Friday, May 24, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

দম্পতিদের মধ্যে বাড়ছে ‘স্লিপ ডিভোর্স’

এটি ‘এখন ট্রেন্ডে’ পরিণত হয়েছে বলেও মনে করেন মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞরা

আপডেট : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৪:৪৬ পিএম

অনেকেই ঘুমের মধ্যে নাক ডাকেন। ঘুমের মধ্যে নাক ডাকার বিষয়টি বেশ বিব্রতকর। নাক ডাকার কারণে অনেকের কাছে হতে হয় হাসির পাত্র। নাকা ডাকা লোকের পাশে কেউ ঘুমাতে চান না। তবে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েন তার দাম্পত্য স্ঙ্গী। চার দেয়ালের বদ্ধ ঘরে রাতভর নাকা ডাকার উচ্চস্বরে অপর সঙ্গীটির ঘুমানো নিঃসন্দেহে কষ্টকর।

আর এ কারণেই অনেক দম্পতি বিছানায় আলাদা ঘুমান। তবে শুধু নাকা ডাকা নয়, আরও অনেক কারণেই কিছু কিছু দম্পতি আলাদা বিছানা ঘুমান। দম্পতিদের আলাদা বিছানায় ঘুমানোর এই বিষয়টিকে বলা হয় “স্লিপ ডিভোর্স”। মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, স্লিপ ডিভোর্স হলো এমন একটা বিষয়, যেটি প্রাথমিকভাবে সাময়িক সময়ের জন্য করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাকলিন হাসপাতালের মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ স্টেফানি কলিয়ার সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে বলেন, “এটি ঘটার কারণ—যারা নাক ডাকেন, ঘুমের মাঝে তারা পা নাড়ান। তাদের স্লিপ ওয়াকিং, অর্থাৎ ঘুমের ঘোরে হাঁটার অভ্যাস থাকতে পারে। অথবা, শারীরিক সমস্যার কারণে তারা ঘনঘন বাথরুমেও যেতে পারে। সুতরাং, তারা অনেক বেশি নড়াচড়া করে, গড়াগড়ি খায় এবং এটি তাদের সঙ্গীকে বিরক্ত করে।”

তিনি বলেন, “এটি এখন এমন একটি ট্রেন্ড যেটি নিশ্চিতভাবেই অনেক বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।”

ওয়াই জেনারেশনের মাঝে বাড়ছে স্লিপ ডিভোর্স

আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব স্লিপ মেডিসিনের ২০২৩ সালের একটি সমীক্ষা অংশ নেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের এক তৃতীয়াংশেরও বেশি উত্তরদাতা জানিয়েছেন যে ভালোভাবে ঘুমানোর জন্য তারা মাঝে মাঝে বা প্রায় প্রতিদিনিই সঙ্গী থেকে আলাদা রুমে ঘুমান।

গবেষণায় অংশ নেওয়া ২৮ থেকে ৪২ বছর বয়সী (এরা মিলেনিয়াল বা ওয়াই জেনারেশন, এদের জন্ম ১৯৮১ থেকে ১৯৯৬ সালের মাঝে) উত্তরদাতাদের ৪৩% জানিয়েছেন, তারা তাদের সঙ্গীর সঙ্গে ঘুমান না।

যাদের জন্ম ১৯৬৫ থেকে ১৯৮০ সালের মাঝামাঝি, অর্থাৎ যারা এক্স জেনারেশনের মানুষ, তাদের ৩৩%; জেনারেশন জেড (১৯৯৭ সাল থেকে ২০১২ সালের মাঝে যাদের জন্ম) এর ২৮% এবং বেবি বুমার্সদের (১৯৪৬ এবং ১৯৬৪ সালের মাঝে যারা জন্মগ্রহণ করেছে) ২২% একই কথা জানান।

যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল বেড ফেডারেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালেও যেসব ব্রিটিশ দম্পতি একসঙ্গে ঘুমাত, তাদের প্রতি ছয়জনের মধ্যে একজন, অর্থাৎ ১৫% দম্পতি এখন আলাদা ঘুমায়। শুধু তাই নয়, তাদের প্রতি ১০ জনের নয় জন, অর্থাৎ ৮৯% মানুষ পৃথক রুমে ঘুমায়।

অথচ, ২০০৯ সালে দ্য স্লিপ কাউন্সিলের একটি জরিপে দেখা গেছে, ১০ জনের মধ্যে একজনেরও (৭%) কম দম্পতির আলাদা বিছানা রয়েছে। ন্যাশনাল বেড ফেডারেশন বলছে, গত এক দশকে আলাদা ঘুমানোর হার বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

আলাদা ঘুমানোর এই প্রবণতার বিষয়ে স্টেফানি কলিয়ার বিবিসিকে বলেন, “তরুণ প্রজন্মের মাঝে স্লিপ ডিভোর্সের প্রবণতা বেশি কেনো এর কারণ এখনও জানা যায়নি। তবে ধারণা করা যেতে পারে যে আলাদা ঘুমানোর বিষয়টিকে তারা ততটা অসম্মানজনক মনে করে না। এটি একটি সাংস্কৃতিক পরিবর্তন। তারা ভাবে, যদি আমি ভালো ঘুমাই, ভালো বোধ করি, তবে কেন নয়?”

তবে ঐতিহাসিকদের মতে, অতীতে দম্পতিদের কাছে আলাদা রুমে ঘুমানোটা খুব সাধারণ একটি বিষয় ছিল। কিন্তু ইতিহাসের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেই ধারণাতেও পরিবর্তন এসেছে।

কিছু কিছু ঐতিহাসিকের মতে, ডাবল বিছানা (বৈবাহিক বিছানা) হলো একটি আধুনিক ধারণা এবং শিল্প যুগের বিকাশের সময় এই ধারণা বিস্তার লাভ করেছিল। তখন মানুষ জনবহুল এলাকায় বসবাস করত। উনিশ শতকের আগে বিবাহিত দম্পতিদের আলাদা ঘুমানোটা একটি সাধারণ বিষয় ছিল।

এ বিষয়ে চিলির ক্যাথলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিক্যাল স্কুলের সোমনোলজিস্ট (ঘুম বিশেষজ্ঞ) পাবলো ব্রকম্যান বিবিসিকে বলেন, “সেই সময়ে আর্থ-সামাজিক অবস্থা যাদের বেশি ভালো ছিল, তাদের মাঝে এটি তত বেশি সাধারণ বিষয় ছিল। রাজপরিবারের সদস্যরা কীভাবে ঘুমাত, সেটি লক্ষ্য করলেই এটা বোঝা যাবে।”

আলাদা ঘুমানোর সুবিধা

দম্পতিদের আলাদা ঘুমানোর কিছু সুবিধা রয়েছে বলেও জানান বিশেষজ্ঞরা। এ বিষয়ে ডা. কলিয়ার বলেন, “সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এতে করে তারা একটা নিয়মিত এবং গভীর ঘুমের অভ্যাস গড়তে পারে। ভালো ঘুম সামগ্রিক সুস্থতার জন্য অপরিহার্য।”

তিনি আরও বলেন, “যদি কোনো ব্যক্তি ঘুমাতে না পারে, এটা তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা থেকে শুরু করে শরীরের অন্যান্য কার্যকারিতাকে ব্যাহত করতে পারে। ঘুম না হলে আপনি দ্রুত রেগে যেতে পারেন এবং সেইসঙ্গে অধৈর্যও হয়ে পড়তে পারেন। এমনকি, আপনার মাঝে এক ধরনের হতাশাও জন্ম নিতে পারে।”

“স্লিপ ডিভোর্স” একটি সুস্থ সম্পর্ক রক্ষায় সহায়ক হতে পারে উল্লেখ করে এই মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ বলেন, “আমরা জানি যে দম্পতিরা যখন পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে পারেন না, তখন তারা তর্কে জড়িয়ে পড়তে পারেন, খিটখিটে হয়ে যেতে পারেন এবং সহানুভূতি হারাতে পারেন।”

পালমোনোলজিস্ট সীমা খোসলা এ বিষয়ে একমত পোষণ করে বলেন, “আমরা জানি যে ঘুম না হলে আপনার মেজাজ খারাপ হতে পারে। যারা ভালোভাবে ঘুমাতে পারে না, সঙ্গীর সঙ্গে সাথে তর্কে জড়ানোর সম্ভাবনা তাদের বেশি থাকে। কেউ আপনার ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে, তার প্রতি আপনার বিরক্তি জন্মাতে পারে এবং এটি সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।”

তিনি আরও বলেন, “রাতে ভালো ঘুম হওয়া শরীরের সুস্থতা ও খুশি থাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই, কিছু দম্পতি নিজেদের সামগ্রিক সুস্থতার জন্য আলাদা ঘুমানোর সিদ্ধান্ত নিলে তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। ভালোভাবে ঘুমাতে পারা, বা বিছানায় অনেকখানি জায়গা পাওয়া, অন্যকে বিরক্ত না করে বিছানায় পাশ বদল করা; এগুলো অনেক বেশি আরামদায়ক। এছাড়া, সঙ্গীর সঙ্গে আপনাকেও জেগে উঠতে হবে না। আপনি যখন চান, বা যখন আপনার প্রয়োজন, আপনি ঠিক তখনই ঘুম থেকে উঠতে পারবেন।”

স্লিপ ডিভোর্সের অসুবিধা

এটির সবচেয়ে বড় অসুবিধা হলো, আলাদা ঘুমাতে হলে একটি অতিরিক্ত বিছানা এবং রুম দরকার। কিন্তু অনেক দম্পতির জন্য এটার বন্দোবস্ত করা সম্ভব না। এছাড়া, এমন সিদ্ধান্তের কিছু নেতিবাচক দিকও রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আলাদা ঘুমানোর ফলে অনেক দম্পতিই তাদের মধ্যকার ইন্টিমেসি, অর্থাৎ পারস্পরিক সংস্পর্শ হারিয়ে ফেলার ঝুঁকিতে থাকেন।

ডা. কলিয়ার বলেন, “যারা পূর্ণ সময় ধরে কাজ করে, তারা শুধুমাত্র ঘুমানোর সময়ই তাদের সঙ্গীদের সংস্পর্শে আসেন। সুতরাং, এর অন্যতম সমাধান হলো নিজেদের সংস্পর্শে আসার সময়টাকে আলোচনা করে নেওয়া।”

একসঙ্গে ঘুমানো অনেকের কাছে ‘ড্রিম বন্ড’

ঘুম বিশেষজ্ঞ ড. ব্রকম্যান যদিও বলেন, “স্লিপ ডিভোর্স সব দম্পতির জন্য কার্যকর না। একসঙ্গে ঘুমানোর বেশ কিছু জৈবিক উপকারিতা রয়েছে। অনেকের কাছে এই বন্ধন স্বপ্নে তৈরি হয়। উদাহরণস্বরূপ, একজন মা এবং তার সন্তানের মাঝে বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় এই বন্ধন তৈরি হয়। মা এবং শিশুর ঘুমের সময়ও একই থাকে, তখন তারা দু’জনেই বিশ্রাম নেয়।”

তিনি আরও বলেন, “গবেষণায় দেখা গেছে যে এমন অনেক দম্পতি আছেন, যারা বছরের পর বছর একসঙ্গে ঘুমাচ্ছেন এবং তারা পারস্পরিক সংস্পর্শে আসার পর গভীরভাবে ঘুমাতে পারেন।”

কোনো দম্পতি আলাদা ঘুমাতে চাইলে তাদের কিছু বিষয় অনুসরণ করার সুপারিশ করেন বিশেষজ্ঞরা।

ড. কলিয়ার বলেন, “যদি একজন চায় এবং অপরজন না চায়, তখন এটি বিরক্তির কারণ হতে পারে। অনেক মানুষ আছেন, যারা একা ঘুমাতে চান না। একাকী ঘুমালে তাদের খারাপ লাগে। তাই, দম্পতিদের নিজেদের বিষয়ে সমানভাবে ভাবতে হবে। এমন একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যেটিতে দু’জনেই রাজি।”

ড. ব্রকম্যানও বিষয়টিতে একমত পোষণ করে বলেন, “নাক ডাকার সমস্যা, ঘুমের মাঝে হাঁটা বা পা নাচানোর অভ্যাস থাকলেও এটা তাদের জন্য কঠিন হতে পারে। কারণ কিছু মানুষ আছে, যারা ভিন্ন বিছানায় ঘুমাতে পছন্দ করে না। সাধারণত, পুরুষরা এটি করতে অনিচ্ছুক।”

About

Popular Links