• শুক্রবার, নভেম্বর ১৫, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:৪৬ রাত

ভ্রমণকন্যা: দলবেধে ‌‘একা একা’ ঘুরে বেড়ায় যারা!

  • প্রকাশিত ০৯:২০ সকাল অক্টোবর ২৫, ২০১৯
ভ্রমণকন্যা
'একা একাই' ঘুরে বেড়ান ভ্রমণকন্যারা সৌজন্য

আমাদের প্রথম ইভেন্টে যখন যাই, তখন শুনতে হয়েছে, ১৯ জন মেয়ে একা একা যাচ্ছে!

মেয়েরা ঘুরতে যাবে? কার সঙ্গে? একা একা যাওয়া নিরাপদ না। মেয়েদের ঘুরতে যাওয়ার দরকারই বা কী? এতোসব বাধা আর প্রশ্নের সমাধান দিলেন দুই ভ্রমণকন্যা। তারা ভাবলেন, হ্যাঁ ইচ্ছে হলেই মেয়েরা ঘুরবে। আর সেটা হবে দলবেঁধে; মেয়েদের দল। এই ভাবনা থেকে তারা গড়ে তুললেন শুধুমাত্র নারীদের নিয়ে ভ্রমণ ও সচেতনতা বিষয়ক অনলাইন প্ল্যাটফর্ম "ট্রাভেলেটস অব বাংলাদেশ-ভ্রমণকন্যা"।

তারা হলেন- ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) থেকে এমবিবিএস পাস করা ডা. সাকিয়া হক ও ডা. মানসী সাহা। এসব বিষয়ে দুই ভ্রমণকন্যা সম্প্রতি কথা বলেন ঢাকা ট্রিবিউন সাংবাদিক আহমেদ সার্জিন শরীফের সঙ্গে।

ঢাকা ট্রিবিউন:  শুরুর গল্পটা বলুন

ভ্রমণকন্যা: আমরা ছোটবেলা থেকেই বন্ধু। হাইস্কুল, কলেজ এমনকি মেডিকেল কলেজেও একইসঙ্গে পড়েছি। থেকেছি একই রুমে। ঘোরাঘুরি করার ইচ্ছা আমাদের ছিল অনেক আগে থেকেই। কিন্তু বাসায় বললে বলা হতো, একা একা যেও না অথবা পরে বাসার লোকজনের সঙ্গে যেও। এভাবে থমকে যেতো ঘোরাঘুরির প্ল্যান। তো, থার্ড ইয়ারে পড়াকালে এক বান্ধবী আসে সুইজারল্যান্ড থেকে। ওর সঙ্গে আমাদের ফেসবুকেই পরিচয়। বাংলাদেশের একটা ছবি দেখে আগ্রহী হয়ে এখানে ঘুরতে আসে। তাকে নিয়ে আমরা বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে যাই। এমন করে যখন পরিবারের কোনো পুরুষ সদস্যকে ছাড়া ঘোরাঘুরি শুরু করি, তখন দেখতে পাই আমাদের মতো এমন অনেক মেয়েই আছে যারা ইচ্ছা থাকলেও বিভিন্ন প্রতিকূলতার কারণে ঘুরতে যেতে পারে না। তো সেই থেকেই একটি ফেসবুক গ্রুপের মাধ্যমে ভ্রমণপিপাসু মেয়েদের একত্রিত করার বিষয়টি মাথায় এলো। ২০১৬ সালের ২৭ নভেম্বরের কথা। প্রাথমিকভাবে আমরা দেশের সুন্দর সুন্দর পর্যটনকেন্দ্রগুলোর ছবি নিয়ে একটা এক্সিবিশন করার চিন্তা করি। একমাসের মধ্যে গ্রুপের সদস্য সংখ্যা হাজারে পৌঁছে গেলো।

ঢাকা ট্রিবিউন: বর্তমানে আপনাদের গ্রুপে কতজন সদস্য আছেন?

ভ্রমণকন্যা: ৪০ হাজারেরও বেশি।

কেওক্রাডাংয়ে ভ্রমণকন্যারা। ছবি: সৌজন্যঢাকা ট্রিবিউন: প্রথম ইভেন্ট কোথায় ছিল?

ভ্রমণকন্যা: ২০১৭ সালের ২০ জানুয়ারি ১৯ জন মেয়েকে নিয়ে আমরা আমাদের প্রথম ইভেন্ট করি। সেবার আমরা নরসিংদীতে সরিষা ক্ষেত দেখতে গিয়েছিলাম। তখন সবাই "হলুদ সরিষার রাজ্য" দেখতে যেতে চাইত। কারণ শহরের অনেকেই কখনো সরিষা ফুল দেখেনি। তখনও আমাদের শুনতে হয়েছে, "১৯ জন মেয়ে একা একা যাচ্ছে!” আমি জানি না এতগুলো মেয়ে কি করে "একা একা" হয়!

দ্বিতীয় ট্যুর ছিল মৈনটঘাটে, ৫১ জন নারী ভ্রমণকারীকে নিয়ে। এরপর থেকে আমাদের ইভেন্টগুলোর জন্য মানুষ খুঁজতে হয়নি।

ঢাকা ট্রিবিউন: এখন পর্যন্ত মোট কতগুলো ইভেন্ট করেছেন আপনারা?

ভ্রমণকন্যা: বর্তমানে আমাদের ৬৭তম ইভেন্ট চলছে।

ঢাকা ট্রিবিউন: প্রতিবছরই যাওয়া হয়, এমন কোনো নির্দিষ্ট জায়গা আছে?

ভ্রমণকন্যা: প্রতিবছরই আমরা একবার সুন্দরবনে বার্ষিক ট্যুরে যাই।

ঢাকা ট্রিবিউন: কতদিন পরপর আপনারা একেকটা ইভেন্ট করেন?

ভ্রমণকন্যা: সাধারণত প্রতিমাসেই আমরা একটা বা দুইটা ইভেন্ট আয়োজন করতে চাই। তবে গত মাসে (সেপ্টেম্বর) আমাদের চারটি শুক্রবারের প্রত্যেকটিতেই ইভেন্ট ছিল। এমনও হয়েছে, গ্রুপ মেম্বারদের চাহিদার ভিত্তিতে একইসঙ্গে চারটি টিম ভিন্ন চারটি স্পটে গেছে।

ঢাকা ট্রিবিউন: এসব ট্যুরের তত্ত্বাবধানে কারা থাকেন?

ভ্রমণকন্যা: আমাদের খুবই দক্ষ একটি কমিটি রয়েছে। আমি আর সাকিয়া ছাড়াও কমিটির সদস্য রয়েছেন ২০ জন এবং স্বেচ্ছাসেবী রয়েছেন ৬০ জন। তারা সবাই-ই ভালোবেসে আমাদের সঙ্গে আছেন। প্রথম থেকেই যেহেতু আমরা অলাভজনক উদ্দেশ্য নিয়ে শুরু করেছি তাই মেয়েরা ঘুরতে যেতে চাইলে আমরা ব্যবস্থা করে দেই। সম্প্রতি আমরা সরকারিভাবে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি পেয়েছি। আমাদের কার্যক্রম কেবল গ্রুপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। ইতোমধ্যে আমরা একটি সংগঠনের মর্যাদা অর্জন করেছি।

নরসিংদীর মায়ারচরের মায়া উপভোগে ভ্রমণকন্যারা। ছবি: সৌজন্যঢাকা ট্রিবিউন: ভ্রমণের পাশাপাশি আপনাদের অন্য কোনো কার্যক্রম রয়েছে?

ভ্রমণকন্যা: ভ্রমণের পাশাপাশি আমাদের অন্যতম উল্লেখযোগ্য কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে "নারীর চোখে বাংলাদেশ"। এই কর্মসূচির আওতায় আমরা দেশের ৬৪ জেলায় অন্তত একটি করে স্কুলে গিয়ে বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধ এবং নারীস্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলি। এছাড়া, আমরা দুজন যেহেতু চিকিৎসা বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী তাই অনেকেই আমাদের কাছে বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে কথা বলতে আসেন। পাশাপাশি, আমাদের রয়েছে 'আত্মরক্ষা ওয়ার্কশপ' কার্যক্রম। আমাদের সংগঠনের কমিটির প্রতিরক্ষা সম্পাদক তায়েকোয়োনদো প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। তিনিও আমাদের সঙ্গে জেলায় জেলায় গিয়ে মেয়েদেরকে আত্মরক্ষার কিছু প্রাথমিক বিষয় শেখান। এছাড়াও, বাল্যবিবাহ, মাদক এসবের কুফল এবং পরিত্রাণের উপায় নিয়েও আমরা কথা বলি।

ঢাকা ট্রিবিউন: এসব কার্যক্রমে কেমন সাড়া পেয়েছেন?

ভ্রমণকন্যা: সবগুলো জায়গা থেকেই ইতিবাচক সাড়া পেয়েছি। নারীস্বাস্থ্য বিষয়ে কথা বলতে গেলে প্রথমে মেয়েরা লজ্জা পেয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকতো বা হাসাহাসি করতো। কিন্তু পরে যখন আমরা তাদেরকে বোঝাতাম যে বিষয়টি প্রাকৃতিক, এখানে লজ্জার কিছু নেই। তখন তারা আগ্রহী হয়ে কথা শুনতো, জানতে চাইতো।

ঢাকা ট্রিবিউন: দেশে ভ্রমণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো লাগা এবং সবচেয়ে খারাপ লাগার দুটি অভিজ্ঞতার কথা বলুন।

ভ্রমণকন্যা: প্রথমে খারাপ অভিজ্ঞতার কথা বলি, দেশের দক্ষিণাঞ্চলের একটি জেলায় ওয়ার্কশপ করতে গিয়ে আত্মরক্ষা নিয়ে কথা বলার সময় ওই স্কুলের প্রিন্সিপ্যাল (তিনিও ছিলেন নারী) বললেন, মেয়েদেরকে এসব শিখিয়ে কী লাভ? ওরা তো ঘরের কাজই করবে! আরেকটা স্কুলের প্রধান শিক্ষক তো ক্যামেরার সামনেই মেয়েদেরকে বলে ফেললেন, "জানো ইভটিজিংয়ের জন্য দায়ী কারা? তোমরা।" এই দুটি ঘটনা ছাড়াও আরও ছোটখাটো কিছু খারাপ অভিজ্ঞতা আছে। তবে আমরা ইতিবাচক বাংলাদেশকেই বেশি দেখেছি। সারাজীবন মনে রাখার মতো অসংখ্য স্মৃতি সঞ্চার করেছি যা বলে শেষ করা যাবে না। বেশিরভাগ জায়গার স্থানীয় মানুষ যথেষ্ট আন্তরিক।

ঢাকা ট্রিবিউন: বাইরের কারও সহায়তা পেয়েছেন?

ভ্রমণকন্যা: সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী, ড. কামরুল হাসান, মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল গণিসহ অনেকেই আমাদেরকে বিভিন্ন সময় নানা সহায়তা করে থাকেন। আরও একজন আছেন, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব নুরুন আক্তার। তিনি আমাদেরকে খুব স্নেহ করেন। আমাদের কর্মসূচির কথা জানার পরে প্রতিটি জেলা সার্কিট হাউসে তিনি আমাদের থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।

দিনাজপুরের কান্তজির মন্দিরেও পড়েছে ভ্রমণকন্যাদের পায়ের ছাপ। ছবি: সৌজন্যঢাকা ট্রিবিউন: দেশে ভ্রমণের ক্ষেত্রে মেয়েদের জন্য আপনারা একটা নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছেন। এই দুই/তিন বছরে কতখানি পরিবর্তন দেখতে পেয়েছেন?

ভ্রমণকন্যা: আমাদের মনে হয়, অনেকখানি পরিবর্তন এসেছে। এখন অনেক মেয়ে শুধু ভ্রমণই করছে না, আমাদের মতো সংগঠন করে অন্য মেয়েদেরকেও নিয়ে যাচ্ছে। যেসব পরিবার ভ্রমণকন্যার কথা জানে তারা এখন আর মেয়েদেরকে আমাদের সঙ্গে যেতে বাধা দেয় না। ভ্রমণকন্যা এখন একটা আস্থার নাম।

ঢাকা ট্রিবিউন: পেশাগত-ব্যক্তিগত ব্যস্ততা সামলে কীভাবে এত ঘুরে বেড়ান?

ভ্রমণকন্যা: আমরা বিসিএস-এ সুপারিশপ্রাপ্ত হলেও এখনও পোস্টিং হয়নি। পোস্টিং হয়ে গেলে এতো ঘোরাঘুরি করা হবে না। আর এতো ঘুরি তাও কিন্তু না। সময়ের সদ্ব্যবহার করতে জানি।

ঢাকা ট্রিবিউন: ভবিষ্যতে আপনাদের সংগঠনকে বাণিজ্যিক বা লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা আছে?

ভ্রমণকন্যা: না, এখনও সেরকম কোনো পরিকল্পনা নেই।

হামহাম ঝর্ণার সৌন্দর্য যেন আরও বেড়ে গিয়েছিল ভ্রমণকন্যাদের উপস্থিতিতে। ছবি: সৌজন্যঢাকা ট্রিবিউন: ভ্রমণের ক্ষেত্রে সরকারি কর্তৃপক্ষের প্রতি কোনো পরামর্শ?

ভ্রমণকন্যা: পর্যটন কর্পোরেশন অথবা ট্যুরিজম বোর্ডের উচিত এমন একজন উপদেষ্টা নিয়োগ করা যিনি সত্যিকারার্থে ভ্রমণ সম্পর্কে ধারণা রাখেন এবং নিজেও ভ্রমণ করেন। একইসাথে, আমাদের বিমানবন্দরগুলোতে দেশের ভ্রমণকেন্দ্রগুলো সম্পর্কে বিজ্ঞাপন দেওয়া যেতে পারে।