• বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২০
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:০৮ সকাল

যে কারণে ১৫০ বছর পেরিয়েও বেলা বিস্কুটের এতো জনপ্রিয়তা

  • প্রকাশিত ১১:৩০ সকাল জানুয়ারী ২, ২০২০
বেলা বিস্কুট
বেলা বিস্কুট ঢাকা ট্রিবিউন

দেড় শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও গণি বেকারির তৈরি বেলা বিস্কুটের জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েনি এতোটুকুও

বেলা বিস্কুটের নাম শোনেননি এমন মানুষ হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে না। বিশেষ করে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে এটির পরিচিতি সর্বজনবিদিত। অনেক প্রতিষ্ঠান এই বিস্কুট বাজারজাত করলেও সবার আগে আসে “গণি বেকারি”র নাম।

চট্টগ্রাম মহানগরীর এই বেকারি প্রতিষ্ঠিত হয় গত শতাব্দীর শুরুর দিকে। গণি বেকারি ছাড়াও ইস্পাহানির মতো বড় প্রতিষ্ঠানও এই বিস্কুট বাজারজাত করে আসছে। তবে, গণি বেকারির বেলা বিস্কুট জনপ্রিয়তার দিক দিয়ে এখনও সবার শীর্ষে।

ব্যাপক এই জনপ্রিয়তার কারণ

১৫০ বছর পেরিয়ে গেলেও গণি বেকারির বেলা বিস্কুটের জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েনি এতোটুকুও। কী কারণে তারা এই জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে প্রাচীন এই বেকারিতে গিয়ে দেখা যায়, সময়ের প্রয়োজনে বিপণনকেন্দ্রে পরিবর্তন আনলেও দেড় শতাব্দী পরেও বিস্কুট প্রস্তুত প্রণালীতে কোনো পরিবর্তন আনেনি তারা। ব্রিটিশ আমলের মতো এখনও দু'টি “তন্দুর” অর্থাৎ কাদামাটির তৈরি ওভেনে তৈরি করা হয় বিস্কুট।

এখনও শতাব্দী প্রাচীন পদ্ধতিতে কাদামাটির ওভেনে বেলা বিস্কুট তৈরি করে গণি বেকারি। ছবি: ঢাকা ট্রিবিউন কেন এখনও সেই পুরনো পদ্ধতিতে বিস্কুট তৈরি করা হয় জানতে চাইলে গণি বেকারির কেয়ারটেকার (মুতাওয়ালি) আব্দুল্লাহ মো. এহতেশাম ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “বিস্কুট তৈরির ক্ষেত্রে তন্দুরের ব্যবহার প্রায় বিলুপ্ত। বেকারিতে কাদামাটির তৈরি ওভেনের জায়গা নিয়ে নিয়েছে ইলেক্ট্রিক ওভেন। কিন্তু ইলেক্ট্রিক ওভেনে তৈরি করা হলে আপনি বেলা বিস্কুটের আসল স্বাদ পাবেন না। কাদামাটির ওভেনে তৈরি বিস্কুটের স্বাদ সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাই আমরা এখনও কাদামাটির ওভেন ব্যবহার করি।”

গণি বেকারির প্রতিষ্ঠাতা আব্দুল গণি সওদাগরের চতুর্থ বংশধর এহতেশাম আরও বলেন, “বাণিজ্যিকভাবে আধুনিক পদ্ধতিতে বেলা বিস্কুট প্রস্তুতে একঘণ্টার বেশি লাগে না। কিন্তু পুরনো পদ্ধতি অনুসরণ করলে লেগে যায় প্রায় দু'দিন। এই বিস্কুটে ময়দা, চিনি, লবণ, এডিবল অয়েল, ডালডা, গুড়া দুধ আর পানির পাশাপাশি ব্যবহার করা হয় বিশেষ ধরনের একটি তরল উপাদান। যা আজও এই বিস্কুটের স্বাদের রহস্য।”

প্রতিদিন ২৫০ থেকে ৩০০ প্যাকেট অর্থাৎ ১০ থেকে ১২ হাজার পিস বেলা বিস্কুট তৈরি করে গণি বেকারি। গণি বেকারির ফ্র্যাঞ্চাইজির জন্য ইতোমধ্যে অনেকেই অনেক লোভনীয় প্রস্তাব নিয়ে এলেও ব্যবসায়িক দিকের চেয়ে পারিবারিক প্রথাকেই বেশি গুরুত্ব দেন আব্দুল গণি সওদাগরের বংশধরেরা।

ভবিষ্যতে রাজধানীতে একটি শাখা খুলে ব্যবসার পরিধি বাড়ানোর ইচ্ছা আছে বলে জানান এহতেশাম।

ওভেনে ঢোকানোর আগে সাজিয়ে রাখা হয়েছে বিস্কুট। ছবি: ঢাকা ট্রিবিউনতবে, মজার বিষয় হলো গণি বেকারি বেলা বিস্কুট তৈরিতে অগ্রগণ্য প্রতিষ্ঠান হলেও তারাই যে এর আবিষ্কর্তা এমনটা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।

বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যমতে, মুঘল আমলের শেষ ও ব্রিটিশ আমলের শুরুর দিকে ভারতের বর্ধমান থেকে চট্টগ্রামে আসা ব্যবসায়ীদের হাত ধরেই বন্দরনগরীতে বেকারি ব্যবসার পথচলা শুরু।

আব্দুল গণি সওদাগরের পূর্বপুরুষ লাল খান সুবেদার ও তার ছেলে কানু খান মিস্ত্রি ওই অঞ্চলে বেকারি ব্যবসা শুরু করেছিলেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় লাভজনক হয়ে ওঠে এই ব্যবসা। গণি বেকারি থেকে খাদ্যদ্রব্য সরবরাহ করা হতো ব্রিটিশ সেনাদের।

১৮৮০ সালে পারিবারিক ব্যবসায় যোগ দেন আব্দুল গণি সওদাগর। নিঃসন্তান এই ব্যবসায়ী ১০৫ বছর বয়সে ১৯৭৩ সালে মারা যান। ১৯৪৫ সালে তিনি বেকারিকে ওয়াক্‌ফ সম্পত্তি (বিক্রি করা যাবে না) হিসেবে ঘোষণা করেন।

গণি সওদাগরের মৃত্যুর পর বেকারির দায়িত্ব নেন তার ভাইয়ের ছেলে দানু মিয়া সওদাগর। ১৯৮৭ সালে পারিবারিক ব্যবসায় যোগ দেন দানু মিয়ার ছেলে জামাল উদ্দিন। আর ২০১২ সাল থেকে বেকারির দায়িত্বে আছেন আব্দুল্লাহ মো. এহতেশাম।