ এএম

বয়ঃসন্ধিকাল মানুষের শরীরে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন নিয়ে আসে। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে এ সময়টি বেশ সংবেদনশীল। মেয়েদের এ সময় পিরিয়ড অর্থাৎ মাসিক ঋতুচক্র শুরু হয়। এই প্রক্রিয়া একজন নারীকে মা হওয়ার জন্য প্রস্তুত করে।

মেয়েদের পিরিয়ড শুরু হতে পারে ৮ থেকে ১৩ বছরের মধ্যে। এমন পরিস্থতিতে সাধারণত মেয়েদের শারীরিক অনেক সমস্যা হয় যেমন শারীরিক দুর্বলতা, তলপেট ব্যথা, বমি ভাব ইত্যাদি। একটা নির্দিষ্ট বয়সের পর প্রত্যেক মেয়ের জীবনেই এটি হয়ে থাকে স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক নিয়মে। প্রথম মাসিকের অভিজ্ঞতা হবার পর থেকে, ধীরে ধীরে মাসিক মেয়েদের জীবনের একটা অংশ হয়ে যায়। তবে প্রথমদিনগুলোর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া বেশ কঠিন ।

সাধারণত এমন সময় মেয়েদের বাড়ির বাইরে যেতে ভালো লাগে না। বিশ্রাম এবং পুষ্টিকর খাবার খেতে পারলে মাসিক ঋতুচক্রকালীন শারীরিক দুর্বলতা দ্রুত কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।

উল্লিখিত পরিস্থিতি নারীদের স্বাভাবিক জীবনযাপনের অংশ। কিন্তু বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সুবিধাবঞ্চিত শিশু রয়েছে যারা মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। মাসিক ঋতুচক্রেরে সময় এই শ্রেণির কিশোরীদের কেমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তা বোঝার চেষ্টা করেছে ঢাকা ট্রিবিউন।

“আমি রাস্তায় থাকি এবং এমন সময় আমি কাপড় ব্যবহার করি। আগের দিনগুলাই ভালো ছিল যখন এগুলা (পিরিয়ড) হতো না। মাঝে মাঝে প্রচুর রক্ত যায় তখন খুব দুর্বল লাগে। এসব দিনে খুব কষ্ট হয়। কাজ করতে ভালো লাগে না, তবুও করতে হয়। কাজ না করলে কী খাব?”

এমনটাই বলছিল ১২ বছর বয়সী সুরমা। তার সঙ্গে দেখা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায়। সেখানে ফুল বিক্রি করে জীবন চলে সুরমার। পিতৃহারা এই কিশোরী মায়ের সঙ্গে টিএসসি এলাকার ফুটপাতে থাকে।

সুরমা জানায়, মাসিকের দিনগুলোতে সে কাজ করতে পারে না। তাই রোজগাড়ও হয় না। টাকা না থাকায় ওইদিনগুলো সে ঠিকমতো খেতেও পারে না।

বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের শতকরা প্রায় ৪২% নারীর রক্তে আয়রনের ঘাটতি আছে, যা অ্যানিমিয়ার লক্ষণ। মাসিকের সময় যাদের অনেক বেশি রক্তপাত হয়, তাদের অ্যানিমিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।

এ বিষয়ে গায়নোকোলজিস্ট ডা. শাম্মা এ জাহান বলেন, “মাসিকের সময় রক্তপাতের কারণে রক্তসল্পতা দেখা দিতে পারে। রক্তস্বল্পতায় বেশি বেশি আয়রন জাতীয় খাবার খাওয়া প্রয়োজন। এছাড়া লাল ফল যেমন বেদানা খেলে রক্তস্বল্পতা দূর হয়।”

পুষ্টিকর খাবারের পাশাপাশি মাসিকের সময় স্যানিটারি প্যাডের ব্যবহার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্যাডের পরিবর্তে ন্যাকড়ার ব্যবহার বিভিন্ন ধরনের সংক্রামক রোগের কারণ হতে পারে।

“আমার তো খাবার কেনারই টাকা থাকে না। প্যাড কীভাবে কিনব? এসব (মাসিক) সময়ে খুব ক্ষুধা পায়, কিন্তু টাকার অভাবে পরিমাণমতো খাবার পাই না। মাসিক যে কেন হয়....,” বলছিল হাজারীবাগের একটি বস্তিতে থাকা ১৫ বছর বয়সী আমেনা।  

ডা. শাম্মা এ জাহান বলেন, “ন্যাকড়া বা কাপড় ঠিকমতো পরিষ্কার না করলে সংক্রামক যৌনরোগ হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। সারভিসাইটিস, লিউকোরিয়য়া, ইউটিআই (প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া) এসব রোগের ঝুঁকি থাকে মাসিকের সময় অপরিষ্কার কাপড় ব্যবহারে।”

এই চিকিৎসক জানান, যেসব মেয়েরা ফুটপাতে বা খোলা জায়গায় থাকে তাদের কিছু লোকাল ইনফেকশন হতে পারে। এসব রোগ থেকে তাদের প্রজননজনিত  সমস্যাও হতে পারে। এছাড়া প্রস্রাবে জ্বালাপোড়ার সমস্যা থেকে তাদের কিডনিতে সমস্যা হতে পারে।

রাজধানী ঢাকার বস্তিগুলোতে পরিচালিত এক জরিপে উঠে এসেছে, বস্তিতে থাকা ৯৫% প্রাপ্তবয়স্ক নারী এবং ৯০% কিশোরী মাসিকের সময় ঠিকমতো পরিষ্কার না করে কাপড় ব্যবহার করেন।

“অ্যাওয়ারনেস অ্যাবাউট মেন্সট্রুয়াল হাইজিন ম্যানেজমেন্ট ইন বাংলাদেশ অ্যান্ড পসিবিলিটিস অব মিডিয়া ইন্টারভেনশন: ইউজিং আ ন্যাশনওয়াইড ক্রস সেকশনাল সার্ভে” শীর্ষক জরিপের ফলাফলে বলা হয়, এসব কারণে অনেক নারী মূত্রনালীর সংক্রমণ এবং গর্ভকালীন জটিলতায় ভোগেন। নিম্নমানের কাপড়ের ক্ষতিকর রং নারীদের জননাঙ্গের জন্য ক্ষতিকর।

এ বিষয়ে বেসরকারি সংস্থা উত্তরণের প্রোগ্রাম ডেভলপমেন্ট স্পেশালিস্ট জাহিদ আমিন বলেন, “জরায়ু খুবই সংবেদনশীল একটি অঙ্গ। অবহেলার কারণে এই অঙ্গে বিভিন্ন সমস্যা হতে পারে। যেসব নারীরা রাস্তাঘাটে থাকে এবং মাসিকের সময় কাপড় ব্যবহার করে তাদের জরায়ুর সমস্যা হওয়াটা স্বাভাবিক। তারা এ কাপড়গুলো ধুয়ে ঠিকমতো শুকাতে পারে না, এ থেকে জন্ম নেয় বিভিন্ন রোগবালাই।”

তিনি মনে করেন, স্যানিটারি প্যাড আরও সহজলভ্য করতে হবে। এটিকে পাড়ায় পাড়ায়, এলাকায় এলাকায় ছড়িয়ে দিতে হবে যাতে এটি সব পর্যায়ের নারীরা পেতে পারে। সরকার ইতোমধ্যে বিভিন্নভাবে বিনামূল্যে স্যানিটারি প্যাড সরবরাহ করছে। তবে এর বিস্তার আরও বাড়াতে হবে। বিভিন্ন এনজিও গ্রামের নারীদের দিয়ে স্যানিটারি প্যাড তৈরি করে।

নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্যের উন্নয়নে সবাই মিলে এ প্রযুক্তিকে আরও উন্নত করার চেষ্টা করতে হবে বলেও মত দেন তিনি।

About

Popular Links