বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক পরিস্থিতি কিংবা সহিংসতা নিয়ন্ত্রণের জন্য কারফিউ জারি করা নতুন কোনো বিষয় নয়। সহিংসতা যখন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে যায় তখন তা নিয়ন্ত্রণের সর্বশেষ উপায় হিসেবে কারফিউ বিবেচনা করে সরকার। তবে বর্তমান প্রজন্মের একটা বড় অংশের কাছে কোনো পরিস্থিতিতে কারফিউ জারি এবং সেনা মোতায়েন দেখা নতুন অভিজ্ঞতা।
কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গত সপ্তাহে দেশে ঘটে যায় অপ্রত্যাশিত সহিংসতা। কোনো আন্দোলনকে কেন্দ্র করে এত কম সময়ে একশ’র বেশি মানুষ নিহত হওয়ার ঘটনা স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে আগে কখনও ঘটেনি।
বাংলাদেশে সর্বশেষ কারফিউ জারি করার ঘটনা ঘটেছিল ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়। এরপর বিভিন্ন সময় দেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলনকে ঘিরে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হলেও কারফিউ জারি করা হয়নি। অর্থাৎ দেশে ১৭ বছর পর কারফিউ জারি হলো।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গত এক দশকে যেসব আন্দোলন হয়েছে সেগুলোর মধ্যে শাহবাগের “গণজাগরণ মঞ্চ” আজও আলোচিত একটি নাম। ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে এই আন্দোলন শুরু হয়। একপর্যায়ে শাহবাগেই দিনের পর দিন অবস্থান নিয়ে একের পর এক কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। একই কর্মসূচি ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে।
শাহবাগে আন্দোলনে চলাকালে ব্লগার রাজীব হায়দারকে হত্যা করা হয়, একই সময়ে শাহবাগের আন্দোলনকারীদের “নাস্তিক” আখ্যা দিয়ে ব্যাপক প্রচারণা শুরু করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিপক্ষে থাকা গোষ্ঠী। একই বছর নভেম্বরে বাংলাদেশে ১৮- দলীয় বিরোধীজোটের ডাকা অবরোধ কর্মসূচির সময় রাজধানী ঢাকায় অনেকগুলো বাসে আগুন দেওয়া হয়, যেখানে অনেক মানুষের প্রাণহানি ঘটে।
অপরদিকে, ২০১৫ সালে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০- দলীয় জোটের ডাকা ২৫০ দিনেরও অধিক সময়ের অবরোধ কর্মসূচিতে অনেক মানুষের প্রাণহানি ঘটে। সারাদেশে বিশেষ করে নগর ও মহানগরে সহিংস হামলা, অগ্নিসংযোগ ও ভাংচুর ছড়িয়ে পড়ে।
সর্বশেষ দেশের বড় আন্দোলনগুলোর মধ্যে অন্যতম ২০১৮ সালের কোটা প্রথা নিয়ে মূল আন্দোলন শুরু হয় জানুয়ারি থেকে, পরে জুন মাসে দ্বিতীয় দফা আন্দোলন শুরু হয়। যার ফলে একপর্যায়ে কোটা বাতিলের ঘোষণা দেয় সরকার। কিন্তু এসব কোনো আন্দোলনের ফলে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে কারফিউ জারি হতে দেখা যায়নি।
সর্বশেষ চলমান জুলাই মাসে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সারাদেশে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে।
শিক্ষার্থীদের ডাকা আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে রাজধানীসহ দেশের স্থানে বিভিন্ন গুরত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনায় দুর্বৃত্তদের হামলা ও প্রাণহানির ঘটনার প্রেক্ষাপটে সরকার কারফিউ জারির সিদ্ধান্ত নেয়। মোতায়েন করা হয় সেনাবাহিনী।
১৯ জুলাই দিবাগত রাত ১২টা থেকে এই করিফিউ শুরু হয়। পরদিন শনিবার দুপুর ১২টা থেকে ২টা পর্যন্ত বিরতি দিয়ে রবিবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত বলবৎ রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়। এরপর ফের দুই ঘণ্টা বিরতি দিয়ে কারিফউ শুর হয়; যা সোমবার দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত আবার বিরতি দেওয়া হয়। এরপর মঙ্গলবার বিভিন্ন জেলায় আলাদা আলাদাভাবে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কারফিউ শিথিল করা হয়। এদিন রাজধানী ঢাকায় দুপুর ১টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত কারফিউ শিথিল করা হয়। এরপর বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ফের কারফিউ শিথিলের ঘোষণা আসে। বুধ ও বৃহহস্পতিবার ঢাকা, নরসিংদী, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে একই সময়ে কারফিউ শিথিল থাকলেও দেশের অন্যান্য জেলায় স্থানীয় প্রশাসনের সিদ্ধান্তে আলাদা আলাদা সময়ে কারফিউ শিথিল রাখা হয়েছে।
জরুরি পরিষেবাসহ গণমাধ্যম কারফিউয়ের আওতামুক্ত রাখা হয়েছে। এছাড়া, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট কারফিউয়ের আওতামুক্ত রাখা হয়েছে। এসব যাত্রীদের বিমানের টিকেট সঙ্গে রাখতে বলা হয়েছে।
এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জানিয়েছেন জনমনে পুরোপুরি স্বস্তি না ফেরা পর্যন্ত কারফিউ বলবৎ থাকবে।



