• বৃহস্পতিবার, জুন ২৭, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:৩০ রাত

হারিয়ে যেতে বসেছে নীলফামারীর ঐতিহ্যবাহী ঢাকশিল্প

  • প্রকাশিত ০৩:০৮ বিকেল অক্টোবর ১৫, ২০১৮
ঢাকশিল্প
পূজা উপলক্ষ্যে ব্যস্ততা বাড়লেও চরম দুর্দশায় আছেন নীলফামারীর ঢাকের কারিগররা। ছবি: ঢাকা ট্রিবিউন।

তবে উৎসবকে প্রাণোদনা এনে দেওয়া এই ঢাকের কারিগরদের জীবন কাটছে চরম দুর্দশায়

নীলফামারীতে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে, সনাতন ধর্মাম্বাবলীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। উৎসব চলবে ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত। আর এই উৎসবকে কেন্দ্র করে ব্যস্ত সময় পার করছেন জেলার ঢাক, ঢোলের কারিগররা। জমে উঠেছে পুজার মূল বাদ্যযন্ত্র ঢাক ও ঢোলের বাজার।  

পুজার আরতি ও মন্ত্র পাঠের সময় ঢাক ও ঢোলের বিকল্প নেই। ঢাকঢোলের বাদ্য ছাড়া পূজার উৎসব যেন অপূর্ণ থাকে। তবে উৎসবকে প্রাণোদনা এনে দেওয়া এই ঢাকের কারিগরদের জীবন কাটছে চরম দুর্দশায়।   

নীলফামারীর ঢাকি পল্লীতে যেয়ে সরেজমিনে দেখা যায়, ঢোল তৈরীতে কারিগররা দেশীয় আম, জাম, রেইনট্রি কড়াই ও মেহগনি কাঠ ঢাকের ছাউনির জন্য এবং ছাগল, ভেড়া ও মহিষের চামড়া বেড়ি দেওয়ার জন্য ব্যবহার করে থাকেন। তবে, এবছর চামড়ার দাম সহনীয় পর্যায় থাকলেও কাঠের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন এ শিল্পের কারিগররা। 

এবাদেও, পরিবহন খরচ বৃদ্ধির কারনে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তারা। তাই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে না পেরে অনেকেই এ পেশা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন অন্য পেশায়। 

এদিকে, সমাজ সেবা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে যে জেলায় প্রায় ২শত ৬০টি পরিবার ঢোলের কারিগর হিসেবে নিয়োজিত আছেন। এর মধ্যে সদর উপজেলার রামনগর ইউনিয়নের বাহালী পাড়া গ্রামে ও রামনগর বাসার বাড়ী বেহারা পাড়া গ্রামে ৫০টি পরিবার ঢাক-ঢোল, দোতারা, ডুগি-তবলা, খোল, খঞ্জনী ও একতারাসহ নানা প্রকার বাদ্যযন্ত্র তৈরী ও মেরামত করে থাকেন। 

এ সব বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে ঢাক, ঢোল এবং খোল দেশের চাহিদা মিটিয়ে এক সময় পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, নেপালসহ বেশ কয়েকটি দেশেও রপ্তানি হত। সীমান্তবর্তী এলাকায় নীলফামারী জেলার অবস্থান হওয়াতে ভারতে এসব বাদ্যযন্ত্রের কদরও ছিল প্রচুর।

বর্তমানে ঢোলের কারিগরদের দুর্দশা নিয়ে জেলা শহরের গাছবাড়ী ডালপট্টী এলাকার ঢোলের কারিগর হিসেবে ৩৫ বছর কাজ করা সাগর চন্দ্র দাস বলেন, "আগে একটি ঢোল বিক্রি হতো ৬ থেকে ৭ হাজার টাকায়। আর বর্তমানে এ ঢোল বিক্রি হচ্ছে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকায়। বর্তমানে আধুনিক বাদ্যযন্ত্রে বাজার সয়লাব।"

তিনি আরো বলেন, "একসময় ভালো আবস্থা থাকলেও বর্তমানে এ পেশায় সংসারের খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ছেলেমেয়ের লেখা পড়ার খরচতো দুরের কথা দুবেলা দুমুঠো ডাল ভাতই জোটে না কপালে। জোটেনা পুজা পার্বনে ছেলেমেয়ের জন্য কোন নতুন কাপড় কিংবা মিস্টি মুখ করার মত টাকা পয়সা।"

তবে এ পেশায় আগ্রহ হারালেও পূর্বপুরুষের পেশার ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য এখনও এতেই নিয়োজিত রয়েছেন সাগর চন্দ্র দাস। 

নীলফামারী সদরের রামনগর ইউনিয়নের বাহালী পাড়া গ্রামের সুবাস ঋষি বলেন, "এক সময় দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে কাজের অর্ডার আসতো। কিন্ত এখন আর তেমন কাজের অর্ডার আসে না। বর্তমানে দুর্গা পূজার জন্য ঢাক মেরামত তৈরীর কিছু কাজ পেয়েছি।" 

এ বিষয়ে জেলা শহরের হাড়োয়া দুর্গা মন্ডবের পুরোহিত শ্রী মহেষ চন্দ্র রায় বলেন, "ঢাকের বোলে জগৎ জননী মায়ের পূজা আনন্দময় হয়ে উঠে। পূজায় ষোল কলা পূর্ণ করতে ঢাক বা ঢোলের কোন বিকল্প নেই।"

এদিকে ঐ মন্দিরের ঢাকি হৃদয় ঋষি বলেন, "জিনিস পত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই প্লাস্টিকের তৈরী ঢাকের মধ্যে ছাউনি দিয়ে পুজার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের প্রতিযোগিতায় হারিয়ে যাচ্ছে পুরনো দিনের এই সব ঢাকঢোল সহ আরো অনেক ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র। 

নীলফামারী স্বর্নালী সুর সঙ্গীত একাডেমির সভাপতি ফেরদৌস আলম বলেন, "আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের দাপটে ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। এ সস্প্রদায়কে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারের হস্তক্ষেপ একান্ত প্রয়োজন।" 

উল্লেখ্য, আগের দিনে ঢোল, ডুগি-তবলা, হারমোনিয়াম ছাড়া গানের আসরই জমতো না। তবে, আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের সহজলভ্যতায় দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের চাহিদা অনেকটাই কমে গেছে। যদিও, আজও মূলধারার বাঙালী সংস্কৃতির চর্চায় এসব দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের কোন বিকল্প নেই।  

তবে কিনা এই মূল ধারার বাঙালী সংস্কৃতির ধারক এইসব দেশজ বাদ্যযন্ত্রের যে কারিগরেরা তারাই আজ সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত। তারা দিন কাটাচ্ছেন নিদারুন কষ্ট এবং দুর্দশায়। কিন্তু, সরকারি সহযোগিতা পেলে এই শ্রেনী পেশার মানুষকে আর্থিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করার সূযোগ এখনও রয়েছে।  

নীলফামারী জেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ইমাম হাসিম এ প্রসঙ্গে ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, "প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট ওই ২৬০ পরিবারের কথা জানানো হয়েছে। আশা করি, দ্রুতই তাদের সমস্যার সমাধান করা হবে। সরকারিভাবে তাদের সহযোগিতার জন্য সরকার নানা পদক্ষেপ ইতোমধ্যেই হাতে নিয়েছে।"

এ ব্যাপারে, জেলা প্রশাসক বেগম নাজিয়া শিরিন বলেন, "এই অঞ্চলের তৈরি ঢাকঢোল অনেক ঐতিহ্যবাহী। তবে, আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের কারণে হারিয়ে যেতে বসেছে আমাদের জেলার এই সুপ্রাচীন ঐতিহ্য। আমি ইতোমধ্যেই সমাজসেবা দপ্তরের কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিয়েছি উপজেলা ভিত্তিক তাদের সমিতির মাধ্যমে ঢোলের কারিগর ঐ ২৬০টি আর্থিক সহায়তা প্রদানের জন্য।

তবে, আশ্বাস অনেক থাকলেও এখনও চরম দুর্দশাতেই দিন কাটাচ্ছেন নীলফামারীর এইসব ঢাকের কারিগরেরা। এর ফলে বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে দেশের ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প। তবে আশা এখনও আছে। সরকার আন্তরিক উদ্যোগ নিলে এই শিল্পে জড়িত এই ২৬০টি দুর্দশাগ্রস্ত পরিবারের ভাগ্য ফেরানোর সুযোগ এখনও রয়েছে। তাহলেই হয়ত মানুষের আনন্দ উৎসবকে পূর্ণতা এনে দেওয়া এই মানুষগুলোর মুখে হাসি ফুটবে। আর তাহলেই হয়ত বেঁচে থাকবে হাজার বছর ধরে চলে আসা বাঙালীর এই ঢাকঢোলের ঐতিহ্য। সহযোগিতা পেলে পুজার এই উৎসব এইসব দুর্দশাগ্রস্ত পরিবারেরও উৎসব হয়ে উঠবে।