• বুধবার, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০১৮
  • সর্বশেষ আপডেট : ০১:২৩ রাত

জুমের সোনালী ফসল উঠছে জুমিয়াদের ঘরে

  • প্রকাশিত ০৪:৪৭ বিকেল সেপ্টেম্বর ৯, ২০১৮
জুমচাষ
সারা বছর পরিশ্রম শেষে পাহাড়ের কোলে জুমক্ষেতের পাকা ধানের ফসল কাটছে পাহাড়ের আদিবাসী নারীরা। ছবি: ঢাকা ট্রিবিউন

“হিল্লো মিলেবো জুমত যায় দে, জুমত যায় দে, যাদে যাদে পধত্তুন পিছ্যা ফিরি রিনি চায়, শস্য ফুলুন দেঘিনে বুক্কো তার জুড়ায়.....”

চাকমা আদিবাসী সম্প্রদায়ের জনপ্রিয় এই গানটি। সারা বছর হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম শেষে পাহাড়ী তরুনীরা যখন জুম ক্ষেতের পাকা ফসল ঘরে তুলতে যায়, তখন মনের আনন্দে জুম ঘরের মাচায় বসে জুম্ম তরুন-তরুনীরা এই গানটিই গেয়ে থাকে।

এ গানের বাংলা অর্থ হলো “পাহাড়ী মেয়েটি জুমে যায় রে, যেতে যেতে পথে পথে পিছন ফিরে চায়, পাকা শস্য দেখে তার বুকটা জুড়ায়।” 

জুমে বীজ বপনের পাঁচ মাস পরিচর্যা ও রক্ষাণাবেক্ষণের পর ফসল দেখে হাঁসি ফুটে ওঠে জুম চাষীদের মুখে। এ মৌসুমে জুম ক্ষেত থেকে ফসল ঘরে আনতে শুরু হয় উৎফুল্ল জুমিয়া নারী-পুরুষেরা। 

কিছু কিছু জুময়িা ঘরে নবান্ন উৎসবের আয়োজনও শুরু হয় এসময়ে। এ মৌসুমে উপযুক্ত জলবায়ু ও বৃষ্টিপাতের কারণে ভালো ফলন হয়েছে। জুমের সোনালী ফসল ঘরে তুলতে পাড়ায় জুম্ম নারী-পুরুষ ফিরে পেয়েছে মুখের হাসি। চোখে ফুটে   উঠেছে আশার আলো। পাহাড়ে জুম ক্ষেতে এখন পাকা ফসল তোলার ভরা মৌসুম । জুমিয়াদের ঘরে উঠেছে অনেক পরিশ্রমের জুমের সেই সোনালী ফসল। আর ফলানো ফসল ঘরে তুলতে পেরে জুমিয়া নারী -পুরুষের মুখে ফুঠেছে   হাঁসি। চোখে আশার আলো। জুম্ম নারীরা উৎফুল্ল মনে ব্যস্ত জুমের পাকা  ধান কাটতে। 

তিন পার্বত্য জেলা রাঙামাটি ,খাগড়াছড়ি, ও বান্দবানের আদিবাসীদের জুম ক্ষেতে শুরু হয়েছে পাকা ধান কাটা। ধুম পড়েছে মারফা (পাহাড়ী শশা), ছিনারগুলা (পাহাড়ী মিষ্টিফল), বেগুন, ধানি মরিচ, ঢেড়ঁশ, কাকরোল, কুমড়াসহ ইত্যাদি ফসল তোলার কাজ। এরপর ঘরে উঠবে তিল আর যব। সবশেষে তোলা হবে তুলা। 

আদিবাসী জুমচাষীরা পৌষ-মাঘ মাসে পাহাড়ের ঢালে জঙ্গল পরিষ্কার করে করে শুকানোর পর ফাল্গুন-চৈত্র মাসে আগুনে পুড়িয়ে জুম ক্ষেত্র প্রস্তুত করে। এরপর বৈশাখ-জৈষ্ট্য মাসে পোড়া জুমের মাটিতে শুঁচালো দা দিয়ে গর্ত খুড়ে একসঙ্গে ধান তুলা, তিল, কাউন, ভুট্টা, ফুটি চিনার, যব ইত্যাদি বীজ বপন করে। 

আষাঢ়-শ্রাবন মাসে জুমের ফসল পাওয়া শুরু হয়। সে সময় মারফা (পাহাড়ী শশা), কাঁচা মরিচ, চিনার, ভুট্টা পাওয়া যায়। ধান পাকে ভাদ্র-আশ্বিন মাসে আর সব শেষে তুলা, তিল ,যব ঘরে তোলা হয় কার্ত্তিক-অগ্রহায়ন মাসে।

এবছর রাঙামাটিসহ পার্বত্য তিনটি জেলার পাহাড়ে জুমের ভালো ফলন হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছে। জুম চাষী সুনীতি চাকমার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বছর কাঙ্খিত বৃষ্টিপাতের ফলে সময়মতো জুমচাষ সম্ভব হয়েছে। ফলনও হয়েছে আশাতীতভাবে ভালো।

রাঙামাটি সদর উপজেলার বরাদম ইউনিয়নের গোলাছড়ি এলাকার অর্পনা চাকমা জানিয়েছেন গতবারের চেয়ে এবার তার জুমের ফসল অনেক ভালো হয়েছে। রাঙামাটি সদররের মগবান ইউনিয়নের বৌদ্ধ চাকমা তার জুমের ফসল কাটতে কাটতে হাস্যোজ্বল মুখে বলেন, “এবার আমার জুম থেকে প্রায় ৪০ মন ধান পাবো আশা করছি।”

মগবান ইউনিয়নের আরেক জুমচাষী সুমন চাকমা বলেন, “দেড় একরের মতো জায়গায় জুমচাষ করেছি। এ জুমে উৎপাদিত ফসল দিয়ে আমি আগামী ৭-৮ মাস পর্যন্ত আমার চলে যাবে। এর পাশাপাশি আমি হলুদও রোপন করেছি। এখান থেকে বেশকিছু অর্থ আমার উপার্জন হবে।”  

রাঙামাটি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, এ বছর রাঙামাটির দশ উপজেলায় ৫ হাজার ২৩০ হেক্টর জমিতে জুম ধান চাষ হয়েছে। এ বছর জুম চাষের লক্ষ্যমাত্র ছিল ৫ হাজার ৮২৯ হেক্টর। যা প্রতি হেক্টরে গড়ে ১ দশমিক ২ মেট্রিক টন জুম ধান উৎপাদন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। জুম ধানের মধ্যে রয়েছে গেলং, কবরক, আমেই, বাদোয়ে, বিনি ধান ইত্যাদি। এছাড়া অর্থকরী ফসল হচ্ছে মারফা, মরিচ, বেগুন, তিল, ঢেঁড়স ইত্যাদি। 

পার্বত্য তিন জেলায় প্রতি বছর কত একর জায়গায় জুম চাষ হয় তার সঠিক হিসাব কৃষি বিভাগ জানাতে না পরলেও বিশেষ পদ্ধতির এ আদি জুম চাষ পার্বত্য আদিবাসীদের জীবিকার আদিম ও প্রধান উৎস। বাংলাদেশের একমাত্র পার্বত্য চট্টগ্রামেই জুম চাষ হয়ে থাকে। 

জুম চাষ সম্পর্কে, রাঙামাটি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এর উপ-পরিচালক পবন কুমার চাকমা বলেন, জুমচাষে আমরা পর্যবেক্ষন করে দেখেছি এই বার জুমের ফলন ভালো হয়েছে। এখানে জুমচাষীদেরকে এখানকার স্থানীয় বীজের পাশাপাশি খড়া সহিষ্ণু ফলনশীল জাত বিরি ধান-৪৮, বিরি ধান ৮৫, বিরি ধান ৮২, বিরি ধান ৬৫ জাতের বীজ আমরা চাষীদেরকে আমরা দিয়ে থাকি।

পার্বত্য চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী জুম চাষ পদ্ধতিকে আধুনিকায়ন ও জুম চাষীদের ব্যাংক থেকে ঋণের সুবিধা দিলে জুমে ব্যাপক উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে, অন্যদিকে এ অঞ্চলের খাদ্যর ঘাটতি পূরণ হবে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।