https://bng-media.dhakatribune.com/?width=undefined&height=undefined&quality=90&image=/uploads/2020/04/dhakatribune-whatsapp-image-2020-04-01-at-9-41-1585766414186-1587645560019.jpg

চতুর্থ শিল্প বিপ্লব: বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং চ্যালেঞ্জ

ফজলে রাব্বী খান

মতামত

প্রাচীন যুগে ‘‘আগুন’’ আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে মানব সভ্যতার এগিয়ে চলার যে  নতুন যুগের সূচনা হয় তারই পরিক্রমায় কৃষিকাজ ও চাকার মতো ছোট-বড় নানা উদ্ভাবনের মাধ্যমেই যাযাবর আদিম মানুষেরা সমাজ ভিত্তিক সভ্যতার গোড়াপত্তন করে। 

১৭৮৪ সালে জেমস ওয়াটের বাষ্পীয় ইঞ্জিনের আবিষ্কার মানব সভ্যতায় প্রথম শিল্প বিপ্লবের সূচনা  হয়। শ্রমভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থা থেকে আমরা যন্ত্রের মাধ্যমে উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত হই।  ১৮৭০ সালের বিদ্যুতের আবিষ্কার মানব সভ্যতায় নতুন মাত্রা সংযুক্ত করে। ২য় শিল্প বিপ্লবটি ছিল মূলত বিদ্যুতকে কেন্দ্র করে। ৩য় শিল্প বিপ্লবে কম্পিউটার ও ইন্টারনেটের ব্যপক ব্যবহার এবং অটোমেশন প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে সভ্যতা এগিয়ে যায়, অনেকটা অকল্পনীয় গতিতে।

বিগত সময়ের সমস্ত হিসেব-নিকাশকে বাতিল করে আমাদের দরজায় এখন যে শিল্প বিপ্লবটি কড়া নাড়ছে সেটি হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ৪র্থ শিল্প বিপ্লব, যার গতির দৌড় কল্পনার চেয়েও বেশি। ৪র্থ শিল্প বিপ্লবটির ভিত হচ্ছে ‘‘জ্ঞান এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’’ ভিত্তিক কম্পিউটিং প্রযুক্তি। রোবটিক্স, আইওটি, ন্যানো প্রযুক্তি, ডেটা সাইন্স ইত্যাদি প্রযুক্তি প্রতিনিয়ত ৪র্থ শিল্প বিপ্লবকে নিয়ে যাচ্ছে অনন্য উচ্চতায়। 

৪র্থ শিল্প বিপ্লবের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে কর্মবাজারে। অটোমেশন প্রযুক্তির ফলে ক্রমশ শিল্প কারখানা হয়ে পড়বে যন্ত্রনির্ভর। টেক জায়ান্ট কোম্পানি অ্যাপলের হার্ডওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ফক্সকন ইতোমধ্যে  ৬০ হাজার কর্মী ছাটাই করে তার পরিবর্তে রোবটকে কর্মী হিসাবে নিয়োগ দিয়েছে। বিগত বছরগুলোতে চীনের কারখানাগুলোতে   রোবট ব্যবহারের হার বৃদ্ধি পেয়েছে ৩০.৮%। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম তাদের একটি গবেষণা প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ২০২২ সালের মধ্যে রোবটের কারণে বিশ্বজুড়ে সাড়ে ৭ কোটি মানুষ চাকরি হারাবে। ম্যাককিনস গ্লোবাল ইন্সটিটিউটের তথ্যমতে, ২০৩০ সালের মধ্যে চাকরি হারানো মানুষের সংখ্যা হবে প্রায় ৮০ কোটি । ফরচুন ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের অন্তত ৫০০টি নেতৃস্থানীয় কোম্পানি তাদের নিয়োগ প্রক্রিয়া ছেড়ে দিয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার হাতে, অর্থাৎ যন্ত্র এখন মানুষকে নিয়োগ দিচ্ছে। ধরা যাক চালকবিহীন গাড়ির কথা, টেসলা ২০২০ সালে নিউইয়র্কের রাস্তায় এ ধরনের গাড়ি নামানোর ঘোষণা দিয়েছে, অবশ্য দুবাইসহ অনেক জায়গায় পরীক্ষামূলকভাবে চলছে এ ধরনের গাড়ি। অদূর ভবিষ্যতে দেখা যাবে শুধুমাত্র এ ধরনের গাড়ির কারণেই লাখ-লাখ চালককে চাকরি হারাতে হবে। ড্রাইভার ছাড়া গাড়ি পেলে কে চাইবে বেতন দিয়ে ড্রাইভার রাখতে? 

এসব আশঙ্কার ভেতরেই রয়েছে আগামী দিনের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের বিশেষ সম্ভাবনা। বাংলাদেশে বর্তমানে তরুণের সংখ্যা ৪ কোটি ৭৬ লাখ যা মোট জনসংখ্যার ৩০%। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আগামী ৩০ বছর জুড়ে তরুণ বা উৎপাদনশীল জনগোষ্ঠী সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকবে। বাংলাদেশের জন্য ৪র্থ শিল্প বিপ্লবের সুফল ভোগ করার এটাই সব থেকে বড় হাতিয়ার। জ্ঞানভিত্তিক এই শিল্প বিপ্লবে প্রাকৃতিক সম্পদের চেয়ে দক্ষ মানবসম্পদই হবে বেশি মূল্যবান। ৪র্থ শিল্প বিপ্লবের ফলে বিপুল পরিমাণ মানুষ চাকরি হারালেও এর বিপরীতে সৃষ্টি হবে নতুন ধারার নানাবিধ কর্মক্ষেত্র। নতুন যুগের এসব চাকরির জন্য প্রয়োজন উঁচু স্তরের কারিগরি দক্ষতা। ডেটা সাইন্টিস্ট, আইওটি এক্সপার্ট, রোবটিক্স ইঞ্জিনিয়ারের মত আগামি দিনের চাকরিগুলোর জন্য সবচেয়ে বেশি উপযোগী তরুণ জনগোষ্ঠী। 

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা অনুযায়ী, আগামী দুই দশকের মধ্যে মানবজাতির ৪৭% কা স্বয়ংক্রিয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন যন্ত্রের মাধ্যমে হবে। ৪র্থ শিল্প বিপ্লবের ফলে শ্রমনির্ভর এবং অপেক্ষাকৃত কম দক্ষতা নির্ভর চাকরি বিলুপ্ত হলেও উচ্চদক্ষতা নির্ভর যে নতুন কর্মবাজার সৃষ্টি হবে আমাদের তরুন প্রজন্মকে তার জন্য প্রস্তুত করে তোলার এখনই সেরা সময়। দক্ষ জনশক্তি প্রস্তুত করা সম্ভব হলে জনমিতিক লভ্যাংশকে কাজে লাগিয়ে ৪র্থ শিল্প বিপ্লবের সুফল ভোগ করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অন্যান্য অনেক দেশ থেকে অনেক বেশি উপযুক্ত। 

এক্ষেত্রে আমাদের জন্য সবচেয়ে ভালো উদাহরণ হতে পারে জাপান। ২য় বিশ্বযুদ্ধের পর ভঙ্গুর অর্থনীতি থেকে আজকের ২য় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ জাপান পৃথিবীকে দেখিয়ে দিয়েছে শুধুমাত্র মানবসম্পদকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক এবং সার্বিক জীবনমানের উত্তরণ ঘটানো যায়। জাপানের প্রাকৃতিক সম্পদ অত্যন্ত নগণ্য এবং আবাদযোগ্য কৃষি জমির পরিমান মাত্র ১৫%। জাপান তার সব প্রাকৃতিক প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করেছে তার জনসংখ্যাকে সুদক্ষ জনশক্তিকে রূপান্তরিত করার মাধ্যমে। জাপানের এই উদাহরণ আমাদের জন্য সবচেয়ে বেশি উপযোগী। বাংলাদেশের সুবিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে জনসম্পদে রূপান্তরিত করতে পারলে আমাদের পক্ষেও উন্নত অর্থনীতির একটি দেশে পরিণত হওয়া অসম্ভব নয়। 

৪র্থ শিল্প বিপ্লবের সুযোগকে কাজে লাগাতে হলে আমাদের প্রধানতম লক্ষ্য হতে হবে ৪র্থ শিল্প বিপ্লবের উপযোগী সুদক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টি, আর এজন্য প্রয়োজন হবে শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন। জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের জন্য মেধাবীদের মূল্যায়ন করতে হবে, বাড়াতে  হবে গবেষণায় বরাদ্দ। গবেষণাকেই যেন পেশা হিসেবে গ্রহণ করা যায় সেরকম সুযোগ থাকতে হবে এদেশের তরুণ মেধাবীদের জন্য। আর সেরকমটি সম্ভব হলে আমাদের পক্ষে জাপানের মতো মানব সম্পদ ভিত্তিক একটি কল্যাণরাষ্ট্র গঠন করা অসম্ভব হবে না। ৪র্থ শিল্প বিপ্লব এখন কেবল গবেষণা-পত্রের তাত্ত্বিক কথা নয়। প্রতিনিয়ত ডিজিটালাইজেশনের দৌড়ে খাপ খাওয়াতে না পারলে ৪র্থ শিল্প বিপ্লবের সুফল পাওয়া মোটেই সম্ভব হবে না। আগামীর পৃথিবীটি হবে জ্ঞানভিত্তিক প্রজন্মের পৃথিবী, তাই সেই সময়ের জন্য প্রস্তুতি নেয়ার এখনই সময়। অন্যথায় পিছিয়ে থাকার গল্প কেবল বারবারই পুনরাবৃত্তি হতে থাকবে।  


ফজলে রাব্বী খান, প্রকৌশলী এবং কলামিস্ট


 প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রকাশিত লেখার জন্য ঢাকা ট্রিবিউন কোনো ধরনের দায় নেবে না।