Saturday, May 25, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

দেশের বৃহত্তম জলপ্রপাত তিনাপ সাইতারে

পানিপ্রবাহের দিক থেকে তিনাপ সাইতার বাংলাদেশের সব থেকে বড় জলপ্রপাত

আপডেট : ২১ জানুয়ারি ২০২৪, ০৬:২৪ পিএম

প্রকৃতি ও ভ্রমণপ্রেমীদের কাছে অন্যতম পছন্দের গন্তব্য জলপ্রপাত। আর এক্ষেত্রে পছন্দের তালিকায় এগিয়ে বান্দরবানের তিনাপ সাইতার জলপ্রপাত।

পানিপ্রবাহের দিক থেকে বাংলাদেশের বৃহত্তম জলপ্রপাত বান্দরবানের তিনাপ সাইতার যেন সেই নৈসর্গিক অবগাহনেরই নামান্তর।

তিনাপ সাইতার বম ভাষার দুটি শব্দ, যেখানে তিনাপ মানে নাকের সর্দি, আর সাইতার বলতে বোঝানো হচ্ছে ঝর্ণা বা জলপ্রপাত। এত সুন্দর একটি প্রস্রবণের এমন বিচিত্র নাম কেন রাখা হলো তা জানা যায়নি। তবে পাইন্দু খালের গহীনে লুকিয়ে থাকা অপার এই বুনো সৌন্দর্য্যকে স্থানীয়রা পাইন্দু সাইতার নামেও ডাকে।

তিনাপ সাইতারের অবস্থান

বান্দরবানের রোয়াংছড়ি উপজেলার অন্তর্গত পাইন্দু ইউনিয়নের পাইন্দু খালে অবস্থিত এই দানবাকৃতির জলপ্রপাত। এর সবচেয়ে কাছাকাছি লোকালয়ের নাম রনিন পাড়া, যেটি ঝর্ণা থেকে ১৩ কিলোমিটার দূরে।

তিনাপ সাইতার ভ্রমণের সেরা সময়

বর্ষাকালে বৃষ্টি যত বাড়তে থাকে এই জলপ্রপাত ততই আপন মহিমায় অধিষ্ঠিত হয়। তাছাড়া রৌদ্রোজ্বল দিনে এখানে পানির উপর রংধনুর খেলা দেখতে হলে বর্ষাকালই একমাত্র ভরসা। তাই অতি বৃষ্টির মৌসুম জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাস এই জলপ্রপাত দেখার সেরা সময়।

কিন্তু এর সঙ্গে দুর্গম পিচ্ছিল পাহাড়ি পথ আর কোমড় সমান পানির পাইন্দু খাল পেরোবার ধকল সামলাতে হবে। একদিকে মেঘলা রোদে ঘামে ভেজা শরীর, অন্যদিকে বৃষ্টির জন্য ঠাণ্ডা বাতাস। সেই সঙ্গে জোঁকের উৎপাতে শরীরকে টেনে নিয়ে চলাটা দায় হবে। তাই সাঁতার না জানলে পাইন্দু খাল অতিক্রমটা এড়িয়ে যেতে হবে।

যা দেখার আছে তিনাপ সাইতারে

এটি ট্রেকিং-এর জন্য সবচেয়ে কঠিন পথ। অর্থাৎ মনের প্রবল ইচ্ছাশক্তি এবং শারীরিক সহ্য ক্ষমতা সম্পন্ন ব্যক্তিরাই এর চ্যালেঞ্জগুলো গ্রহণ করতে পারবেন। কেপ্লং পাড়া, পাইখং পাড়া, রনিন পাড়া, এবং সবশেষে দেবাছড়া পাড়ার পর তিনাপ ঝর্ণা। এই পথ যেমন সুন্দর তেমনই কঠিন, যা পর্যটকদেরকে বিভ্রমে ফেলে দিতে পারে।

রনিনপাড়ায় পাহাড়ের উপরে আদিবাসিদের চালাঘর থেকে দূরে চোখে পড়বে ২,৯৪০ ফুট উচু সিপি আরসুয়াং। শীতের মৌসুমে দেখা যাবে এই চূড়ার আশেপাশের পাহাড়গুলো সব মেঘে ঢাকা।

দেবাছড়া পাড়া থেকে পাহাড়ি ছড়ায় নামার পর দুই পাশে জঙ্গলাকীর্ণ পাহাড়ের মাঝে চোখে পড়বে গয়ালের সারি। শ্যাওলা ভরা স্যাঁতস্যাঁতে এই পথটি স্বাপদসংকুলও বটে। হঠাৎ করে সাপ অথবা কাঁকড়া চোখে পড়াটাও বিচিত্র কিছু নয়।

শেষের দিকে পাইন্দু খালপথটি সবচেয়ে বেশি সুন্দর; সেই সঙ্গে বেশি বিপদের আশঙ্কাযুক্ত। বিভিন্ন পাহাড়ের আঁকা-বাকা পথ বেয়ে প্রায় ১৫০ ফুট উপর থেকে পড়ে তিনাপের ঝর্ণা। নিচের স্বচ্ছ পানিতে দেখা যায় স্রোতের তোড়ে ভেসে আসা গাছ এবং বিশালাকার সব পাথর। দু’পাশ ঘিরে খাড়া উপরের দিকে উঠে যাওয়া সবুজ পাহাড় জায়গাটিকে যেন প্রাকৃতিক এক স্নান ঘরে রূপ দিয়েছে।

স্রোতের মাঝের পাথরগুলোর যেকোনওটিতে দাড়িয়ে; এমনকি প্রপাতের ঠিক নিচে দাড়িয়েও গোসল করা যায় ঝর্ণার ঠাণ্ডা পানিতে। পড়ন্ত জলের প্রতিটি আঘাতে শরীরে বয়ে যাওয়া শিহরণ যাত্রাপথের সমূহ ক্লান্তি ভুলিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট

ঢাকা থেকে তিনাপ সাইতার যাওয়ার উপায়

ঢাকা থেকে বান্দরবানের রোয়াংছড়ি

ঢাকার কলাবাগান, ফকিরাপুল বা সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালগুলো থেকে বিভিন্ন বাস বান্দরবানের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। এগুলোর মধ্যে নন এসিগুলোর ভাড়া প্রতি ভাড়া ৮৫০ থেকে ৯০০ টাকা, আর এসিগুলোতে পড়বে ১,২০০ থেকে ১,৮০০ টাকা। এগুলো ৯ থেকে ১২ ঘণ্টার মধ্যে বান্দরবান সদরে নামিয়ে দেয়।

সদর থেকে ১৫ টাকা ভাড়ায় টমটমে করে রোয়াংছড়ি যাওয়ার বাসস্ট্যান্ডে যাওয়া যায়। সেখান  থেকে প্রতি ঘণ্টায় রোয়াংছড়ির বাস ছাড়ে। জনপ্রতি ভাড়া ৮০ টাকা এবং পৌঁছাতে সময় লাগে প্রায় দেড় ঘণ্টা।

এছাড়া বড় গ্রুপের জন্য গাড়ি রিজার্ভ নিয়েও যাত্রা শুরু করা যায়। সেক্ষেত্রে ১২ থেকে ১৪ জনের দলের জন্য গাড়ি ভাড়া পড়তে পারে ১,০০০ থেকে ১,২০০-এর মতো। এখানে আধ ঘণ্টা সময় বাঁচে।

রোয়াংছড়ি থেকে তিনাপ সাইতার

রোয়াংছড়ি নেমেই প্রথম কাজ হলো গাইড ঠিক করা। অতঃপর কতদিন থাকা হবে, কোথায় কোথায় যাওয়া হবে ইত্যাদি যাবতীয় পরিকল্পনা গাইডের সঙ্গে শেয়ার করতে হবে। এতে গাইড আগে থেকেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে পারবে।

এখান থেকে প্রথম গন্তব্যের নাম রনিন পাড়া। চান্দের গাড়ি রিজার্ভ নিলে খরচ পড়তে পারে ৪,০০০ থেকে ৫,৫০০ টাকা পর্যন্ত। চান্দের গাড়ি ২ থেকে আড়াই ঘণ্টার মধ্যে খাড়া এক পাহাড়ের কাছে নামিয়ে দেয়। তারপর সেখান থেকে আবার ঘণ্টাখানেক হাটার পথ।

এছাড়া রোয়াংছড়ি থেকে পায়ে হেটেও পুরোটা পথ আসা যায়। বিভিন্ন চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে রনিনপাড়া পৌঁছাতে ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা সময় লেগে যাবে।

রনিনপাড়া পৌঁছে বিশ্রাম নেওয়ার পরে কাজ হলো আর্মি ক্যাম্পে গিয়ে রিপোর্ট করা। এখানে গাইড অনেক সাহায্যে আসবে। বিশেষ করে আগে থেকে সবকিছু ঠিকঠাক করা থাকলে খুব কম সময়েই রিপোর্টিংয়ে যাবতীয় কাজ শেষ করা যায়।

রনিনপাড়া থেকে যতটা সম্ভব ভোরে যাত্রা শুরু করা উচিত। কেননা এখান থেকে তিনাপ জলপ্রপাত কমপক্ষে চার ঘণ্টার পথ। রনিনপাড়া থেকে পায়ে হেটে ঘণ্টা দেড়েক পর পৌছা যায় দেবাছড়াপাড়ায়। দেবাছড়া পাড়ায় পাহাড়ি ছড়া দিয়ে এগোতে হবে। এরপর রয়েছে ক্লান্তিকর পাহাড় হাইকিংয়ের পথ।

উঁচু পাহাড় থেকেই চোখে ধরা দেবে বিশাল পাইন্দু খালের দারুণ দৃশ্য। তবে এই খালের রূপের মায়ায় হারালে চলবে না। কেননা খালের আগে অনেক খাড়া একটা পাহাড়ি রাস্তা বেয়ে নিচে নামতে হয়।

অতঃপর পাইন্দু খালপথে প্রচন্ড স্রোতকে পায়ে ঠেলে পৌছতে হয় বাংলাদেশের বৃহত্তম জলপ্রপাতে। তবে পাহাড় দিয়ে যাওয়াটা একটু ঘুরপথ হলেও তুলনামুলক ভাবে এটি সহজ পথ। দুটোর যেকোনো পথ ধরে এগোলেই কানে আসতে থাকবে তিনাপের পানির গর্জন।

রুমা হয়ে ফেরবার পথ

যে পথে আসা হয়েছে সে পথে না ফিরে রুমা দিয়ে বের হলে এই জলপ্রপাত ভ্রমণ ষোলো আনা পূর্ণ হয়। জলপ্রপাত দেখে সেখান থেকে নতুন পাড়া হয়ে যাত্রা বিরতি করতে হবে আট্টাপাড়ায়। অতঃপর পরদিন আট্টাপাড়া থেকে ৪,০০০ থেকে ৬,০০০ টাকা ভাড়ায় চান্দের গাড়ি করে রুমা দিয়ে বান্দরবান সদর।

রুমা দিয়ে তিনাপ ভ্রমণ

বান্দরবানের রুমা উপজেলা দিয়ে তিনাপ ভ্রমণে অপেক্ষাকৃত কম সময় লাগে। বান্দরবান সদর থেকে বাসে অথবা চাঁদের গাড়িতে করে পৌঁছানো যায় রুমা। রুমার আর্মি স্টেশনে অনুমতি নেয়া শেষে আবার যাত্রা শুরু আট্টাপাড়া পর্যন্ত। এই পুরো যাত্রায় চান্দের গাড়ি ভাড়া পড়তে পারে ২,২০০ থেকে ২,৫০০ টাকা পর্যন্ত।

এখানে প্রয়োজনীয় পরিচয়পত্র জমা দিয়ে বিজিবি ক্যাম্পে রিপোর্ট করতে হয়। পরের দিন গাইডকে সঙ্গে নিয়ে তিনাপের জলপ্রপাত দেখে আসা যায়। দুই ঘণ্টার এই ট্রেকিংয়ে চোখে পড়ে বেশ কয়েকটা ছোট ছোট ঝিরি আর ঝর্ণা। আট্টাপাড়া থেকে চান্দের গাড়িতে সরাসরি বান্দরবান সদরে ফিরতে ভাড়া পড়বে ৫,০০০ টাকা। খারাপ আবহাওয়ায় বিপদ এড়াতে এই পথটি ব্যবহার করা উত্তম।

থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা

যাত্রাপথের বিভিন্ন স্থানে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থায় গাইড সাহায্য করবে। রনিনপাড়ায় থাকা, গোসল, ও খাওয়ার সুবন্দোবস্ত আছে। সৌরবিদ্যুতের কল্যাণে এখানকার কিছু কিছু বাড়িতে আলো পাওয়া যায়। এমনকি চাইলে মোবাইল, ক্যামেরা চার্জ দিয়ে নেওয়া যেতে পারে।

রোয়াংছড়ি ও রনিনপাড়ায় রাত্রি যাপনের জন্য ঘণ্টায় ১৫০ থেকে ২০০ টাকায় রুম ভাড়া পাওয়া যায়। একটু ভালো মানের হোটেলে নন এসি রুম ৫০০ টাকা আর এসি রুম ১,৫০০ টাকায় পাওয়া যেতে পারে। তাছাড়া গাইডকে বলে রনিন পাড়ার বম বা তঞ্চঙ্গ্যাদের বাসায় থাকার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

আট্টাপাড়ায় রাত্রিযাপনের জন্য খরচ পড়তে পারে মাথাপিছু ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। রনিন পাড়ায় প্রতি বেলা ১৫০ টাকার মেনুতে ভাতের সঙ্গে পাওয়া যায় ডিম, ডাল, ও আলুভর্তা। মুরগী, ডাল, ও ভাতের জন্য ২০০ টাকা। আট্টাপাড়ায় খাওয়া খরচ পড়তে পারে জন প্রতি ৮০ টাকা।

ভ্রমণকালে প্রয়োজনীয় সতর্কতা

ক্লান্তিকর এই ভ্রমণে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন যথেষ্ট বিশ্রাম ও সময়মত খাওয়া। বিশেষ করে রনিনপাড়া ও আট্টাপাড়ায় যাত্রা বিরতির পুরো সময়টাকে কাজে লাগাতে হবে। তাড়াহুড়া না করে রাতে ভালো ঘুম দিয়ে পরের দিন ভোর বেলা যাত্রা শুরু করা উত্তম।

  • দীর্ঘযাত্রায় ভরা পেটে পাহাড়ে ট্রেকিং খুবই কষ্টকর। তাই যাত্রা শুরুর পূর্বে হাল্কা কিছু খেয়ে নেওয়া উচিত।
  • সঙ্গে পানি, শুকনো খাবার, ওষুধ, জোঁক ও মশার প্রতিষেধক রাখা যেতে পারে।
  • ঢাকা থেকে যাত্রা শুরুর সময়েই কাপড়-চোপড় এমনভাবে নিতে হবে যেন ব্যাগ ভারি হয়ে না পড়ে। ব্যাগ যত কম নেওয়া যায় ততই ভালো। এ সময় ছাতা এবং রেইনকোটের কথা স্মরণে রাখতে হবে।
  • রিপোর্টিংয়ের সুবিধার্থে ন্যাশনাল আইডি কার্ড-এর মূল কপিসহ একটি ফটোকপি সঙ্গে রাখতে হবে।
  • প্লাস্টিকজাত দ্রব্যের বদলে পচনশীল কাগজের প্যাকেট ব্যবহার করা উচিত। ঝর্ণার সৌন্দর্য্য অটুট রাখতে এমন কোনো কাজ করা ঠিক নয় যাতে সেখানকার পরিবেশের ক্ষতি হয়।
  • স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ করলে প্রয়োজনের সময় তারাই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিবে।

সর্বোপরি রোয়াংছড়ি থেকে শুরু করে দেবাছড়া পাড়া পর্যন্ত প্রতিটি স্থানই জীবনের সেরা রোমাঞ্চ উপহার দিতে পারে। সেই সূত্রে, আট্টাপাড়া ও রুমা ঘুরে দেখারও দাবি রাখে বান্দরবানের তিনাপ সাইতার ভ্রমণ।

তাই এ শুধু বাংলাদেশের বৃহত্তম জলপ্রপাত জয়ের অভিযান নয়; বম ও তঞ্চঙ্গ্যাদের জীবনধারা খুব কাছে থেকে দেখার সুযোগ। যার পরিণতিতে তাদের একজন হয়ে পাহাড়ী জীবনকে চেখে দেখার সাধ করতেই পারেন কোনো খেয়ালী পর্যটক!

About

Popular Links