• বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২০
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:৩০ সকাল

বন কাগজের গল্প

  • প্রকাশিত ০৯:২৬ সকাল জানুয়ারী ৯, ২০২০
বনকাগজ
বনকাগজ তৈরির কাজে ব্যস্ত শিল্পী ঢাকা ট্রিবিউন

তবে একটি বনকাগজ ১ বছর পর্যন্ত ভালো থাকে। অর্থাৎ, একটি বনকাগজের ভেতরে থাকা বীজ একবছর পর্যন্ত সতেজ থাকবে

গাছ থেকে কাগজ আবার কাগজ থেকেই জন্ম নেবে ১১ ধরনের গাছ। অবাক করার মতো হলেও সত্যিকারার্থে এই অসাধারণ বিষয়টিকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন তড়িৎ প্রকৌশলী মাহবুব সুমন ও তার প্রতিষ্ঠান “শালবৃক্ষে”র কর্মীরা। 

বিশেষ ধরনের এই কাগজটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘‘বন কাগজ’’। 

চারিদিকে যখন নির্বিচারে বন উজাড় আর পরিবেশ ধ্বংসের মহাৎসব ঠিক তখনই বিশেষ এই কাগজের মাধ্যমে সবুজায়নের বার্তা নিয়ে ছুটছেন মাহবুব সুমন ও তার “শালবৃক্ষ” টিম। 

ইতোমধ্যে ‘‘বনকাগজ’’ জনপ্রিয় উঠতে শুরু করেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও বিষয়টি ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে।  

বিশেষ এই পরিবেশবান্ধব কাগজের গল্প ঢাকা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন এর স্বপ্নদ্রষ্টা মাহবুব সুমন নিজেই। 

ছোটবেলা থেকেই পরিবেশের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক পেশায় প্রকৌশলী এই যুবকের। দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশ ও জলবায়ু রক্ষায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিষয়ক গবেষণা এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িত আছেন তিনি।

বনকাগজের যাত্রার শুরু:

নিজের প্রতিষ্ঠান শালবৃক্ষের জন্য ভিজিটিং কার্ড বানাতে গিয়ে সর্বপ্রথম পরিবেশ সহায়ক কাগজ তৈরির বিষয়টি মাথায় আসে মাহবুব সুমনের। তখন থেকেই বনকাগজ তৈরির চিন্তা। 

এরপর শুরু হয় গবেষণা। একের পর এক পরীক্ষা, ব্যর্থতা, বিভিন্ন প্রতিন্ধকতাসহ নানা অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে টানা একবছরের প্রচেষ্টায় অবশেষে আসে সাফল্য। 

তবে এই যাত্রা খুব একটা সহজ ছিলো না।

মণ্ড থেকে তৈরি বনকাগজের প্রাথমিক পর্যায়। ছবি: ঢাকা ট্রিবিউনমাহবুব সুমন বলেন, ভিজিটিং কার্ড বানাতে গিয়ে মনে হলো, একটি ভিজিটিং কার্ড সাধারণত নির্দিষ্ট সময় পরে ফেলে দেওয়া হয়। বিয়ের অনুষ্ঠানের নিমন্ত্রণ কার্ডগুলোর ক্ষেত্রেও একই অবস্থা হয়। প্রয়োজন শেষে ফেলে দেওয়া হলেও কাগজ তৈরির জন্য প্রতিদিন কাটা হচ্ছে হাজার হাজার গাছ।

তিনি বলেন, ‘‘বিশ্বের কয়েকটি দেশে এমন কাগজ তৈরির বিষয়ে কাজ চলছে। তবে আমরাই প্রথম একসাথে এতোগুলো (১১ টি) ফসলের বীজ দিয়ে কাগজ তৈরির পর সেই কাগজ থেকে গাছ জন্মাতে সক্ষম হয়েছি।”

তিনি আরও বলেন, “এই কাগজ তৈরি করতে গিয়ে অনেক সময় দিতে হতো। এজন্য উৎসর্গ করতে হয়েছে অনেক কিছু। শেষ পর্যন্ত চাকরিও ছাড়তে হয়। কিন্তু বনকাগজটা আমার কাছে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাড়িয়েছিল। কিন্তু বারবার ব্যর্থতা আমাকে আশাহত করে দিয়েছিল। প্রায় ৪-৫ বার প্রচেষ্টার পর কাগজ থেকে গাছ জন্মাতে সক্ষম হই।”

যেভাবে কাগজ থেকে জন্ম নেয় গাছ:

বনকাগজের মধ্যে ৮ ধরনের সবজি আর ৩ ধরনের ফুলের বীজ আছে। এই কাগজ মাটিতে লাগানোর জন্য বিশেষ কোনো নিয়ম নেই। কাগজটি আস্ত অথবা ছিঁড়ে টুকরো করে ফেলে দিলেই ৮ থেকে ১০ দিনের মধ্যে বীজের অঙ্কেুারোদগম শুরু হয়। তবে অবশ্যই মাটিতে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা থাকতে হবে। মাটি পর্যাপ্ত আর্দ্র না হলে কাগজটিকে মাটির উপর রেখে একটু ভিজিয়ে দিলেই হবে। বিষয়টি অনেকটা মাটিতে বীজ ছিটিয়ে দেওয়ার মতোই। বীজ ছেটানোর পর পর্যাপ্ত আলো, বাতাস আর পানির সংস্পর্শে শুরু হয় অঙ্কুরোদগম। আর সেখান থেকে ধীরে ধীরে বড় হয় গাছ।

তবে একটি বনকাগজ ১ বছর পর্যন্ত ভালো থাকে। অর্থাৎ, একটি বনকাগজের ভেতরে থাকা বীজ একবছর পর্যন্ত সতেজ থাকবে।

বনকাগজ তৈরির প্রক্রিয়া:

যেহেতু এটি পরিবেশ রক্ষার্থে একটি প্রয়াস তাই বনকাগজ মূলত তৈরি হয় পরিত্যক্ত কাগজ থেকে। মেশিনের মাধ্যমে প্রথমে কাগজগুলো টুকরো করে ৪২ ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হয়। কাগজগুলো পুরোপুরি গলে গেলে সেগুলো থেকে মণ্ড তৈরি করে কাঙ্খিত ফ্রেমের আকারে বসিয়ে দিতে হয়। পরে বিশেষ পদ্ধতির মাধ্যমে বীজগুলো কাগজে দিয়ে দিতে হয়। একজন কর্মীর পক্ষে দুই ঘণ্টায় “এ ফোর” আকৃতির ৫টি বনকাগজ তৈরি করা সম্ভব। এভাবে একদিনে প্রায় ২৫-৩০ টি কাগজ তৈরি করা যায়। বীজগুলো যাতে নষ্ট না হয়, সেজন্য কাজটি করতে হয় খুবই সর্তকতার সাথে। 

বনকাগজ তৈরির ব্যয় প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সুমন জানান, বনকাগজের প্রকল্পটি নিয়ে এখনও কার্যক্রম চলমান। এই মুহূর্তে ব্যয় তুলনামূলকভাবে একটু বেশি।  একটি সাধারণ কাগজের চেয়ে প্রায় চারগুণ বেশি ব্যয় হচ্ছে। প্রতি পিস কাগজ তৈরিতে ব্যয় হচ্ছে ১২০ থেকে ১৪০ টাকা। 

তবে এই খরচ অর্ধেকেরও কমে নামিয়ে আনা সম্ভব বলে জানান মাহবুব। আর অচিরেই খরচ কমিয়ে এটিকে সবার হাতের নাগালে নিয়ে আসতে পারবেন বলে তাদের বিশ্বাস।

তবে শুধুমাত্র বনকাগজেই থমকে থাকেনি মাহবুব সুমন। পরিবেশকে প্লাস্টিক দূষণের কবল থেকে বাঁচাতে তিনি বাঁশ দিয়ে তৈরি করেছেন বাঁশের জগ ও মগ। উদ্ভাবন করেছেন পরিবেশ উপযোগী সার তৈরির যন্ত্রও। যার নাম দেয়া হয়েছে “মাতাল”।

সার তৈরির যন্ত্র মাতাল। ছবি: ঢাকা ট্রিবিউন“মাতাল”-এ দৈনন্দিন পচনশীল বর্জ্য থেকে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে তৈরি হবে সার। আর এই সার ছাদ কৃষিকাজে ব্যবহার করা যাবে। ইতোমধ্যে বাসার ছাদে এর কার্যক্রম চলছে। 

আর পুরো কাজটিতে মাহবুব সুমনকে নানাভাবে সহায়তা করেছেন সায়দিয়া গুলরুখ, কামরুল হাসান ও ইকরামুনেসা চম্পা। আর তাদের নিয়েই গড়ে উঠেছে শালবৃক্ষ।

এই উদ্যোগের শুরুর গল্প বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘‘বনকাগজ তৈরির অনুপ্রেরণা আরো প্রগাঢ় হয় সুন্দরবন রক্ষার আন্দোলন থেকে। এই যে প্রতিনিয়ত আমরা যে বন ধ্বংস করছি, নির্বিচারে গাছ কাটছি আমরা কি ওই পরিমাণে গাছ রোপণ করছি? না। তাই এই বনকাগজের মধ্যে দিয়েই সবুজ বনায়ন ও দূষণমুক্ত পৃথিবীর গড়ার বার্তাই মানুষে কাছে পৌঁছে দিতে চাই।”

পাশাপাশি সরকারি সহায়তা পেলে এই পথচলা আরও সহজ হবে বলে জানান তিনি।