Thursday, May 23, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে বাংলাদেশি তরুণ এখন রোবট নির্মাতা

লাবিব তাজওয়ার রহমান, বাংলাদেশি “সেলফ ড্রাইভিং” বা স্বয়ংক্রিয় রোবট নির্মাতা হিসেবেই বর্তমানে সুপরিচিত। সিওল ভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানে “খাদ্য-বিতরণ” রোবট তৈরি করার আগে লাবিব বাংলাদেশে “ইনক্লুশনএক্স” নামে একটি প্রতিবন্ধী অন্তর্ভুক্তি এবং মানসিক স্বাস্থ্য সেবা সংস্থাও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষাজীবন সম্পন্ন করার পাশাপাশি স্ট্যানফোর্ড হিউম্যান-কম্পিউটার ইন্টারঅ্যাকশন গ্রুপ, এসএলএসি ন্যাশনাল এক্সিলারেটর ল্যাবরেটরি, স্ট্যানফোর্ড স্কুল অব মেডিসিন এবং সার্ন-এ গবেষণক পদেও কাজ করেছিলেন লাবিব। তিনি স্ট্যানফোর্ড ফিজিক্স সোসাইটির সঙ্গেও জড়িত ছিলেন এবং বর্তমানে সেখানে সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

ঢাকা ট্রিবিউনের জিসান বিন লিয়াকত-এর সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে ইনক্লুশনএক্স শুরু করার পেছনে অনুপ্রেরণা, কারিগরি উদ্যোক্তা জগতে যাত্রা এবং কীভাবে তার ভাই এই যাত্রার শুরু করেছিলেন সে সম্পর্কে কথা বলেছেন লাবিব তাজওয়ার রহমান- 

আপডেট : ২০ অক্টোবর ২০২১, ০৯:২৮ পিএম

ঢাকা ট্রিবিউন: আপনার উদ্যোক্তা হওয়ার যাত্রা কীভাবে শুরু হয়েছিল?

লাবিব: আমার উদ্যোক্তা হওয়ার যাত্রা শুরু হয়েছিল আমার বড় ভাই অর্ণবকে ঘিরে। যিনি জন্ম থেকে “সেরিব্রাল পালসি”-তে আক্রান্ত ছিলেন। ২০০৯ সালে ভাইয়া খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। সে বছর প্রথমবার আমার পরিবার আমার জন্মদিন পালন করেনি। পরের দিন আমি খুব রেগে গেলাম। আমি আমার মাকে খুঁজতে আমার ভাইয়ের ঘরে গেলাম। কাঁদতে কাঁদতে আমি মাকে বললাম, “যদি আমি অসুস্থ হতাম তাহলেই ভালো হতো। কারণ তখন তুমি আমার দিকেও একটু খেয়াল রাখতে।” কথাটা বলেই আমি রাগ করে ঘর থেকে বেরিয়ে যাই। আর এ ঘটনার এক ঘণ্টা পরেই আমার ভাই আমাদের ছেড়ে চিরদিনের মতো চলে গেলেন। 

দু সপ্তাহ পর স্কুলে গেলে আমার এক বন্ধু আমাকে বলে, “লাবিব, তোমার অপূরণীয় ক্ষতির জন্য আমি খুবই দুঃখিত। কিন্তু অনেকেই বলছে তোমার ভাই নাকি পাগল ছিল। এটা কি সত্যি?” 

আমি অনেক বড় আঘাত পেয়েছিলাম। আমি আমার সব বন্ধু এবং সহপাঠীদের চিৎকার করে বলতে চেয়েছিলাম, “আমার ভাই ‘পাগল’ ছিল না। সে আমার ভাই ছিল। আর আমার ভাই শুধুমাত্র প্রতিবন্ধী ছিল।”

সেদিন থেকেই আমি আমার বন্ধুদের প্রতিবন্ধিতা বিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে চেয়েছিলাম। সেই কথা মাথায় রেখে ২০১৫ সালে ইনক্লুশনএক্স-এর যাত্রা শুরু হয়েছিল। গত বছরে যা একটি সংগঠন হয়ে উঠেছে এবং হাজার হাজার মানুষকে সেবা দিয়েছে এবং বছরের পর বছর হাজার প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও আমরা বাস্তবতার পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি। যা সম্ভবত অন্যথায় ঘটত না।

আমরা বুঝতে পেরেছি, পদ্ধতিগত পরিবর্তন তখনই সম্ভব যখন কারও অনুমতি বা সম্পদের কথা বিবেচনা না করেই মানুষ তা অনুসরণের জন্য অনুপ্রাণিত হয়।

ঢাকা ট্রিবিউন: ইনক্লুশনএক্স কী এবং কীভাবে এটি সামাজিক অন্তর্ভুক্তিতে সহায়তা করছে?

লাবিব: ইনক্লুশনএক্স বাংলাদেশের একটি প্রতিবন্ধী অন্তর্ভুক্তি এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সংস্থা। আমাদের প্রোগ্রাম ও পরিষেবাগুলো ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষ ব্যবহার করেছে এবং অনলাইন এখন পর্যন্ত ৫০ লাখেরও বেশি লোক আমাদের কন্টেন্ট দেখেছে।

ইনক্লুশনএক্স-এর দীর্ঘকালীন প্রোগ্রামগুলোর মধ্যে একটি “জয় অব কম্পিউটিং (জিওসি)” যা গত ছয় বছর ধরে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল বিভাজন দূরীকরণে কাজ করে আসছে। আমরা বহুমুখী পদ্ধতি ব্যবহার করে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের হাসি-আনন্দের মাধ্যমে কম্পিউটার অ্যানিমেশন এবং থ্রিডি-মডেলিংয়ে দক্ষ করে তুলতে সক্ষম হয়েছি।

আমরা ২০০টিরও বেশি কম্পিউটার বিজ্ঞান শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিয়েছি যারা জিওসি শিক্ষার্থীদের শিক্ষায় সহায়তা করতে সক্ষম। এছাড়া, কোভিড-১৯ মহামারিতেও শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে বিভিন্ন ধরনের সরঞ্জাম ব্যবহার করেছি।

প্রতি বছর ইনক্লুশনএক্স জাতীয় বা সাংস্কৃতিক দিবসগুলোতে অন্তর্ভুক্তিমূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থেকে। এ বছর আমরা প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের পারফরম্যান্সের পাঁচটি ভিডিও তৈরি করেছি এবং সেগুলো ৬০ লাখেরও বেশি মানুষ ইতোমধ্যে অনলাইনে দেখেছে। আমাদের শিক্ষার্থীদের প্রতিভা এত বিশাল আকারে উদযাপন করা ইনক্লুশনএক্স দলের জন্য একটি আবেগঘন মুহূর্ত ছিল।

আমরা ইনক্লুশনএক্স-এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জন্য একটি সাশ্রয়ী মূল্যের মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবাও চালু করেছি। যেখানে কোনো শিক্ষার্থীকে খুব কম খরচে মনোচিকিৎসকের সঙ্গে সংযুক্ত করে দেওয়া হচ্ছে।

এছাড়া, শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসা প্রশিক্ষণের ধারাবাহিকতায়, আমরা “স্টুডেস্টস আস্ক আ সাইকিয়াট্রিস্ট” (#studentsaskapsychiatrist) নামে বছরব্যাপী একটি ওয়েব সিরিজও চালু করেছি। দেশের শীর্ষস্থানীয় সাইকিয়াট্রিস্টরা ছোট ছোট ভিডিওর মাধ্যমে ছাত্র-বান্ধব পদ্ধতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর দেবেন সেখানে।

এই সিরিজটি ডিজিটালভাবে বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারতের বিভিন্ন স্কুলেও বিতরণ করা হচ্ছে এবং ইতোমধ্যে ৫ লাখেরও বেশি মানুষ ভিডিওগুলো দেখেছে।

আমি স্ট্যানফোর্ড ডিসেবিলিটি ল্যাঙ্গুয়েজ গাইডও (নির্দেশিকা) রচনা করেছি। এই নির্দেশিকাটি মেরিল্যান্ড ডিপার্টমেন্ট অব হেলথ, স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউশনের মতো সরকারি অফিসেও ব্যবহৃত হচ্ছে।

এমনকি মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ে যেমন টফটস ইউনিভার্সিটির প্রধান মেডিকেল সেন্টার, ওয়েস্টার্ন ইলিনয় ইউনিভার্সিটি, ফোর্ডহ্যাম ইউনিভার্সিটি এবং মন্টানা স্টেট-এ কোর্স রিডিং হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। 

ঢাকা ট্রিবিউন: অন্য কোনো প্রযুক্তির উন্নয়নে কাজ করছেন?

আমি অন্য যে বিষয়ে কাজ করছি তা হল নিউবিলিটি (Neubility)। এখানে আমরা ক্যামেরাভিত্তিক সেলফ-ড্রাইভিং রোবটিক্স প্রযুক্তির উন্নয়নে গবেষণা করছি।

ক্রমবর্ধমান ই-কমার্স মার্কেটের কারণে, কোরিয়ান ব্যবসায়ীদের জন্য লাস্ট-মাইল ডেলিভারির খরচ বজায় রাখা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে এবং তারা আরও দক্ষ বিকল্প খুঁজছে। বিশেষ করে অটোমেশন আকারে। আর এখানেই নিউবিলিটির যাত্রা শুরু।

আমার দলটি বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে আছে। ২০১৫ সালে অ্যান্ড্রু লি এবং চেওংহো চো-এর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। আমরা ফ্লোরিডার নাসা কেনেডি স্পেস সেন্টারে অনুষ্ঠিত কনরাড অ্যাওয়ার্ডে অংশ নিয়েছিলাম। আমরা সেরা ছয়ে ছিলাম এবং প্রতিযোগিতার সময় আমাদের বন্ধুত্ব হয়। প্রতিযোগিতার অনেক পরেও আমাদের যোগাযোগ ছিল। আমরা একসঙ্গে প্রযুক্তিগত প্রকপ্লের লাজ করতে পারি কি-না সে সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করছিলাম। অবশেষে, নিউবিলিটি আমাদের একত্রিত করেছে।

বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি টেলিকম থেকে অটোমোবাইল শিল্প পর্যন্ত বিভিন্ন শিল্প অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করতে পেরে আমরা কৃতজ্ঞ। সম্প্রতি বার্সেলোনায় অনুষ্ঠিত মোবাইল ওয়ার্ল্ড কংগ্রেসে (এমডব্লিউসি) শীর্ষস্থানীয় স্টার্ট-আপ হিসেবেও নিউবিলিটিকে উপস্থাপন করা হয়েছে।

ঢাকা ট্রিবিউন: আপনার ভবিষ্যত পরিকল্পনা কী?


লাবিব: আমার লক্ষ্য, আমি যেভাবে পৃথিবীকে পেয়েছি তার চেয়ে ১০০ গুণ ভালো অবস্থায় তাকে রেখে যাওয়া। যেকোনো ছোট পদ্ধতি গ্রহণ করে এবং ডিজিটাল, স্বচ্ছ এবং সবার জন্য সহজলভ্য করে, আমরা আমাদের পরের প্রজন্মের জন্য ভালো কিছু রেখে যেতে পারি।

আমি অন্যদের নিজের মতো করে জীবনযাপনে সাহায্য করতে চাই, যাতে আমরা যদি বুড়োও হয়ে যাই, তাও যেন মৃত্যুশয্যায় জেনে যেতে পারি পৃথিবী আগের চেয়েও অনেক সুখী।

ঢাকা ট্রিবিউন: বাংলাদেশি তরুণদের জন্য কোনো পরামর্শ আছে?

লাবিব: আমি “সবার জন্য এক উপদেশ” ধরনের পরামর্শ দিতে পছন্দ করি না। কিন্তু বাংলাদেশি হিসেবে আমার পরামর্শ “স্বাস্থ্য এবং শিক্ষা”র জন্য বিনিয়োগ করা প্রয়োজন। পৃথিবী আরও জটিল হচ্ছে, কিন্তু চারপাশের পৃথিবীকে আরও ভালোভাবে বুঝতে নতুন নতুন জ্ঞানও তৈরি হচ্ছে।

তাই কখনোই শেখা বন্ধ করা উচিত নয়। আমরা যদি নিজের এবং একে অপরের যত্ন নিই তাহলেই পৃথিবী আরও সুন্দর হয়ে উঠবে।

About

Popular Links