• বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ১৪, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:৩৮ রাত

জ্ঞানের ফেরিওয়ালা সুনীল কুমার গাঙ্গুলী

  • প্রকাশিত ০২:৫১ দুপুর নভেম্বর ২, ২০১৯
গোপালগঞ্জ/জ্ঞানের ফেরিওয়ালা
২০১৪ সালে অবসর নেওয়ার পর নিজ বাড়ির পাশে একক প্রচেষ্টায় পুত্রবধূর নামে গড়ে তোলেন ‘চন্দ্রিকা জ্ঞান পাঠাগার’

সত্তরোর্ধ জ্ঞানের এই ফেরিওয়ালা পায়ে হেঁটে বাড়ি বাড়ি গিয়ে পাঠকের কাছে বই পৌঁছে দিচ্ছেন হাসিমুখে। বর্তমানে তার ব্যক্তিগত পাঠাগারটিতে ৬ শতাধিক বই রয়েছে

গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার একটি প্রত্যন্ত গ্রাম কুমরিয়া। গ্রামটি উপজেলা সদর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তরে কলাবাড়ী ইউনিয়নের দক্ষিণ-পশ্চিম সীমানায় অবস্থিত। প্রায় দুই কিলোমিটার ভাঙাচোরা একটি সড়ক দিয়ে হেঁটে কুমরিয়া গ্রামে যেতে হয়।

গ্রামটিতে সর্বসাকুল্যে যে দুইহাজার মানুষ বাস করেন তাদের একজন সুনীল কুমার গাঙ্গুলী। আর্থিক সংকটের কারণে বেশিদূর পড়ালেখা করতে পারেননি। উচ্চমাধ্যমিক পাস করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাকরি নিয়ে হাল ধরেন সংসারের। স্ত্রী, ছেলে ও পুত্রবধূসহ এক নাতিকে নিয়ে তার সংসার। সত্তরোর্ধ জীবনের প্রায় অর্ধেকটা সময় অন্যের ছেলেমেয়কে নিজের সন্তানের মত মানুষ করার ব্রত নিয়ে উপজেলা সদর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একটানা ২৫ বছর শিক্ষকতা করেছেন।

২০১৪ সালে অবসর নেওয়ার পর নিজ বাড়ির পাশে একক প্রচেষ্টায় পুত্রবধূর নামে গড়ে তোলেন ‘চন্দ্রিকা জ্ঞান পাঠাগার’। বর্তমানে তার এই পাঠাগারে ছয় শতাধিক বই রয়েছে। এতো সামান্য বইয়ে মন ভরে না তার। তার আন্তরিক ইচ্ছা পাঠাগারটি আরও বই দিয়ে সমৃদ্ধ করবেন। তবে, আর্থিক সংকটের কারণে সেটি পারছেন না বলে জানিয়েছেন জ্ঞানের এই ফেরিওয়ালা।

সরেজমিনে দেখা যায়, পাঠাগারটিতে তেমন কোনো আসবাবপত্র না থাকার কারণে অনেক মূল্যবান বই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিনই ঝেড়ে-মুছে নিজের সন্তানের মতো বইগুলো আগলে রাখেন সুনীল কুমার গাঙ্গুলী।

অন্যান্য পাঠাগারের চেয়ে সুনীল কুমার গাঙ্গুলীর এই পাঠাগারটি একটু ব্যতিক্রম। এখানে কোনো চেয়ার-টেবিল কিংবা তেমন পাঠক সমাগমও নেই। সুনীল কুমার গাঙ্গুলী তার বইয়ের তালিকা নিয়ে পাঠকদের দ্বারে দ্বারে ছুটে যান। যে পাঠকের যে বইটি পছন্দ হয় সুনীল কুমার গাঙ্গুলী পরেরদিন ওই পাঠকের কাছে পছন্দের বইটি দিয়ে আসেন। আবার ওই পাঠকের বই পড়া শেষ হলে তিনি গিয়ে বইটি নিয়ে আসেন। বিনিময়ে তিনি কারো কাছ থেকে কোনও টাকা-পয়সা নেন না। যদি কেউ খুশি হয়ে পাঁচ-দশ টাকা দেন, তা গুছিয়ে পাঠাগারের নতুন বই কেনেন। বর্তমানে এই পাঠাগারে সহস্রাধিক নিয়মিত পাঠক রয়েছে। তবে পাঠকের চাহিদা মতো বই না থাকার কারণে দিন দিন পাঠকের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। 

চন্দ্রিকা জ্ঞান পাঠাগারের নিয়মিত পাঠক উপজেলার ঘাঘর বাজারের হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক প্রেমরঞ্জন মন্ডল বলেন, “আমি আজ পাঁচবছর ধরে চন্দ্রিকা জ্ঞান পাঠাগারের নিয়মিত পাঠক। প্রায় ২০ কিলোমিটার দূর থেকে এসে সুনীল কুমার গাঙ্গুলী আমাকে বই দিয়ে যান। বই পড়া শেষ হলে আবার নতুন একটি বই দিয়ে পুরোনো বইটি নিয়ে যান। বিনিময়ে তিনি কোনো টাকা-পয়সা নেন না। বর্তমানে তার মতো মানুষ সমাজে বিরল।”

বীণাপাণি গ্রন্থাগারের প্রতিষ্ঠাতা, সাংবাদিক প্রশান্ত অধিকারী বলেন, “আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের প্রতিষ্ঠিত বিশ্ব সাহিত্যকেন্দ্র গাড়িতে গাড়িতে করে পাঠকের কাছে বই পৌঁছে দেয়। আর আমাদের কোটালীপাড়ার ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি হলেন সুনীল কুমার গাঙ্গুলী। সত্তরোর্ধ জ্ঞানের এই ফেরিওয়ালা পায়ে হেঁটে হেঁটে সেই প্রত্যন্ত গ্রামে থেকেও পাঠকের কাছে বই পৌঁছে দিচ্ছেন হাসিমুখে। তার স্বপ্নপূরণের লক্ষ্যে আমাদের পাঠাগারের পক্ষ থেকে তাকে বই দিয়ে সহযোগিতা করতে চাই।”

সুনীল কুমার গাঙ্গুলী বলেন, “ছাত্রজীবনে আমার বই পড়ার খুব আগ্রহ ছিল। কিন্তু তখন অর্থকষ্টের কারণে বই কিনে পড়তে পারিনি। তখনই মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম কখনও যদি সুযোগ আসে তাহলে একটি পাঠাগার করবো। চাকরি জীবনে আমার এই পাঠাগার করার স্বপ্ন পূরণ করতে পারিনি। অবসর নিয়ে সেই স্বপ্ন পূরণের চেষ্টা করে যাচ্ছি কিন্তু এখনো পর্যাপ্ত বই সংগ্রহ করতে পারিনি। পাঠাগারে বই ও আর্থিক সহযোগিতা চেয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে আবেদন করেছি। আমি চাই এলাকার যারা বিত্তবান আছে তারা এই পাঠাগারটি উন্নয়নে এগিয়ে আসুক।”

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসএম মাহফুজুর রহমান বলেন, “সুনীল কুমার গাঙ্গুলীর কর্মকাণ্ড নিঃসন্দেহে প্রশাংসার দাবি রাখে। আমি ব্যক্তিগত ও সরকারিভাবে চন্দ্রিকা জ্ঞান পাঠাগারে বই সরবরাহ থেকে শুরু করে সকল প্রকার সহযোগিতা করবো।”