• বুধবার, ডিসেম্বর ১১, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:৩৯ সকাল

সাভারের বেদেপল্লীতে পরিবর্তনের হাওয়া

  • প্রকাশিত ০৯:৫২ সকাল সেপ্টেম্বর ১৮, ২০১৯
সাভার বেদে
পেশা পরিবর্তন করছেন সাভারের বেদে নারীদের অনেকেই ঢাকা ট্রিবিউন

কয়েক বর্গ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন বেদেরা। কথা বলে জানা গেছে, অন্তত দুইশ' বছর ধরে বংশ পরম্পরায় সেখানে বাস করে আসছেন তারা। দীর্ঘ এই পথচলা মোটেও সহজ ছিল না

“সময়ের স্রোত বহে তার আপন ধারাতেই, তীব্র স্রোতের টানে আমিও ভাসি!”...কবিতার এই দু'টি লাইনই যেন বেদে সম্প্রদায়ের জীবন-জীবিকার ধরণ প্রকাশের জন্য যথেষ্ট। পানিতেই তাদের জীবন, পানিতেই মৃত্যু। এমনটাই জানেন সবাই। বেদে সম্প্রদায় কোনো নির্দিষ্ট বসতি না গড়ে বরং বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ঘুরে জীবিকা নির্বাহ করে। কিছুদিন এক জায়গায় থাকার পরে নেমে পড়ে অন্য কোনো অস্থায়ী আবাসের খোঁজে।

এই গল্প বেশ পুরনো। দিন বদলের পালায় প্রয়োজনের তাগিদে বেদেরাও মনোযোগী হয়েছে নিজেদের স্থায়ী আবাস গড়ে তুলতে। এমনই এক সম্প্রদায়ের গল্প উঠে এসেছে এই প্রতিবেদনে।

রাজধানীর অদূরে সাভারের অমরপুর। কয়েক বর্গ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন বেদেরা। কথা বলে জানা গেছে, অন্তত দুইশ' বছর ধরে বংশ পরম্পরায় সেখানে বাস করে আসছেন তারা। দীর্ঘ এই পথচলা মোটেও সহজ ছিল না। কালের পরিক্রমায় প্রতিদিনই তাদের জীবনধারণ হয়েছে কঠিন থেকে কঠিনতর। বেদে সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী পেশা যেমন- সাপখেলা দেখানো, তাবিজ বিক্রি, ঝাঁড়ফুক ইত্যাদি যখন ক্রমশ অজনপ্রিয় হয়ে পড়ছিল তখন তাদের জন্য পেটের যোগান দেওয়া হয়ে পড়ছিল কঠিন থেকে কঠিনতর। বাধ্য হয়েই তাদেরকে জড়িয়ে পড়তে হয়েছিল মাদক ব্যবসাসহ বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডে।

২০১৪ সালে ১০ হাজারেরও বেশি জনগোষ্ঠীর এই বেদেপল্লীকে দুরাবস্থা লাঘবে এগিয়ে আসেন এক পুলিশ কর্মকর্তা। সেসময় ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) হিসেবে দায়িত্বরত থাকাকালে সাভারের বেদেদের সম্পর্কে জানতে পারেন বর্তমানে পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি হাবিবুর রহমান।

বেদেপল্লীর ভেতরের রাস্তা। ছবি: ঢাকা ট্রিবিউনঢাকা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, “সেসময় মারাত্মকভাবে ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিল বেদে সম্প্রদায়। আশপাশের এলাকাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মাদক বিক্রি হয় ওই বেদেপল্লীতে। মাদক ব্যবসা থেকে তাদেরকে বিরত রাখতে রীতিমতো গলদঘর্ম পরিশ্রম করতে হচ্ছিল পুলিশ বাহিনীকে। তখন বেদে সম্প্রদায়ের একজন নেতার সঙ্গে কথা বলতে চাই আমি। পরদিন দেখা গেল একে একে তারা ১৭জন হাজির! জানা গেলো বেদেদের আলাদা ১৭টি গোত্রের নেতা তারা। এরপর তাদের সঙ্গে আলোচনায় বসি।”

ডিআইজি হাবিবুর রহমানের ভাষায়, “তারা জানালেন একরকম বাধ্য হয়েই মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছেন। কারণ যুগের পরিবর্তনে আগের মতো তারা প্রথাগত পেশায় জীবিকা নির্বাহ করতে পারছিল না। ফলে দিন দিন তারা হতে হচ্ছিলো পেশাহীন। সামাজিকভাবেও তারা ছিল বিচ্ছিন্ন। অবস্থা এতোটাই ভয়াবহ হয়ে পড়েছিল যে, কেউ তাদেরকে কোনো কাজে ডাকতো না, তাদের ছেলেমেয়েরা স্কুলে যেতে পারত না এমনকি মারা গেলে কবরও দিতে দেওয়া হতো না। এমন পরিস্থিতিতে একরকম নিরুপায় হয়েই জড়িয়ে পড়ে ইয়াবা ব্যবসায়।”

এসব শুনে বেদেদেরকে সমাজের মূলধারায় ফেরানোর উদ্যোগ নেন ডিআইজি হাবিবুর রহমান। প্রতিষ্ঠা করেন ‘উত্তরণ’ নামে একটি সমাজকল্যাণমূলক সংস্থা। অর্থ সংগ্রহ করে এর আওতায় বেদেপল্লীর নারীদেরকে সেলাই মেশিন কিনে দেন তিনি। তবে, সেখানেও দেখা যায় সমস্যা। কয়েকদিন পর ক্রেতার অভাবে সেলাইয়ের কাজ বন্ধ করে দিলেন বেদে নারীরা। ভালো একটি উদ্যোগ এভাবে থমকে যেতে দেখে আবারও তৎপর হলেন হাবিবুর রহমান। এবার তিনি বেদেপল্লীর মেয়েদের জন্য একটি ঘর ভাড়া করে সেলাই মেশিনগুলো বসানোর ব্যবস্থা করেন এবং একটি গার্মেন্টসের সঙ্গে তাদের চুক্তির ব্যবস্থা করে দেন। ‘উত্তরণ ফ্যাশনের’ হাত ধরে শুরু হয় দিন বদলের পালা। বর্তমানে সেখানে কাজ করেন ৭৫জন বেদে নারী।

উত্তরণ ফ্যাশন। ছবি: ঢাকা ট্রিবিউনউত্তরণ ফ্যাশনের তত্ত্বাবধানে নিয়োজিত সাজেরা খাতুন ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “আমাদের পূর্বপুরুষরা একসময় বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে জীবিকা নির্বাহ করলেও একটা সময় তারা দেখলেন নদী-খাল শুকিয়ে যেতে শুরু করেছে। আর সাপের খেলা, তাবিজ বিক্রি এগুলোও ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা হারাতে শুরু করলো। তখন তারা এই অঞ্চলে থিতু হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।”

সাম্প্রতিক সময়ে নিজেদের দূরাবস্থার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “দিন যতো গড়াতে থাকলো, আমাদের অবস্থাও ততোই খারাপ হতে থাকলো। আমরা হয়ে পড়লাম পেশাহীন। কেউ আমাদেরকে কাজে নিতে চাইতো না। পেটের দায়ে আমরা লোকের কাছে জোর করতাম টাকার জন্য। ভালো না লাগলেও করতে হতো। গ্রামে গ্রামে ঘুরে সাপখেলা দেখানোর সময় আমাদের মেয়েরা ইভটিজিংয়ের শিকার হতো। তবুও আমরা ছিলাম নিরুপায়। আমাদের ছেলেমেয়েরা যতটুকু পড়তে পারত, তাদেরকেও কেউ চাকরি করতে দিতো না শুধু বেদে বলে। এককথায় আমাদের জীবনটাই ছিল অবহেলিত।”

সাজেরার মুখ থেকেই শোনা গেল এই সংকট উত্তরণের গল্প, “এমন পরিস্থিতিতে আমাদের সম্প্রদায়ের কেউ কেউ যখন মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে গেল তখন একদিন ডিআইজি স্যার (হাবিবুর রহমান) আমাদের কথা ভাবলেন। তিনি আমাদেরকে সমাজের মূলধারায় ফিরিয়ে আনার প্রস্তাব দিলে আমরা তা সাদরে গ্রহণ করি। তিনটি ধাপে তিনি আমাদের এখানকার ১০৫ জন মেয়েকে সেলাই প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে দেন। পরে একটি ঘর ভাড়া নিয়ে সেখানে ২৫টি সেলাই মেশিন নিয়ে আমাদের উত্তরণ ফ্যাশনের যাত্রা শুরু।”

তিনি বলেন, “আমরা সাপ খেলাটাকেই জীবন মনে করতাম। এর বাইরের জীবন সম্পর্কে আমাদের তেমন ধারণা ছিল না। হাবিব স্যার আমাদেরকে নতুন জীবনের পথ দেখিয়েছেন। আমাদের গার্মেন্টসে বর্তমানে কাজ করেন ৭৫জন নারী শ্রমিক। আগে অনেকেই এখান থেকে কাজ শিখে অন্য প্রতিষ্ঠানে কাজ নিয়েছে। কেউ কেউ টেইলরিংয়ের দোকান করেছে। এই প্রতিষ্ঠান আমাদের মেয়েদের স্বাবলম্বী হতে শিখিয়েছে।”

উত্তরণে কাজ করছেন বেদেপল্লীর মেয়েরা। ছবি: ঢাকা ট্রিবিউনমাদক ব্যবসা ছেড়ে দিলেও এখনও কেউ কেউ পুরনো পেশায় নিয়োজিত আছেন। তাদেরকেও পুনর্বাসনের চেষ্টা চলছে। সেজন্য সমাজের সামর্থ্যবান মানুষদের প্রতি তাদের পাশে থাকার আহ্বান জানান সাজেরা।

কর্মসংস্থান ছাড়াও সাভারের বেদেপল্লীতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মুক্তি নামে একটি স্কুল ও কোচিং সেন্টার। সবার জন্য উন্মুক্ত এই বিদ্যাপীঠে লেখাপড়া করানো হয় বিনামূল্যে। এছাড়া, সেখানকার ৪০টি দুঃস্থ পরিবারের জন্য আবাসনের ব্যবস্থাও করে দিয়েছে ‘উত্তরণ’।

শুধু সাভারই নয় ‘উত্তরণ’ কাজ করে যাচ্ছে মুন্সীগঞ্জসহ বেশকিছু এলাকার বেদে ও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের জন্য।

উত্তরণের সদস্য রমজান আহম্মেদ ঢাকা ট্রিবিউনকে জানান, সাভারে বেদে সম্প্রদায়ের জীবনমান উন্নয়নের জন্য তাদের সংগঠনের উদ্যোগে গুচ্ছগ্রামে ৫০টি পরিবারকে ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হচ্ছে। এছাড়াও কর্মসংস্থানের জন্য একটি গার্মেন্টস কারখানা, কাপড়ের শো-রুম ও বেশ কয়েকটি দোকন-পাট করে দেওয়ার কথাও তিনি জানান।

বেদেপল্লীর শিশুদের পড়াশোনার জন্য প্রাথমিক বিদ্যালয়ও রয়েছে।

এছাড়াও উত্তরণ ফাউন্ডেশনের আওতায় মানিকগঞ্জ, গাজীপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, মুন্সিগঞ্জ, গাইবান্ধায় বিভিন্ন প্রকল্প চলমান। ওইসব এলাকাতেও কর্মসংস্থানের জন্য বিউটি পার্লার, দোকান, গবাদিপশুর খামারসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে। পাশাপাশি পর্যায়ক্রমে প্রতিটি এলাকায় বেদেদের জন্য স্থায়ী বসতি নির্মাণ করে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।