• রবিবার, নভেম্বর ১৭, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৮:১০ রাত

ওরা স্কুলে যায় না, স্কুলই আসে ওদের কাছে

  • প্রকাশিত ১১:২৩ সকাল আগস্ট ২, ২০১৯
হোপ স্কুল
হোপ'৮৭ পরিচালিত মোবাইল কোয়ালিটি স্কুল সৌজন্য

বর্তমানে ইস্কাটন, জুরাইন, মিরপুর, রায়েরবাজারসহ রাজধানীর বেশ কয়েকটি পয়েন্টে চালু রয়েছে তাদের কার্যক্রম। চট্টগ্রামেও চলছে যথারীতি

রাজধানীর রায়েরবাজার এলাকার কিশোরী মীম। মায়ের সঙ্গে বসে রাস্তার ধারে পিঠা বিক্রি করে চলে তাদের সংসার। জু্রাইনের ১২ বছর বয়সী রাশেদের গল্পটাও এমনই। অভাবের সংসারের হাল ধরতে এই বয়সেই মোটর ওয়ার্কশপে কাজ করতে হয় তাকে। আয়েশা, ইতি, রিমাসহ রাজধানীর আরও অনেক শ্রমজীবী-সুবিধাবঞ্চিত শিশুর গল্পই এমন। তাই পড়াশোনার ইচ্ছা থাকলেও সুযোগ পাওয়াটা তাদের কাছে দূরূহ ব্যাপার।

সুযোগের অভাবে এসব শ্রমজীবী শিশু পড়াশোনার জন্য স্কুলে যেতে পারে না। তাই তাদের মাঝে শিক্ষার আলো পৌঁছে দিতে এগিয়ে এসেছে বিশেষ একটি যান। হ্যাঁ, আসলেই দুটি বাস রাজধানী ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন পয়েন্টে ঘুরে ঘুরে এসব সুবিধাবঞ্চিত শিশুকে সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে পড়ালেখা করায়।

‘নূরুল ইসলাম বিএসসি মোবাইল কোয়ালিটি স্কুল’ নামে বাসটি মূলত একটি ভ্রাম্যমাণ স্কুল।

শুরুর গল্পটা একেবারে নতুন নয়। ২০১২ সালে অস্ট্রিয়ান সংস্থা হোপ'৮৭-এর বাংলাদেশ শাখা বন্দর নগরী চট্টগ্রামে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য একটি বিদ্যালয়ের পরিকল্পনা হাতে নেয়। ঘটনাচক্রে তারা জানতে পারে চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি'র অনুদানে পরিচালিত একটি বিশেষ স্কুলের কথা।

বিশেষ এই স্কুলটি ছিল একটি বাসের ভেতর। বন্দর নগরীর বিভিন্ন পয়েন্টে শিক্ষা উপকরণ বহন করে নিয়ে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পড়াত স্কুলটি। তবে কয়েক বছর পর বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়ে এ মহৎ উদ্যোগ। সহায়তার অভাবে একসময় এর কার্যক্রম বন্ধের উপক্রম হয় ভ্রাম্যমাণ এ স্কুলটির।

বাসই ওদের ক্লাসরুম। ছবি: সৌজন্যবিষয়টি জানার পর হোপ'৮৭, বাংলাদেশের কর্মকর্তারা ভাবনায় পরিবর্তন আনলেন। তারা সিদ্ধান্ত নিলেন ঘুরে ঘুরে শিক্ষা দেওয়ার এই ভিন্ন ধরনের শিক্ষালয়টিকেই পুনরায় সচল করে তুলবেন তারা। সেই ভাবনা থেকেই ‘নূরুল ইসলাম বিএসসি মোবাইল কোয়ালিটি স্কুলের’ নতুন করে হাল ধরলেন তারা। আবার চালু হলো মোবাইল স্কুল।

২০১৮ সাল থেকে রাজধানীতে কার্যক্রম শুরু করে ‘নূরুল ইসলাম বিএসসি-হোপ মোবাইল কোয়ালিটি স্কুল’। বর্তমানে ইস্কাটন, জুরাইন, মিরপুর, রায়েরবাজারসহ রাজধানীর বেশ কয়েকটি পয়েন্টে চালু রয়েছে তাদের কার্যক্রম। চট্টগ্রামেও চলছে যথারীতি। এ স্কুলে শিশু থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পায় শিশুরা। প্রতিটি পয়েন্টে তিন ঘণ্টা ধরে শিশুদের পড়াশোনা করানোর পর রওনা হয় অন্য একটি পয়েন্টের উদ্দেশ্যে।

হোপ'৮৭ বাংলাদেশের প্রধান মোহাম্মদ রেজাউল করিম ঢাকা ট্রিবিউনকে জানান, “আমরা প্রথমে একটা নির্দিষ্ট এলাকায় জরিপ চালিয়ে সুবিধাবঞ্চিত কর্মজীবী শিশুদের খোঁজ করি। কোনো এলাকায় ৫০ জন এমন শিশু পাওয়া গেলেই আমরা সেখানে গাড়ি পাঠাই।”

নতুন বই পেয়ে উৎফুল্ল শিক্ষার্থীরা। ছবি: সৌজন্য

তিনি বলেন, “ঢাকায় শিক্ষকরা বিনা বেতনেই স্বেচ্ছায় বাচ্চাদের পড়ান। শিক্ষকদের বেশিরভাগই তরুণ। দেখা গেল, কোথাও আগে থেকেই সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে একটি স্কুল ছিল। কিন্তু রোদ, বৃষ্টিতে বাচ্চাদের সেখানে পড়ালেখায় অসুবিধা হতো। আবার শিক্ষা উপকরণগুলো রাখা নিয়েও সমস্যা ছিল। কিন্তু বাস সেই সমস্যার সমাধান করেছে।”

গত বছর এই স্কুল থেকে ১৩ শিক্ষার্থী প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিএসসি) পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। জুরাইন এলাকায় হোপ'৮৭ পরিচালিত একটি নৈশ বিদ্যালয়ের অধীনে পরীক্ষায় বসে তারা। সরকারি বই পড়ানো হয় তাদের। 

মোহাম্মদ রেজাউল করিম জানান, ভবিষ্যতে তাদের কার্যক্রম আরও সম্প্রসারিত করার ইচ্ছা রয়েছে।

বাচ্চাদের সঙ্গে অস্ট্রিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কেরিন নেইসল। ছবি: সৌজন্যমোবাইল স্কুলটিতে সহায়তা দিচ্ছে ‘হোপ'৮৭ অস্ট্রিয়া’ (HOPE'87 Austria), ‘জেডএফ হিল্ফট’ (ZF hilft) এবং ‘ইউ ফাউন্ডেশন - এডুকেশন ফর চিলড্রেন ইন নিড, জার্মানি’ (You Foundation- Education for Children in Need) নামে তিনটি সংস্থা।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ সফরকালে এই স্কুলের কার্যক্রম পরিদর্শন করে শিশুদের সঙ্গে সময় কাটান অস্ট্রিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কেরিন নেইসল।

শুধু শিক্ষাদানই নয়, শিক্ষা সফরের মতো বিভিন্ন সহপাঠ কার্যক্রমেরও আয়োজন করে থাকে মোবাইল কোয়ালিটি স্কুল।

স্কুল সংশ্লিষ্টরা বিশ্বাস করেন, এমন উদ্যোগ আরও বেশি করে হলে তা সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।