সড়ক দুর্ঘটনায় জন্ম নেওয়া সেই ফাতেমার চোখজোড়া যেন মা’কে খোঁজে

ময়মনসিংহের ত্রিশালে সড়ক দুর্ঘটনায় পেট ফেটে ভূমিষ্ঠ হওয়ার ফাতেমার বয়স এখন ১ মাস ১৫ দিন। তাকে ঢাকার আজিমপুর ছোটমণি নিবাসে রেখেছে সরকার

“যখন ছোট ছিল তখন খাইয়ে বিছানায় রাখলেই ঘুমিয়ে পড়ত। কিন্তু এখন কোল ছাড়া ঘুমাতে চায় না ফাতেমা, বিশেষ করে রাতে। মায়ের কোল খোঁজে। কিন্তু ওর মাকে পাব কই?”

কথাগুলো বলছিলেন ঢাকার আজিমপুর ছোটমণি শিশু নিবাসের এক মেট্রোন (আয়া)। গত ১৬ জুলাই ময়মনসিংহে সড়ক দুর্ঘটনায় মায়ের পেট ফেটে জন্ম নেওয়া শিশু ফাতেমার তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে আছেন তারা।

বুধবার (৩১ আগস্ট) দুপুরে ফাতেমার খোঁজ নিতে আজিমপুর ছোটমণি শিশু নিবাসে গেলে কথা হয় আয়াদের সঙ্গে। 

ফাতেমার বয়স এখন ১ মাস ১৫ দিন।  

ছোটমণি শিশু নিবাসের তৃতীয় তলায় ঢুকতেই দেখা যায় আয়া ফজিলাতুন্নেছার কোলে ঘুম ঘুম চোখে দুপুরের খাবার খাচ্ছে ফাতেমা। খেতে খেতে ঘুমিয়ে পড়লে, বিছানায় শোয়াতেই কান্না জুড়ে দিয়েছে।


আরও পড়ুন-  ট্রাকচাপায় জন্ম নেওয়া নবজাতকের ঠাঁই হলো আজিমপুর ছোটমণি নিবাসে


তাকে শান্ত করতে করতেই ফজিলাতুন্নেছা বলেন, “দেড় মাস হইয়া গেছে তো, এখন মা’রে  খুঁজে। সহজে ঘুমাইতে চায় না। মাঝে মাঝে কোলে নিলে ঠাণ্ডা থাকে। আবার শোয়াইলে এদিক-ওদিক তাকায়, কী জানি খুঁজে আর কান্দে। হয়ত মা’রে খুঁজে। কিন্তু মা কই পামু? আর ২৮টা বাচ্চা এখানে, কাকে রাইখা কারে কোলে নিমু....”

ফাতেমার ব্যাপারে খোঁজ নিতে কথা হয় ছোটমণি নিবাসের উপতত্ত্বাবধায়ক মোছা. জুবলী বেগম রানুর সাথে। ২০১৬ সাল থেকে ছোটমনি নিবাসের দায়িত্বে রয়েছেন তিনি।

জুবলী বেগম রানু বলেন, “ফাতেমা এখন সম্পূর্ণ সুস্থ। হাতের আঘাতটা সেরে উঠেছে। ও এখানে আমাদের তত্ত্বাবধায়নে সাত বছর পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত থাকতে পারবে। তবে শুনেছি এর আগেই ওর দাদা-দাদি ওকে নিয়ে যাবে। তাই ফাতেমাকে  দত্তক দেওয়া হচ্ছে না। তবে ওর দাদা কবে নিয়ে যাবে সে ব্যাপারে কিছু বলেনি। বলেছে সরকার ঘর-বাড়ি করে দিলে নিয়ে যাবে। 


আরও পড়ুন- সড়কে জন্ম নেওয়া সেই শিশুকে এক মাসের মধ্যে ৫ লাখ টাকা দেওয়ার নির্দেশ


তিনি আরও বলেন, “ফাতেমাসহ এ নিবাসে মোট ২৮টি শিশু রয়েছে। এদের প্রত্যেকেই কেউ হারিয়ে গেছে, নয়তো রাস্তায় ফেলে দেওয়া হয়েছে অথবা হাসপাতালে ফেলে গেছে। সরকারিভাবে তিনজন আয়াসহ আটজন কর্মী ওদের দেখভাল করে।”

সমাজসেবা অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, দেশের ছয় বিভাগে একটি করে ছোটমনি নিবাস রয়েছে। এ নিবাসগুলোতে ৬০০ আসনের বিপরীতে বর্তমানে মোট ১৩৫টি শিশু রয়েছে। 

আজিমপুরের এই ছোটমণি নিবাসে ফাতেমাসহ বর্তমানে ২৮টি শিশু রয়েছে । এদের মধ্যে চারজনের বয়স ০-৯ মাস। বাকিদের বয়স ২-৫ বছরের মধ্যে। ইতোমধ্যে তাদের একজনকে দত্তক নিতে আইনি কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে।


আরও পড়ুন- ট্রাকচাপায় জন্ম নেওয়া শিশুটির হাত ভেঙেছে, তবে শঙ্কামুক্ত


কোনো শিশুকে দত্তক না নেওয়া হলে সাত বছর পূর্ণ হওয়ার পর তাকে সরকারি শিশু পরিবারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

 গত ১৬ জুলাই ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে ট্রাকচাপায় মারা যান ফাতেমার বাবা জাহাঙ্গীর আলম (৪২) ও বোন সানজিদা (৩)। অন্তঃসত্ত্বা মা রহিমা আক্তার ওরফে রত্নার (৩২) শরীরের বা দিক দিয়ে ট্রাকের পেছনের চাকা চলে গেলে পেট ফেটে ভূমিষ্ট হয় ফাতেমা।

সদ্যোজাত শিশুটি বেঁচে গেলেও দারিদ্রতার কারণে  পরিবার তার ভরণপোষণের জন্য আজিমপুরে ছোট মনি নিবাসী পাঠিয়ে দেওয়া হয়। 

৭ আগস্ট  সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য গঠিত ট্রাস্টি বোর্ডকে  এক মাসের মধ্যে  ৫ লাখ টাকা পরিশোধের নির্দেশ দেন আদালত। সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য গঠিত ট্রাস্টি বোর্ডকে এই টাকা দিতে বলা হয়। বিচারপতি খিজির আহমেদ চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন।


আরও পড়ুন- মা-বাবা-বোন হারানো ট্রাকচাপায় জন্ম নেওয়া শিশুটি আইসিইউতে


জানা গেছে,  সোমবার (২৯ আগস্ট)  সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য গঠিত ট্রাস্টি বোর্ডের পক্ষ থেকে এফিডেভিট আকারে  শিশুটির পরিবারকে  ৫ লাখ টাকার চেক হস্তান্তর করেন ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক। 

৩০ আগস্ট হাইকোর্টে আদালতে এ ব্যাপারে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। ট্রাস্টি বোর্ডের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী রফিকুল ইসলাম। রিটের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার সৈয়দ মাহসিব হোসাইন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল প্রতিকার চাকমা।

ADVERTISEMENT

×