• বুধবার, নভেম্বর ১৪, ২০১৮
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:১৫ রাত

‘এই রুপালি গিটার ফেলে…’

  • প্রকাশিত ১২:৩৬ দুপুর অক্টোবর ১৮, ২০১৮
আইয়ুব বাচ্চু
চলে গেলেন আইয়ুব বাচ্চু। ছবি: সৌজন্য

বাবার কাছ থেকে কৈশোরে গিটার উপহার পেয়েছিলেন আইয়ুব বাচ্চু

নব্বইয়ের কোন এক গ্রীষ্মের দুপুর। স্কুল ছুটি, কাঁধে ব্যাগ নিয়ে মফস্বলের রাস্তা ধরে হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ফিরছে এক কিশোর। বাসায় পৌঁছে কাঁধ থেকে ব্যাগটা নামিয়ে সে সোজা চলে যায় ক্যাসেট প্লেয়ারের কাছে। হাতে তার একদম নতুন একটা ক্যাসেট, ‘অচেনা জীবন-আনপ্লাগড, এলআরবি’। ক্যাসেটটা চালিয়ে সে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ে। নাওয়া-খাওয়া বাদ, আগে সবগুলো গান শোনা হবে, পরে বাকি সব কাজ!

এই গল্পটা নব্বইয়ের দশকের অনেক কিশোরেরই চেনা গল্প। আর তাদের সবারই প্রিয় নাম আইয়ুব বাচ্চু। গানে এবং গিটারে যিনি ধরে রেখেছিলেন তাঁর শ্রোতাদের। আইয়ুব বাচ্চু এবং এলআরবি-এর ভক্ত সেই কিশোর পত্রিকা পড়ে জেনেছিল, বাবার কাছ থেকে কৈশোরে গিটার উপহার পেয়েছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। সেই থেকে গিটারই তাঁর সঙ্গী। গিটারেই যেন জীবনটা বেঁধে ফেলেছিলেন। চট্টগ্রামের দূরন্ত শৈশব-কৈশোর পেরিয়ে চলে আসেন ঢাকায়। ঢাকায় এসে ব্যান্ডের সঙ্গে জুড়ে গেলেন। প্রথমে ফিলিংস, তারপর একটা দীর্ঘ সময় সোলস-এ, বাজাতেন লিড গিটার, এরপর ১৯৯২ সালে নিজেই শুরু করলেন এলআরবি। প্রথমে এলআরবি মানে ছিল ‘লিটল রিভার ব্যান্ড’। পরে এই নামে বিদেশি ব্যান্ড থাকায় নাম এলআরবি রেখেই অর্থ পরিবর্তন করা হয়, এলআরবি মানে হয় ‘লাভ রানস্ ব্লাইন্ড’।

এলআরবি আর আইয়ুব বাচ্চু মানেই গিটার আর সুরের দারুন সমণ্বয়। ক্যাসেট, সিডি প্লেয়ার, এমপিথ্রি কাল পেরিয়ে প্রথম আইয়ুব বাচ্চুর কনসার্ট দেখি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চে। ৩০ ব্যাচের র‍্যাগের অনুষ্ঠান। কৈশোরের সেই রকস্টার, যার গান শুনে শুনে মুখস্থ হয়ে গেছে, মাঝে মাঝেই মাথায় বাজে যার গান, সেই আইয়ুব বাচ্চু, সেই এলআরবি চোখের সামনে। শীতের রাত, গান হচ্ছে, একমনে গিটার বাজাচ্ছেন আইয়ুব বাচ্চু। 

আইয়ুব বাচ্চু মানেই মানুষের ঢল।  শুধু ক্যাম্পাসের ছাত্ররাই নয়, আশেপাশের এলাকা থেকেও প্রচুর মানুষ এসেছেন কনসার্ট দেখতে। সবাই মুগ্ধ আইয়ুব বাচ্চুতে। একের পর এক গান গেয়ে চলছেন, সব গানেই মানুষের দারুন সাড়া। সবাই প্রতিটা লাইন গাচ্ছে আইয়ুব বাচ্চুর সাথে। পরে যখন গিটার বাজাচ্ছেন একদম নিস্তব্ধতা, সবাই মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুধু শুনছে। ঘণ্টা দুয়েকের কনসার্ট শেষ হলো। শ্রোতারা তৃপ্ত। এবার ঘরে ফেরার পালা। কনসার্ট শেষে সবাইকে ধন্যবাদ দিয়ে আইয়ুব বাচ্চু বললেন, ‘সবাই ভালো থাকবেন। আবার দেখা হবে। আপনারা যতবার ডাকবেন, আমরা ততবার আসবো’। বলেই ব্যাকস্টেজে চলে গেলেন। 

আজও সবাইকে মাতিয়ে ব্যাকস্টেজেই চলে গেলেন আমাদের সময়ের অন্যতম সেরা গিটারিস্ট, রকস্টার আইয়ুব বাচ্চু। তবে আমরা যতোই ডাকি তিনি আর আসবেন না। ডাকলেও একদিন যে আসতে পারবেন না সেটা তিনি জানতেন, আমরাও জানতাম। তিনি তো গানে গানে বলেই গেছেন,

‘এই রুপালি গিটার ফেলে/ একদিন চলে যাবো দূরে, বহুদূরে/ সেদিন চোখের অশ্রু তুমি রেখো/ গোপন করে..’

ধন্যবাদ আইয়ুব বাচ্চু আমাদের কৈশোরটা গানে গানে পূর্ণ করে দেবার জন্য। ওপারে নিশ্চয়ই মাতিয়ে রাখবেন সবাইকে।