• বুধবার, ডিসেম্বর ১১, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:১৮ রাত

বিড়াল কেন বন্ধুত্বপূর্ণ নয়?

  • প্রকাশিত ০৭:১৯ রাত নভেম্বর ১৫, ২০১৯
বিড়াল
বিড়ালের মতিগতি বোঝা খুব সহজ নয়! ছবি: বিবিসি

আপনার বিড়ালটির আচরণ সম্পর্কে উত্তর খুঁজতে হলে জানতে হবে কীভাবে বিড়াল মানুষের গৃহপালিত পশু হয়ে উঠলো, সেইসাথে বুঝতে হবে এর শরীরী ভাষাও

মানুষের সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু হিসেবে কুকুরের খ্যাতি জগৎজোড়া হলেও বিড়ালের পরিচিতি কিন্তু অনেকটাই এর উলটো। দেখতে আদুরে ও শৌখিন স্বভাব হবার কারণে গৃহপালিত প্রাণি হিসেবে বিড়ালের চাহিদা অনেক, তা স্বত্ত্বেও মানুষের অতটা কাছের হয়ে উঠতে পারেনি তারা, যতটা পেরেছে কুকুর। নিজের মতো করে থাকতে পছন্দ করা এই পশুটির 'অকৃতজ্ঞ'ও 'স্বার্থপর' হিসেবেও পরিচিতি রয়েছে অনেকের কাছে। শুধুমাত্র খাবার সময় হলেই এরা আশেপাশে ঘুরঘুর করে, অন্য সময়ে নাকি চেনেই না। যদিও কিছু কিছু বিড়াল মালিকের দাবি তাদের বিড়ালও কুকুকের মতোই বন্ধুসুলভ, কিন্তু সেটা ব্যতিক্রম ঘটনা বলেই অনেকের কাছে গণ্য হবে। কিন্তু বিড়ালের এমন আচরণের কারণ কী? কেন তারা বন্ধুত্বপূর্ণ নয়? বিবিসির এক প্রতিবেদনে এর উত্তর খোঁজা হয়েছিল, তা অবলম্বনেই এই নিবন্ধ।


জানতে হবে শুরুর গল্প

বিড়ালের আচরণ সম্পর্কে উত্তর খুঁজতে হলে জানতে হবে কীভাবে বিড়াল মানুষের গৃহপালিত পশু হয়ে উঠলো। কুকুরের তুলনায় বিড়ালের গৃহপালিত হয়ে ওঠার ইতিহাস অনেক ছোট। গৃহপালিত প্রাণী হিসেবে বিড়ালের প্রথম দেখা মেলে মধ্যপ্রাচ্যে আজ থেকে প্রায় দশ হাজার বছর আগে, নিওলিথিক যুগে। ইঁদুর থেকে ফসল রক্ষার জন্যই মূলত তাদেরকে পালা শুরু করে মানুষ। কিন্তু তখন বিড়ালকে খাবার দেওয়ার প্রবণতা মানুষের মধ্যে তেমন একটা। খাবারের জন্য এরা মানুষের ওপর নির্ভর ছিল না, নিজেদের খাবার নিজেরাই জুটিয়ে নিত। কুকুর যেমন শিকারে সহযোগিতাসহ বিভিন্নভাবে মানুষের পাশে ছিল এবং মানুষের ফেলে দেওয়া খাবারের উপরেই নির্ভরশীল ছিল, বিড়ালের ক্ষেত্রে ঠিক এমনটি ঘটেনি। তাই মানুষের সাথে বিড়ালের সম্পর্কটি শুরু থেকেই বেশ দূরত্বপূর্ণ ছিল। 

আপনার সোফা বা বিছানায় শুয়ে ঘুমানো বিড়ালটি আপনার অনেক ঘনিষ্ঠ হলেও এর পূর্বপুরুষেরা আমাদের পূর্বপুরুষদের সাথে খুব বেশি ঘনিষ্ঠ ছিল না। অনেকটা বুনো স্বভাব নিয়েই এরা মানুষের সঙ্গী হয়েছিল। তাই এত বছর পরেও বর্তমানে মানুষ বিড়ালকে আদর ও ভালবাসা দিয়ে অনেক আপন করে নিলেও বিড়াল এদের আগের স্বভাব খুব বেশি বদলাতে পারেনি। 

'ইন্টারন্যাশনাল ক্যাট কেয়ার' সংগঠনের ডাক্তার ও ট্রাস্টি ক্যারেন হিয়েস্ট্যান্ড এ প্রসঙ্গে বলেন, "এটা আসলে বিড়াল প্রজাতিটির ওপর মানুষের ভুল বোঝাবুঝি। মানুষ আর কুকুর বহু বছর একসঙ্গে থেকেছে। বলা যায়, এদের বিবর্তন হয়েছে প্রায় একসাথেই। কিন্তু বিড়ালের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক সে তুলনায় খুবই নতুন। বিড়ালের পূর্বপুরুষরা একাকী থাকা স্বভাবের প্রাণি ছিল, যারা খুব একটা সামাজিক নয়।"

যে প্রজাতির বিড়াল মানুষ প্রথম বাসাবাড়িতে পালা শুরু করে তা হলো আফ্রিকান বুনো বিড়াল। এরা নিযেদের বিড়াল সমাজেই একাকী ও নির্জনে বসবাস করে। শুধুমাত্র প্রজননের সময় ছাড়া একে অন্যের সঙ্গে মেশেও খুব কম। বিড়ালই হলো একমাত্র অসামাজিক পশু যাকে মানুষ গৃহপালিত বানিয়েছে। বিড়াল ছাড়া অন্য যেসব প্রাণীকে মানুষ গৃহপালিত করেছে এদের সবগুলোরই নিজেদের প্রজাতির অন্য সদস্যদের সঙ্গে সামাজিক বন্ধন রয়েছে।   

বোঝা বড় দায়!

মানুষের সঙ্গে বিড়ালের এই দূরত্বের কারণে বিড়ালের ভাষা বুঝতেও আমরা অনেক সময়ই ব্যর্থ হই।

হিয়েস্ট্যান্ড বলেন, "বিড়ালের একগুঁয়ে ও স্বনির্ভর সভাবের কারণে বিড়ালের জনপ্রিয়তা দিনকে দিন বাড়ছেই। তবে বিড়াল এই জীবন-যাপনে অভ্যস্ত কিনা সেটা অন্য বিষয়। মানুষ চায় বিড়ালও যেন কুকুরের মতোই হয়, কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে; এরা এরকম না।"

গবেষণায় দেখা যায়, মানুষের প্রতি বিড়ালের আচরণ একটু জটিল। 

"এটি খুবই পরিবর্তনশীল ও জিনগত বৈশিষ্ট্য দ্বারা পরিচালিত। একটি বিড়ালের বাচ্চা জন্মের পর প্রথম ছয় থেকে আট সপ্তাহ কী ধরণের অভিজ্ঞতা পেয়েছে তার উপর নির্ভর করে বিড়ালটি কতটা সামাজিক হবে। যদি জীবনের শুরুর এই সময়টিতে তারা মানুষের কাছ থেকে ভাল ব্যবহার পায়, তাহলে দেখা যায় পরবর্তী জীবনে এরা সাধারণত মানুষকে পছন্দ করে," যোগ করেন হিয়েস্ট্যান্ড।

তবে এরপরও সার্বিকভাবে বিড়ালের আচরণ একটু অদ্ভুত লাগতে পারে। যেমন বেওয়ারিশ বা রাস্তায় থাকা বিড়াল সাধারণত মানুষকে দেখলে পালিয়ে যায়। এই স্বভাবটি তারা পেয়েছে পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে। আবার দেখা যায় গৃহপালিত কোনো বিড়ালও বাসার মানুষের সঙ্গে দূরত্ব রেখে চলছে, কোনো বিড়াল আবার মানুষের সঙ্গ খুবই পছন্দ করছে। 

তাহলে বিড়ালের ভাষা বুঝবো কীভাবে?

কুকুরের মতো বিড়ালও মানুষের সঙ্গে অনেক ধরনের যোগাযোগ করে, তবে সেটা শব্দ ব্যবহার না করে শুধুমাত্র শরীরী ভাষার মাধ্যমে। বিড়ালের আচরণ নিয়ে পিএইচডি করা গবেষক ক্রিস্টিন ভিটালে বলেন, "মানুষের পক্ষে কুকুরের তুলনায় বিড়ালের শরীরী ভাষা বোঝা অনেক কঠিন।"

কুকুর কৃত্রিম বিবর্তনের ফসল। কুকুরের পুরো বিবর্তনটাই হয়েছে মানুষের সঙ্গে থেকে। এই বিবর্তনে কুকুরের মধ্যে কিছু এসেছে বৈশিষ্ট্য যেটি বিড়ালের মধ্যে আসেনি। এর মধ্যে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিবর্তন হলো ভ্রু ও চোখের ভাষা। মানুষের দয়া পেতে কুকুর এদের চোখের পাশের পেশী ব্যবহার করে চোখকে করুণ করে তুলতে পারে যেটি "পাপি ডগ আইয" নামে পরিচিত। এর মাধ্যমে মালিকের প্রতি কুকুকের ভালোবাসা প্রকাশ হয়। দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে বিড়ালে চোখে এই বিবর্তনটি হয়নি। ফলে এরা চোখের ভাষা দিয়ে ভালোবাসা প্রকাশ করতে পারে না। তবে অন্যভাবেও আপনি আপনার বিড়ালের চোখের ভাষা পড়তে পারবেন। সেটি হলো, ধীরভাবে চোখের পাতার পলক দেওয়া। এটি যদি আপনার বিড়াল করে থাকে তাহলে বুঝবেন সে আপনার প্রতি ভালবাসা প্রকাশ করছে। 

কিছু কিছু বিড়াল বাসায় মালিক ঢোকা মাত্রই তার কাছে আসে। এটি কুকুরও করে থাকে তবে সেটা তাদের শরীরী ভাষায় অনেক বেশি প্রকাশ্য হয়। আপনার বিড়াল এরকম করে থাকলে আপনারও খুশি হবার কথা। কারণ এর মাধ্যমে সে বোঝাচ্ছে আপনার কাছে সে নিরাপদ বোধ করছে। এটি আপনার সাথে বিড়ালের ভালো সখ্যতারই নিদর্শন। 

আপনার বিড়াল কি আপনার সঙ্গে তার শরীর ঘষে? অনেক বিড়ালই কিন্তু এটি করে থাকে। এটি মূলত তাদের বুনো বৈশিষ্ট্যের একটি অংশ। বুনো বিড়াল অন্য বিড়ালের সাথে শরীর ঘষে। এর মাধ্যমে এরা অন্য বিড়ালের গন্ধ নিজের শরীরে নেয় আর নিজের গন্ধও অন্য বিড়ালের শরীরে দেয়। তবে একটি বিড়াল সব বিড়ালের সাথে এ কাজটি করে না। শুধুমাত্র যাদেরকে কাছের মনে করে তাদের সাথেই এটি করে। মানুষের সাথেও যখন বিড়াল এরকম করে এর মানে হচ্ছে তাকে বিড়ালটি বন্ধু ভাবছে। 

সর্বোপরি, সন্তুষ্ট ও শান্ত বিড়াল বেশি বন্ধুভাবাপন্ন হয়। 

"যখন এরা দেখে এদের পানি, খাবার, ঘুমানোর জায়গা ও লিটার ট্রে ঠিকঠাকমতো আছে, যখন এরা নিজেরা ঠিকঠাকমতো থাকে, তারপরই কেবল অন্যান্য সামাজিক বন্ধনের ব্যাপারগুলো প্রকাশ করতে এরা সক্ষম হয়।"     

তাই এরপরের বার যখন আপনি বাসায় আসবেন, যদি আপানার বিড়ালটিকে চঞ্চল না দেখে শান্তভাবে আপনাকে পর্যবেক্ষণ করতে দেখেন, হতাশ হবেন না। এর মানে হচ্ছে সে বোঝাচ্ছে, আপনাকে বাসায় ফিরতে দেখে সে ভাল বোধ করছে এবং আপনার প্রতি সে সন্তুষ্ট।