https://bng-media.dhakatribune.com/?width=undefined&height=undefined&quality=90&image=/uploads/2020/08/cttc-1597956963538.jpg

সিটিটিসি প্রধান: জঙ্গিরা সাংগঠনিকভাবে দুর্বল

আরিফুর রহমান রাব্বী

মতামত

কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম মনে করেন, জঙ্গিবাদ নিয়ন্ত্রণে আছে। কিন্তু এ নিয়ে আত্মতুষ্ঠিতে ভোগার কোনো কারণ নেই। কারণ জঙ্গিবাদ একটি জটিল ও দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া। তাই কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট বা পুলিশ বা ইনটেলিজেন্ট এজেন্সির একার পক্ষে এটা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ বা দমন সম্ভব নয়।

তারমতে, জঙ্গিবাদ দমনে পরিবার থেকে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সম্পৃক্ততার প্রয়োজন রয়েছে। এছাড়া শিক্ষক, সমাজের লোকজন, মিডিয়া সকলেরই অংশগ্রহণমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জঙ্গিবাদকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। 

ঢাকা ট্রিবিউন: হুজি’র উত্থান ও বর্তমান অবস্থা কী?

মনিরুল ইসলাম: আফগানিস্তানে কথিত জিহাদে অংশগ্রহণ করা লোক দেশে ফিরে আল কায়দার অনুসরণে হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশ (হুজি-বি) তৈরি করে ১৯৯২ সালের ৩০ এপ্রিল।

সে সময় তারা মাদ্রাসাভিত্তিক রিক্রুটমেন্ট করেছিল এবং তাদের প্রশিক্ষণও দেয়। প্রথম দিকে তারা কথিত শরিয়া ‘ল’ (আইন) বাস্তবায়নের জন্য কাজ করছিল। তখন অপারেশনের এলাকা বাংলাদেশকে ওইভাবে না ধরে, তারা চিন্তা করেছিল আশেপাশের দেশগুলোতে তৎপরতা চালাবে। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের শেষের দিকে হুজি-বি’র সঙ্গে একটা রাজনৈতিক দলের এক ধরনের এলায়েন্স (জোট) গড়ে ওঠে।  

এছাড়া ২০০১ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে তৎকালীন বিরোধী দল (বিএনপি-জামাত) চিন্তা করে যে, নির্বাচনের আগে যদি জঙ্গি হামলার মাধ্যমে সরকারের ব্যর্থতা প্রমাণ করা যায়, তাহলে তাদের ক্ষমতায় আসাটা সহজ হবে। আর প্রতিপক্ষকে দুর্বল করতে হত্যার মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়ার পথ সুগম করার চেষ্টাও ছিল। সে কারণে ১৯৯৯ সালে হুজি-বি বিচ্ছিন্নভাবে সহিংস হামলা চলানো শুরু করে। যশোরে উদীচি বোমা হামলা, পহেলা বৈশাখে রমনা বটমূলে বোমা হামলাসহ নানা জায়গায় হামলা চালায় তারা ।

২০০১ সালে বিএনপি-জামাত জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর হুজি-বি’র কার্যক্রম অনেকটা প্রকাশ্যে চলতে থাকে। পরে সরকারের এক অংশের সহযোগীতায় চূড়ান্ত রূপ আমরা দেখি, ২০০৪ সালে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা। এ ঘটনায় পলিটিক্যাল লিডাররা নেতৃত্ব দিয়েছে, সরকারি এজেন্সি ওই জঙ্গিদের সহযোগীতা ও উৎসাহিত করেছে, তাদের সেফ প্যাসেজ করে দিয়েছে। এ ঘটনায় সু্ষ্ঠু তদন্ত না করে বরং ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য নানা রকম চেষ্টা ও নাটক মঞ্চস্থ করেছেন। পরে আর্ন্তজাতিক সম্প্রদায়ের ও জাতীয় চাপ, বিশেষ করে তৎকালীন ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর উপর হামলার কারণে তারা প্রচণ্ড আর্ন্তজাতিক চাপের মুখে পড়ে। ফলে হুজি-বি’কে নিষিদ্ধ করতে বাধ্য হয়।

২০০৯ সালের পর সরকারের জিরো টলারেন্স পলিসির ঘোষণার কারণে তারা সেভাবে সদস্য সংগ্রহ করতে পারেনি। তারা সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে যায়। অনেকে গ্রেফতার হয় বিভিন্ন মামলায়। হুজি-বি’র কেউ কেউ পালিয়ে বিদেশে আশ্রয় নেয়। তাদেরই একজন আতিকুল্লাহ। সে বাংলাদেশে এসে মূলত তার পুরোনো সহকর্মীদের উদ্বুদ্ধ করার মাধ্যমে অর্গানাইজড করার চেষ্টা করছিল। তাকেও আমরা গ্রেফতার করেছি। এখন হরকাতুল জিহাদের সেভাবে সংগঠিত হওয়ার সম্ভাবনা কম। এটা যেভাবে গড়ে উঠেছিল সেটা বলা যায় ফাস্ট জেনারেশন জঙ্গি। তারা কিন্তু নতুনদের বা তরুণদের আকৃষ্ট করার মত কোনো স্ট্রাটেজি ট্যাকটিস নির্ধারণ করেনি। যেহেতু ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়ায় বিকশিত হওয়ার আগেই তারা তাদের সাংগঠনিক ক্ষমতা হারায়, ফলে হুজির এপিলটা তরুণ জেনারেশনের ভেতরে তারা ছড়িয়ে দিতে পারেনি।

ঢাকা ট্রিবিউন: জঙ্গিরা কি গোপনে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে, আপনাদের কাছে কি তথ্য রয়েছে?

মনিরুল ইসলাম: জঙ্গি গ্রুপগুলোর আসলে সেভাবে কোনো কিছু করার সক্ষমতা নেই। হিযবুত তাহরীর বাংলাদেশে ভায়লেন্সে লিপ্ত না হলেও, এরা কোনো কোনো বাহিনীকে উস্কানি প্রদানের জন্য কিছু পোস্টার ও লিফলেট বিলি করে। কোথাও কোথাও ঝটিকা মিছিলও করে। এরা মূলত অনলাইন ভিত্তিক প্রচার প্রপাগান্ডা চালায়। তবে এ ধরনের অনলাইন প্রচারণা আগের থেকে অনেক কমে গেছে।  

২০১৬ সালের এপ্রিল মাসের সর্বশেষ জুলহাস মান্নান হত্যার ঘটনার পর এ সংগঠন নাশকতা বা হত্যাকাণ্ড করতে পারেনি। কারণ বিভিন্ন সময়ে তাদের নেতাদের অনেককেই গ্রেফতার করা হয়েছে। অনেকে গ্রেফতার এড়াতে পলাতক রয়েছে। ফলে এই নিষিদ্ধ সংগঠন মূলত অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন কার্যক্রম করে সদস্য সংগ্রহের চেষ্টা করে। সম্প্রতি তারা তাদের ন্যারেটিভে কিছুটা পরিবর্তন এনেছে। তারা মনে করে, বাংলাদেশে কথিত জিহাদের পরিবেশ নেই। সেই কারণে বাংলাদেশে জিহাদী তৎপরতা না চালিয়ে পৃথিবীর যেখানে যেখানে জিহাদের পরিবেশ বজায় আছে সেখানে যাওয়ার এটা প্রচেষ্টা তাদের রয়েছে। 

অন্যদিকে, ২০১৬ সালেই নব্য জেএমবির সাংগঠনিক সক্ষমতা চূড়ান্ত অবস্থায় ছিল। তবে হলি আর্টিজানের পর বিভিন্ন অভিযানে সংগঠন, মাস্টারমাইন্ড, ট্রেইনার অনেকেই নিহত হয়েছে অথবা গ্রেফতার হয়েছে। তখন কিছুটা দুর্বল হয় তারা। পরে ২০১৭ সালেও তাদের সক্ষমতা পুনরায় গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিল মাইনুল ইসলাম মুসার নেতৃত্বে। কিন্তু মৌলভীবাজারের অপারেশনে সে নিহত হয়। এছাড়া সক্ষমতা যতটুকু গড়ে উঠেছিল, সেটা আমরা ভেঙ্গে দিতে পেরেছি বিভিন্ন জায়গা অভিযান চালিয়ে। সে কারণে নব্য জেএমবি আর সাংগঠনিকভাবে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি। যে কারণে ২০১৮ সালে তেমন একটা ঘটনাও ঘটাতে পারেনি।

কিন্তু ২০১৯ সালে নব্য জেএমবি আবার ঢাকায় ৫টি ও খুলনায় দুটি স্থানে বোমা পেতে রেখে বিস্ফোরণ ও বিস্ফোরণের চেষ্টা করেছিল। তারাও সবাই শনাক্ত ও গ্রেফতার হয়েছে।

এ বছরও তারা চট্টগ্রামে একটা হামলা করেছে এবং ঢাকায় ও সিলেটে হামলার চেষ্টা করেছে। এরাও গ্রেফতার হয়েছে। ফলে তাদের ওই সাংগঠনিক কাঠামো নেই। তারপরও তাদের স্লিপার সেণ বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন সময়ে চেষ্টা করে। তবে তাদের সক্ষমতা নেই।

ঢাকা ট্রিবিউন: জঙ্গি দমনে কী কী পদক্ষেপ নিচ্ছেন?

মনিরুল ইসলাম: অপারেশনাল এপ্রোচের পাশাপাশি আমরা সফট এপ্রোচে জঙ্গিবাদ দমনে চেষ্টা করছি। কারা ভালনারেবল গ্রুপ, তাদের আইডেনটিফাইড করে সেখানে ইন্টারভেনশনের মাধ্যমে যাতে তারা জঙ্গিবাদের ফাঁদে পা না দেয় তার ব্যবস্থা করা। যারা ইতোমধ্যে রেডিকেলাইজড হয়েছে কিন্তু টেররিস্ট হয়নি, তাদেরকে ওই পর্যায়ে ইন্টারভেনশন করার পাশাপাশি যারা টেররিস্টের সাথে লিপ্ত হয়েছে তাদের গ্রেফতারের মাধ্যমে আইনি প্রক্রিয়ায় নিয়ে আসা। পাশাপাশি যারা জেলখানায় আছে, জামিনে মুক্তি পেয়েছে কিংবা সাজা খেটে বেরিয়েছে তাদেরকে ডিরেডিকেলাইজড করে রিহেবিলিটেশন করা।

ইতোমধ্যে আমরা দেশব্যাপী জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে অ্যাওয়ারনেস বিল্ডিংয়ের কাজ শুরু করেছি। সেখানে স্টেকহোল্ডার হিসেবে থাকেন গ্রামের চৌকিদার, দফাদার, ইউপি মেম্বোর, চেয়ারম্যান, টিচার, স্টুডেন্ট, সাংবাদিক, কালচারাল অ্যাক্টিভিস্ট, মাদ্রাসা স্টুডেন্ট, মাওলানা। এর পাশাপাশি ক্ষেত্র বিশেষে প্রিজন গার্ডস, আনসারকেও আমরা অ্যাওয়ারনেস বিল্ডিংয়ে নিয়ে এসেছি। যেন তারা তৃণমূল পর্যায়ে জঙ্গিবাদের বিপক্ষে কর্মকাণ্ড চালায়।

জঙ্গিবাদ একটা জটিল বিষয়। এটা থেকে উত্তোরণের জন্য বেশ কিছু অ্যাকাডেমিক রিসার্চ প্রয়োজন। সে রকম বেশ কয়েকটি অ্যাকাডেমিক রিসার্চ ইতোমধ্যে সস্পন্ন হয়েছে। ৮টি রিসার্চ ফাইন্ডিংস আমরা জমা দিয়েছি। এগুলো প্রকাশের ব্যবস্থা নিচ্ছি। আমরা মনে করি, জঙ্গিবাদ নিয়ন্ত্রণে আছে। কিন্তু আত্মতুষ্ঠিতে ভোগার কোনো কারণ নেই। কারণ জঙ্গিবাদ একটি জটিল ও দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া। এটি শুধুমাত্র কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট বা পুলিশ বা ইনটেলিজেন্ট এজেন্সির একার পক্ষে এটা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ বা দমন সম্ভব নয়।

বরং পরিবার থেকে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সম্পৃক্ততার প্রয়োজন রয়েছে। এছাড়া শিক্ষক, সমাজের লোকজন, মিডিয়া সকলেরই অংশগ্রহণমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জঙ্গিবাদকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।