• বৃহস্পতিবার, আগস্ট ১৬, ২০১৮
  • সর্বশেষ আপডেট : ০২:০৭ দুপুর

একজন সফল নারীর গল্প

  • প্রকাশিত ১২:০৬ দুপুর জুলাই ৩, ২০১৮
tangail-rina-begum-pic-.jpg

তিনি শুধু নিজের ভাগ্যই বদল করেননিপাল্টে দিয়েছেন গ্রামের চিত্র।

বিষমুক্ত সবজিসহ বিভিন্ন ফসল আবাদ করে নিজের ভাগ্য বদল করেছেন টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার মামুদপুর মধ্যপাড়া গ্রামের গৃহবধূ রিনা বেগম। তিনি শুধু নিজের ভাগ্যই বদল করেননিপাল্টে দিয়েছেন গ্রামের চিত্র। অনেকের কাছে রিনা বেগম এখন দৃষ্টান্ত।

দীর্ঘদিনের চেষ্টা আর স্বামীর প্রেরণায় তিনি এখন সফল চাষী। তার এই সফলতা শুধু দেলদুয়ারেই সীমাবদ্ধ নেই। দেশ ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিকভাবেও তিনি এখন পরিচিত। 

গল্পের শুরু 

কৃষক পরিবারে জন্ম রিনা বেগমের। তাই জন্মের পর থেকেই কৃষি কাজের সঙ্গে তার পরিচয়। লেখাপড়ার পাশাপাশি সংসারের কাজ করেছেনকৃষি কাজে সহযোগিতা করেছেন বাবা-মাকে। বিয়ে পর শ্বাশুড়ির কাছ থেকে বাড়ির আঙ্গিনা ও আশপাশের জায়গায় সবজি চাষ শিখতে থাকেন। ১৯৯১ সালে ৭০ শতাংশ জায়গা বর্গা নিয়ে শ্বাশুড়ির পরামর্শ মতো রাসায়নিক সারের পাশাপাশি জৈব সার ব্যবহার করে সবজিসহ ধানপাট আবাদ শুরু করেন। প্রথমেই ভালো ফলন হয়। ১৯৯৭ সালে বাবার সম্পত্তি থেকে ওয়ারিশ সূত্রে ১শ’ দশ শতাংশ জায়গায় নতুন উদ্যমে চাষাবাদ শুরু করেন রিনা বেগম। ২০০৭ সালে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে জোর দেন তিনি। বর্জন করেন রাসায়নিক সার। নিজেই তৈরি করতে থাকেন জৈব সার। এজন্য এলাকার অন্যচাষীরা তাকে বিদ্রুপ করেছেন। কিন্তু তাতে তিনি দমে যাননি। রিনা বেগম বলেনশ্বাশুড়ি বলতোবাজারের সারে আবাদ করলে সেই ফসল খেয়ে রোগ ব্যাধি হয়। তার (শ্বাশুড়ির) জ্ঞান নিয়ে তার পরামর্শ মতো বাজারের সার বাদ দিয়ে নিজের তৈরি সার দিয়ে আবাদ করি। পরে বিভিন্ন এনজিও এগিয়ে আসে। তারা উৎসাহ দেয়। 

বিষমুক্ত সবজি চাষ

বিষ পরিবেশ নষ্ট করে। মানুষের মারাত্মক ক্ষতি করে। দেহ অচল হয়ে যায়। এটা খেয়ে শরীরে যে রোগ হচ্ছে তার চিকিৎসা করতেই তো টাকা সব শেষ। এ জন্যই রিনা বেগম জৈব সার ব্যবহার করে ফসল আবাদ করছেন। বর্তমানে তিনি বেগুনচাল কুমড়াধুন্দলচিচিঙ্গামরিচহলুদকাকরোলকচুলেবু চাষ করছেন। অন্য মৌসুমে অন্য ফসল আবাদ করে থাকেন তিনি।

বীজ সংরক্ষণ

কৃষি কাজের পাশাপাশি রিনা বেগম বিভিন্ন ফসলের বীজও সংরক্ষণ করছেন। ২০০২ সালে তার নিজ ঘরের একটি কক্ষে প্রথম ৮ প্রকাশের বীজ দিয়ে তিনি তার বীজ সংগ্রহশালা চালু করেন। এখন তার সংগ্রহ শালায় প্রায় ১০০ জাতের সবজি ও ফসলের বীজ রয়েছে। তিনি যেখানেই যান সেখানে যদি কোন ভালো জাতের বীজ পান তা তিনি সংগ্রহ করেন। রিনা বেগম বলেনবীজ খুব গুরুত্বপূর্ণ। ভালো বীজ হলে ভালো ফসল হয়। স্বীকৃতি

রিনা বেগমের বিষমুক্ত চাষাবাদের কথা এক সময় ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে। সরকারের দৃষ্টিও পড়ে তার প্রতি। ফলে ২০১৫ সালে সরকার রিনা বেগমকে আদর্শ কৃষক হিসেবে ঘোষণা করে। একই বছর জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থা এশিয়ার চারজন কৃষকের মধ্যে রিনা বেগমকে আদর্শ কৃষক হিসেবে পুরস্কার দেয়। বিশ্ব খাদ্য দিবসে থাইল্যান্ডে তার হাতে এ পুরস্কার তুলে দেয়া হয়। 

দক্ষ সংগঠক

বিষমুক্ত ফসল চাষে রিনা বেগমের দক্ষতা দেখে সরকার থেকে ২০০৯ সালে মামুদপুর মধ্যপাড়া মহিলা সমবায় সমিতিনামে একটি সমিতি করে দেয়া হয়। রিনা বেগম সেই সমিতির সভাপতি। সমিতির সভায় ফসলের বিভিন্ন সমস্যা ও তার সমাধানের পথ দেখান তিনি। সেখানকার পরামর্শে ওই মহিলারাও তাদের আঙ্গিনাসহ আশপাশের জমিতে বিষমুক্ত ফসল আবাদ করছেন।

ভবিষ্যত পরিকল্পনা

রিনা বেগম বলেনআমার মতো নারীরা কাজ করে সামনের দিকে আগাতে পারবে। আমরা একদিন থাকবো না। যারা থাকবো তারা যেন বিষমুক্ত ফসল আবাদ করে রোগমুক্ত জীবনযাপন করতে পারে। বাজারের সার ব্যবহার করতে করতে একদিন হয়তো মাটি পাথর হয়ে যাবে। তখন আর ভালো ফসল আবাদ সম্ভব হবে না। তাই নিরাপদ খাদ্যের জন্য কৃষকের ঘরে বীজ সংগ্রহ রাখা এবং জৈব সার ব্যবহার করে ফসল আবাদ করা। এ প্রক্রিয়া আশপাশের গ্রামসহ সারাদেশে ছড়িয়ে দিতে হবে।