• বুধবার, নভেম্বর ১৪, ২০১৮
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:১৫ রাত

ভ্রমণ: লালনের আখড়ায় দুই দিন

  • প্রকাশিত ০৩:৩৭ বিকেল অক্টোবর ২৩, ২০১৮
লালন সাঁইজির মাজার
লালন সাঁইজির মাজার। ছবি: ঢাকা ট্রিবিউন

মেলার প্রথম দিন আমি যখন সাঁইজির মাজারে পৌঁছাই তখন প্রায় মধ্যরাত। অথচ পুরো এলাকাটা তখনও উৎসবের আমেজে জ্বলজ্বল করছে, মুখরিত হয়ে আছে লালন শিল্পীদের গান আর পরিবেশনায়

“মানুষ ভোজলে সোনার মানুষ হবি” - এই সার্বজনীন দর্শনের জনক ফকির লালন শাহ চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন কুষ্টিয়া জেলার চেউরিয়ায় অবস্থিত তার মাজারে। লালন গীতি আর তার জীবনদর্শনের সান্নিধ্যে এসে নাগরিক ব্যস্ততা থেকে কিছুটা সময়ের জন্য রেহাই পেতে যারা এখানে আসেন, তাদের কাছে এই অসামান্য কথাটুকু মানবতা ও ভালোবাসার মহান বার্তা পৌঁছে দেয়।

বাউল সম্রাটের মহাপ্রয়াণের স্মরণে কুষ্টিয়ার ‘লালনের আখড়া’য় অক্টোবরের ১৬ থেকে ১৮ তারিখ তিন দিন ব্যাপী এক “লালন মেলা” যৌথ উদ্যোগে আয়োজন করে লালন একাডেমি ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়। 

সাঁইজির মাজারে চারপাশের আলো, বাতাস, পানি, পুরো পরিবেশ আমাকে একটা পবিত্রতা আর নির্মলতার বন্ধনে মোহাবিষ্ট করে রেখেছিল। ভেবে ভালো লাগছিল সেখানে আমি একা নই, মাজারে কাটানো সময়ে আমাকে সঙ্গ দিয়েছেন সাঁইজির দুজন ভক্ত যারা নিজেদের সুখ সমৃদ্ধির জীবনকে স্বেচ্ছায় ত্যাগ করে এখানে চলে এসেছেন শুধুমাত্র এই মহামানবের শিষ্যত্ব পাবার আকাঙ্ক্ষায়।

তাদের একজন হলেন ফ্রান্সের নাগরিক, এক স্কুল শিক্ষক দেবরাহ জান্নাত চুকিরমান। যখন জানতে চাইলাম ফ্রান্সের জীবনযাপন থেকে লালনের “সহজিয়া” জীবনদর্শনের পার্থক্যটা তার  দৃষ্টিতে কেমন; জবাবে তিনি জানালেন এই দর্শনটির মূলমন্ত্র হচ্ছে “অনস্তিত্ব”।

দেবরাহ বললেন, “বছর তিনেক আগে আমি ইউটিউবে প্রথম আমি প্রথম লালনের ভক্তিমূলক গানগুলোর সাথে পরিচিত হই। এরপর কয়েকদিন আমি তার গানের মর্মার্থ বোঝার চেষ্টা করি। বোঝার পর আমি মুগ্ধ হয়ে যাই। ওই গানগুলোই আমাকে টেনে এনেছে এতদূর এই কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে; এখানে স্বার্থহীনভাবে মানুষের সেবা করে যাবার মূলমন্ত্রে নিজেকে সপেছি।” 

তিনি আরও বললেন মানুষ নিজের জীবনের গূঢ় অর্থ তখনই বুঝতে পারে, যখন সে সবকিছু ত্যাগ করে, সব কামনা বিসর্জন দেয় আর একমাত্র মানবতার ধর্মে বিশ্বাস করে।

লালন মেলা। ছবি: ঢাকা ট্রিবিউন

চেক প্রজাতন্ত্র থেকে ফকির ললন শাহের ১২৮তম মৃত্যুবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষ্যে আগত আরেকজন লালন অনুসারী ও গবেষক হ্যান্স ক্রিস্টি বললেন যে লালনের গানগুলো আপাতভাবে ধর্মীয় মতাদর্শ প্রতিফলিত করলেও নিহিত অর্থে তিনি সরল ও সহজিয়া জীবনদর্শনের দিকে ইঙ্গিত করেছেন যেখানে অজ্ঞতার কোনো স্থান নেই।

অনুষ্ঠানের প্রথম দিন চেউরিয়ার কালীগঙ্গার তীর থেকে শুরু করে লালনের মাজার পর্যন্ত হাজার হাজার লালন ভক্ত, কবি, কুমারখালী উপজেলার স্থানীয় লালন শিল্পী এবং লালন একাডেমির বাউলেরা আসর জমিয়েছিলেন।

কুষ্টিয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের সহ সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ এই মেলার শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেন। তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু ছিলেন উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি। লালনের “সহজিয়া” জীবনদর্শন বিষয়ে তিনি বক্তব্য রাখেন এবং এই আদর্শকে ধারণ করে বাংলাদেশকে আরও শান্তিপূর্ণ দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে আহ্বান জানান তিনি।

মেলার প্রথম দিন আমি যখন সাঁইজির মাজারে পৌঁছাই তখন প্রায় মধ্যরাত। অথচ পুরো এলাকাটা তখনও উৎসবের আমেজে জ্বলজ্বল করছে, মুখরিত হয়ে আছে লালন শিল্পীদের গান আর পরিবেশনায়। 

আমি ভাগ্যবান ছিলাম, কেননা আমি “আনন্দ নগর” নামের একটি গানের দলের সাথে পরিচিত হতে পেরেছিলাম, যারা পরের দিনে অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। আমি সেই প্রস্তুতিগুলোর খুঁটিনাটি নিবিড়ভাবে দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম।

“যেইখানে সাঁইয়ের বারামখানা”, “বাড়ির কাছে আড়শি নগর”, “ভজ রে আনন্দের গৌড়াঙ্গ”, “এ বেলা তোর ঘরের খবর জেনে নে রে মন” আর “আমি অপার হয়ে বসে আছি ওহে দয়াময়” - লালনের এই পাঁচটি গান “আনন্দ নগর” দলটি অল্পকিছু দর্শকের সামনেই অনুশীলন করে নিল।

দলটির একজন গায়ক আসিফ জানালেন এই গানগুলো তারা মানুষের কাছে জনপ্রিয়তা পাওয়ার উদ্দেশ্যে করেন না। বরং “সহজিয়া” জীবনদর্শনকে আত্মীকরনের জন্য ও মানবতার বার্তা মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য করেন। 

রোদের তীব্রতায় ২য় দিনে ভক্ত ও দর্শনার্থীদের বেশিরভাগই আখড়ায় ভীড় করেছিলেন। মানুষ এতই বেশি ছিল যে আমি একটা পরিবেশনাও নির্বিঘ্নে উপভোগ করতে পারিনি। 

এক জুটির দ্বৈত পরিবেশনার কথা না উল্লেখ করলেই নয়, যেটা আমাকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছিল। তারা স্থানীয় চারণ-বাউল ও লালনের একনিষ্ট ভক্ত। “চল যাই আনন্দের বাজারে”, “চাতক বাঁচে কেমনে, মেঘের বর্ষণ বিনে” ও “কে বুঝে তোমার অপার লীলা আল্লাহ” এই তিনটি গান পরিবেশন করেছেন এই বাউলদ্বয়।

আমি পুরো ভ্রমনটা করেছি একটি গ্রুপের সাথে, যাদের নাম “দ্য ফ্ল্যাগ গার্ল”। পরিবার ছাড়া এটা আমার প্রথম একা ভ্রমণ, যেখানে আমার সাথে আরও নয়জন নারী ছিলেন, যাদের প্রত্যেকে দেশের ভিন্ন জেলার, ভিন্ন পেশার, ভিন্ন প্রেক্ষাপট থেকে আসা। আমাদের দশ জনের চিন্তা-চেতনা-মতাদর্শ সম্পূর্ণ আলাদা ছিল সাঁইজির মাজারে আসার আগ পর্যন্ত, যা ফেরার পথে এক সুতোয় গেথে যায়। 

নয় ঘন্টার ক্লান্তিকর বাস যাত্রার পর সেখানে পৌঁছে লালনের গানের যাদুতে এক নিমিষেই উবে যায় সব ক্লান্তিবোধ।

সাঁইজির মাজার থেকে বিদায়ক্ষণে আমাকে ফকির লালন শাহের সচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ একজন শিষ্য আমায় আশীর্বাদ করে বললেন যেন আমি জীবনটাকে ভিন্নভাবে দেখতে শিখি, নিজেকে প্রতিনিয়ত আরও উন্মুক্ত করার চ্যালেঞ্জ নিতে শিখি আর মহাপরাক্রমশালী স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস রেখে চলি। সাঁইজির গানের সাথে সাথে তার কথাগুলোও আমার কানে মন্ত্রের মতো বাজছে। 

নাফিসা নাজমুল, সঙ্গীত প্রেমী এবং ঢাকা ট্রিবিউনের শো-টাইম ডেস্কের একজন শিক্ষানবিশ