Sunday, May 26, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

মিথ বনাম বাস্তবতা

নারীর চলাফেরা নিয়ে উদ্বিগ্নতা, পুরুষের মনোজাগতিক পরিবর্তন নিয়ে কেন নয়

সমাজের যেকোনো ধরনের আমূল পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন উভয়ের যৌথ উদ্যোগ, অংশগ্রহণ ও প্রচেষ্টা

আপডেট : ০৬ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৪:৫০ পিএম

জেন্ডার সমতায় নারী ও পুরুষ উভয়ই সমান আলোচনার দাবিদার। জেন্ডার বৈষম্যের মূলে রয়েছে নারী-পুরুষের পরস্পরের প্রতি বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি। তাই নারী-পুরুষের সম্পর্কে সমতা প্রতিষ্ঠার প্রসঙ্গে একপেশে মনোভাব এই যাত্রাকে দীর্ঘায়িত হতে বাধা দেয়। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে লিঙ্গভিত্তিক ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হয় পরিবার ও সমাজে বিদ্যমান প্রচলিত কিছু গৎবাঁধা আচরণিক মানদণ্ড থেকে। 

গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষরা যখন জেন্ডার সমতা সমর্থনে সক্রিয় ভূমিকা রাখে তখন তারা যেমন অন্য পুরুষদের কাছেও রোল মডেল হয়ে ওঠে, তেমনি পুরুষত্বকে তারা আরও নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে সমাজে বিদ্যমান অসুস্থ আচরণিক মানদণ্ডকেও ধীরে ধীরে পরিবর্তনে বৈপ্লবিক ভূমিকা রাখে।

বৈষম্য কর্মক্ষেত্রে

আমাদের দেশে পুরুষদের চেয়ে নারীর বেকারত্বের হার দ্বিগুণের চেয়েও বেশি।  এর বাইরে বিশ্বব্যাপী এখনো প্রায় ৫১% নারীদের ১৮ বছর হওয়ার আগেই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়। কর্মক্ষেত্রেও চাকরিজীবী নারীদের ৯৫%-ই অপ্রাতিষ্ঠানিক- অর্থাৎ, প্রাতিষ্ঠানিক চাকরিতে ৫% এর ও কম বাংলাদেশি নারীর নিরাপত্তা আছে। বড় বড় পদে এই বৈষম্য আরও অনেক বেশি- সেখানে পুরুষ ও নারীদের সংখ্যার পার্থক্য প্রায় ৮৮%। এসব কারণে চাকরিজীবী নারীদের ৭.২% এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে আছে। এছাড়া, প্রতিদিন ধর্ষণ, নারী সহিংসতার মতো ঘটনা, এসব তো লেগেই থাকে।

আসলে, যুগ যুগ ধরে বিরাজমান পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় নারীদের সমান অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা কোনো সহজ বিষয় নয়। অংশীদারিত্ব নিশ্চিত হয় সমঝোতার মাধ্যেমে। তাদের চিন্তা, নারী ও পুরুষদের প্রতি আচরণিক মনোভাব - সবই এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। অনেক সময় সামাজিক চাপের প্রভাবে অনেক পুরুষ নারীদের প্রতি কোমল ও সহযোগিতামূলক হওয়াকে নারীসুলভ আচরণ মনে করেন, ফলে আত্নসম্মান রক্ষার্থে এসব এড়িয়ে যেতে চান তারা। আবার অনেক পুরুষই ভাবেন, নারীরা এগিয়ে গেলে তাদের সুযোগ-সুবিধা কিংবা আধিপত্য কমে যাবে। 

জেন্ডার জাস্টিস

এসবই হচ্ছে “জেন্ডার সমতা”র পুরো ধারণাকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করার ফলাফল।

এ বিষয়ে তুরস্কের একজন অধ্যাপক অত্যন্ত গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেন এবং সম্পূর্ণ বিষয়টিকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেন। আলোচনায় তিনি “জেন্ডার-ইক্যুয়ালিটি”-কে “জেন্ডার জাস্টিস” হিসেবে উল্লেখ করেন। 

এ ধরনের নামকরণের কারণ হিসেবে তিনি বলেন, আমরা সাধারণ অর্থে “জেন্ডার সমতা” বলতে যা বোঝাতে চাই তা নারীর স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যকে অস্বীকারের মাধ্যমে তাদের “পুরুষ” বানাতে চেষ্টা করে। বরং জেন্ডার সমতা বলতে দাবি করা উচিত নারী ও পুরুষের মধ্যে কোনো লিঙ্গভিত্তিক “শ্রেষ্ঠত্ব বা নিকৃষ্টতার” বীজ বপন না করে তাদের “প্রকৃতিজাত অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্য” এবং “সমাজ ও সংস্কৃতি আরোপিত দায়বদ্ধতাকে” স্বীকার করা। 

জেন্ডার সমতার উদ্দেশ্য

সহজ কথায়, নারী ও পুরুষের স্বতন্ত্র পরিচয় ও বৈশিষ্ট্যকে কোনোরূপ পরিবর্তনের চেষ্টা না করে, উভয়ের জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করাই হচ্ছে জেন্ডার সমতার মূল উদ্দেশ্য। বলা যায়, সুষ্ঠু ও সমান অংশীদারত্বই এই ধারণার মূল ভিত্তি। এই “অংশীদারিত্ব” শব্দটিই বলে দেয় এই প্রক্রিয়ায় দুই পক্ষের অংশগ্রহণ কতটা গুরুত্বপূর্ণ। 

যেকোনো সমস্যা চিহ্নিত ও সমাধানের জন্য পর্যাপ্ত রিসোর্স ও ক্ষমতার প্রয়োজন। আমাদের জেন্ডার বৈষম্যের বিদ্যমান প্যাটার্নে পুরুষরাই বেশিরভাগ অর্থনৈতিক সম্পদ, রাজনৈতিক ক্ষমতা ও সাংস্কৃতিক কর্তৃত্বের মূলে থাকে- তাই তাদের ছাড়া এই যাত্রা নিরর্থক। তাছাড়া যেহেতু উচ্চপদস্থ স্থানে নারীর চেয়ে পুরুষের অনুপাতই বেশি, তাই ক্ষমতা ও প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে তারা সহজেই নারীদের কর্মজীবনকে সমর্থনের পাশাপাশি একটি সহযোগিতামূলক সংস্কৃতির ধারা তৈরি করতে পারে, যা নারী ও পুরুষ উভয়কেই এগিয়ে যাওয়ার সমান সুযোগ দেয়।

সমাজের যেকোনো ধরনের আমূল পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন উভয়ের যৌথ উদ্যোগ, অংশগ্রহণ ও প্রচেষ্টা। কিন্তু জেন্ডার সমতাকে কেবলমাত্র নারীকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ড হিসেবে সামনে আনা হলে কিছু ভুল ধারণার জন্ম হয়। সবচেয়ে ভুল জায়গাটি  হচ্ছে, এতে আমরা সমাজের অপর আরেকটি অবিচ্ছেদ্য ও গুরুত্বপূর্ণ অংশের অংশগ্রহণকে নাকচ করে দিই। 

লিঙ্গভেদে সবার জন্য একটি সমতাপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে চাইলে সবার অংশগ্রহণই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যতটা গুরুত্ব দিয়ে মেয়েদের ওঠা-বসা, চলাফেরা নিয়ে জ্ঞান দিই, ঠিক ততটা গুরুত্ব দিয়ে যদি ছেলেদের মনোজাগতিক পরিবর্তন ঘটাতে পারি, দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে পারি, তাহলে সমাজ ও রাষ্ট্রের দৈনন্দিন রূপ ও চিত্র অনেকখানিই পাল্টে যাবে।

ইউথ পলিসি ফোরাম ও 'অধিকার এখানে,এখনই' প্রকল্পের যৌথ প্রয়াসের মিথবাস্টার সিরিজের এটি দ্বিতীয় পর্ব। এই প্রকল্প নিয়ে আরও জানতে ভিজিট করুন www.ypfbd.org

About

Popular Links