Tuesday, May 28, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস: একজন সালমা হক ও তার অন্তহীন যুদ্ধ

১৯৭১ সালের ১৫ নভেম্বর আল-বদর বাহিনীর সদস্যরা সালমা হকের স্বামী ডা. আজহারুল হককে তুলে নিয়ে যায়

আপডেট : ১৪ ডিসেম্বর ২০২১, ১২:১৫ পিএম

আর দশজন সাধারণ গৃহিণীর মতোই সাদাসিধে ছিল সৈয়দা সালমা হকের জীবন। রাজধানীর হাতিরপুলের ২২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের হাকিম হাউজে স্বামী ডা. আজহারুল হকের সঙ্গে চমৎকার জীবন কাটাচ্ছিলেন তিনি। দিন গুনছিলেন প্রথম সন্তানকে আহ্বানের।

কিন্তু ১৯৭১ সালের ১৫ নভেম্বর তার জীবনের গল্প চিরতরে বদলে যায়।

সালমা হকের স্বামী আজহারুল হক প্রতিভাবান ও প্রতিশ্রুতিশীল শল্যচিকিৎসক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তৎকালীন তরুণ এই চিকিৎসক একটি স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতেন, যে দেশে তার অনাগত সন্তান একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ পাবে।

সেই স্বপ্ন বাস্তয়নের লক্ষ্যেই আরেক চিকিৎসক হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে গোপনে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা দিতেন আজহারুল।

১৯৭১ সালের ১৫ নভেম্বর মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা দিতে আল-বদর বাহিনী ডা. আজহারুল হক ও ডা. হুমায়ুন কবিরকে তুলে নিয়ে যায়। পরদিন ১৬ নভেম্বর, ডা. আজহারুল হকের হাত-পা ও চোখ বাঁধা মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

১৯৭১ সালের আজকের (১৪ ডিসেম্বর) এই দিনে বাংলাদেশের প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সাংবাদিক, শিল্পী, শিক্ষক এবং অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে, টেনে-হিঁচড়ে বা চোখ বেঁধে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর নীলনকশার অংশ হিসেবে নির্মম অত্যাচারের পর নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় জাতির সূর্যসন্তানদের।

স্বামী ডা. আজহারুল হকের সঙ্গে সালমা হক সংগৃহীত

১৯৭১ সালের সেই দিনটির কথা স্মরণ করে সালমা হক জানান, ডা. আজহারুল হক ১৫ নভেম্বর খুব ভোরে হাসপাতালের উদ্দেশে বাড়ি থেকে বের হন, যদিও তিনি জানতেন তার আশেপাশের এলাকার লোকজন আল-বদর বাহিনীর সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল। আজহারুল হককে তুলে নিয়ে যাওয়ার অনেক পর এক প্রতিবেশীদের কাছ থেকে সালমা হক জানতে পারেন তার স্বামীকে কয়েকজন অজ্ঞাত লোক তুলে নিয়ে গেছেন।

ডা. আজহারুল হককে তুলে নেওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর চারজন সশস্ত্র ব্যক্তিসহ পাঁচজনের একটি দল সালমা হকের বাড়িতে আসে। তারা ডা. হুমায়ুন কবির সম্পর্কেও প্রশ্ন করে। তারা আজহারুল হক কোথায় তাও জানতে চায়।

সালমা হকের ধারণা, তার স্বামীকে সত্যিই তুলে নিয়ে গেছে কি-না পরীক্ষা করতেই তারা বাড়িতে এসেছিল।

“আমার একবার মনে হচ্ছিল তিনি হয়তো আর কখনও ফিরে আসবেন না। আবার মন বলছিল তিনি ফিরে আসবেন। পর দিনই নটরডেম কলেজের কাছে কালভার্টের নিচে ডা. হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে তার মরদেহও পাওয়া যায়,” ঢাকা ট্রিবিউনের সঙ্গে কথোপকথনের সময় সালমা হক বলেন।

পরে ডা. আজহারুল হকের মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে নিয়ে গেলে সেখানে উপস্থিত এক চিকিৎসক তাকে শনাক্ত করেন।

সালমা হক ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “সেদিনের স্মৃতি এখনও আমার চোখে ভাসে। সেই স্মৃতি এতোটাই পরিষ্কার যে ভাবলে এখনও বুকের মধ্যে মোচড় দিয়ে ওঠে।”

তিনি বলেন, “পাঁচজনের মধ্যে বেসবল ক্যাপ পরা লোকটি যাওয়ার আগে আমার দিকে ফিরে বলেছিল ‘কিছু মনে করবেন না’। তারপর অন্যদের দিকে তাকিয়ে রহস্যময় হাসি দিয়েছিল।”

“আমি নিজের ও আমার অনাগত সন্তানের কথা চিন্তা করে প্রচন্ড ভয় পেয়েছিলাম। কিন্তু তাদের বাংলায় কথা বলতে দেখে, আমি কিছুটা স্বস্তি পেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম তারা বাঙালি, তারা আমাদেরই একজন, আমাদের কোনো ক্ষতি করবে না। কিন্তু তারাই আমার সবকিছু কেড়ে নিয়েছে,” সালমা হক বলেন।

তাদের একমাত্র ছেলে নিশানের জন্ম হয় ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে, যুদ্ধবিধ্বস্ত স্বাধীন বাংলাদেশে। সেই থেকে সালমা হকের অন্তহীন লড়াইয়ের শুরু। সন্তান ও প্রয়াত স্বামীর স্মৃতিকে আঁকড়ে পুরো জীবন পার করছেন তিনি।

সালমা হক স্বামীর পেনশনও পাননি। কারণ, মৃত্যুর আগে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডা. আজহারুলের হকের চাকরির সবে মাত্র দুই বছর পূর্ণ হয়েছিল। তাই সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য প্রতিটি পয়সা হিসাব করে ব্যবহার করেছেন তিনি।

১৯৭৩ সালে সালমা হক এলিফ্যান্ট রোডে নামমাত্র ভাড়ায় তৎকালীন সরকারের দেওয়া বাড়িতে থাকতে শুরু করেন। এখন পর্যন্ত তিনি সেখানে বসবাস করছেন।

সালমা হক উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, স্থানীয় একটি গোষ্ঠী সম্পত্তি মালিকানা দাবি করে তাকে উচ্ছেদের চেষ্টা করছে। বর্তমানে সেই গোষ্ঠী ও সরকারের মধ্যে আইনি লড়াই চলছে।

“আমি একজন প্রাণবন্ত মানুষ ছিলাম। আমার স্বামীর মৃত্যু আমার হৃদয়ে এমন একটি শূন্যতা তৈরি করেছে যা কেউ কোনোদিনও পূরণ করতে পারবে না। আমি কখনোই তার জায়গায় অন্য কাউকে কল্পনা করতে পারিনি,” সালমা হক বলেন।

১৯৬৮ সালে বন্দুকের গুলিতে আহত সালমা হক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন, তখন তার সঙ্গে ডা. আজহারুল হকের পরিচয় হয়। সেখানেই তারা প্রেমে পড়েন।

ডা. আজহারুল হক বাংলাদেশের জন্য নিজের জীবন দিয়েছিলেন। বাংলাদেশের জন্ম তার মতো শত শহীদ বুদ্ধিজীবী, দেশ প্রেমিকদের আত্মত্যাগের কারণে। আমরা তাদের কাছে ঋণী।

About

Popular Links