• বুধবার, মার্চ ২০, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:৫৬ রাত

জননী রমা চৌধুরী

  • প্রকাশিত ০৪:৩৩ বিকেল ডিসেম্বর ১৬, ২০১৮
রমা চৌধুরী
রমা চৌধুরী ছবি - সৌজন্য

রমা চৌধুরীর জীবনটা যেন গানের প্রতিটি লাইনের মতো। কতটা আত্মপ্রত্যয়ী হলে তিনি নিজের দুঃসহ দিনের কথা, নিজের কষ্টের কথা, নিজের সম্ভ্রম হারানোর কথা নিজেই লিখে যান বইয়ে

১.

বাংলাদেশ সৃষ্টির পেছনে যে ক’জন বীরাঙ্গনার সম্ভ্রমহানির ইতিহাস জড়িয়ে আছে তাঁদের মধ্যে অন্যতম তিনি। তিনি তাঁর সর্বস্ব দিয়ে বাংলাদেশটা বিনয় দত্তআমাদের উপহার দিয়েছেন। এই দেশের জন্য তিনি তাঁর সম্ভ্রম উৎসর্গ করেছেন, উৎসর্গ করেছেন জীবনের অনেক খ্যাতিময় অর্জন। তাঁর ত্যাগের পিছনে লুকিয়ে আছে অনেক অজানা গল্প, অনেক অজানা সত্য।

যে জাতীয় পতাকা আজকে আমাদের কাছে পরম শ্রদ্ধার, যা নিয়ে আমাদের গর্ব সেই জাতীয় পতাকার মাঝে অন্তর্নিহিত হয়ে আছে তাঁর গল্প। ১০:৬ ফুট দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের আয়তক্ষেত্রাকার গাঢ় সবুজ এবং মাঝখানে লাল বৃত্তের জাতীয় পতাকার মধ্যে লুকিয়ে রমা চৌধুরী, তারামন বিবি, জয়ন্তী বালা দেবী, আছিয়া বেগম সহ অসংখ্য বীরাঙ্গনাদের গল্প, যাঁরা নিজেদের সবচেয়ে পবিত্র সম্পদটুকু দেশের জন্যে উৎসর্গ করেছেন। বলছিলাম রমা চৌধুরীর কথা, যিনি নিজেই একজন আদর্শ ও অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে স্বীয় আমাদের কাছে।

‘...স্বপ্ন দেখব বলে  

আমি দুচোখ মেলেছি

..............................

তাই স্বপ্ন দেখব বলে আমি দুচোখ মেলেছি’

ভারতীয় বাঙালি সংগীত শিল্পী ও গীতিকার মৌসুমী ভৌমিকের মতো রমা চৌধুরীও জীবন সায়াহ্নে বলেছিলেন, ‘আমি বাঁচতে চাই।’ নতুন করে স্বপ্ন দেখার প্রয়াস নিয়ে বাঁচতে চেয়েছিলেন। শেষ বয়সে এসে তাঁর শরীরে বাসা বেঁধেছে ডায়াবেটিস, গল ব্লাডারে পাথর, উচ্চ রক্তচাপ-সহ নানান জটিল রোগ। এইসব রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালের বেডে তিনি স্বপ্ন দেখতেন নতুন করে বাঁচবার। আরো কিছু বলবার, দেশকে নতুন করে কিছু দেবার, দেশের জন্য নতুন উদ্দীপনায় কিছু করার, সারা দেশে তাঁর প্রিয় অনাথশ্রমের শাখা গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন।

‘....তোমার আমার ক্লান্ত দেহ,

শব্দে কথায় ভারাক্রান্ত।

কত রকম কথা বলা

বলতে বলতে চলতে চলতে

পৌঁছে গেছি এ কোন প্রান্ত।’

মৌসুমী ভৌমিকের গানের মতো রমা চৌধুরীও ছিলেন আত্মপ্রত্যয়ী। বয়স এবং অসুস্থতা দৃশ্যত রমা চৌধুরীকে ক্লান্ত করলেও মনের শক্তিতে তিনি অসীম শক্তির অধিকারিণী তখনো পর্যন্ত। যে বীভৎসতা, যে দুর্বিপাক, যে পীড়ন-নির্যাতন, কথার তীর্যক আঘাত, অপমান, গ্লানি তিনি দেখেছেন, সহ্য করেছেন তার তুলনায় তাঁর শারীরিক অসুস্থতা কিছুই নয়। তিনি অসম্ভব তেজস্বী একজন নারী, যার ছায়াতলে যুগের পর যুগ রইলেও তিনি ছায়া সরাবেন না, বরং পরম মমতায় কোলে তুলে নিবেন।


২.

১৯৪১ সালের ১৪ অক্টোবর চট্টগ্রামের বোয়ালখালী থানার পোপাদিয়া গ্রামে রমা চৌধুরীর জন্ম। মাত্র তিন বছর বয়সে বাবা রোহিনী চৌধুরীকে হারান। রোহিনী বাবুকে হারিয়ে পরিবারের স্বচ্ছল অবস্থার করুণ পরিস্থিতি তৈরি হলেও রমা চৌধুরীর মা মোতিময়ী চৌধুরী থেমে থাকার মানুষ নন। মোতিময়ী চৌধুরী শত বাধা পেরিয়ে তাঁকে পড়াশোনা জন্যে অনুপ্রেরণা দিয়ে যান। মায়ের অনুপ্রেরণায় ১৯৫২ সালে মাত্র ১১ বছর বয়সে বোয়ালখালীর মুক্তকেশী গার্লস হাইস্কুল থেকে এসএসসি এবং ১৯৫৬ সালে কানুনগোপাড়া কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। সেই সময় মেয়েদের এইচএসসি পড়া মানে অনেক দূর এগিয়ে যাওয়া। অল্প পড়াশোনার পর মেয়েদের বিয়ে দিয়ে শ্বশুরবাড়ি পাঠিয়ে দিতো। শুধু মায়ের অনুপ্রেরণায় তিনি ১৯৫৯ সালে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে ডিগ্রি পাস করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ভর্তি হন।

মায়ের উৎসাহ ও উদ্দীপনায় ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। ষাটের দশকে তখন নারীদের উচ্চশিক্ষা এতো সহজ ছিল না। সেই সময় রমা চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।

দক্ষিণ চট্টগ্রামের তিনিই প্রথম নারী, যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। পড়াশোনার প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল প্রবল। তাই তিনি এক সাক্ষাৎকারে জানান, ‘সুযোগ পেলে আবার ভর্তি হতে চাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে মাস্টার্সটা করতে চাই ইংরেজিতে।’

তাঁর পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ দেখে সলীল চৌধুরীর মতো বলতে হয়,

‘....দুস্তর বাঁধা প্রস্তর ঠেলে

বন্যার মত বেরিয়ে

যুগ সঞ্চিত সুপ্তি দিয়েছে সাড়া

হিমগিরি শুনল কি সূর্যের ইশারা

যাত্রা শুরু উচ্ছল চলে দূর্বার বেগে তটিনী,

উত্তাল তালে উদ্যাম নাচে মুক্ত স্রোত নটিনী.....’

রমা চৌধুরীর জন্ম অন্য সাধারণ নারীদের মতো হতে পারতো, স্বামী সংসার, সন্তান-সন্ততি নিয়ে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখে দিন পাড় করতে পারতেন, কিন্তু তিনি তা পারেননি। মাত্র ২০ বছর বয়সে কক্সবাজার বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। দীর্ঘ এক যুগের উপরে তিনি বিভিন্ন উচ্চবিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে চলতে চলতে তিনি বৈবাহিক জীবনে আবদ্ধ হন। এরই মধ্যে আসে উনিশো একাত্তর, স্বাধীনতা যুদ্ধ।

১৯৭১ সালে যখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয় তখন তিনি চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর বিদুগ্রাম উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা হিসেবেই কর্মরত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ রমা চৌধুরীর সামনে মূর্তিমান আতংক হয়ে দাঁড়ায়। এই সময় তাঁর স্বামী তাঁকে ছেড়ে দেশান্তরী হয়ে যান। সাগর আর টগর দুই সন্তানকে নিয়ে রমা চৌধুরী পৈতৃক ভিটা পোপাদিয়ায় বসবাস শুরু করেন।

১৯৭১ সালের ১৩মে সকালবেলা, পোপাদিয়ায় স্থানীয় রাজাকারদের সহযোগিতায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীরা রমা চৌধুরীর বাড়িতে আক্রমণ চালায়। সেদিন পাকিস্তানি এক সৈনিক তাঁর সম্ভ্রম কেড়ে নেয়। তাঁর উপর চালায় শারীরিক নির্যাতন। এই ক্ষত তিনি কখনোই ভুলতে পারেননি।

ওই বিভীষিকার বর্ণনা রয়েছে তাঁর “একাত্তরের জননী” বইয়ে। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘যখন আমাকে নির্যাতন করতে উদ্যত হলো পাক সেনা, তখন জানালার পাশে দাঁড়ানো আমার মা ও দুই ছেলে বারবার আকুতি করছিলেন। ছিল আমার পোষা বিড়াল কনুও। তখন আমি মাকে আমার সন্তানদের নিয়ে সরে যেতে বলেছিলাম।’

সম্ভ্রম হারানোর পর রমা চৌধুরী পাকিস্তানি দোসরদের হাত থেকে পালিয়ে পুকুরে নেমে আত্মরক্ষা করেছিলেন। হানাদাররা তাঁকে না পেয়ে গানপাউডার দিয়ে ঘরবাড়িসহ যাবতীয় সহায় সম্পদ সবকিছুই পুড়িয়ে দেয়। এই সময় এলাকাবাসী কেউ কেউ তাঁর প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর নিজের আত্মীয়রাই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। রমা চৌধুরী তাঁর ‘একাত্তরের জননী’ বইয়ে লিখেছেন, ‘...আমার আপন মেজো কাকা সেদিন এমন সব বিশ্রী কথা বলেছিলেন, লজ্জায় কানে আঙুল দিতে বাধ্য হই। আমি লজ্জায় মুখ দেখাতে পারছি না, দোকানে গিয়ে কিছু খাবারও সংগ্রহ করতে পারলাম না মা ও ছেলেদের মুখে দেবার জন্য।’

ঘরবাড়ি সহায় সম্বলহীন বাকি আটটি মাস তিনি দুইপুত্র সাগর, টগর আর বৃদ্ধ মাকে নিয়ে জলে-জঙ্গলে লুকিয়ে লুকিয়ে দিন পাড় করেছেন। পোড়া ভিটায় কোনোরকমভাবে পলিথিন আর খড়কুটো মাথায় আর গায়ে দিয়ে রাত কাটিয়েছেন। এইভাবে বহু কষ্টে যুদ্ধের দিনগুলো পাড় করেন।

‘তবু কিছুই যায় না বলা

শব্দ খেলায় কেবল ফাঁকি

কথার পিঠে কথা সাজাই

আমরা এখন একলা থাকি...

আমরা এখন একলা থাকি।’

রমা চৌধুরীর জীবনটা যেন গানের প্রতিটি লাইনের মতো। কতটা আত্মপ্রত্যয়ী হলে তিনি নিজের দুঃসহ দিনের কথা, নিজের কষ্টের কথা, নিজের সম্ভ্রম হারানোর কথা নিজেই লিখে যান বইয়ে। সেই সময়ের আত্মীয়, পরিজন, সমাজ, ধর্ম, সংস্কার সবকিছুরই শেষ মার্জিন তিনি দেখেছিলেন তাই তিনি নিজেই নিজের পথ বেছে নিয়েছেন।


৩.

মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল সময়ে তাঁর ছেলে সাগর ছিল সাড়ে পাঁচ বছরের। দুরন্ত সাগর মিছিলের পেছনে পেছনে ‘জয় বাংলা, জয় বাংলা’ বলে ছুটে বেড়াত। রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে একসময় সাগর নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ১৯৭১ সালের ২০ ডিসেম্বর মারা যায়। সাগরের মৃত্যুর ১ মাস ২৮ দিনের মাথায় ৩ বছরের ‍টগরও মারা যায়। ছেলেদের হিন্দু সংস্কারে না পুড়িয়ে তিনি মাটি চাপা দেন। দুই সন্তানের দেহ মাটিতে আছে বলে রমা চৌধুরী জুতা পড়া বন্ধ করে দেন।

ছেলেদের মৃত্যুর স্মৃতি কখনোই তিনি ভুলতে পারেননি। খালি পায়ে হাঁটতে হাঁটতে একসময় তাঁর পায়ে ঘা হয়ে যায়। আত্মীয়স্বজনদের জোরাজুরিতে তিনি অনিয়মিতভাবে তখন জুতা পড়া শুরু করেন।

‘হয়ত তুমি পাশেই আছো

তবু তোমায় ছুঁতে কি পাই

তোমার বুকে ব্যথা ছিল

কেমন করে কথা দিয়ে

সেই ব্যথাতে আঙ্গুল বুলাই’

পর পর দুইটি সন্তান হারিয়ে রমা চৌধুরীর প্রায় পাগলপ্রায় হয়ে গিয়েছিলেন। সন্তান হারানোর কষ্ট যে কতটা কঠিন তা একমাত্র মা’ই জানেন। সেই কঠিন সময়ও তিনি পাড় করেছেন। প্রিয় সন্তানদের শোক তাকে ভয়ানক কাতর করে তোলে। সেই কাতরতায় তিনি দীর্ঘ সময় পাড় করেছেন।

প্রথম সংসারের পরিসমাপ্তি ঘটলে রমা চৌধুরী দ্বিতীয় বারের মতো সংসার বাঁধার স্বপ্ন দেখেন। দ্বিতীয় বার সংসার বাঁধতে গিয়ে প্রতারণার শিকার হন। দ্বিতীয় সংসারের ছেলে টুনু ১৯৯৮ সালের ১৬ ডিসেম্বর বোয়ালখালীর কানুনগোপাড়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। টুনুর মৃত্যুর পর রমা চৌধুরী একেবারের মতো জুতা ছেড়ে দেন।

মৌসুমী ভৌমিকের গানের মতো রমা চৌধুরীও নিজের কথাগুলোকে লিখে গেলেন।

‘আমার কিছু কথা ছিলো

...........................

বুঝতে হলে কথার মানে,

চেনা পথের বাহিরে চল।’

যুদ্ধপরবর্তী সময়ে তিনি লেখালেখিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। তিনি বলতেন, ‘আমার কুষ্ঠিতে লেখা আছে আমি লেখ্যবৃত্তি গ্রহণ করেই জীবিকা নির্বাহ করব। অনেকটা সে কথাকে বাস্তবায়ন করার জন্যই লিখছি। আর এ ছাড়া এই অবস্থায় আমার অন্য কিছু করারও সুযোগ নেই। বাঁচতে হলে অর্থের প্রয়োজন। আমি কারো গলগ্রহ হতে কখনো পছন্দ করতাম না, এখনো করি না।’

প্রথমে তিনি একটি পাক্ষিক পত্রিকায় লিখতেন। সম্মানীর বিনিময়ে তাঁকে পত্রিকার ৫০টি কপি দেয়া হত। সেই পত্রিকা বিক্রি করেই চলত তাঁর জীবনজীবিকা। পরে তিনি নিজেই নিজের লেখা বই প্রকাশ করে বই ফেরি করতে শুরু করেন। তাঁর সমস্ত বইয়ের প্রকাশক আলাউদ্দিন খোকন ছায়াসঙ্গী হিসেবে সবসময়ই তাঁর পাশে থেকেছেন।

প্রবন্ধ, উপন্যাস ও কবিতা সবমিলিয়ে তিনি নিজের ১৮টি গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে ‘রবীন্দ্রসাহিত্যে ভৃত্য’, ‘নজরুল প্রতিভার সন্ধানে’, ‘স্বর্গে আমি যাব না’, ‘চট্টগ্রামের লোকসাহিত্যে জীবনদর্শন’, ‘শহীদের জিজ্ঞাসা’, ‘নীল বেদনার খাম’, ‘সেই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’, ‘ভাববৈচিত্র্যে রবীন্দ্রনাথ’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

‘যদি সবাই থাকে মুখ ফিরায়ে

সবাই করে ভয়–

তবে পরান খুলে

ও তুই মুখ ফুটে তোর মনের কথা

একলা বলো রে।’

কবিগুরুর এই কথাটি রমা চৌধুরী পদে পদে অনুসরণ করেছেন। তিনি নিজেই নিজের বই ফেরি করে বিক্রি করেছেন। নিজের লেখা বইগুলো তিনি সকলের মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছেন। এ থেকে প্রতি মাসে তাঁর হাজার বিশেক টাকার মতো আয় হত। এ দিয়েই তিনি থাকা খাওয়ার সংস্থান করেছেন।


৪.

চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী চেরাগী পাহাড়েই লুসাই ভবনের অবস্থান। সেই ভবনের ৪০৮ নম্বর কক্ষটিতে থাকতেন রমা চৌধুরী। তাঁর সঙ্গে থাকত চারটি বিড়াল। আর তাঁর ছায়াসঙ্গী আলাউদ্দিন খোকন। এই কক্ষ থেকেই তিনি প্রতিদিনের জীবনযুদ্ধে নামতেন। লেখালেখির পাশাপাশি তিনি একই সঙ্গে পরিচালনা করেছেন ‘দীপংকর স্মৃতি অনাথালয়’ নামের একটি অনাথ আশ্রম। প্রচণ্ড কষ্টের জীবন কাটলেও তাঁর দু’চোখে স্বপ্ন ছিল সুখ সমৃদ্ধ বাংলাদেশের।

দেশের প্রতিটি জেলায় একটি করে অনাথ আশ্রম খুলতে চেয়েছিলেন। সকল ধর্মের অনাথরা সেই আশ্রমে থাকবে। মনুষ্য দীক্ষায় দীক্ষিত হয়ে তারা কর্মজীবনে প্রবেশ করবে। তিনি ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখতেন প্রতিনিয়ত।

তাঁর দৃপ্ত ছুটে চলা দেখে সবারই মনোবল বহুগুণে বেড়ে যেত। এই মনোবল নতুন দিনের, নতুন স্বপ্নের, নতুন সত্যের। কবির মতো বলতে হয়,

‘একদিন সূর্যের ভোর

একদিন স্বপ্নের ভোর

একদিন সত্যের ভোর

আসবেই...’

২০১৩ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগ্রহে রমা চৌধুরী তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি দেখা করেননি, বঙ্গবন্ধুর কন্যা হিসেবে রমা চৌধুরী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করেছিলেন। খালি পায়ে তার সাথে সাক্ষাতে নিজের কষ্টের কথা জানান। প্রধানমন্ত্রী আর্থিক সহযোগিতা করতে চাইলে রমা চৌধুরী বিনয়ের সঙ্গে তা ফিরিয়ে দেন। বরং উল্টো তাকে উপহার দিয়ে এসেছিলেন নিজের লেখা “একাত্তরের জননী” গ্রন্থটি।

সবকিছু হারিয়ে একরকম নিঃস্ব হয়েছেন তিনি। জীবনের দীর্ঘ সময় পাড় করে ফেলেছেন এখন এই আর্থিক সহযোগিতা নিয়ে তিনি কিইবা করবেন তাই কোনো ধরনের আর্থিক সহযোগিতা গ্রহণ করেননি। নিজের সন্তানেরা শহীদের মর্যাদা পায়নি, কিন্তু তাঁর কাছে ওরা শহীদ। এই কথাটি তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন।

একাত্তর রমা চৌধুরীকে দিয়েছে পোড়া ভিটে, কাঁধের ঝোলা, ছেলের শোক আর খালি পা। এই নিয়েই ছিল এখন রমা চৌধুরীর দিনযাপন। ১৯৯৫ সালের মার্চ মাসে একবার মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণজনিত রোগে রমা চৌধুরী আক্রান্ত হয়েছিলেন। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গোটা দেড়মাস আলাউদ্দিন তাঁর সেবাশুশ্রূষা করেছেন। এই অসুস্থতায় তাঁর ডান পাশ অবশ হয়ে পড়েছিল, একটি চোখও নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। এই ভয়ানক সময়ে আলাউদ্দিন যেন দেবতারূপে রমা চৌধুরীকে একা টেনে সুস্থ করে তুলেছিলেন।

আলাউদ্দিনের শুশ্রূষায় তিনি আবার চলার শক্তিও ফিরে পান। শুরু হয় আবারও তাঁর পথচলা। কাঁধে ঝোলা, কানে হিয়ারিং এইড লাগানো রমা চৌধুরী হেঁটে যাচ্ছেন চট্টগ্রামের ফুটপাত ধরে। এ দৃশ্য সকলের পরিচিত। বয়সের কারণে তাঁর সুস্থতা টিকে উঠতে পারেনি। সলীল চৌধুরীর মতো বলতে হয়,

‘ও আলোর পথযাত্রী, এ যে রাত্রী

এখানে থেমোনা

এ বালুচরে আশার তরণী তোমার

যেন বেঁধোনা…’

রমা চৌধুরী যেন আলোর পথযাত্রী হয়ে ছুটে বেড়াতেন। বছরখানেক ধরে অসুস্থ অবস্থায় শয্যাশায়ী ছিলেন তিনি। সেই সময় চিকিৎসার সুব্যবস্থা করার জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন আলাউদ্দিন। কোথাও সহযোগিতা পেয়েছেন, কোথাও পাননি। অবশেষে সরকারি নির্দেশে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাঁর জন্য কেবিনের ব্যবস্থা হয়েছিল। এই সময়ও সার্বক্ষণিক জেগে ছিলেন সেই আলাউদ্দিন। তাঁর ইচ্ছা ছিল শত বছর বেঁচে থাকার। কিন্তু শত বছর আর ছোঁয়া হয়নি এ যোদ্ধার। ২০১৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ভোরে ৭৭ বছর বয়সে রমা চৌধুরী নিজের জীবনের অধ্যায় সমাপ্ত করে দেন।


৫.

জীবনের অনেক বড় সময় তিনি একাই যুদ্ধ করে এগিয়েছেন। কখনো ভালোবাসা পেয়েছেন, কখনো তীর্যক বাক্যবাণে জর্জরিত হয়েছেন, কখনো তাঁকে কেউ আগলে রেখেছে, কখনো তিনি কাউকে আগলে রেখেছেন, কখনো স্মৃতি তাঁকে ক্রন্দনে ভাসিয়েছে, এখন রমা চৌধুরী নিজেই স্মৃতি হয়ে ফিরছেন আমাদের কাছে।

মৌসুমী ভৌমিকের গানের মতো বলতে হয়,

‘এক একটা রাত বড় একা লাগে।।

পাশ ফিরে শুলে খাট কঁকিয়ে উঠে

কান পেতে থাকি হাওয়া জেগে উঠে না

কান পেতে থাকি কেউ জেগে উঠে না…’

একজন হার না মানা নারীর নাম রমা চৌধুরী। একজন দৃপ্ত সৈনিকের নাম রমা চৌধুরী। রমা চৌধুরী এই সময়ে মরতে চাননি। অনেক কিছুই তাঁর লেখার বাকি ছিল। দেশকে অনেক কিছুই দেওয়ার ইচ্ছে ছিল তাঁর। গোটা জীবন স্বনির্ভর, স্বাবলম্বী আর আত্মমর্যাদা নিয়ে বাঁচতে চেয়েছিলেন রমা চৌধুরী। দেশব্যাপী অনাথ আশ্রম গড়ার স্বপ্ন নিয়ে তিনি আমাদের ছেড়ে এখন বহু দূরে। হয়তো তিনি দেখছেন, আমরা তাঁকে নিয়ে লিখছি। মৌসুমী ভৌমিকের গানের মতো বলতে হয়,

‘এখনও গল্প লেখো,

গান গাও প্রাণ ভরে,

........................

তোমাদের ভালবাসা

এখনো গোলাপে ফোটে’

তিনি এতোটাই তেজস্বী যে, কারো দান দক্ষিণা গ্রহণ করতেন না, নিজের কষ্টের কথা কাউকে মুখ ফুটেও বলতেন না। জীবনের সর্বস্ব হারিয়েও একা দীপ্তিময় ভূমিকায় হেঁটে গিয়েছেন গোটা জীবন। যুদ্ধদিনের বিভিন্ন ঘটনা সহ অসংখ্য ইতিহাসের সাক্ষী ছিলেন তিনি। তিনি স্বপ্ন দেখেছেন, দেখিয়েছেন। তিনি আমাদের সবার প্রিয়, জননী রমা চৌধুরী। কবির ভাষায় বলতে হয়,


‘এনেছিলে সাথে করে মৃত্যুহীন প্রাণ

মরণে তাহাই তুমি করে গেলে দান

তোমার মৃত্যুর মাঝে তুমিই মহান।।’


বিনয় দত্ত একজন লেখক ও সাংবাদিক