• শনিবার, অক্টোবর ২০, ২০১৮
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৩:৩৩ বিকেল

কৃতীত্বটা আমাদের তরুণদের : ক্যাথরিন মাসুদ

  • প্রকাশিত ১২:০২ দুপুর আগস্ট ৮, ২০১৮
ক্যাথরিন মাসুদ
প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা ক্যাথরিন মাসুদ। ছবিঃ রাজিব ধর/ ঢাকা ট্রিবিউন

প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা ও প্রয়াত চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদের স্ত্রী, ক্যাথরিন মাসুদ নিরাপদ সড়কের জন্য চলমান ছাত্র আন্দোলন এর পরবর্তী সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে কথা বলেছেন ঢাকা ট্রিবিউনের সাথে।  

ছাত্রদের নেতৃত্বে সাড়া দেশে ছড়িয়ে পড়া এ আন্দোলন নিয়ে আপনার মন্তব্য কী? এই স্কুল শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে আপনি কোনো বার্তা দিতে চান?

নিরাপদ সড়ক সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে যে সাহসী ও ইতিবাচক উদ্যোগ নিয়েছে এই স্কুল পড়ুয়ারা তা দেখে আমি ভীষণ অনুপ্রাণিত হয়েছি। এই যুবারাই দেশের ভবিষ্যত, তারা জনগণের নিরাপত্তার কথা ভেবে ব্যক্তিগত যানবাহন ও পাবলিক পরিবহনের লাইসেন্স, ফিটনেস, রেজিস্ট্রেশন আর ট্রাফিক আইন মেনে চলা সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টি করে অসাধারণ দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। তবে খারাপ লাগার বিষয়টা হচ্ছে বয়োজ্যেষ্ঠদের ব্যর্থতার কারণেই তারা বাধ্য হয়ে রাস্তায় নেমেছে। আমরা অনেকেই শুধু মাথা নাড়িয়ে বলি যে ‘কোনোদিন পরিবর্তন আসবে না, সিস্টেমে সমস্যা আর চলমান ব্যবস্থাকে বহাল রাখতে বড় শক্তি কাজ করছে।’ কিন্তু, শুধু বাংলাদেশেই নয়, পুরো বিশ্বে আমাদের শিশুরা বলছে, ‘আপনারা আমাদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ, সুতরাং এখন আমাদেরই করে দেখাতে হবে আপনাদেরকে।’ যুবাদের এই কন্ঠস্বরকে আমাদের শ্রদ্ধা করতে হবে, কেননা তারাই দেশের ভবিষ্যত ও মানবতার কাণ্ডারি। সড়কে নিরাপত্তার বিষয়টি আমাদের সবার সাথে জড়িত, এখানে কোনো রাজনৈতিক দলাদলি, বয়স, ধর্ম, লিঙ্গ আর শ্রেণিবৈষম্য নেই; তাই তাদের এই সাধু উদ্যোগে দলমত নির্বিশেষে আমাদের সকলের হাত বাটানো উচিৎ। তাই আমি এই শিক্ষার্থীদের বলতে চাই, ‘আমরা তোমাদের কথা শুনছি, আর তোমাদের কাছ থেকে শিখে নিতেও আমরা প্রস্তুত।’

তারেক মাসুদের মৃত্যুর পর থেকে দুর্ঘটনা রোধ করতে সরকার কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে? আর আপনি কি মনে করেন যে তা পর্যাপ্ত ছিল?

সর্বপ্রথমে, আমি এই ঘটনাগুলোকে শুধু আকস্মিক, অপ্রত্যাশিত দুর্ঘটনা বলতে চাই না। বরং নিয়মিতভাবে ঘটা এই ঘটনা গুলো কিছু ব্যক্তি, সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বহীনতার কারণে ঘটছে। তাই এগুলো সড়ক দুর্ঘটনা বা সড়কে হত্যাকান্ড; আর বাংলাদেশের সড়ক ততদিন পর্যন্ত বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক সড়ক হিসেবে বহাল থাকবে যতদিন না পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে ন্যূনতম জবাবদিহিতার মুখোমুখি করা হবে এবং আইন প্রণয়ন করে তা প্রয়োগ নিশ্চিত করা হবে।  

২০১১ সালের আগস্টে তারেক মাসুদ, মিশুক মনির সহ আরও তিন জনের প্রাণঘাতী ওই সড়ক দুর্ঘটনার পরে সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টির উপর বেশ ভালোভাবেই আলোকপাত করা হয়েছিল। সাড়া জাগানো ওই ট্র্যাজিডির পরেও সরকার তখন কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেননি। বিশেষত আরিচা মহাসড়কে বিপজ্জনক স্থানগুলো মেরামত ও অন্যান্য দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকাগুলোতে ট্রাফিক সতর্কতা সংকেত বসানো যেতো কিন্তু তাও করা হয়নি। উপরন্তু, সে সময় ১৯৮৩ সালের জাতীয় মোটর যান অধ্যাদেশ সংস্কারের কথা উঠলেও ‘সড়ক পরিবহন আইন’ নামে এতো বছর পরে তা বাস্তবায়িত হচ্ছে এবছরে। যাহোক, সেই আইনের খসড়াতেও সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চয়তা প্রদানে নানা বিষয়ে অসম্পূর্ণতা রয়েছে। যেমন দ্রুত বিচারের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোনো কিছু বলা হয়নি (যেটা আগের অধ্যাদেশে ছিল) এবং দুর্ঘটনার ভুক্তভোগী বা তার পরিবারকে তাৎক্ষণিক উপযুক্ত ক্ষতিপূরণের কোনো পদ্ধতি উল্লেখ করা হয়নি; এখন এ আইনের খসড়া অনুমোদন হলেও আমরা ১৯৮৩ সালের অধ্যাদেশ থেকেও এক ধাপ পিছিয়ে পড়ব। আমি মন থেকেই চাই, সম্প্রতি নিরাপদ সড়কের উদ্দেশ্যে তৈরি এই গণসচেতনতায় যেনো সরকার এসব পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিচার করে তা চূড়ান্তভাবে মন্ত্রীসভার বৈঠকে অনুমোদন দেয়। এখানে আরেকটা কথা যুক্ত করতে হবে যে সরকারকে এই পদক্ষেপ নিতে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়। বিশেষভাবে বলতে গেলে সরকার দলীয় বিভিন্ন দায়িত্বশীল ব্যক্তি একই সঙ্গে এসব পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সাথে সরাসরি জড়িত থাকায় সরকারের পক্ষে কাজটি কঠিন হয়ে যায়। উদাহরণ স্বরূপ ধরতে পারেন ২০১৬ সালের মে মাসে আমাদের পক্ষে দেয়া দৃষ্টান্তকারী ক্ষতিপূরণের রায়কে। উচ্চ আদালতের ওই রায়কে প্রভাবিত করতে পরিবহন সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো লাগাতার ধর্মঘট করেছিল। এটা পরিষ্কারভাবেই মধ্যস্থতার মাধ্যমে ন্যায়বিচারকে বাধাগ্রস্থ করার একটা প্রচেষ্টা। সৌভাগ্যবশত মহামান্য আদালত তাঁর রায়ের উপর অনড় ছিলেন, আর অবরোধের কারণে দুর্ভোগ পোহাতে হলেও সাধারণ মানুষ নিরাপদ সড়কের ব্যাপারে ইতিবাচক ছিল।

এই আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছে যে দুই শিক্ষার্থীর অপঘাতের মৃত্যুতে, তাদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেয়ায় সরকার বিশেষত প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা অবশ্যই প্রশংসাযোগ্য, তবে এককালীন ক্ষতিপূরণ বা বিলিপত্র দিয়ে সমস্যার সমাধান না করে বরং সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্তে পৌঁছানোটা গুরুত্বপূর্ণ। শিল্প কারখানার দুর্ঘটনা বা সড়ক দুর্ঘটনায় দু’একটা ক্ষতিপূরণ দিয়ে দায় সাড়ানোর যুগটা শেষ করে আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনগতভাবে অর্থপূর্ণ ও সহযোগিতাপূর্ণ একটা পদ্ধতি নির্ণয় করতে হবে যাতে করে এই সঙ্কটটিতে শুধু প্রতিক্রিয়া না জানিয়ে বরং হাজার হাজার প্রাণ সুরক্ষিত করতে পারি। কৃতীত্বটা আমাদের তরুণদের-তারা আমাদের দেখিয়েছে আমাদের কর্তব্য কী।                     

আর সবশেষে অহিংস আন্দোলনকারী স্কুলছাত্র ও সাংবাদিকদের উপর সরকার দলীয় ছাত্রসংগঠনের পরিকল্পিত এই সহিংসতা ও বর্বর আচরণে তীব্র নিন্দা জানানো উচিৎ। অহিংস আন্দোলনে এভাবে ছাত্রদের উপর পাশবিক নির্যাতনের স্বপক্ষে কোনো যুক্তিই খাটে না। 

এই সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে কি করা উচিৎ বলে আপনি মনে করেন, কোন পদ্ধতিতে এগিয়ে গেলে এর সর্বোৎকৃষ্ট ফলাফল পাওয়া যাবে? এখন পর্যন্ত কোনো প্রসংশনীয় কোনো পরিবর্তন বা সাফল্য আপনি দেখছেন কি?

পরিবহন খাতের সকল পর্যায়েই আরও জবাবদিহিতা ও পদ্ধতিগত পরিবর্তন আনতে হবে। শুধু সরলভাবে চালকদের দোষ দিলে লাভ নেই, কেননা তারা তাদের মালিকের চাপেই দ্রুত ও অধিক সময় ধরে গাড়ি চালাতে বাধ্য হয় যাতে তাদের লাভের পরিমাণ বাড়ে, যানবাহনগুলো ন্যূনতম নিরাপত্তা ছাড়াই সড়কে চলাচল করছে, সংশ্লিষ্টরা যাচাই করেও দেখছেন না প্রয়োজনীয় নিরাপত্তার শর্তগুলো মানা হচ্ছে কি না, অপর্যাপ্ত ট্রাফিক পুলিশ এবং তাদের বেতন ভাতা যথেষ্ট নয় বলে তারা দুর্নীতির দিকে ঝুঁকছে, শহরের অধিক সংখ্যক বাস সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান যাদের কোনো সুসংহত ব্যবস্থাপনা নেই, এরকম আরও অনেক কিছু আছে। পরিস্থিতি  আরও বেশি জটিল কেননা শহরের বাসিন্দাদের চলাচলের জন্য এখনও কোনো রেল ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।

কিন্তু কিছু বিষয় নিশ্চিতভাবেই ফলপ্রসু হবে, যেমন বাস/ট্রাক কোম্পানিগুলোর মালিক ও এদের যাচাইকারীকারীদের আইনের আওতায় আনতে হবে যদি তাদের ড্রাইভাররা বিপজ্জনকভাবে গাড়ি চালায়। আর্থিক জরিমানা না করলে এদের টনক নড়বে না। দুর্ঘটনার শিকারদের বড় মাপের আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেয়ার আইন করলে এরা বাধ্য হয়েই সিস্টেমটাকে বদলাবে, সচেতন হবে নিজের স্বার্থে। সড়ক পরিবহন আইন প্রণয়ন নিঃসন্দেহে জটিল তবে একই সমান গুরুত্বপূর্ণ যারা ব্যবস্থাপনা ও নজরদারী করেন তাদের দ্বারা এই আইনগুলোর যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা। ভালো মাত্রায় সচেতনতা গড়ে তুলেও সড়কের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে সাহায্য করা যায়। ব্র্যাক ছোট বড় বিভিন্ন পর্যায়ে একাধিক প্রোগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে এই সড়ক নিরাপত্তার জন্য। স্রোতা (সেফ রোড এন্ড ট্রান্সপোর্ট অ্যালায়েন্স), এই প্ল্যাটফর্মে সাধারণ নাগরিক, এনজিও ও পরিবহন সংশ্লিষ্টদের একত্রিত করে বিভিন্ন কৌশল উদ্ভাবন করা হয় যা সড়ক নিরাপত্তার এই সামাজিক সমস্যাকে দূর করতে পারে। কিছু বিবাদ সত্ত্বেও এই সার্বজনীন সংকট মোকাবিলা করতে আমাদের সম্মিলিত প্রয়াস চালিয়ে যেতে হবে।

আর দুই সপ্তাহেরও কম সময়ে সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার ৭ বছর পূর্ণ হতে চলেছে। আপনি কি সে প্রসঙ্গে আমাদের সাথে কিছু বলবেন?

২০১১ সালের ১৩ আগস্টে তারেক মাসুদ, মিশুক মনির সহ চলচ্চিত্র ইউনিটটির আরও তিনজনের সেই অপমৃত্যুকে বদলে আনা সম্ভব নয়। তারেককে ফিরিয়ে এনে তার ছেলে নিশাদের বাবার দায়িত্ব পালন সম্ভব নয়, দেশের জন্য তার শিল্পকর্মের মাধ্যমে অবদান রাখাও অসম্ভব। তারেকের মৃত্যুর মুহূর্তেই আমি এই সত্যটা মেনে নিয়েছি, কিন্তু তার আশাগুলোর অপমৃত্যু আমি মেনে নিতে পারিনি। নাগরিক জীবনের চাপে আমরা যারা নিজেদের সক্ষমতার উপর বিশ্বাস হারিয়ে স্রোতে গা ভাসিয়ে চলছি, তরুণদের নেতৃত্বের এই আন্দোলন তাদেরকে মনে করে দিয়েছে যে, আশাহত হতে নেই। নিরাপদ সড়ক ও দুর্ঘটনার ভুক্তভোগিদের ন্যায়বিচারের জন্য আমাদের মানবিক ভাবে লড়তে হবে। এটা একটা অভিন্ন আন্দোলন, যেখানে আমাদের সচেতন থাকতে হবে যেনো আমাদের দলীয়করণ বা ভাগাভাগী করে, বৈষম্য করে বা রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত না হয়। একইসাথে, আমাদের প্রত্যেককেই এই সমাধানের অংশ হয়ে কাজ করতে হবে, যারা যে বিভাগে আছে সড়কের নিরাপত্তায় তার দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করতে হবে, তাহলেই হয়তো ভবিষ্যতে আমাদের আর সড়ক দুর্ঘটনায় তাজা প্রাণের বিলাপ শুনতে হবে না।


অনুবাদ_জুম্মান সাদিক জ্যাভলিন