• বৃহস্পতিবার, মে ০৬, ২০২১
  • সর্বশেষ আপডেট : ১১:৩২ সকাল

বই আলোচনা: আরিনার সাথে কথোপকথন

  • প্রকাশিত ০৯:০৬ রাত মার্চ ৩০, ২০২১
বই
আরিনার সাথে কথোপকথনের প্রথম সংস্করণ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। ডা. মোহাম্মদ রেজাউল খান ইভান

বাংলা সাহিত্যের বিস্তর ভাণ্ডারে আমার পদচারণা খুবই কম। তাই আমার শেষ বাক্যগুলো রীতিমতো স্পর্ধার। কিন্তু আমি কেবল আমার বিশ্বাসটাকেই পাঠকদের সঙ্গে ভাগাভাগি করছি, সেটি ধ্রুব সত্য নাও হতে পারে। আমি যত বই পড়েছি, লেখকদের সম্পর্কে যতটুকু জানতে পেরেছি, তাদের প্রত্যেকের লেখার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। বয়স। একেকটি লেখা একেকটি বিশেষ বয়সের মানুষকে লক্ষ্য করে। শিশুতোষ বই, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, কবিতা-প্রত্যেকেরই লক্ষ্য একটি বিশেষ শ্রেণির মানুষ। কিন্তু আরিনার সাথে কথোপকথন হয়তো বাংলা সাহিত্যের প্রথম সাহিত্যকর্ম যা বয়সের সেই প্রচলিত বেড়াজালকে ভাঙতে পেরেছে। শিশুদের ভাবনাকে গুরুত্ব দেবার শিক্ষার পাশাপাশি এখানেই বইটির সবচেয়ে বড় সার্থকতা

খুব শান্ত অথচ স্মিত হেসে ডা. এজাজ “আরিনার সাথে কথোপকথন” নামের বইটি আমার হাতে তুলে দিতে দিতে বলেছিলেন, “কিছু সময় আগেই এটা প্রেস থেকে এসেছে। পাঠক হিসেবে তুমিই প্রথম। তোমার ভালোলাগা-খারাপলাগা আমায় জানিও”। অথচ নগর জীবনে অক্টোপাসের মতো চেপে ধরা সমস্যার নাগপাশ থেকে কিছুটা মুক্তি পেতেই চলে যায় বেশ কিছুদিন। তারপর একদিন বইটি খুলে বসি।

সন্ধ্যার কফি হাতে নিয়ে বইয়ের পাতা উল্টে চলেছি। খুবই কাকতালীয় ঘটনা, হঠাৎ ডা. এজাজ একটা মেসেজে আমার কুশল জানতে চান। আমি সেটি এড়িয়ে জানাই, তার বইটি হঠাৎ হঠাৎ খুব কঠিন ও দুর্বোধ্য মনে হয়। আমি বুঝতে পারি- খুব সরল, প্রাঞ্জল ও ছোট ছোট বাক্যে লেখা বই সম্পর্কে এমন মন্তব্যে তিনি কিছুটা অবাক হন। তিনি ফোন করে পাল্টা জানতে চান, আমি কেন এমনটা বলছি। উত্তরে বলেছিলাম, “প্রকৃত রিভিউ দিতে হলে আগে আমার বাবা হওয়া লাগবে, কখনও কখনও সম্পর্কের অনুভূতি কিছুতেই ধরতে পারি না।” আমার উত্তরে সশব্দে হেসে ওঠেন তিনি। দ্রুত আমার বাবা হওয়া কামনা করেন এবং তারপর আরও একটি রিভিউ চান। 

লেখকের জবানবন্দি

আরিনার বয়স পাঁচ, ডা. এজাজের ছোট মেয়ে। বাবা-মেয়ের আলাপচারিতা নিয়েই লেখা “আরিনার সাথে কথোপকথন”। 

চারপাশে লেখার এত বিষয় থাকতে কেন নিজের ছোট মেয়ে আরিনাকে নিয়ে লিখতে গেলেন সেই জবানবন্দি ফ্ল্যাপেই দিয়েছেন লেখক। তার ভাষায়, “দুই বোন, অহনা পাড়ি দিচ্ছে কৈশোর আর আরিনা শৈশব। এই পাড়ি দিতে গিয়ে যে পর্যবেক্ষণ, প্রতীতি ওদের আন্দোলিত করে সেসব নিয়ে বাবার সাথে কথা হয়, গল্প হয়। বাবা-মেয়ের কথোপকথনে উঠে আসে প্রকৃতি, চারপাশের মানুষ, মুক্তিযুদ্ধ-দেশ, পার্থিব-অপার্থিব জীবন আরও কত কিছু। ছোট মনের বিচিত্র সব ভাবনার কথা বলে শেষ করা যাবে না, যা বাবাকে করেছে মুগ্ধ, বিস্মিত, কখনো কখনো রেখেছে বিনিদ্র। সেই বিমুগ্ধ বিস্ময়ের দিন, বিলোড়িত রাত্রির স্মৃতিকথাই ‘আরিনার সাথে কথোপকথন’।”

বাবা-মেয়ের দিনপঞ্জি

মানুষ যখন পৃথিবীতে আসে, তখন তার রিজিক সঙ্গে নিয়ে আসে। অন্যের সম্পদ দখলের অমনুষ্যত্ব পশু-পাখিরাও দেখায় না। বৃষ্টির এক সন্ধ্যায় কথা হচ্ছিল বাবা-মেয়ের-

বাবা ওই বড় গাছটায় একটা পাখির বাসা ছিল, ভিজে সব নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, আমার খুব খারাপ লাগছে। 

  : আমারও শুনে খারাপ লাগছে। 

  : বাবা পাখিরা অনেক কষ্ট করে বাসা বানায়, পা আর ঠোঁট দিয়ে। আবার বাসা বানাতে পাখিদের অনেক কষ্ট হবে।

বারান্দায় চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছি। চারিদিক সন্ধ্যা শেষে অন্ধকার নেমে আসছে। এই আলো-আঁধারিতেও অহনা আর আরিনার চোখে মুখে বেদনার ছাপ স্পষ্ট ফুটে উঠছে, পাখিদের জন্য বেদনা। 

পাখিরা অনেক কষ্ট করে বাসা বানায়, ঝড়বৃষ্টিতে সেই বা নষ্ট হয়ে যায়, আবার বানায়। সারাদিন পাখিরা মনের আনন্দে ঘুরে বেড়ায়, সন্ধ্যায় নীড়ে ফিরে আসে। খেয়াল করলে দেখতে পাওয়া যায় পরিশ্রম শেষে সন্ধ্যায় নীড়ে ফেরা পাখির ডানায় ক্লান্তির তেমন ছাপ থাকে না। আবার ভোর না হতেই পাখিরা কিচির-মিচির শব্দে বেরিয়ে পড়ে।  কারও সাথে ঝগড়াঝাঁটি নেই, খাবারের চিন্তা নেই, বাসায় জমিয়েও রাখে না তেমন কোনো খাবার। যেটা পাওয়ার সেটা আসবেই, সবার ক্ষেত্রেই, কী জন্য যে আমরা মানুষরা অনেক সময়ই সেটা বুঝতে চাই না বা বুঝি না জানি না।


ডিজিটালের যুগে রঙিন প্রচ্ছদে লেখকের সাদাকালো ছবি ভিন্নতা এনে দিয়েছে। সৌজন্য


একদিন বেড়াতে যাওয়া নিয়ে কথা হচ্ছিলো বাবা-মেয়ের-

  : বাবা, বেড়াতে যেতে চাই। 

  : এখন যে স্কুল খোলা। 

  : স্কুল বন্ধ হলে যাবো। 

   : স্কুল বন্ধ হবে সামনে। 

   : ঠিক আছে যাবো,পাহাড় আর সমুদ্র দু'টাই দেখতে যাবো। 

   : সত্যি,সত্যিই বাবা!  

   : সত্যি। 

   : তুমি অনেক ভালো, অনেক ভালো । 

   : আমার সমুদ্র আর পাহাড় পছন্দ। 

   : আমার বেশি পছন্দ সমুদ্র পাহাড়ও পছন্দ। বিবির (আরিনার বড় বোন) বেশি পছন্দ পাহাড়।

   : তাই।

  : আমার সমুদ্রের পানিতে পা ভিজাতে, গোসল করতে ভাল লাগে, ঢেউ ভালো লাগে, ঝিনুক কুড়াতে খুব ভালো লাগে। বিবি অতটা ভিজতে চায় না। 

   : পাহাড় পছন্দ না তোমার? 

   : পছন্দ, মেঘ দেখা যায় সুন্দর। বাবা তোমার কী পছন্দ?      

  : বাবা আমার কাছ থেকে সমুদ্র পছন্দ আর দূর থেকে পাহাড়। সমুদ্রের পাড়ে বসে থাকতে, পানিতে ভিজতে তোমার মতো ভালো লাগে। পাহাড়ের গায়ে মেঘ দেখতে কী যে ভালো লাগে। আমাদের না উঁচু পাহাড়ে উঠে পুরোপুরি রংধনু দেখার কথা। দেখি রংধনু দেখা পাওয়া যায় কী না।       

  : বাবা, মা আর বিবি'কে এখনই বলবো বেড়াতে যাওয়ার কথা। 

  : বলো। 

আরিনা ভীষণ খুশি বেড়াতে যাওয়ার কথা শুনে। আমার নিজের ভীষণ পছন্দ সমুদ্র আর পাহাড়। যেই সমুদ্র আর পাহাড় আমার এত পছন্দের তা আমি প্রথম নিজের চোখে দেখি অনেক বড় হয়ে, আমার বয়স তখন একুশ।  সমুদ্রের বিশালতার কাছে দাঁড়ালে  জগত-সংসার সব তুচ্ছ মনে হয়।

আরিনার সাথে কথোপকথন বইয়ের প্রচ্ছদ। সৌজন্য


পাহাড়ের আবার অন্য ধরনের সৌন্দর্য, সারি সারি পাহাড়ের গায়ে রোদ আর মেঘের খেলা। মেয়েরা প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য অনুভব করুক, সমুদ্র আর পাহাড়ের মতো বিশাল হোক ওদের হৃদয়। আমার তো দেখি এখনি যেতে ইচ্ছে করছে! "

কখনও হঠাৎ থমকে যাই আমি

পড়তে পড়তে কোথায়ও কোথায়ও হঠাৎ থমকে যাই। বাবার সাথে আমার ছেলেবেলার সময়গুলো আবার খুব কাছ থেকে ধরা দেয়। বাবা মারা যাবার বহুবছর পরও যেন বাবার সান্নিধ্য খুঁজে পাই। কৌতূহলী প্রশ্ন, বাবা-ছেলের খুঁনসুটি,আবদারের ভাণ্ডার আর অযাচিত জ্বালাতনের সেই দিনগুলো কিছুটা আবেগী করে তোলে। মনে হয় সন্তান হিসেবে বাবাকে সরি বলার প্রয়োজন ছিল, তার মতো করে তাকে ভালোবাসতে পারিনি। 

এগিয়ে চলে কথোপকথন

এভাবেই ঘটনা, স্মৃতিচারণায় এগিয়ে যেতে থাকে সময়। মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে বাংলাদেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের সূত্রপাত হয়। বন্ধ হয়ে যায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। স্কুল, খেলার মাঠ, বন্ধুদের মিস করে আরিনা। সংক্রমণ আরও বাড়লে চারপাশের অনেকেই মারা যাবার খবর আসে। একদিন আরিনা বাবার কাছে জানতে চায়, “আল্লাহর কাছে আমরা সবাই চলে যাবো, তোমার সাথে কী আমার দেখা হবে?” বাবা উত্তর দেন, “যদি আমারা বেশি বেশি ভালো কাজ করি, তাহলে আমাদের সবার দেখা হবে।”  

ভাবনাগুলো এগিয়ে যেতে থাকে। মহামারিকালে চারদিকে অনেক পরিচিতজন আমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছেন, বাচ্চারাও খুব ভালোমত বোঝে, জানে। প্রায়ই আজকাল বিক্ষিপ্ত চিন্তা মনে এসে ভর করে। সেদিন কাগজে আঁকুবুঁকি করছিলাম, অদেখা ভুবনের কথা মনে করতে করতে লিখলাম- 

ঘোরলাগা সব

শূন্যের ভেতর ভেসে চলা

ভেসে ভেসে কোথায় যেন চলে যাচ্ছি

কোথায়?

চারপাশ সুনশান

হিমহিম অন্ধকার

মনে হয় খুব একা হয়ে

অন্য এক পৃথিবীর দিকে যাচ্ছি। 

আরিনা কথায় কথায় বলছিল, করোনার ভ্যাকসিন বের হলে সব ঠিক হয়ে যাবে। আবার আমি স্কুলে যেতে পারব। বন্ধুদের সাথে স্কুলের মাঠে খেলব। সবকিছু ঠিক হয়ে যাক, এই আঁধার কেটে যাক, ঝলমলে আলোয় ঝকঝক করুক চারপাশ। নিশ্চয় আল্লাহর সাহায্য নিকটবর্তী। 

আমার উপলধ্বি এবং একটি স্পর্ধা

বইটি কোনো নির্দিষ্ট বয়সের সীমারেখায় বেঁধে দিতে পারবেন না আপনি। একটি শিশু যখন বইটির পাঠক- খুব ছোট বাক্য সহজেই তার বোধগম্য হবে এবং নিজেকে আরিনার স্থানে দাঁড় করিয়ে ভাবনার দুয়ারে পদচারণায় উন্মুক্ত হবে বিশ্ব। আপনি যদি বড় হয়ে যাওয়া সন্তানের পিতা হন, তবে বাবা হিসেবে সন্তানকে সময় দেওয়া, তার চিন্তা-আবেগকে গুরুত্ব দেওয়ার অপ্রচলিত শিক্ষা থেকে নিজেকে দূরে রাখার আফসোস রয়েছে প্রতিটি অধ্যায়ে। শিশু সন্তানের বাবা হিসেবে আপনার সামনে খুলে যাবে অবারিত সম্ভাবনার দুয়ার। আপনি বৃদ্ধ হলেও বইটির প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পড়বেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো, বাবার সঙ্গে আপনার সোনালি অতীত প্রতি মুহুর্তে আপনাকে নাড়া দেবে। বাবা-মেয়ের প্রতিটি ঘটনা, প্রতিটি কথা, শব্দ কিছু সময়ের জন্য হলেও ফিরিয়ে দেবে আপনার জীবনের সবচেয়ে সুসময়। আপনি অবিবাহিত যুবক-যুবতী হলে সেটি অন্যদের চেয়ে আরও ফলদায়ক হয়ে উঠতে পারে- একজন আদর্শ পিতা বা মাতা হয়ে ওঠার সুপ্ত শিক্ষা রয়েছে বইটির প্রতিটি বাক্যে।     

বাংলা সাহিত্যের বিস্তর ভাণ্ডারে আমার পদচারণা খুবই কম। তাই আমার শেষ বাক্যগুলো রীতিমতো স্পর্ধার। কিন্তু আমি কেবল আমার বিশ্বাসটাকেই পাঠকদের সঙ্গে ভাগাভাগি করছি, সেটি ধ্রুব সত্য নাও হতে পারে। আমি যত বই পড়েছি, লেখকদের সম্পর্কে যতটুকু জানতে পেরেছি, তাদের প্রত্যেকের লেখার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। বয়স। একেকটি লেখা একেকটি বিশেষ বয়সের মানুষকে লক্ষ্য করে। শিশুতোষ বই, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, কবিতা-প্রত্যেকেরই লক্ষ্য একটি বিশেষ শ্রেণির মানুষ। কিন্তু আরিনার সাথে কথোপকথন হয়তো বাংলা সাহিত্যের প্রথম সাহিত্যকর্ম যা বয়সের সেই প্রচলিত বেড়াজালকে ভাঙতে পেরেছে। শিশুদের ভাবনাকে গুরুত্ব দেবার শিক্ষার পাশাপাশি এখানেই বইটির সবচেয়ে বড় সার্থকতা

কোথায় পাবেন

অনন্যা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত মোহাম্মদ এজাজ হোসেনের “আরিনার সাথে কথোপকথন” পাওয়া যাচ্ছে অমর একুশে বইমেলার ২২ নম্বর প্যাভিলিয়নে। এছাড়া পাঠকেরা রকমারি.কম থেকেও বইটি সংগ্রহ করতে পারবেন। ইতোমধ্যেই বইটির প্রথম সংস্করণ শেষ হয়েছে।


আরও পড়ুন - বই আলোচনা: একাত্তর ও আমার শৈশব

52
Facebook 50
blogger sharing button blogger
buffer sharing button buffer
diaspora sharing button diaspora
digg sharing button digg
douban sharing button douban
email sharing button email
evernote sharing button evernote
flipboard sharing button flipboard
pocket sharing button getpocket
github sharing button github
gmail sharing button gmail
googlebookmarks sharing button googlebookmarks
hackernews sharing button hackernews
instapaper sharing button instapaper
line sharing button line
linkedin sharing button linkedin
livejournal sharing button livejournal
mailru sharing button mailru
medium sharing button medium
meneame sharing button meneame
messenger sharing button messenger
odnoklassniki sharing button odnoklassniki
pinterest sharing button pinterest
print sharing button print
qzone sharing button qzone
reddit sharing button reddit
refind sharing button refind
renren sharing button renren
skype sharing button skype
snapchat sharing button snapchat
surfingbird sharing button surfingbird
telegram sharing button telegram
tumblr sharing button tumblr
twitter sharing button twitter
vk sharing button vk
wechat sharing button wechat
weibo sharing button weibo
whatsapp sharing button whatsapp
wordpress sharing button wordpress
xing sharing button xing
yahoomail sharing button yahoomail